ঢাকা, শনিবার 23 February 2019, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে নদীগুলোও দখল মুক্ত হতে পারে

-সাইফুল ইসলাম তানভীর
বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। কারণ ছোট্ট আয়তনের এই দেশের অধিকাংশ এলাকায় নদী ছিল। ছিল- এই অতীত কালকেই এখন মেনে নিতে হচ্ছে! বর্তমানে দেশের সব এলাকায় পূর্বেকার মতো নদী আর নেই! বয়স্ক ব্যক্তিরা হয়তো মরে যাওয়া নদীগুলোর ইতিহাস বর্ণনা করতে পারবেন। নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারবেনা এমন এমন জায়গায় নদ নদী ছিল। যেমন এখন পদ্মা নদী অনেক ছোট হয়ে এসেছে। আমরা মাওয়া এলাকায় গেলে বয়স্ক অনেক ব্যক্তির কাছে শুনেছি যে এই জায়গাটা পদ্মা নদী ছিল। সেখানে এখন বসতী। বিপরীত দিকে দেশের অনেক জায়গায় নদী ভাঙ্গনের কবলে লাখ লাখ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। হাজারো স্মৃতি নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। এসব কিছুই ঘটেছে মানুষের অপকর্মের কারণে। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি নদী, সমুদ্র, পাহাড়ের সঙ্গে মানুষ বেঈমানী করেছে। পবিত্র কোরআন অর্থ সহকারে অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে নদী, সমুদ্র, পাহাড়, মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। পৃথিবীর ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য এসব সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সেগুলোকে ধ্বংস করছি। দূষিত করছি। তাদের গতিতে বাধা দিচ্ছি। মূলত এ কারণেই এত বিপর্যয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের সাথে বাংলাদেশের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানীরা এগোতে পারেনি নদীর কারণে। কারণ বাংলাদেশ নদীমার্তৃক দেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। তখনকার ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের যোদ্ধাদের পানি পথে যুদ্ধ করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল। বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তানীরা) ছিল নদী পথে, পানি পথে যুদ্ধ করতে পারদর্শী। এজন্যই খুব অল্প সময়ে এদেশীরা যুদ্ধে জয়ী হতে পেরেছিলেন- বলে অনেকের ধারণা। দীর্ঘ ৪৭ বছর চলে গেছে। এখন সেই নদী আর নেই। বহু নদী দখল করে তার নাব্যতা ধ্বংস করা হয়েছে। এখন সেসব নদীর ওপর হাজার রকমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ সম্মত তাও নয়। এগুলো থেকে দূষিত হচ্ছে দেশের সর্বত্র এলাকা। একদিকে নদী দখল করে ভরাট করে নদীকে ধ্বংস করা হচ্ছে। অন্যদিকে সেখানে নোংরা পরিবেশ বিপর্যয়কর কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে সাধারণ মানুষ যে খুব দায়ী, তা কিন্তু নয়। রাষ্ট্র শক্তিই নদী ধ্বংসের সাথে সরাসরি জড়িত। যেমন ফারাক্কায় ভারত বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ৬০টি নদী ধ্বংস করেছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ সরকার ভারতকে ওই বাঁধ দিতে বাধা দেয়নি। প্রথমে ভারত বলেছিল-এটা পরীক্ষামূলক! কিন্তু সেটা পরীক্ষামূলক ছিলনা। শুধু ফারাক্কাই নয়, আরো কয়েকটি নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইন লঙ্ঘন করেছে। মূলত ভারতের সা¤্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতি এবং বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশের শত শত নদী মৃত্যুর মুখে। এখন সম্প্রতি প্রিন্ট মিডিয়াতে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে যে নদী দখলের চিত্র দেখানো হচ্ছে। এগুলো এক ধরনের আইওয়াশ।
বাংলাদেশের শাসকদের উচিত ছিল- ভারতকে এক তরফাভাবে বড় বড় ওই নদীগুলোতে বাঁধ দিতে বাধা দেয়া। সেটাতো করেই নি। এত বছর পর মিডিয়াতে নদী দখলের যে চিত্র দেখানো হচ্ছে তা অত্যন্ত হাস্যকর।  কারণ এই ৪৭ বছরের শাসকরা অধিকাংশ সময় নিজেরা লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। তারা দেশের পরিবেশ নিয়ে তেমন ভাবেননি। কৃষি নিয়ে তেমন ভাবেননি। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ফরমালিটি কিছুমাত্র কাজ দেখিয়েছে। এত বছর পর বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী নিয়ে মায়াকান্না দেখানো হচ্ছে। এই ৪৭ বছর কি দেশে সরকার ছিল না? এই দেশ কি স্বাধীন ছিল না? কারা এই নদীগুলো দখল করেছে। এরা কি পাকিস্তানী? যারা এই নদী দখল করেছে তারা কোনো না কোন রাজনৈতিক দলের লোক। ৪৭ বছরের এই সরকারগুলোর শেল্টারেই তারা এই নদীগুলো দখল করতে পেরেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কি করে? কীভাবে নদীর পাশে যেখানে সেখানে ইট ভাটার অনুমোদন দেয়া হয়? কে কে ইট ভাটার লাইসেন্স পাচ্ছে? এই ইট ভাটাগুলো থেকে সরকারের উপর মহলে নেয়া হয় কোটি কোটি টাকা চাঁদা। ঘুষ দিয়ে নেয়া হয় লাইসেন্স। এখন যে সাংবাদিকগণ নদী দখলের রিপোর্ট করেছেন- তারা এর পূর্বে কোন দেশে ছিলেন? অনেক সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বে নেই। বিশেষ সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী তারা চলে। তারা অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করে। প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ অনেকের সাথে তাদের দোস্ত দোস্ত সম্পর্ক! সাংবাদিকগণ যদি অতীতে নদী দখল নিয়ে এমন রিপোর্ট করতেন তাহলে এভাবে নদী ধ্বংস হতো না। আমাদের দেশের সামাজিকতায় একতরফা পুলিশকেই সব সময় দু’নম্বরী ভাবা হয়!  আমি নিজে নদী অঞ্চলে জন্মেছি। আমাদের বাড়ির পাশে পানগুছি নদী। এই নদীর গভীরতা অনেক। ¯্রােত আছে প্রবল। কিন্তু ভবিষ্যতে কি হয় তা বলা মুশকিল।
এই পানগুছির তীরে পরিবেশ বিরোধী বহু কিছু গজিয়ে উঠেছে। অবৈধ উপায়ে টাকা লেনদেনের মাধ্যমে এসব ঘটছে। পৃথিবীর উন্নত অনেক দেশের শহরগুলো নদীর পাশে। সেসব দেশের নদীগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। আমাদের বুড়িগঙ্গা তুরাগের পাশে গেলে বমি আসে। যেখানে গেলে বিষাক্ত জীবাণু নিয়ে আসতে হয়। পূর্বেকার যুগে নদীই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ঢাকার নবাববাড়ী বুড়িগঙ্গা তীরে। সেখান থেকেও প্রমাণিত নদী হচ্ছে আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম। নদী ভাঙ্গনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা সরকারের কাছে উপযুক্ত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। সহযোগিতা পাচ্ছে সমাজের দুষ্ট লোকজন। পানগুছী নদীতে আমাদের কয়েক শত বিঘা জমি বিলীন হয়েছে। আমরা দেখছি এই নদীর পাশে পরিবেশ বিরোধী অনেক ইট ভাটা গজিয়ে উঠছে। যেগুলোর সুবিধা ভোগী অন্য জায়গার। গত ১৪ই ফেব্রুয়ারী ২০১৯ একটি ইংরেজী পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম ছিল- Brick kilns top polluter Doe air pollution survey finds ‘gang most polluted; air quality of 7 cities ‘severely un healthy’- এই ইংরেজী পত্রিকাটি পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ড নিয়ে বেশ রিপোর্ট করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ