ঢাকা, শনিবার 23 February 2019, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নদী দখলকারীরা বিশ্ব মানবতার শত্রু

-ডাঃ মোঃ মুহিব্বুল্লাহ
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। নদ-নদীতে ছেয়ে আছে এদেশের প্রতিটি গ্রামগঞ্জ। যে কারণে সুবিধা বিধায় মৎসের চেয়ে অনেকটা কৃষি নির্ভর এদেশের জনগণ। আর কৃষিকাজে নদ-নদীর ভূমিকা অন্তহীন। প্রাণীদেহে শিরা উপশিরা ব্লক হয়ে যেমন রক্ত সঞ্চলন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে প্রাণীর মৃত্যু অনিবার্য করে দেয়। তেমনি নদ-নদীর প্রবাহমান পরিবেশ বিহীন ভূখন্ড অনুর্বর মুমূর্ষু তৃণ লতাহীন মরুপ্রান্তরে পরিণত হয়ে পড়ে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলি, সুরমা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, শিতলক্ষা,  মধুমতি, তিস্তা, তিতাস, ধানসিড়ি, আঠার বাঁকি, রূপসা, চিত্রা, ধলেশ্বরী, বলেশ্বর, মহানন্দা, গমতি, তুরাগ, গড়াই, আত্রাই, নাফ, বুড়িগঙ্গা, বীষখালী, গৌরনদী, শঙ্খ, বংশী ও ইছামতি নদী সহ শত সহস্র নদীতে জাল বুনিয়ে আমাদের দেশের বিশ্বসেরা উর্বর মৃতিকাকে করে রাখে উর্বর থেকে আরো উর্বর। ফলে-ফসলে, শস্য-শ্যামলে সবুজের এই মনোমুগ্ধকর রংতুলির নিপুণ কারুকর্মী নদী ছাড়া আর কাকে বলা যাবে। স্রষ্টার এ মহোত্তম দানে শুধুমাত্র প্রকৃতিক সৌন্দর্য ও ফসল ফলাদির সমারোহ দান করেছে তানয়। বরং পল্লীবধূদের পোশাক আশাক ও আসবাবপত্র পয়পরিস্কারের কাজে এ নদীই অদ্বিতীয়। দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মালামাল আনা নেওয়াতে ও আসা যাওয়ার জন্য নদীর ভূমিকা রোমাঞ্চকর। এক কথায় নদী ছাড়া আমাদের দেশের আয় উন্নয়ন থেকে শুরু করে জাগতিক জীবনযাত্রায় কোনো ছন্দ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ আমাদের এমন সোনার হরিণ নদী আজ দেশি ও বিদেশি শত্রুর আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় অস্তিত্ব বিধ্বংসী সংক্রামকের সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এমনও বৈরীদেশ আছে যারা আমাদের দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অনেক নদীর উৎস মুখগুলোকে দখল করে পুরা নদীটার হত্যাকারীতে পরিনত হয়েছে। ফারাক্কা আর তিস্তার টিপাই মুখের বাঁধে এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশকে নির্ঘাত মরুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। কোনো নদীর উৎসমুখকে এভাবে বেঁধে তার জোয়ার ভাটার স্রোতধারার গতিরোধ করা মানেই তার প্রাণ হরণার্থে গলা চেপে ধরা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এহেন বাংলাদেশ বিধ্বংসী প্রতিহিংসামূলক কর্মকান্ডে এদেশের নদীগুলো আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। কোনো কোনো নদীর কপালে তো এমন দূরাবস্থা ঘটে চলছে যে তার বুকে গড়ে উঠা জনবসতির নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা এখানে যে প্রকৃতই একটা নদী ছিল তা রূপকথার গল্পের মতো গল্পই মনে করবে। সে নদীতে যে মানুষ কোনো একদিন ইলিশ মাছ ধরতো তা তাদের বিশ্বাস করতে এতোই কষ্ট হবে যে তারা তাকে দাদা-দাদীর মুখের আজগবি কেচ্ছা কাহিনী ব্যতীত সত্য বলে মেনে নিতে পারবেই না। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীরাও ভুলে যাবে তার পুরা সুনাম সুখ্যাতির ও ইতিহাসকে। মনে করতে পারবেনা তার উপকারের হৃদয় উজাড় করা স্মৃতিগুলোকে। এছাড়াও প্যারালাইজড রুগীর মতো নদীর বৈশিষ্ট্য স্রোত হারা হয়েও কিছু নদীকে মুমূর্ষু অবস্থায় শুধুমাত্র আগেকার "নাম" টুকুর উপরে বেচে থাকতে হচ্ছে। যার কোনো স্রোত নাই। নাই জোয়ার ভাটা হওয়ার মতো কোনো শক্তি। নৌযান চলার মতো কোনো পরিবেশও তার মধ্যে যোগ্যতা সম্পন্ন নাই। এমনকি মানুষের ব্যবহার উপযোগী মৌলিক গুনাগুন সম্পন্ন পানি টুকুও নাই সেসব নদীতে। এই যে খুলনা বিভাগের বাগেরহাটের মোল্লারহাট ও খুলনা জেলার তেরখাদার সীমানা বেয়ে এঁকেবেঁকে চলা আঠার বাঁকি নদী, আজ দেশের কোটি কোটি টাকা অপচয় করে যার পুনঃখনন কাজ চলছে। তার তীরের জনপদবাসীর কাছে শুনা যায় "একদিন এই আঠার বাঁকি নদী দিয়েই বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও পরিচিত ঢাকা টু খুলনা যাতায়াতের শ্রেষ্ঠ নৌযান গাজীরকেট চলত। অথচ ২০০৩/৪ সালের দিকে মধুমতি থেকে তার চাহিদার পানির অভাবে উৎস মুখ বন্ধ হয়ে শুধু তার জান চলাচল বন্ধ করিনি বরং অতি দ্রুত বঙ্গপোসাগরের বালু উঠে চোখের পলকে পুরা নদীটাই বন্ধ  হয়ে গেলো।" প্রায় বছর দশেক ধরে তার বুকেও গড়ে উঠেছিলো বসৎ বাড়ি। অসংখ্য মরা নদীর মোতো যেখানকার নতুন প্রজন্মও তাদের বসত ভিটার জায়গার পূর্ব ইতিহাস শুনলে গল্পই মনে করতো। যে নদীকে বর্তমানে খননের কারণে এসকল নবাগতরা প্যারালাইজড রুগীর মতো একটা আকৃতির নদী হলেও নদী হিসেবে দেখবে। কিন্তু ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধ না হলে এসকল নদীগুলোর আজকের এদশা হতনা। এমন করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পানির ন্যায্য হিস্যা খর্ব করে নদী দখলের কারণে বাংলাদেশের অসংখ নদীর ধ্বংস সংঘটিত হয়েছে। যারা বিশ্বের ইতিহাসে বাংলাদেশকে অস্ত্রের আঘাতে ঘায়েল করার বদনাম এড়িয়ে বাংলার উন্নয়নের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করে এদেশকে তাদের তাঁবেদারে পরিণত করে রাখতে এহেন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চাষাবাদে উর্বরের স্বর্গ চূড়া তুল্য বাংলাদেশের জমিকে তারা যদি অনুর্বর করে রাখতে পারে তাহলে অবশ্যই এ বাঙ্গালী জাতি চিরকাল তাদের কাছে নতজানু হয়ে থাকবে এই হল তাদের লক্ষ্য। তবে তারা যে তাদের কু রিপু চরিতার্থ করার মানসে তামাম বিশ্ববাসীকে অপূরণীয় খাদ্য সংকটের মুখে ঠেকে দিচ্ছে তার সম্পর্কে দেশ ও দুনিয়াকে গাফেল হলে চলবেনা। কেননা পৃথিবীতে মানুষ যতদিন বেচে থাকবে ততোদিনই তার অবস্থান যেখানেই হোক তাকে খাদ্য গ্রহণ করতেই হবে। তাই চাই তার ইনকাম থাক বা না থাক। কোনো খনিজ পদার্থ খেয়ে কেউ কখনও বেঁচে থাকতে পারেনা। সেকারণে খনিজ বা শিল্প নির্ভর দেশগুলোর মানুষকেও বেঁচে থাকার তাকিদে পৃথিবীর খাদ্য শস্য উৎপাদনক্ষম দেশও ভূখন্ডকে নিজের জীবন ধারনের মৌলিক সম্পদ বলেই জানতে ও মূল্যায়ন করতে হয়। তাই বাংলাদেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের উপযোগী ভূমিকে বিশ্ববাসী কোনোভাবে নষ্ট হতে দিলে সে খেসারত বিশ্ববাসীকেই ভোগ করতে হবে। এহেন পরিবেশে সর্বোপরি পরিতাপের বিষয় হল ফলে ফসলে বাংলাদেশ সুসজ্জিত হলে তার প্রাথমিক স্বাদ আসাদনকারী দেশের নাগরিকেরাই প্রধানত উক্ত প্রতিবেশী নিকৃষ্ট সম্প্রদায়ের সহযোগী হয়ে বিশেষত তাদের দোসরী দলে রূপান্তরিত হয়ে দেশের অভ্যন্তরেও নদী দখলের আরো এক ন্যাক্কারজনক অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশ ও জাতীর উন্নয়ন এবং বিশ্ববাসীর কল্যাণকর চিন্তা কখনও তাদের বিবেককে নাড়া দেয়না। ধন ঐশ্বর্যের অসমকক্ষ প্রভু সাজতে সকল প্রকার দুর্নীতির শীর্ষস্থানীয় হয়ে রাষ্ট্র ও নাগরিকের কোটিকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ার পরেও নদীর মতো দেশ জাতি ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের উপকার সাধক প্রকৃতিক সম্পদের উপরেও পড়েছে তাদেও লোলুপ দৃষ্টি। সে কারণে দেশবাসীকে প্রত্যক্ষ করতে হয়, নদী-নালার দখলদার উচ্ছেদ অভিযানের সরকারি নাটকীয়তার পাশাপাশি আবার দখল উৎসবের উল্লাসি আমেজকে ঢেউ খেলতে। সে ক্ষেত্রে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঘুষ বাণিজ্যে উজ্জীবিত হওয়ার যে দৃশ্য নজরে পড়ে তাতে মনে হয় এ উচ্ছেদ অভিজান বা দখলদার মুক্তকরণ সবই একটা নাটক মাত্র। যা মঞ্চায়নেও রয়েছে সরকার ও সরকারি দলের লোকদের ইনকাম সোর্স নিহিত।
অতএব দেশ ও দুনিয়ার মধ্যের সকল জাগ্রত জনতাকে প্রত্যেক প্রকার নদী দখল মুক্ত করার কাজে মানবতার কল্যাণমুখি ভূমিকা রাখতে বিশ্বে খাদ্যশস্য উৎপাদন উপযোগী জমিকে আরো উর্বর করে তুলতে নদী দখলকারী মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
তাই আসুন আমরা তামাম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হয়ে সারা পৃথিবীর নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে তামাম জাহানের নদীগুলোকে আবারও মানুষের কল্যাণে ব্যবহারযোগ্য করে তুলি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ