ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 February 2019, ৯ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভাষার জন্য ভালোবাসা

-ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান
বাংলার দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবার দাবিতে সোচ্চার হয়ে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন- তা সোনার অক্ষরে খুুদিত হয়ে গেলো ভাষার ইতিহাসের প্রস্তরখন্ডে। সেই আত্মত্যাগের কারণে এই দেশের স্বাধীনতার বীজ সেই দিনেই রূপিত হয়েছিল এই দেশের জনমানুষের চৈতন্য এবং স্বাধীন সত্তার বেদীমূলে। মাতৃভাষার জন্য ভালোবাসার কারণে এই দেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সূচনা ও সেইদিন ঘটেছিল। মাতৃভাষার প্রতি গভীরতম ভালোবাসার পথ ধরে স্বাধীনতার জন্য বিদেশী দখল মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করবার স্পৃহা তাই ধীরে ধীরে জাগ্রত হতে থাকে। সাতচল্লিশে যদি ভারত বিভক্ত না হত, তবে ভাষার জন্য যে ভালোবাসা তা তেমন ধোপে টিকতো কিনা প্রবল সন্দেহ। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের তখন কি বলার এবং কি করবার থাকতো- তা অনুমান করাও এই মুহূর্তে সুকঠিন বলেই প্রতীয়মান।
গোটা ভারতবর্ষে তাদের জাতীয় ভাষা হিন্দির যে দাপট ও আগ্রাসী মনোবৃত্তির প্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে- সেইটার জন্য অখন্ড ভারত বর্ষের সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকবৃন্দ কি ভূমিকায় তখন অবতীর্ণ হতেন, তা আজ বোধগম্য না হলেও সহজেই অনুমেয় যে, ভারতীয় মুসলিম জনগোষ্ঠির যে ভাগ্য আজ বিদ্যমান, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাই আমাদেরকে বরণ করতে হতো বাধ্য হয়েই। এ ব্যতীত অন্য কোন উপায় কি খোলা থাকতো তখন? কস্মিনকালেও সেই আশা পূরণ হওয়ার সুযোগ ঘটতো না। ঘটার কোনো দূরতম আশা পোষনের সম্ভবনাই থাকতো না। তাই বলি ভারত ভাগের জন্য মুসলিম নেতৃত্ব যেমন দায়ী নন, তেমনি হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রবল গরজ ও কারণেই যেহেতু ভারত বিভক্তি ঘটেছে, সেহেতু আমরা যারা স্বাধীন দেশে বাস করছি শ্বাস নিচ্ছি, বেঁচে বর্তে আছি, স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করছি। নিজেদের ভূখন্ডের ভালো-মন্দের খবরা খবর নেই। সে সুযোগের জন্য সেই মহামূল্যবান সুবিধার সৃষ্টির জন্য একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করছি কৃতজ্ঞচিত্তে। বিস্ময়কর প্রতিভা, জগৎ বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের আর্বিভাব ঘটিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভান্ডার কে সুসমৃদ্ধ করে দিলেন যে মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের মাতৃভাষাকে উন্নতকরণ, জীবনের সকল ক্ষেত্রে মাতৃভাষা প্রয়োগ ও ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেন। তার সদ ব্যবহার আমরা কতটুকু করছি তার খোঁজখবর নেওয়া কি প্রয়োজন নয়? অবশ্যই- কারণ মানুষের যে মহান সৃষ্টিকর্তা তিনিই যেহেতু মানুষের ভাষা সৃষ্টি করেন-তিনিই যেহেতু আমাদের মাতৃভাষা সৃষ্টি করে দিয়েছেন-বিশ্বের মধুরতম একটি ভাষা আমাদের জন্য নির্ধারণ করলেন তার সর্বাত্মক ব্যবহার ও  মূল্যায়ন সময়ের দাবী- কারণ পৃথিবীর অগণিত ভাষা রয়েছে যেগুলো মানুষের সঠিক ব্যবহার প্রয়োগ এবং আন্তরিক চর্চার অভাবে এক সময়ের জীবন্ত ভাষা মৃত ভাষায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের এমন ধরনের অসংখ্য মৃত ভাষার সন্ধান পাওয়া যায় - যেগুলো ছিল এক সময় জীবন্ত ও সচল ভাষা। কিন্তু মানুষের অপব্যবহার এবং ব্যাপক চর্চাহীনতার কারণে সেসবের জীবন বায়ু নিশেষ হয়ে গেছে। অথবা অর্ধমৃতাবস্থায় বিদ্যমান। সুতরাং  বাংলাভাষার এক সময়ের প্রধান জন্ম স্থান ও চর্চার কেন্দ্রে আজ যে ‘মহামারী’ লেগে ‘গ্রাম উজাড়’ হওয়ার পথে সেটা মাথায় নিয়ে আজকের বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে চিন্তাভাবনা করবার প্রয়োজন। বাস্তব সম্মত কার্যক্রম গ্রহণ এবং তা বিপুল ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
বাংলা একাডেমির উদ্যোগে প্রতি বছর যে বইমেলা উদযাপিত হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশেরই গৌরবের একটি বলিষ্ঠ প্রতীক। এমন চমৎকার এবং বিপুল আয়োজন সত্যিকারার্থে বাংলাভাষাকে অনেক উর্ধ্বে তুলে নিবে। সন্দেহে নেই। কিন্তু একটা বিষয় খুবই দুঃখজনক যে, দলমত নির্বিশেষের দিকে এই মেলা সমান এবং সার্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দলমত নির্বিশেষের চিন্তা চেতনার স্রোত যদি অবাধ হয় তবে চিন্তার স্বাধীনতার সুযোগ পায়  এবং জনগনের মধ্যে উন্নত চিন্তা চেতনার প্রবাহ্ বইবে এবং একটা সচেতন এবং প্রজ্ঞাবান জাতি গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পাশ্চাত্য চিন্তা চেতনার অবাধ প্রবাহ সৃষ্টি ও প্রসারের কারনে সেদেশে বিপুল সংখ্যক প্রজ্ঞাবান ও জগৎ বিখ্যাত মনীষীর জন্ম সম্ভব হচ্ছে। এ দিকটা  আমাদের কে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। চিন্তা চেতনার অবাধ প্রবাহের কারণে সে দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ নতুন চিন্তাধারা সম্বলিত বই পুস্তক প্রতি বছর রচিত ও প্রকাশিত হচ্ছে এবং সারা বিশ্বে তাদের পাঠক উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে। আমাদের কে তাই সংকীর্ণ চিত্ততা ত্যাগ করতে হবে। তাহলে আমরাও তাদের মত মনীষীদের সাক্ষাৎ পাবো, আমাদের দেশেও অগণিত প্রতিভা জন্মের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ