ঢাকা, মঙ্গলবার 26 February 2019, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কর্মজীবী শিশু অধিকার এবং বাস্তবতা

আখতার হামিদ খান : নবাগত প্রাণকে ভালোবাসে না, আদর দেয় না; এমন প্রাণী পৃথিবীতে বিরল। মানব সভ্যতায় শিশুর প্রতি ভালোবাসা প্রকট। এর পরও শিশুরা অধিকারবঞ্চিত হয়ে আসছে। কারণে-অকারণে, অভাব-অনটন, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা সচেতনতার অভাবেই প্রতিটি মানুষের আশপাশে, ঘরে-বাইরে, শিক্ষা-দীক্ষা, চলাফেরা, খেলাধুলায় আমাদের শিশুরা তাদের অধিকার পাচ্ছে না। তাদের ঘিরে আছে নানা বৈষম্য। প্রতি বছর ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু, ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় শিশু অধিকার এবং ৩ অক্টোবর বিশ্ব শিশু দিবস পালনের মধ্য দিয়ে শিশুজীবনের কল্যাণের প্রচার-প্রচারণার মহৎ উদ্যোগটি বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ? শিশুর অধিকার সুনিশ্চিত করতে জাতিসংঘ শিশু অধিকার (UNCRC) ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সনদে পৃথিবীর ১৯৩টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। ১৯৯০ সালে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। তবু পূরণ হচ্ছে না আমাদের শিশুদের অধিকার। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৪টি মূলনীতি- বৈষম্যহীনতা, সর্বোত্তম স্বার্থ, বেঁচে থাকা ও বিকাশ এবং শিশুদের অংশগ্রহণ। এই মূলনীতির সঙ্গে শিশুদের অধিকারের বাস্তবতার চিত্রের ফারাক পর্বতসম। বৈষম্যহীনতায় গোত্র, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক ভিন্নমত, জাতীয়তা কিংবা সামাজিক পরিচয়, শ্রেণি, জন্মসূত্র কিংবা অন্য কোনো মর্যাদা নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই এই ঘোষণার সব ধরনের অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করবে। কিন্তু তা কি কোনো শিশু ভোগ করতে পারছে? একজন শিশু জানে না তার অধিকার নীতিতে কী আছে। যিনি বা যারা জানেন, তারা তার শিশুর অধিকার কতটুকু বাস্তবায়ন করছেন? রাষ্ট্র পরিচালক বা কোনো দাতা গোষ্ঠীর পক্ষে কী করে সম্ভব শিশুর সত্যিকার অধিকার বাস্তবায়ন? একজন শিশু বেড়ে ওঠে তার পারিবারিক গ-ি বেয়ে। পর্যায়ক্রমে সে পরিচিত হতে থাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে। এই শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত শিশুর অভিভাবকরা শিশুর পরিপূর্ণ অধিকার বাস্তবায়ন করতে পারছেন? উত্তর সোজা-সাপ্টা- না। কারণ কী?
উত্তর বহুবিধ। অপরিকল্পিত পরিবার, অসচেতন সমাজ ব্যবস্থা, প্রকৃতিগত শিক্ষার অভাব, শিশুদের বুঝে উঠতে না পারা, ধর্মান্ধতা, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সাধ্যাতীত বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার নানা জটিলতায় অবরুদ্ধ। জাতির ভিত, পরিচ্ছন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রথম সোপান পারিবারিক শিক্ষা। পরিবার থেকে একজন শিশু যা শেখে, তার কোনো ক্ষয় নেই। হতে পারে তা সুশিক্ষা বা কুশিক্ষা। বাড়ন্ত শিক্ষার মূল ভিত্তি নিশ্চিত করে বিদ্যালয় আঙিনা। যে অঙ্গন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রের মানব সম্পদ গঠনে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। অথচ একজন শিশুর অধিকার এই দুই জায়গাতেই খর্ব হয়।
শিশুর উন্নয়ন বা মঙ্গল চাপিয়ে দেওয়া কাজে হয় না। শিশুর ইতিবাচক ইচ্ছা পূরণের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিশু-শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে অনেকেই শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করার সুযোগই পায় না। প্রশ্ন করলেই নাকি তারা বেয়াদব হয়ে যায়। অথচ প্রাইভেট পড়লে এই বিশেষণ ইতিবাচক ধারা পায়। আশ্চর্য! একজন শিক্ষার্থীর সার্বক্ষণিক সহযোগী হচ্ছেন তার শিক্ষক। অথচ এ কী হচ্ছে শিক্ষালয়ে! শিশুর অধিকার বাস্তবায়নের এই দুরবস্থা কে দূর করবে? ‘কুইনিন জ্বর সারাবে, কিন্তু কুইনিন সারাবে কে?’ বয়সের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকোষ্ঠে বন্দি আমাদের কোমলমতি শিশুরা। দুর্বোধ্য, বিদেশি ভাষার বইয়ের বস্তা হেফজখানা, কওমি মাদরাসা, এতিমখানা ও কিন্ডারগার্টেনের প্লে-নার্সারির শিশুদের কাঁধে। সারাক্ষণ পড়ালেখা, সুনির্ধারিত ইউনিফর্মের আবরণে শিশুর চাহিদা ঢাকা পড়ে আছে। বিচিত্র ধারা, বহু মাত্রার শিশুশিক্ষা কতটা যুক্তিযুক্ত, শিশুর উপযোগী তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা, ভাবনা, পরিকল্পনা এখন হয়নি। বৈষম্যহীনতা, শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব কি-না, সন্দেহ আছে। বর্তমান সরকার, জাতিসংঘ শিশু সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচ্ছন্ন একটি শিশুনীতি প্রণয়ন করেছে, যা বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিশুরা ‘শিশুস্বর্গের ফুটন্ত মানবসম্পদ’ হিসেবে বেড়ে উঠবে।
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার শিশুদের শারীরিক অবয়ব এবং সুস্থ দেহ-মনের ভাবী প্রজন্ম গঠনে আয়োজন করছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেশিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধু ও মেয়ে শিশুদের জন্য বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ। চালু হওয়ার কথা মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের ফুটবল টুর্নামেন্ট। খবরটি শিশু সমাজের জন্য আনন্দের বটে। তবে এখানেও চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে সরকারি, বেসরকারি, রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা অংশগ্রহণ করতে পারলেও খেলতে পারছে না মাদরাসার ইবতেদায়ি, হেফজখানা, কওমি শাখা এবং কিন্ডারগার্টেন নামক প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পর্যায়ের শিশু-শিক্ষার্থীরা।
জাতীয় শিশু দিবস, জাতীয় শিশু অধিকার দিবস এবং বিশ্ব শিশু দিবস ঘিরে শহরকেন্দ্রিক যে শোভাযাত্রা, প্রতিযোগিতার আলোচনা হচ্ছে, তা কেন গ্রামপ্রধান দেশের তৃণমূল পর্যায়ে হচ্ছে না? স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, স্কুল-কলেজ, এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে না? তবে কি এগুলো লোক দেখানো শিশুসেবা? একজন চেয়ারম্যান, মেম্বার কি চান না তার ইউনিয়নের শিশুরা সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠুক? কোনো উন্নয়ন ধারার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে হলে শহরের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে তার বিস্তার ঘটাতে হয়। পচন ধরা সমাজের শৈশব-কৈশোর এখন দুর্গন্ধে নিমজ্জিত। অন্ধত্ব, কুসংস্কারে ঘিরে আছে পাড়া-মহল্লা, আধুনিকতার নেতিবাচক দিকে হাবুডুবু খাচ্ছে শিশু-কিশোররা। অচল হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রীড়া-কালচার। এই দুঃখজনক পরিবেশ থেকে জাতিকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপহার দিতে হলে শিশু অধিকার বাস্তবায়ন অনিবার্য। এ ক্ষেত্রে শুধু সনদ, নীতি, আইন, সরকার ও দাতাগোষ্ঠীর দ্বারাই তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকারি নির্দেশনা, সামাজিক জাগরণ, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, স্থানীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, নজরদারি, সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ