ঢাকা, বৃহস্পতিবার 28 February 2019, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৫, ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এমন খেলার পরিণতি কেমন হবে

গাড়ির গ্যাস-সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত হলেও উচ্চ দহনশীল কেমিক্যালের স্পর্শেই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয় চকবাজারে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে বিপুল প্রাণহানির সূত্রপাত যখন গ্যাস সিলিন্ডার থেকে, তখন বাসাবাড়ি ও যানবাহনে ব্যবহৃত গ্যাস-সিলিন্ডার কতটা নিরাপদ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক-মহাসড়কের জন্য অশনিসঙ্কেত হলো যানবাহনে অনিরাপদ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বিভিন্ন যানবাহনে যে গ্যাস-সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে তার ৭০ ভাগ রি-টেস্টিংয়ের আওতার বাইরে থাকছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার হরহামেশা ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করায় একেকটি গাড়ি যেন একেকটি বোমা বহন করে চলেছে।

আজকাল বাসাবাড়িতেও রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ব্যবহারও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ কমে আসার ফলে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্নার কাজে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে। তবে এর ব্যবহারে সচেতনতা প্রয়োজন। দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, গ্যাস-পাইপলাইনের ত্রুটি থেকেও বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে মানুষ হতাহত হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় এবং বস্তিতে অবৈধভাবে গ্যাস পাইপ সংযোগ নেয়া হয়েছে, এসব সংযোগে কারিগরি ত্রুটি থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। পাইপ লাইনের লিকেজ থেকেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং মাঝেমধ্যে হতাহতের খবর পাওয়া যায়। গত ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পাইপ লাইনের লিকেজ বিস্ফোরণে দগ্ধ হয় একই পরিবারের নয়জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, পাইপ লাইন বিস্ফোরণ, চুলার ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণসহ অন্যান্য কারণে মানুষ হতাহত হচ্ছে। সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের হিসাব থেকে দেখা যায়, গত বছর এ ধরনের গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭৮টি। আগের বছর ঘটে ৭৯টি। ২০১৬ সালে ১৩১টি এবং ২০১৫ সালে ৮০টি গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল। গ্যাস দুর্ঘটনা থেকে যেন আমাদের মুক্তি নেই। আসলে এ ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও তদারকী প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, গ্যাস সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োজিত রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল। তারা অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা কমে আসতে পারে। অন্যথায় দিন যত যাবে, সিলিন্ডার দুর্ঘটনার হারও তত বেড়ে যেতে পারে। ফলে প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়বে। আমরা কি এমন আশঙ্কা দূর করতে পারি না?

গ্যাসসিলিন্ডার বিস্ফোরণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আমরা রাজধানীর চকবাজারের ঘটনায় উপলব্ধি করতে পেরেছি। বিস্ফোরণ আসলে কোন শুভ সংবাদ বয়ে আনে না। আর বর্তমান সময়ে তো আমরা নানাবিধ বিস্ফোরণের ঘটনা লক্ষ্য করছি। সিরিয়া নামক দেশটিতে তো পরাশক্তিগুলো সমরাস্ত্রের বিস্ফোরণের ধারা অব্যাহত রাখায় সেখানকার মানুষগুলো ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন শরণার্থী। বর্তমন সময়ে ভয়াবহ এক বিস্ফোরক দ্রব্যের নাম আরডিএক্স। ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলাওয়ামায় আরডিএক্স বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি নিয়ে ভারতের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের গাড়িবহরে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে বহরের ৭০টি গাড়ির মধ্যে একটি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়ে যায়। প্রাণ হারায় বাহিনীর অন্তত ৪৪ সদস্য। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাশ্মীর পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে আছে। পাক-ভারত সীমান্তেও হুমকি-ধমকি চলছে। 

(দুই)

পুলাওয়ামা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্লেমগেমের পাশাপাশি বিচার বিশ্লেষণও চলছে। এই ঘটনায় মোদি সরকারের সমালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার কেন গোয়েন্দা তথ্যকে উপেক্ষা করে সিআরপিএফ বহরকে যেতে দিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এতো বছর কেন তারা কোন ব্যবস্থা নিলো না। নির্বাচন যখন একদমই সামনে চলে এসেছে তখন কেন এই ছায়াযুদ্ধের শুরু? মমতা আরও বলেন, তিনি তার রাজ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে কঠোর থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জনগণকে আহ্বান জানান, তারা যেন কোন সমাজবিরোধী ভাবধারায় প্ররোচিত না হন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মোদি ও অমিত শাহ বক্তব্য দিয়ে জাহির করতে চাইছেন যে শুধু তারাই দেশপ্রেমিক। বাকিরা নন। এটা সত্য নয়। বিজেপি, আরএসএস, ভিএইচপি সবাই আসলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে। আমি গত পাঁচ দিন চুপ ছিলাম। কিন্তু এখন মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমি দেখছি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।

মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য দেখে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি তেমন সরল নয়। ভোটের রাজনীতির সাথে এখানে চলে এসেছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষয়টিও। তাই চোখ-কান খোলা রেখে পরিস্থিতির যথাযথ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আসলে সন্ত্রাস কিংবা সাম্প্রদায়িকতা কোনটাই মানুষের কাম্য হতে পারে না। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা আগে গণ-বিস্ফোরণের কথা শুনেছি। এখন শোনা যাচ্ছে বোমা-বিস্ফোরণ, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, আরডিএক্সসহ নানাবিধ বিস্ফোরণের কথা। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ কাউকে মনের কথা জানাতে এখন আর কলম-কাগজের আশ্রয় নেন না, স্মার্টফোনেই লেখা ও বলার কাজ সেরে নেওয়া যায়। অর্থাৎ মননের বদলে মস্তিষ্ক তথা বুদ্ধির চর্চাটাই এখন হয় বেশি। মানুষে-মানুষে, সমাজে-সমাজে, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব কিংবা মত পার্থক্যের বিষয়ে সুরাহায় এখন উচ্চতর দার্শনিক মূল্যবোধ কিংবা যৌক্তিক বিবেচনার চর্চা হয় না; চর্চা হয় অপকৌশল ও মারণাস্ত্রের। কারণ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই যুগে মস্তিষ্কের চর্চাটাই বেশি হচ্ছে। হৃদয় বা আত্মার আহ্বান শুনতে আমরা এখন অভ্যস্ত নই। ফলে বর্তমান সভ্যতার চলতি হাওয়ায় সরব অসংখ্য খ-িত মানুষ, পূর্ণাঙ্গ মানুষের দেখা মেলা ভার। খ-িত মানুষের সিদ্ধান্তে এখন মানুষের সুখ বাড়ে না, বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অসুখ বাড়ে। না চাইলেও এমন বাস্তবতাই এখন আমাদের ঘিরে রেখেছে।

খ-িত মানুষদের চিন্তা-ভাবনা, সিদ্ধান্ত ও কর্ম সুসম ও ন্যায়ানুগ হয়না। ফলে তা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণপ্রদ বলে বিবেচিত হতে পারে না। দেশ-বিদেশের ঘটনা প্রবাহে আমরা তেমন চিত্রই লক্ষ্য করছি। তেমন একটি ঘটনার নাম এনআরসি তথা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন। ভারতের আসাম রাজ্যে এনআরসির বিরুদ্ধে গণ-বিস্ফোরণের পর এখন আবার পাশের রাজ্য অরুণাচল অশান্ত হয়ে উঠেছে কিছু খ-িত মানুষের পিআরসি (স্থায়ীভাবে বসবাসের সনদ) নিয়ে। এর জেরে ২৪ ফেব্রুয়ারি উপ-মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বাংলোয় আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। এছাড়া জেলা প্রশাসকের দপ্তর ও রাজ্য সরকারের বনমন্ত্রীর মালিকানাধীন বিপনিবিতানে আগুন দেওয়া হয়েছে। গুলী ও সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন চারজন। অরুণাচল রাজ্য সরকার রাজধানী ইটানগর ও এর আশপাশের এলাকায় কারফিউ জারি করেছে। সড়কে নেমেছে সেনাবাহিনী। 

অবশ্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় পেমা খান্ডুর সরকার পিছু হটেছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পিআরসির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বলেন, রাজ্যবাসীর আবেগকে মর্যাদা দিয়ে বিধানসভার চলতি অধিবেশনে পিআরসির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ক্ষমতা ও ভোটের স্বার্থে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ-িত মানুষেরা কখনো নাগরিক নিবন্ধন, কখনো বসবাস সনদ নিয়ে রাজনৈতিক খেলা শুরু করেছেন। এ খেলার পরিণতি কেমন হবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ