ঢাকা, শনিবার 23 February 2019, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চলে গেলেন বাংলা কবিতার শাহজাদা

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : পৃথিবীতে অসংখ্য ও অগণিত মানুষ জন্মগ্রহণ করেন। আবার অমোঘ নিয়মে পৃথিবীর সব মায়া-মমতা ফেলে দিয়ে মানুষকে চলেও যেতে হয়। এটাই নিয়ম। এ নিয়ম রোধের ক্ষমতা কারুর নেই। মানুষকে চলে যেতেই হয়। কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মউত। মানুষকে মৃত্যু স্পর্শ করবেই। তবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও মানুষের মাঝে কেউ কেউ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেন। মানুষ কাউকে কাউকে মনে রাখেন। স্মরণ করেন। মৃত্যুর পরও যাদের মানুষ মনে রাখেন, তাঁরা মানুষ হলেও অসাধারণ। এমন অসাধারণকেই সাধারণ মানুষ মনে রাখেন। এমনই এক বিরল ও অসাধারণ মানুষের সঙ্গে দশ-বারো বছর যাবৎ খুব কাছে থেকে এবং ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর নিয়ে আমাদের অফিসে যোগ দিলেন। সম্পাদকীয় এবং নিয়মিত কলাম লেখতেন কবি সাহেব। যদ্দিন আমাদের এখানে ছিলেন, তদ্দিনই পাশাপাশি বসে কাজ করেছি। কাজেই সেসময়ের প্রায় সব সম্পাদকীয় ও কলামসহ অনেক কবিতা আমার সামনেই লেখেন তিনি। মাঝেমধ্যে কোনও কোনও লেখা শেষ করে আমাকে পড়েও শোনাতেন। অনেক সময় আমার কাজ ফেলে কবির লেখা শুনেছি। এর মধ্যে অনেক কবিতাও ছিল। অতএব এ সময় কবির অনেক কবিতারও জন্ম হয়েছে আমার সামনে। এটা আমার সৌভাগ্য বৈকি।
আল মাহমুদ প্রধানত কবি। তবে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং প্রাবন্ধিকও। এমনকি শক্তিশালী নিবন্ধকারও। সাংবাদিক ও সম্পাদকতো বটেই। এসবের কোনওটাতেই তিনি কম ছিলেন না। একজন কবি সব হতে পারেন। এর প্রমাণ কবি আল মাহমুদ। কিন্তু সব ঔপন্যাসিক, গল্পকার কিংবা সাংবাদিক কবি হতে পারেন এমন উদাহরণ খুব কমই। তাই আল মাহমুদের তুলনা তিনি নিজে। কবি আল মাহমুদ এক বিরলপ্রজ প্রতিভার অধিকারী।
বাংলাসাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি আল মাহমুদের সত্য-ন্যায়বোধকে গ্রহণ করতে পারেননি তাঁর সহযাত্রীদের অনেকে। তাই অন্যায্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা কবির সঙ্গে। এমনকি ইন্তিকালের পরও তাঁরা কবির প্রতি সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যারা কবির পশমের সঙ্গেও তুলনীয় নন, তাঁরাও তাঁর সম্পর্কে অশোভন কথা বলে নিজেদের নিচুতার পরিচয় দিয়েছেন। তাতে কী? আল মাহমুদের ক্ষতি হয়েছে এতে? নিশ্চয়ই না।
কবিরা ‘দলাদলি’ পছন্দ করেন না। তবুও অনেক কবি কখনও দল ছাড়েন, আবার দলে ভেড়েনও। এমনকি বিশ্বাস-বোধ তথা আদর্শ পর্যন্ত বদলে যেতে পারে কবিদের। বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস পাল্টে যদি কোনও কবি বদলে যান, তাতে কোনও দোষ আছে?
কালজয়ী মার্কিন কবি ও সমালোচক এজরা পাউন্ড ফ্যাসিস্ট ছিলেন। মুসোলিনি এবং হিটলারের পক্ষে কথা বলেছিলেন ঢের। এসাইলামেও ছিলেন দীর্ঘ বারো বছর। এরপরও এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতা নির্মাণের ইতিহাসে চিরসমুজ্জ্বল কবি। এজরা পাউন্ড না হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এলিয়টের কবিতার আড্ডায় এসে ইয়েটসের হাতে গীতাঞ্জলির পা-ুলিপিটা তুলে দেবার সুযোগ পেতেন বলে মনে হয় না। সেটা না পেলে নোবেলটাও পাওয়া হতো কিনা সমূহ সন্দেহ ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাইট উপাধি পেয়েছিলেন যুদ্ধের সময়ে। সেটা নিয়েও তিনি রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বকবি। রালফ ওয়ালদো এলিশন হার্লেমের কালো লেখক ছিলেন। কিন্তু উঁচু মার্গের। তিনি ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন সমর্থন করে পুরস্কৃত হন। এলিশন যুগ যুগ ধরে পাঠকনন্দিত লেখক হয়ে আছেন। আর্জেন্টিনার মহান লেখক হোর্হে ল্যুইস বোর্হেস জেনারেল পিনোচেটকে সমর্থন করেছিলেন। কী হয়েছে শেষ অবধি! বোর্হেস ব্যতীত কি ল্যাটিন সাহিত্য পূর্ণ হতে পারে? না। অসম্ভব। এ রকম অনেক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
কবি আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করেছেন কবিতা ও তাঁর অন্য লেখনি দিয়েও। কোনও ডান রাজনীতির প্রতি তাঁর সমর্থন থাকতেই পারে। এটা কি তাঁর অপরাধ? শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী প্রমুখ আল মাহমুদের কাব্যশক্তিকে ভয় পেতেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। তবে একসময় তাঁদের তিনজনেরই ছিল গলায় গলায় ভাব। তাঁদের এমন অতীত সম্পর্ককে কেউ কেউ ‘কাব্যসখ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। পরে তাঁদের মধ্যে কাব্যবৈরিতা সৃষ্টি হয়। কোনও মহান কবির একটা অংশ কেউ নেবেন এবং অন্যটা নেবেন না; এমনটা সাহিত্যভান্ডারের ঐশ্বর্যের প্রতি অবিবেচনা বৈকি। মূর্খতাও বলা যেতে পারে। কেউ আল মাহমুদের পরিবর্তিত আদর্শিক  বিশ্বাসবোধের জন্য তাঁকে প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা চালাতেই পারেন। কিন্তু এতে বাংলা সাহিত্যে তাঁর যে অবিস্মরণীয় অবদান তা কখনও অনুজ্জ্বল হবার নয়।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের দিকে মীর আবদুশ শুকুর আল মাহমুদ আবির্ভূত হন। লোক লোকান্তর ও সোনালী কাবিন কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে ঠাঁই করে নেন অনায়াসে। তাঁর কবিতায় নগরজীবনের আবহে ভাটিবাংলার জনজীবন, নদীময়তা, চরের জীবনাচার, মানবিক বোধ ও প্রেমভালোবাসা বাক্সময় হয়ে ওঠে।
১৯৬৮ সালে লোক লোকান্তর ও কালের কলসের জন্য কবি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। মায়াবী পর্দা দুলে উঠো, বখতিয়ারের ঘোড়া, দূরগামীসহ অনেক কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প রচনা করেছেন আল মাহমুদ। বলতে দ্বিধা নেই, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পত্রিকার কলাম সবরচনাই তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। কাজেই আল মাহমুদ সবসময় আল মাহমুদ। নিজের তুলনা তিনি নিজে।
হ্যাঁ, আমি যখন স্কুলের ছাত্র। বয়সে সবেমাত্র কিশোর। তখন তিনি জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার জাদরেল সম্পাদক। উত্তর জনপদের প্রত্যন্ত অঞ্চল আমাদের জাবরহাটে পত্রিকাটি পৌঁছুলে পড়বার জন্য কাড়াকাড়ি করতাম। গণকন্ঠের সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে গ্রেফতার করে জেলে রাখা হলে আমরা তখন এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল করেছি। সভা ডেকেছি। এজন্য স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আমাদের বেশ বিতণ্ডাও হয়। আমরা হাল ছাড়িনি। কিন্তু কী সৌভাগ্য, এই কবি আল মাহমুদের সঙ্গে কাজ করবার সুযোগ হলো আমার প্রায় এক দশকেরও অধিক কাল ধরে। তাই তিনি আমার স্মৃতিতে বাংলা কবিতার শাহজাদা হয়েই চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হচ্ছে: ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতীব মহোদয়ের ব্যবস্থাপনায় ইসলাম প্রচার সমিতির ৫ জন প্রতিনিধিকে রাজকীয় মেহমান হিসেবে হজে নেবার সিদ্ধান্ত হয়। এ হজ প্রতিনিধিদলে সমিতির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ভট্টাচার্য, সেক্রেটারি জেনারেল জনাব বদরে আলম, ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুর রহমান গোপ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রহমান ব্যানার্জি এবং আমার নামটিও ছিল। পাসপোর্টসহ প্রায় সব প্রস্তুতি খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। হঠাৎ সৌদি দূতাবাস থেকে জানানো হয়, এই ৫ জনের মধ্যে একজনকে এবার রেখে দিয়ে কবি আল মাহমুদকে যুক্ত করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত খোদ রাষ্ট্রদূত খতীব সাহেবের। তাই স্বাভাবিকভাবে দলের মধ্যে বয়সে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আমাকে বাদ দিয়ে কবি সাহেবকে সমিতির হজ প্রতিনিধিদলে যুক্ত করে নেয়া হলো। আমি কিছুটা হলেও মন খারাপ করে থাকলাম। তবে এটা ভেবে নিজেকে প্রবোধ দিলাম যে, আমার জায়গায় আল মাহমুদের মতো মহান কবিকে শামিল করা হলো। এ ঘটনার প্রায় দেড় দশক পর রাজকীয় অতিথি হিসেবে না হলেও অন্য এক সৌদি সংস্থার ব্যবস্থাপনায় আমার হজ সম্পন্ন করবার সুযোগ আসে।
পরে সৌদি রাষ্ট্রদূত খতীব সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে তিনি আমাকে জানান, ‘ব্রাদার দিনাজী, ডোন্ট টেক আদার ওয়াইজ প্লিজ; পোয়েট আল মাহমুদ অলসো এ নিউ মুসলিম জাস্ট লাইক ইউ।’ আমি বিষয়টি উপলব্ধি করে এর জবাবে বলি, ‘আলহামদুলিল্লাহ স্যার, নো প্রোব্লেম।’ খতীব সাহেব আবার বলেন, ‘জাযাক আল্লাহ।’
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জুমাবার রাত ১১ টা ৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ৮২ বছর বয়সে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে আল মাহমুদ চলে যান। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার যে মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানেই বাবা-মায়ের কবরের কাছে বাংলাসাহিত্যের বিরলপ্রজ এই শীর্ষকবিকে সমাহিত করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ