ঢাকা, শনিবার 23 February 2019, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জীবন্তসত্তা নদী হত্যার অপরাধে কাঠগড়ায় বাংলাদেশ

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে হার্ডিজ ব্রীজের নীচে খরায় চৌ-চির মাঠ। বগুড়ার খরস্রোতা করতোয়া এখন মৃতপ্রায়। নাব্যতাহীনতায় নীলফামারীর খরস্রোতা তিস্তা নদী।

-অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান
বাংলা সাহিত্য সংসদ কর্র্তৃক প্রকাশিত আধুনিক বাংলা অভিধান বইতে জানা যায় মার্তৃক(বিণ)মাতা হতে আগত, মাতৃ সম্বন্ধীয় অর্থাৎ নদী মার্তৃক বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বলা যায় যে নদীকে মাতার সাথে তুলনা করা হয়েছে । নদী মার্তৃক বাংলাদেশ এখন অনেকটাই মাতৃহারা বাংলাদেশে রূপান্তরিত হতে চলেছে। মাতা যদি হত্যার শিকার হয় অথবা কোনো কারণে মৃত্যু বরণ করে তবে সন্তানরা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয় । আর মাতৃহারা সন্তানরা হয়ে পড়ে এতিম। আর এতিমদের জীবন যাত্রায় বহুমার্তৃক দুর্যোগ দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। বিপন্ন হয়ে পড়ে সন্তানদের জীবন যাত্রা। আমাদের দেশের মানুষের জীবন অনেকটা মাতৃস্নেহের অধিকার থেকে দ্রুততার সাথে বঞ্চিত হতে চলেছে।
বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১৯৯৬-৯৭ সালের তথ্য অনুসারে দেখা যায়, বাংলাদেশের নদী অঞ্চলের আয়তন ৯,৪০৫ বর্গ কিলোবাইট। বাংলাদেশের নদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০। আর নদীবহুল দেশ বলে স্বাভাবিকভাবেই এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নদীর প্রভাব রয়েছে।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব‏হ্মপুত্র, উপনদী ও শাখানদী রয়েছে। উপনদী ও শাখানদী সহ বাংলাদেশে নদীর মোট দৈর্ঘ্য হল প্রায় ২২,১৫৫ কিলোমিটার। এ সকল নদনদী এর সমভূমি অঞ্চলকে করেছে শস্য শ্যামলা ও অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ছয়টি ঋতুতে প্রকৃতির ছয় রকম অবস্থা দেখা যায়। বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান দেশ। তার প্রত্যেকটি গ্রাম যেন আজও প্রকৃতির এক অপূর্ব রঙ্গশালা।
সোনার বাংলা একসময়ে সবুজের সমারোহে ভরপুর ছিল  সবুজ বৃক্ষ আর রুপালী রংয়ের পানি প্রবাহ নয়নাভীরাম স্মৃতি অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, বিপর্যয়, দখল ও দূষণের  শিকার হয়ে দেশের ছোট-বড় নদ -নদীগুলো বিলীন হয়ে পড়েছে। শহর নগরের পাদদেশের নদ-নদীগুলোর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।  একশ্রেণির স্বার্থবাদী মানুষের ছোবলে পড়ে নদ-নদীগুলোর দেহের উপর ইটের ইমারত, দোকান পাট, ঘরবাড়ি তৈরি প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মানবসৃষ্ট দূষণ থেকে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরেই সকলেই সমন্বিত ভাবেই মাতৃনামক নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার ইতো মধ্যেই নদীরক্ষায় নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে , যা অসাধারণ শুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে একাজ সরকারের একার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। সরকারের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের বিকশিত বিবেক ও জোরালো পদক্ষেপ এবং আন্তরিক সহায়তা প্রয়োজন। জনসচেনতা সৃষ্টি করে দেশের নদ-নদীরক্ষায় যে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নে সততা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। বিশেষ করে নদীর পার অবৈধ দখল, বালু উত্তোলন এবং নদীখনন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। খরা এবং ভরা মৌসুমে কোনো প্রকার  বর্জ্য সামগ্রী না ফেলার বিষয়ে কঠোর আইন ও গণসচেনতা সৃষ্টি করতে হবে।
পৃথিবীতে প্রাণী জগৎ বেঁচে থাকার জন্য ধমনীতে যেমন রক্ত  প্রবাহ জরুরী তেমনি দেশকে বাঁচতে হলে সে দেশের বুকের ভেতর নদী প্রবাহ জরুরী। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, নদী মরলে দেশ মরবে। রক্ত ও পানি প্রবাহ ব্যহত হলে যেমন প্রাণী মারা যায় তেমনি নদ-নদীর পানি প্রবাহ ও বর্জ্য সামগ্রীর দূষণে আক্রান্ত হয়ে জীবনসত্তা নদ-নদী মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। বিপন্ন পরিবেশ-বাঁচাও নদী বাঁচাও দেশ-নইলে দেখবে সবই শেষ।
ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দেশের মধ্যে ২য় স্থানে। ১ম স্থানে রয়েছে হন্ডুরাস, এবং ৩য় থেকে ১০ম স্থানে রয়েছে সোমালিয়া, ভেনিজুয়েলা, নিকারাগুয়া, ভিয়েতনাম, ডেমিনিকান, প্রজাতন্ত্র ফ্রান্স, ভারত, চীন।
বিশ্বের সব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে নদী মাতৃকতা দিয়ে। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। এক্ষেত্রে কালের বিবর্তনে সে স্মৃতি আজ মৃত প্রায়। দেশের নদী সংখ্যা এখন মাত্র ২৩০ হলেও খোদ রাজশাহীর পদ্মার পানি থাকে তিন মাস। যমুনার পানিও থাকে ৩ থেকে ৪ মাস। ফলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল এর নদীগুলোতে ৯ মাসই পানি না থাকায়  বেশিরভাগ চরাঞ্চলে জেগে থাকে ধুধু বালুচর।
বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। পানি প্রবাহ স্বাভাবিক ছিল বলেই এদেশ এত সুজলা-সুফলা সবুজ বন বনানীর সমারোহে ছিল ভরপুর। কালের বিবর্তনে নদীর উজানে ভারত বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকান্ড আর দখল রাজত্ব নদীকে অঙ্গহানী করায় তিলে তিলে নদীগুলো একের পর এক মরে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ দেখা দিয়েছে। সেচ চাহিদা মেটাচ্ছে মাটির নিচের পানি দিয়ে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানিস্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটছে। নদী রুটে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে জন পরিবহন, মালামাল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। নদীর মৎস্য সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সৃষ্ট প্রভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিগত ৮০ বছরে সোনার বাংলায় নদী সিকস্তি চরবাসিদের জীবন সংগ্রামের নানা রকমারিতা রয়েছে। উপর্যপরি ভয়াবহ বন্যার কারণে নাব্যতা কমে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার ধুধু বালুচর পড়ায় খরা সৃষ্টি হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত উত্তাপে লাখ লাখ একর ফসলি জমি আবাদ যোগ্যতা হারিয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৫ হাজার বিঘা জমি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ায় সহায় সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে লাখ লাখ চইরা মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের আইপিসিসি প্রতিবেদনে জানা যায় ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পরবে। পিআইডি’র ফিচারের তথ্যমতে জানা যায় গত ৫০ বছরে সংঘঠিত ৯টি  বড় ঘুর্ণিঝড়ের কারণে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬১ জনের প্রাণহানী ঘটেছে। উপকূলীয় ৮ হাজার ৯’শ বর্গকিলোমিটার এলাকার জনগণ অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে। ২০১৭ সালে দেশের উত্তরাঞ্চলের ৭টি জেলার অন্তত ১৫’শ বর্গকিলোমিটার বালুচর পরেছে। যে কারণে কুড়িগ্রাম থেকে সিরাজগঞ্জ জেলা পর্যন্ত যমুনা নদীতে দেড় শতাধিক নৌ-ঘাটের পরিত্যক্ততা লক্ষ্য করা যায়। নদী উপকূলীয় ১৪ জেলার সাথে রাজধানী ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ নৌবন্দরের সাথে নৌপথে যাতায়াত ও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
নাব্যতা হারানোর ফলে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদী উপকূলীয় এলাকায় ৪০ বছরে নদী ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর ফসলি জমি। বাস্তুহারা হয়েছেন ৪০ লাখ মানুষ। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। ফলে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পরেছে নদী উপকূলীয় ১৯ জেলার বাসিন্দাদের উপর।
দখল, ভরাট, দূষণ আর নাব্যহীনতায় দেশের ছোট ছোট নদীগুলোর পাশা-পাশি বড় বড় নদীগুলো আজ অস্তিত্বের মুখো-মুখি। অর্থনীতির প্রাণ কর্ণফুলী বিপন্ন। দূষণ ও ভাঙ্গণে জর্জরিত কুশিয়ারা। দখল-দূষণ আর ভাঙ্গণের শিকার কীর্তণখোলা। পরিকল্পনা আর প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভাবে করতোয়া মৃতপ্রায়। ভরাট আর অস্তিত্ব  সংকটে ব্রহ্মপুত্র। উজানে বাঁধ নির্মাণের কারণে তিস্তা ও গজলডোবা নদীতে পক্ষাঘাত।
জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সৃষ্ট প্রভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বিগত ৮০ বছরে বাংলাদেশে নদী সিকস্তি চরবাসীদের জীবনে নেমে এসেছে এক মহা দুর্যোগ। উপর্যপরি বন্যা, নাব্যতাহীনতায় খরা আর বিস্তীর্ণ এলাকা ধুধু বালুরাশিতে মাত্রাতিরিক্ত উত্তাপে লাখ লাখ একর ফসলী জমি অনাবাদি হয়ে পরেছে। কথায় আছে ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, একথাটি যেমন সঠিক ও তাৎপর্যপূর্ণ তেমনি নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে এটিও গুরুত্বপূর্ণ।
হিমালয় অঞ্চলে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীন ৫৫৩টি বাঁধ দিচ্ছে। ভারতের ফারক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর বন্যা হয় ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪ ও ২০১৭ সালে। ফলে সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা ছাড়াও ভূমি, কৃষি, জীব বৈচিত্র, পরিবেশ নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, যাতায়াত ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়েছে। নদী একদিকে যেমন আশীর্বাদ,  অন্যদিকে অভিশাপ ও দুঃখ বেদনার উৎস। নদীর পানিতে পলিমাটি ভেসে এসে বিস্তীর্ণ এলাকার জমি উর্বর করে। সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামলে ভরে উঠে বিস্তর প্রান্তর। তেমনি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার বর্ষা মৌসুমে নদীর দু’কূল ছেয়ে পানি উপচে পড়ায় তলিয়ে যায় মাঠ-ঘাট পথ-প্রান্তর জনপদ ফলে মারাত্মকভাবে ব্যহত হয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের আইপিসিসি প্রতিবেদনে জানা যায়-২০২০ সালে মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। সুপেয় পানি পাওয়া যাবে না এবং জমি অনুর্বর হবে। বাংলাদেশের ভাঙ্গন প্রবণ নদীর মধ্যে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ব্র‏হ্মপুত্র ও তিস্তা অন্যতম। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায়, বিগত ৪০ বছরে নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর ফসলী জমি, বস্তুহাড়া হয়েছে ৪০ লাখ মানুষ, ক্ষতির পরিমান প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রাক্ষুসে যমুনা, পদ্মা, তিস্তা ও ব্র‏হ্মপুত্র নদ-নদীসহ উপনদীর ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে অন্তত ১৯ জেলার নদী উপকুলীয় বাসিন্দা। গত দু’বছরের বর্ষার পর দেশের উত্তরাঞ্চলের ৭টি জেলার অন্তত ১৫শ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বালু চর পড়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ সালের পর যমুনা নদীর নাব্য সংকটের কারণে ফেরি সার্ভিসগুলো বন্ধ হওয়ায় অল্প সময়ে সল্প ব্যয়ে যাত্রী পারাপার, কৃষি পণ্য সামগ্রি, ডিজেল, সার সরবরাহ সহ নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন করা মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলা পর্যন্ত যমুনা নদীতে নৌকা ঘাট ছিল প্রায় দেড় শতাধিক। পানির সল্পতাহেতু চর ও ডুবো চর পড়ায় নৌকা চলাচল করতে না পারায় ঘাটগুলোর বেশীর ভাগই বর্তমানে বন্ধ হয়ে পড়ছে।
ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পদ্মার, গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যমুনার, টিঁপাইমুখ বাঁধ দিয়ে মেঘনার পানি প্রবাহ বন্ধের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে ভারত। অথচ এ তিনটি নদী বাংলাদেশের প্রাণ। ভারতের বাঁধ ও পানি আগ্রাসনের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত মরুকরণ হয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। পদ্মা নদীতে হার্ডিঞ্জ পয়েন্টে ১৫টি পিলারের মধ্যে ১২টি দাঁড়িয়ে আছে শুকনো বালুর চরে। যমুনা ব্রীজের অবস্থা বর্তমানে অনেকটা এরকমই।
 দেশের নদ-নদীগুলোর পূর্বের, অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আন্তঃদেশীয় সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সৃষ্ট ঝুঁকি এবং কৃত্রিম দূষণ থেকে আমাদের নদীগুলোকে বাচাঁর আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। রাজধানীর আশেপাশের বুড়িগঙ্গা,  মেঘনা, শীতলক্ষা, তুরাক, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, রাজশাহীর পদ্মা, রংপুরের তিস্তা যমুনা করোতোয়া, মোমেনশাহীর ব্রহ্মপুত্র সহ দেশের ছোট-বড় সকল নদীগুলোকে রক্ষায় নানামুখী পদক্ষেপ তথা অবৈধ দখল মুক্ত ও নদীখনন করে নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এবং কোনো প্রকার বর্জ্য না ফেলার বিষয়ে জনসচেনতার সৃষ্টির মাধ্যমে নদী রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।
এসব নদীগুলোর শাখা-প্রশাখার নদ-নদীগুলোর পার দখল ও দূষণ মুক্ত সহ ভরা বর্ষায় উপচেপড়া পানির স্রোতের সাথে ভেসে আসা বালু মাটির স্তরে ফসলী জমি বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। নদীমার্র্তৃক উপকূলীয় মানুষের বসবাস এবং জানও মাল রক্ষার তাগিদেই নদীগুলোর নাব্য বা গভীরতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে নদীরক্ষায় ও পরিবেশ রক্ষায় গৃহিত দশ বছরের মাস্টার প্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করে তা বাস্তবায়নে মাঠে নামতে হবে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলীয় জেলাগুলো দেশের নিম্নাঞ্চল তথা বঙ্গোপসাগরের সন্নিকটে হওয়ায় প্রতিবছর এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় ২শ’ বছর ধরে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে এসব দুর্যোগের কারণে গত ৫০ বছরে সংঘটিত ৯টি বড়ো ঘুর্ণিঝড়ে সংঘটিত ৯টি বড়ো ঘূর্ণিঝড়ে ৪ লক্ষ ৭৩ হাজার ৬৬১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ৮ হাজার ৯’শ বর্গকিলোমিটার এলাকার জনগণ অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে বলে এক গবেষণায় জানা গেছে।
-প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ