ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 February 2019, ৯ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাঙালি জাতিসত্তা ও বাংলাভাষা

-ড. এম এ সবুর
আধুনিক বিশ্বে ‘বাঙালি’ জাতির স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বা ও বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ প্রাক-মুসলিম যুগে তথা খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকের আগে বাংলা নামে বিশেষ কোন অঞ্চলের এবং বাঙালি জাতির কোন অস্তিত্ব ছিল না। এখানে ছিল খন্ড খন্ড কতগুলো জনপদ। এ সব খন্ডিত জনপদগুলোর নাম ছিল বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, বরেন্দ্র, সমতট ও হরিকেল। আর এসব জনপদে বসবাস করতেন বহু ‘কৌম’ বা নরগোষ্ঠীর লোকজন। তারা অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, তিব্বতি, চীনা ভাষাভাষি বহু কৌম বা নরগোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। তারা স্ব স্ব জনপদের নামেই পরিচিত হত। এসব নরগোষ্ঠীর সাথে এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে সংঘাত-সংমিশ্রণ ঘটেছিল ইন্দো-আর্যভাষী জনগোষ্ঠীর। তাদের মধ্যে কোন আঞ্চলিক সংহতি ছিল না। তখন বাঙলা বা বাঙালি নামে কোন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী অভিহিত ছিল না। এ অঞ্চল ‘বাঙলা’ ও অধিবাসীরা ‘বাঙালি’ জাতি নামে প্রথম অভিহিত হয় খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকে সুলতান হাজি শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহর শাসনামলে। আর তখন থেকেই বাংলাভাষার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে বাংলাভাষা আধুনিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য ঋগবেদে ‘বঙ্গ’ বা বঙ্গদেশ সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ নাই। তবে ঋগবেদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ঐতরেয় (১৪০০-১০০০ খ্রি: পূর্ব) এর একটি পদে ‘বঙ্গ’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ‘বঙ্গবাসী’ তথা ‘বঙ্গ’ জনপদবাসীকে পাখী আখ্যাত করে বলা হয়েছে বয়াংসি বঙ্গবগধবাশ্চের পাদা (২য়/১ম/১)। প্রচীনকালে বৈদিক আর্যরা ‘বঙ্গ’ বা এ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে অনার্য দাস শ্রেণীর অর্ন্তভূক্ত বলে মনে করতেন। তারা এ জনপদের অধিবাসীদেরকে মানুষ না বলে পশু-পাখীর সাথে তুলনা করতেন। এজন্য তারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে বাঙ্গবাসীকে মানুষ না বলে পাখী হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এ জনপদের ভাষাকে ‘পক্ষীর বুলি’ হিসেবে অবজ্ঞা করেছেন। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত বহিরাগত ব্রাহ্মণ সেনরা বাঙলা ভাষার বিরুদ্ধে তাদের এ অবজ্ঞা ও বিশ্বাস প্রচার করতেন।
ভারত উপমহাদেশে আর্যকরণ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ বছর আগে থেকে। ইউরোপ থেকে আগত আর্যরা দীর্ঘকাল পর্যন্ত পারস্য পেরিয়ে ভারতে আগমন করে। তৎকালীন দ্রাবিড় অধ্যুষিত সিন্ধু-পাঞ্জাব ও উত্তর ভারত আর্যদের দখলভূক্ত হওয়ার পর আর্যরা পূর্ব ভারতের দিক অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু স্বাধীন মনোভাবসম্পন্ন ও নিজ কৃষ্টি গর্বে গর্বিত বঙ্গবাসীরা আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে বাঁধা সৃষ্টি করে। এতে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত এসে আর্যদের সামরিক অভিযান থমকে দাঁড়ায়। তৎকালীন এতদাঞ্চলের অধিবাসীদের প্রতিরোধের ফলে খ্রিষ্টপূর্ব চার শতক পর্যন্ত এ অঞ্চলে আর্যকরণ সম্ভব হয় নাই। সামরিকভাবে অভিযান ব্যর্থ হওয়াতে আর্যরা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাই দেখা যায় মৌর্য বংশ (খ্রিঃপূর্ব ৪ শতক) শাসন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনৈতিকভাবে ও সাংস্কৃতিকভাবে আর্যকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর খ্রিষ্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত রাজবংশের শাসনামলে বঙ্গ অঞ্চলে আর্যকরণ প্রায় সম্পন্ন হয়। গুপ্ত আমলে বঙ্গ অঞ্চলে আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদীদের প্রচন্ড প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মৌর্য ও গুপ্ত রাজবংশের শাসনামলে আর্যভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। এর প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণ জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মকে আশ্রয় করে সংঘঠিত হয়। এ সময় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতি বঙ্গ, রাঢ় ও গৌড় অঞ্চলের জনগণের আত্মরক্ষার সংগ্রামে শক্তির নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। আর জনগণের আর্যআগ্রাসন বিরোধী প্রতিরোধ শক্তিকে অবলম্বন করেই বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের প্রধান ধর্ম-সংস্কৃতি হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শুরুর দিকে গুপ্ত রাজাদের মহাসামন্ত ব্রাহ্মণ্য শৈবধর্মের অনুসারী শশাংক গৌড় অধিপতি হন এবং তিনি মুর্শিদাবাদের কর্র্ণসূবর্ণে গৌড়ের রাজধানী স্থাপন করেন। তার শাসনামলে এ অঞ্চলে অধিক সংখ্যক পশ্চিম ভারতীয় আর্যদের অনুপ্রবেশ ঘটে। শিবপুজারী রাজা শশাংক বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মূলের নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি গয়ায় বৌদ্ধধর্মের তীর্থ গাছ ‘বোধি বৃক্ষ’ ছেদন করেন। এছাড়া সেতুবন্ধ (মুর্শিদাবাদের ভাটির অঞ্চল) থেকে হিমালয় পর্যন্ত তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করার নির্দেশ জারী করেন। রাজা শশাংকের পরে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শেষার্ধ থেকে অষ্টম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ‘মাৎসন্যায়ের’ একশ বছর এতদঞ্চলে চরম বিশৃংখলা বিরাজ করেছিল। ‘মাৎসন্যায়ের’ এ অ›দ্ধকার যুগে বৌদ্ধধর্মের সাংস্কৃতিক আদর্শের  উপর আর্যসংস্কৃতির প্রভাব বেড়ে  যায়। আর এ সময়  এ অঞ্চলে সংস্কৃতি ভাষাও  মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
‘মাৎসন্যায়’ যুগের  অবসান ঘটিয়ে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের মধ্যভাগে গৌড়-বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবালম্বী পাল শাসনের সূচনা হয়। পাল আমলে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজস্ব সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। এ সময় বিভিন্ন ‘বৌদ্ধবিহার’ ‘সংঘারাম’ শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিক্রমপুরের অতীশ দীপংকর (৯৮০-১০৩৫) এ যুগের বিশ্ববিশ্রুত জ্ঞান সাধকের নাম। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শীলভদ্র ছিলেন একজন বঙ্গবাসী। তিনি চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের শিক্ষক ছিলেন। পাল বংশের শাসনামল প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। এ সময় বৌদ্ধধর্ম গৌড়-বঙ্গ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও বিস্তৃতি লাভ করে। পাল রাজাদের উদারতার ফলে বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতির সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তথাকথিত এ সমন্বেেয়র কারণে সংস্কৃতসেবী ব্রাহ্মণরা বৈদিকধর্ম-সংস্কৃতি দূর করার সুযোগ পায়। এ কারণে পরবর্তীতে বঙ্গ-গৌড় থেকে বৌদ্ধধর্ম প্রায় নির্বাসনে যায়।
মূলত পাল যুগ ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জ্ঞান চর্চার যুগ। এ যুগেই বাংলাভাষার আদি সৃহ্যমানকাল হিসেবে আখ্যাত করা হয়। অর্থাৎ এসময় বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ রচিত হয়। তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের বিধি-বিধান, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবন-জীবিকা, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে এসব চর্যাপদে। চর্যাপদের ব্যাকরণ, ছন্দ-অলঙ্কারের কিছু কিছু ব্যতিক্রম দৃষ্টিগোচর হলেও সেগুলোতে বাংলার আদিরূপই বিধৃত হয়েছে। অধিকাংশ চর্যাপদ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে রচিত এবং এগুলো বাংলাভাষার নিজস্ব সম্পদ। তাই বলা যায় চর্যাপদই বাংলা ভাষার শৈশবকাল। কিন্তু চর্যাপদের ভাষা স্থায়িত্ব লাভের আগেই ভারতের দক্ষিণ কর্ণাটক থেকে আগত সংস্কৃতভাষী সেন শাসকেরা বাংলাভাষা চর্চাকে নিষিদ্ধ করেন এবং সংস্কৃতকে রাজভাষা করেন। অধিকন্তু তারা ‘রৈরব’ নামক নরকের ভয় দেখিয়ে বাংলাভাষাকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখার কৌশল করেন। এ ভয়ে সরকারি কর্মচারি ও উঁচু বর্ণের মানুষেরা বাংলাভাষা চর্চা বাদ দিলেও সাধারণ মানুষেরা তাতে কর্ণপাত করেন নাই। তারা ‘পক্ষির বুলি’ তথা বাংলাভাষাকে ছাড়েন নাই এবং বিদেশী ভাষা সংস্কৃতকে মন থেকে গ্রহণ করেন নাই।
১২০৩ সনে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে সেন শাসনের অবসান হলে এ দেশের অধিবাসীরা আবার নতুন করে বাংলাভাষা চর্চা করার সুযোগ পান। তুর্কিরা বিদেশী হলেও তারা স্থানীয় বাংলাভাষাকে অবমূল্যায়ন করেন নাই। ফার্সিকে তারা রাজভাষা করলেও বাংলাভাষা চর্চায় কোন নিষেধাজ্ঞা-ভয় দেখান নাই। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সংঘর্ষ এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের কারণে এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্য নাই। তখন বাংলাদেশ কিংবা বাংলাভাষা ভিত্তিক কোন অঞ্চল ছিল না। সুলতানী শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। ১৩৫২ সনে হাজি শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুন্ড্রবর্ধন, লক্ষ্মণাবতী, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি বাংলাভাষী অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘সুবহি বাঙ্গালা’ নাম দেন। আর এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। এতে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হবার সুযোগ পায় এবং বাংলাভাষার পুর্নজন্ম হয়। এ সময় বড়– চন্ডীদাস ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ (১৩৫০) কাব্য রচনা করে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বন্ধ্যাত্ব ঘুচান। আর শাহ্ মুহাম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ (১৩৮৯-১৪১০) রচনা করে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে রোমান্টিকতার আবির্ভাব ঘটান। পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ, জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ্, রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ্, আলাউদ্দীন হুসেন শাহ প্রমুখ মুসলিম নৃপতিদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু, জৈনুদ্দীন, বিজয় গুপ্ত, কৃত্তিবাস, মুজাম্মিল, বিপ্রদাস পিপিলাই প্রমুখ কবি বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। মূলত পাঠান বংশের স্বাধীন সুলতানদের শাসনামলে (১৩৩৮-১৫৭৫) বাংলাভাষার পুনর্জাগরণ হয়। এরপর মোঘল শাসনামলে সৈয়দ সুলতান, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আব্দুল হাকিম, দৌলত উজীর বাহারাম খান, কোরেশী মাগন ঠাকুর, সৈয়দ আলাওল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর প্রমুখের সাহিত্য সাধনায় বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রভুত উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।
প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসকরা শুধু ‘বাঙালাভাষা’ ও ‘বাঙালি’ জাতিকে স্বতন্ত্র সত্ত্বায় প্রতিষ্ঠিত করেন নাই বরং তারা ‘বাঙালাভাষা’ ও সংস্কৃতি চর্চাকে সমৃদ্ধ করতেও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। গৌড়ের মধ্যে প্রায় বিলীন হওয়া ‘বঙ্গ’ জনপদকে যেমন তারা শুধু রক্ষাই করেন নাই বরং প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তেমনি সেন শাসনামলে সংস্কৃতভাষা দিয়ে বাংলাভাষাকে ঢেকে দেয়ার ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাভাষাকে উদ্ধার করে তারা বিশ্ব দরবারে অন্যতম মর্যাদাশীল ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাল আমলে জন্ম নেয়া সৃহ্যমান বাংলাভাষাকে যখন সেন শাসকরা আতুর ঘরেই গলা টিপে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল তখনই বাংলাভাষার আর্শীবাদস্বরূপ মুসলিম শাসকদের আগমন ঘটেছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় এবং হিন্দু-মুসলিম সাহিত্যিকদের মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাভাষা-সাহিত্যের বিকাশ ও সমৃদ্ধি আসে। কিন্তু ১৭৫৭ সনে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসকের পরিবর্তনের সাথে ভাষা-সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়। এতে মুসলিম শাসনামলের বাংলাভাষার পুনর্জাগরণ স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং নিম্ন মানের মিশ্রভাষার ‘পুঁথি সাহিত্য’ ও ‘কবিয়াল গান’র আর্বিভার ঘটে।
তবে ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ব্যাঘাত ঘটলেও পরে উন্নতি সাধিত হয়। ইংরেজ শাসনামলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শুধু কাব্য সাহিত্য পাওয়া যায়, এ সময় বাংলাভাষায় কোন গদ্য সাহিত্য রচিত হয় নাই। অন্যদিকে ইংরেজ শাসনামলে বাংলাভাষায় গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি গদ্য সাহিত্যের সূচনা হয়। এ সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র  চট্টোপাধ্যায়, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, জীবনান্দ দাশ, জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবি সাহিত্যেকেরা বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। ১৯১৩ সনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে নোবেল বিজয় বিশ্ব দরবারে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে মুসলিম ও ইংরেজ শাসনামলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও ব্যাপ্তি বাড়লেও কখনও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায় নাই। অথচ ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলে জাতীয় ভাষার উন্নতি ও মর্যাদা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই ১৯৪৭ সনে ইংরেজ শাসন অবসানের পর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অধিবাসীরা বাংলাভাষা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখলেন। তারা বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। কিন্তু উর্দুভাষী শাসকেরা বাঙালিদের দাবি উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ। জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে আন্দোলন করেন তারা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮ বাংলা) তারিখে ঢাকায় পুলিশের গুলীতে নিহত হন সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক, রফিক, শফিউদ্দীনসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৫৬ সনে তৎকালীন সরকার পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় ‘শহীদ দিবস’। আর তাদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় রাখতে নির্মিত হয়েছে আমাদের ‘শহীদ মিনার’। অধিকন্তু ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতিসংঘ ১৯৯৯ সনে ইউনেস্কোর মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে। তাই বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক রাষ্ট্র এ দিবসটি পালন করছে। প্রকৃতপক্ষে গ্রহণ বর্জন এবং অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে বাংলাভাষার অবস্থান বিশ্ব দরবারে আজ সুসংহত হয়েছে। আর এ ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনের জন্য বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষা শহীদেরা আত্মত্যাগ করে বিশ্ববরণীয় হয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ