ঢাকা, মঙ্গলবার 26 February 2019, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

একাত্তরের ঘটনাপঞ্জী নিয়ে কিছু কথা

ড. মো. নূরুল আমিন : বাংলাদেশের অতীতাশ্রয়ী রাজনীতিতে একাত্তরকে নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। এই বিতর্কের প্রধান ইস্যু জামায়াত। গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভোটাধিকার হারিয়ে দেশ এখন স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের কঠোর নিগড়ে নিষ্পেষিত হচ্ছে। দুর্নীতি, দুঃশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রশক্তির সাথে সম্পৃক্ত অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির রক্তমাংসের সাথে মিশে গেছে। ধর্ষণ, ব্যাভিচার, নারী নির্যাতন নিত্যনৈমিত্রিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিএফআই-এর তথ্যানুযায়ী গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে লুটপাট সমিতি বানিয়ে দেয়া হয়েছে। নামে-বেনামে ভুয়া জামানতে ও ভুয়া ব্যক্তির নামে ঋণ প্রদর্শন করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া বানিয়ে দেয়া হয়েছে। দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ব্যক্তি ও দলের পুতুলে পরিণত করা হয়েছে এবং সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনকে যেভাবে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে তা থেকে উত্তরণের কোনও আলোচনা নেই, উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নেই। জামায়াতই সকলের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। একাত্তর কি, কি ঘটেছে সে সময়, তার নিরপেক্ষ আলোচনা কাম্য সন্দেহ নেই। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নিয়ে দল বিশেষকে দোষারোপ, রাজনৈতিক ময়দানের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে ধ্বংস এবং ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন দিয়ে দেশ ধ্বংসের প্রক্রিয়াই ত্বরান্বিত হবে- গড়ার নয় বলেই পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে এই স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েই এই দেশের মানুষ এগিয়ে চলেছে। এখানে জামায়াত অথবা ইসলামপন্থী অন্যকোন দলের অনুসারীরা ব্যতিক্রম নয়, তারা দেশের নাগরিক; তারা খাজনা পরিশোধ করেন, ভোট দেন, ভোট নেন, রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নেন, দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজে সহায়তা করেন। ১৯৭১-এর আগে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রায় পৌনে দু’শ’ বছর সংগ্রামের পর। ১৯৪৬ সালে বাংলা ও আসামের গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ  লোক পাকিস্তানে যোগাদানের রায় দেয়ার ফলেই আসামের বৃহত্তর সিলেট ও করিমগঞ্জ মহকুমার কয়েকটি থানা এবং পূর্ব বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চল পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল। পাকিস্তান এই অঞ্চল দখল করেনি। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এর সংক্ষিপ্ত বিবরণী রয়েছে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রীও ছিলেন। তার দল আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাও গঠন করেছিল। বৃটিশ শাসন ও ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার ইতিহাস বর্তমানে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পাঠ্যসূচিতে নেই।
আমি একাত্তরের মর্মান্তিক ঘটনাপঞ্জির কথা বলছিলাম। যারা একাত্তর দেখেছেন, তাদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। অন্যদের কাছে তা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে উভয় শ্রেণীর পাঠকদের সুবিধার্থে নির্মোহভাবে আমি নিচে আমার দেখা একাত্তরকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুর্বার গণআন্দোলন চলছিল। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এই নির্বাচনে দলটি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করে। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসনেই পাকিস্তান পিপলস পার্টি জয়ী হয়। সামগ্রিকভাবে নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় স্বাভাবিকভাবেই দেশ শাসন তথা সরকার গঠনের অধিকার তাদেরই পাওয়ার কথা এবং এই অধিকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং সামরিক বাহিনী তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ দলের নিকট পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর এই অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা ঐ সময়ে আওয়ামী লীগের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য দাবি জানিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক গোলাম আযম, পিডিপির হামিদুল হক চৌধুরী, নেজামে ইসলাম পার্টির মৌলভী ফরিদ আহমেদ, জাতীয় লীগের অলি আহাদ প্রমুখ। এ ব্যাপারে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বহুবার বৈঠক হয়েছে কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রথমে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুর ১.০৫ মিনিটে ঐ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পরপরই সামরিক শাসনকে আরো কঠোর করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক গভর্ণরকে অপসারণ করে তার স্থলে একজন সামরিক প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জনগণ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করতে থাকেন। মার্চ মাসের ৩ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। তার ভাষণে তিনি অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া ও জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সরকারকে অনুরোধ করেন। পাশাপাশি তিনি অসহযোগ আন্দোলনেরও ডাক দেন। সরকার এই দাবিগুলোর প্রতি কোন প্রকার কর্ণপাত করেননি। বরং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সভা-সমাবেশ ও দর কষাকষির মাধ্যমে কালক্ষেপণ করার পথ বেছে নেন।
২. উপরোক্ত অবস্থায় সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে। ফলে জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হতে থাকে। অবাঙ্গালী বিহারীরা আন্দোলন প্রতিরোধে নেমে আসায় বিক্ষুব্ধ জনতা আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং বিহারী অধ্যুষিত এলাকাগুলো এর ফলে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অসহযোগ আন্দোলনকালে কার্যত সারা প্রদেশে প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে এবং অবস্থার এতই অবনতি ঘটে যে দেশে সরকারের অস্তিত্ব আছে সাধারণ মানুষ এর কোন লক্ষণই দেখতে পাচ্ছিলেন না। সারা প্রদেশ আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে চলে আসে। দেশের সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তারই নির্দেশে চলতে থাকে। এসব নির্দেশের অধীনে মানুষ সরকারকে কর পরিশোধ করা বন্ধ করে দেয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষিত হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে টেলি যোগাযোগ ও আর্থিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য তা হচ্ছে সারা দেশ আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে থাকার পরও তিনি বা তার দল এই সময়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি এবং এ ব্যাপারে দেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে কোন প্রকার পরামর্শও করেননি। কিংবা জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে গণদাবির প্রেক্ষাপটে তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার আলোকে পরবর্তী কর্মসূচি কি হওয়া উচিত সে সম্পর্কেও সহযোগী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে আলোচনায় বসেননি। সারা প্রদেশে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেও জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং পিপলস পাটি নেতা ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে ২৪ মার্চ পর্যন্ত তিনি তার বৈঠক অব্যাহত রাখেন। দেশবাসী আশা করেছিল যে, এই সব বৈঠক থেকে একটি চূড়ান্ত ফায়সালা বেরিয়ে আসবে এবং সামরিক শাসকরা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। এসব বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান যেসব দাবি-দাওয়া পেশ করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ২৫ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরণ ইত্যাদি। এর মধ্যে তার দাবি অনুযায়ী জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের পরিকল্পিত অধিবেশন স্থগিত করতে রাজি হন। এই দিন তিনি বৈঠকে স্বীকৃত উভয় পক্ষের সমঝোতার বিষয়গুলো এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকা- সম্পর্কেও ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র শেখ মুজিবুর রহমান এতে সন্তুষ্ট হননি। তিনি সকল দাবি পূরণের লক্ষ্যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ২৭ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করেন। এই অবস্থায় ২৫ ও ২৬ মার্চ মধ্যরাতে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর সশস্ত্র সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এই ধ্বংসাত্মক ও ভয়াবহ আর্মি ক্রাক ডাউনের ফলে প্রদেশব্যাপী হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। আমি নিজে ২৬ মার্চ কারফিউ বিরতিকালে তাঁতীবাজার, ইসলামপুর, নবাবপুর রোড, কাপ্তান বাজার, রাজারবাগ প্রভৃতি এলাকায় গুলিতে মৃত ও অগ্নিদগ্ধ শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। সে ছিল এক বীভৎস দৃশ্য। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই বর্বরোচিত হামলা এবং গণহত্যা ছিল আকস্মিক এবং এর জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। প্রায় মাসব্যাপী সেনাবাহিনীর সাথে আওয়ামী লীগসহ তকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলসমূহ বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটির (ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি) সদস্যদের সাথে আলাদা ও ঐক্যবদ্ধ আলোচনা এবং সময়ে সময়ে সামরিক শাসকদের তরফ থেকে প্রদত্ত প্রেসব্রিফিং থেকে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল তাতে মনে হচ্ছিল যে এই সমস্যার শিগগিরই একটি রাজনৈতিক সমাধান পাওয়া যাবে। কিন্তু অপারেশন সার্চ লাইট মানুষের এই আশাবাদকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। এই সার্চ লাইট অপারেশনের পর সামরিক বাহিনীর অত্যাচার-নিপীড়ন চরমে ওঠে এবং ভীতসন্ত্রস্ত শহরবাসী বাড়িঘর ছেড়ে পায়ে হেঁটে কেউ পল্লী এলাকায় তাদের নিজেদের বাড়িঘরে, আবার কেউ কেউ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই আশ্রয় গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল অমুসলমান। এদের কেউ কেউ ভারতে বসবাসকারী তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। অন্যরা শরনার্থী শিবিরে ওঠে।
উল্লেখ্য যে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মি শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধি বিশেষ করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের বেশীরভাগই দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এই অবস্থায় দেশের মানুষ এক অসহায় অবস্থায় নিপতিত হন। তখনকার পত্রপত্রিকা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যানুযায়ী প্রায় ৮৬ লক্ষ লোক পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নির্যাতন ও তার ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী এদের মধ্যে ৬৯.৭১ লক্ষ লোক ছিল হিন্দু, ৫.৪১ লক্ষ লোক ছিল মুসলমান; ০.৪৪ লক্ষ ছিল অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
মার্চ মাসের ২৭ তারিখে চট্টগ্রামের কালুর ঘাটে স্থাপিত একটি গোপন রেডিও স্টেশন থেকে মেজর জিয়া কর্তৃক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণা আমরা অনেকে শুনেছি। এই ঘোষণাটি প্রথম তিনি নিজের পক্ষ থেকে করেছিলেন। পরে সংশোধন করে শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে করেছিলেন। এই ঘোষণায় প্রদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। এতে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন আবার অনেকেই এটি বিশ্বাস করতে পারেননি। যারা বিশ্বাস করতে পারেননি তাদের যুক্তি ছিল সারা প্রদেশে প্রায় ১ মাসের কাছাকাছি সময় ধরে অসহযোগ আন্দোলন চলেছে এবং এই অসহযোগ আন্দোলনের সময় বলতে গেলে সামগ্রিক প্রশাসনিক কর্তৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ছিল। সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা সবকিছুই তার নির্দেশে চলেছে। তিনি বা তার দল ঐ সময় স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। বরং পাকিস্তানের সংবিধানের খসড়া, ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতি এবং কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক সরকারের অধিক্ষেত্র ও সম্পর্ক নিয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে কি হবে সে সম্পর্কে সহযোগী রাজনৈতিক দল কিংবা তাদের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা বা সলাপরামর্শও করেননি।
তারা যে ধারণা বিশ্বাস পোষণ করতেন তা হচ্ছে স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দই পাকিস্তান আন্দোলনে শরীক ছিলেন। তারা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারেও মন্ত্রিত্ব করেছেন। এই অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই তারা সমস্যার সমাধানের চিন্তাভাবনা করেছেন। তখন দক্ষিণপন্থী ও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানকে মুসলমানদের আদর্শিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, সামরিক শাসকদের জুলুম নির্যাতনের অবসান এবং পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এই সব দল আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছে। তারা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের (কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি) ব্যানারে লড়াই করেছে এবং ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শরীক ছিল। এই অবস্থায় অপারেশন সার্চ লাইট যেমন তাদের হতবাক করেছে, তেমনি তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধও আকস্মিকভাবে আসে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ