ঢাকা, শুক্রবার 22 February 2019, ১০ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পর্নোগ্রাফির কারণসমূহ ঃ ক্ষতি এবং তার প্রতিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [ছয়] মদের নিষিদ্ধতা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, “মদ সকল মন্দ ও অশ্লীলতার উৎস এবং যাবতীয় মন্দের মধ্যে ওটা সর্বনিকৃষ্ট। ‘‘ইমাম দারু কুতনী, আস-সুনান, অধ্যায়: আল-আশরিবাহ ওয়া গুাইবিহা, প্রাগুপ্ত, পৃ: ৪৯৫’’ আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা: বলেছেন “মদের সাথে জড়িত এমন দশ শ্রেণীর লোকদের ওপরে আল্লাহর অভিশাপ। তারা হলো (১) যারা তা’ তৈরী করে (২) যাদের জন্য তা বানানো হয় (৩) যারা তা পান করে (৪) যারা তা বহন করে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় নিয়ে যায় (৫) যাদের জন্য তা নিয়ে আসা হয় (৬) যারা তা পরিবেশন করে (৭) যারা তা বিক্রি কর (৮) যারা তা বিক্রি লব্ধ টাকা ব্যবহার করে (৯) যারা তা কেনে এবং (১০) যারা অন্য আর একজনের জন্য তা কেনে। ‘‘আবূ আব্দুল্লাহ আন-নিশাপুরী, আল-মুসতাদরাক ‘আলাস-সাহিহাইন, অধ্যায়: আল-আত’ইমা, পরিচ্ছেদ: ইন্নাল্লাহু লা’আনাল খামারা ওয়া শারিবিহা, বৈরূত: দারুল-কুতুব আল-ইসমিয়্যাহ, তা.বি. পৃ: ৮১৫’’

অশ্লীলতা প্রতিরোধে পর্দার ব্যবস্থাপনা ঃ পর্দাহীনতা আর নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা সমাজে কেমন বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এবং নারীকে কীভাবে ভোগ্য-পণ্যের বস্তুত পরিণত করেছে তা চারদিকে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাওয়া যায়। পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, দাম্পত্য কলহ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিবাহ-বিচ্ছেদ, নারী-নির্যাতন ইত্যাদি সবকিছুর পেছনেই একটি প্রধান কারণ হলো পর্দাহীনতা এবং নর-নারীর অবাধ মেলা-মেশা। আল্লাহ নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং জাহেলিয়াত যুগের নারীদের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করে অশ্লীলভাবে ঘোরাফেলা কর না। ‘‘আল-কুরআন, ৩৩:৩৩’’ আল্লাহ পুরুষ এবং নারীদেরকে সমবেতভাবে পর্দার আদেশ দিয়ে বলেন, “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের সৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গেহর হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গকে হিফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত: প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভূক্ত বাদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। ‘‘আল-কুরআন, ২৪:৩০-৩১’’

ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে শুধু পরস্পরের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দিতেই বারণ করেনি; অধিকন্তু সকল প্রকারের দৈহিক সংস্পর্শ থেকেও বিরত থাকতে নির্দেশ প্রদান করেছে। ইসলাম মনে করে, দুর্ঘটনা ঘটার আগে তার পথগুলো বন্ধ করাই শ্রেয়। কিছু সংখ্যক লোক ইসলামের পর্দা-ব্যবস্থাকে সমালোচনা করে এবং এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম নারীদের উপরে এক প্রকার এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বলে মনে করে, যার ফলে তারা মানবীয় কার্যাদিতে ইচ্ছামত অংশগ্রহণ করতে পারে না বলে মনে করে অথচ এ ধারণা সঠিক নয়। ইসলাম পর্দাপ্রথার মাধ্যমে নারী জাতিকে মর্যাদা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে এবং তাঁকে এমন এক নিরাপত্তা দান করেছে, যার ফলে একজন নারী অধিকতর স্বাচ্ছন্দের সাথে তার কাজকর্মসমূহ সমাধা করতে পারে। তাই পর্দা মুসলিম নারীকে প্রশান্তি দান করেছে।

তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা ঃ বর্তমান যুগে বিশেষত পাশ্চাত্য-বিশ্বে নারীকে তাঁর নিজের ভাগ্যনিয়ন্তা রূপে আখ্যায়িত করা হয়। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সাথে তাল-মিলিয়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের তুলনায় অধিকতর যোগ্য বলেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। এটা কোন কোন ক্ষেত্রে হতেও পারে। অর্থনৈতিক চাকচিক্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আধুনিক বিশ্বের নারীদের ভোগ্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উন্নতির আড়ালে নারীকে কেন্দ্র করে পর্ণোগ্রাফী তৈরী করে বিভিন্ন দেশে পর্ণোগ্রাফীর বিপুল চাহিদা তৈরী করছে। পর্ণো বাণিজ্যের সম্প্রসারণ লক্ষ্যে পৌঁছতে ইতোমধ্যে এর পিছনে অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনীতি সৃষ্টি করেছে। সারা বিশ্বের দেশে দেশে পর্ণোগ্রাফী থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে তিন হাজার ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় আড়াই লাখ টাকারও বেশি পর্ণোগ্রাফীর পেছনে ব্যয় হচ্ছে। এ থেকেই বুঝা যায় যে, পর্ণো ইন্ডাষ্ট্রি বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। পর্ণোশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ২০০৫ সালে চীনে ২৭.৪০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন, যদিও পর্ণোগ্রাফীর উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিপণন চীনে আইনত নিষিদ্ধ। ২০০৬ সালে পর্ণোগ্রাফীর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৫.৭৩ বিলিয়ন ডলার, জাপানে ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। ‘‘শেখ হাফিজুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ আইন, প্রণয়নের উদ্যোগটি ভালো, তবে... দৈনিক প্রথম আলো, তারিখ: ০৮-০১-২০১২’’ নারী-স্বাধীনতার নামে নারীকে যথেচ্ছভাবে বিজ্ঞাপন-সামগ্রী এবং পর্ণোগ্রাফীতে ব্যবহার করা হচ্ছে। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারী যেন একটি অপরিহার্য অনুসঙ্গ। ‘‘দৈনিক জনকন্ঠ, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭, সম্প্রতি দি ওয়াশিংটন পোষ্ট পত্রিকার বরাত দিয়ে আমাদের ঢাকার দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘আমেরিকার মেয়েরা যৌন আবেদনকারী হওয়ার পরিবেশেই বড় হচ্ছে। মার্কিন সংস্কৃতি, বিশেষ করে প্রধান প্রধান প্রচার মাধ্যমে মহিলা ও তরুণীদের যৌন-ভোগ্য-পণ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন (এপিএ) টাস্ক ফোর্স অন দ্যা সেক্সুয়ালাইজেশন অব গার্লস-এর সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে একথা বলা হয়। রিপোর্টের প্রণেতাগণ বলেন, টিভি-শো থেকে ম্যাগাজিন এবং মিউজিক-ভিডিও থেকে ইন্টারনেট পর্যন্ত প্রতিটি প্রচার-মাধ্যমেই এই চিত্রই দেখা যায়।....... প্রণেতাদের মতে, যৌনরূপদান তরুণী ও মহিলাদের তিনটি অতি সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এগুলো হলো পেটের গোলযোগ, আত্মসম্মানহানিবোধ এবং মনমরা ভাব।..... লিজ গুয়া নামের একজন মহিলা বলেন, তিনি তাঁর ৮ (আট) বছরের মেয়ে তানিয়ার উপযোগী পোশাক খুঁজে পেতে অসুবিধায় রয়েছেন। প্রায়ই সেগুলো খুবই আটসাঁট, নয়তো খুবই খাটো। যৌন-আবেদন ফুটিয়ে তোলার জন্যই এ ধরনের পোশাক তৈরী করা হয়।’’ নানামূখী তৎপরতা ও মিথষ্ক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী কিছুটা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হলেও পাশ্চাত্যের সমাজ-ব্যবস্থাসহ পৃথিবীব্যাপী নারী এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন। নারী-নির্যাতন, শিশুহত্যা, পতিতাবৃত্তি, ধর্ষণ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, লিভটুগেদার, মাদকাসক্তি, কুমারী-মাতৃত্ব ইত্যাদি সমস্যা পাশ্চাত্য-সমাজে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পর্ণোগ্রাফী তৈরী ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করে ‘পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২’ শিরোনামে প্রণয়ন সময়োচিত সিদ্ধান্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ