ঢাকা, শুক্রবার 1 March 2019, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এত মৃত্যুর দায় কার?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : জন্মিলে মরিতে হয়। এটা নতুন কথা নয়। জন্মের সিরিয়াল আছে কিন্তু মৃত্যুর কোনো সিরিয়াল নেই। জন্মকে মানুষ ঠেকাতে পারে। কিন্তু মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। সব মৃত্যুই শোকের ও বেদনার। স্বাভাবিক মৃত্যুর শোক সওয়া গেলেও অস্বাভাবিক মৃত্যুর শোক সবাইকে তাড়িয়ে বেড়ায়। রাজধানী ঢাকাকে আগ থেকেই আতংকিত ও অপ্রস্তুত শহর হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় এ নিয়ে লেখালেখিও কম হয়নি। কিন্তু বিষয়টি এমনই দাঁড়িয়েছে ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিলে শামিল হচ্ছে হাজারো মানুষ। একের পর এক লাশের স্তুপ আমাদের চোখের সামনেই ভেসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কখনো আগুনে পুড়ে,কখনো বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে,কখনো ভবন ধসে। অথচ মনুষ্যসৃষ্টি এ দুর্ঘটনা আমরা প্রতিরোধ করতে পারছি না।  মনুষ্যসৃষ্টি এ দুর্ঘটনা  প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। নিমতলী থেকে চকবাজার। দূরত্ব এক যুগের নয়, মাত্র নয় বছরের। পুরান ঢাকার চকবাজারের মনুষ্যসৃষ্ট অগ্নিকা-ের ঘটনাটি আমাদেরকে আবারো নিমতলীর ট্র্যাজেডির কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর অগ্নিকা-ে ১২০ জনেরও বেশি মানুষ জীবন দিয়েছিল। আর এবার চকবাজারে প্রাণ হারিয়েছে ৭৮ জন মানুষ। পার্থক্য শুধু নয়টি বছর। আর সব আগের সিলসিলা অনুযায়ী ঘটেছে। চকবাজার এখন মৃত্যুপুরী। অসংখ্য মানুষের নির্মম মৃত্যুতে শুধু স্বজন হারারাই কাঁদছেন না, কাঁদছে সারা দেশের মানুষ। শুধু কাঁদছে না দায়িত্বজ্ঞানহীন লোভী কাপুরুষের গোষ্ঠীরা। যারা ঘুষ বাণিজ্যের মোহে বৈধ অবৈধতার  তোয়াক্কা না করেই শুধু লাইসেন্স দিয়েছে। চকবাজার যেন এক পোড়া জনপদ। সেখানে নেই নিত্যদিনের গাড়ির হর্ন। নেই কর্মব্যস্ত মানুষের রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলার দৃশ্য। নিহত স্বজনদেও বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। স্বজন হারানোর বেদনায় কেউ কেউ বাকরুদ্ধ,কেউ প্রচন্ড বেদনায় বুক চাপড়াচ্ছেন। বাতাসে লাশের গন্ধ আর পোড়া ছাইয়ে অংশ দেখে মনে হচ্ছে এই যেন কোন প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ, কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত ধূসর নগরী। 

এই মর্মান্তিক ঘটনা এটাই প্রথম তা কিন্তু নয়! রাজধানীতে এ ধরনের আরো বহু ঘটনা ইতোপূর্বে ঘটেছে। ২০১০ সালে ৩ জুন রাজধানীর পুরান ঢাকার নবাবকাটরার নিমতলিতে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছিল। আগুনের  লেলিহান শিখা কেড়ে নিয়েছিল ১২০টি প্রাণ। সেই ঘটনার পর সবাই প্রত্যাশা করছিল রাষ্ট্র অগ্নিকান্ডের রুটকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করবে। কিন্তু সবই গুলে বালি। গত ১০ বছরে আমরা তাজরিন গার্মেন্টস,রানাপ্লাজা ধ্বস,গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকান্ড ও নিমতলী ট্র্যাজেডিতে হাজারো মানুষকে প্রাণ দিতে দেখেছি। একেকটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সে সব তদন্ত রিপোর্ট আর জাতির সামনে উন্মোচন করা হয় না। ২০১০ সালের ৩ জুন তারিখ রাতে নিমতলির ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পরও একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। অথচ সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজো আলোর মুখ দেখেনি। চোখের সামনেই শত শত মানুষের জীবন ও সর্বস্ব হারানোর আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়েছে। অথচ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ধ্বংসযজ্ঞের উৎস গুদাম কারখানা সরিয়ে নেয়ার কাজ করা হচ্ছে না। পুরনো ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে ফেলার জরুরী নির্দেশনা জারি বাস্তবায়িত হলে চকবাজারে এমন ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হয়তো জাতিকে এভাবে দেখতে হতো না। নিমতলিতে অগ্নিকান্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জীবন বাজি রেখেও হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারেনি। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে অপ্রশ্বস্ত রাস্তা দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ী প্রবেশ করতে না পারা,পানির যোগান না থাকা ও কেমিক্যালের গুদাম। তখনও শাসকেরা বলছিল নিমতলী থেকে সব কেমিক্যালের গুদাম অন্যত্র সড়িয়ে নেয়া হবে। তবে এতদিন কেন নিমতলী কিংবা চকবাজারের কেমিক্যাল গুদাম সড়িয়ে নেয়া হয়নি?এত মানুষের মৃত্যু,এত মানুষের আগুনে ঝলসে আহত হওয়ার দায় কোনোভাবেই সরকার এড়াতে পারে না। এ চরম,নির্লজ্জ ব্যর্থতার ক্ষমা স্বজনহারারা কোন দিন করবে না। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। নিমতলি ট্র্যাজেডির সময় থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটেনি। তাহলে কেন অঙ্গিকার বাস্তবায়ন হয়নি এটা জাতির সামনে পরিস্কার করা উচিত।

একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়কের আশপাশে এবং বাসাবাড়িতে গ্যাস পাইপলাইন ছিদ্র ও চুলার সংযোগ থেকে বের হওয়া গ্যাসে প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার তো এক একটি এটম বোমায় পরিণত হয়েছে। তবু টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগুনে  পুড়েছে এমন কিছু দুর্ঘটনার চিত্র  পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পেশ করছি। ১৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগার আগে চট্রগ্রামের এক বস্তিতে আগুন কেড়ে নেয় তাজা ১০টি প্রাণ। শিল্প ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সকাল নয়টায় সাভার মোড়ে অবস্থিত রানা প্লাজা ধসের শিকার হয়। রানা প্লাজা ধ্বসে ১১০০ শ্রমিক নিহত হন।  ২০০৫ সালের ১০ এপ্রিল স্পেকট্রাম গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৬৪ জন নিহত হন। ২০০৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও এর ফিনিক্স ভবন ধসে ২১ জন নিহত হয়েছিল। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে আগুন লেগে ১১৩ জন। ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে মারা যায় ২৫ জন। ১৫ ডিসেম্বর ২০১০ সালে ঢাকাস্থ হা মীম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যায় ২৪ জন। ২০০৬ সারের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে চট্রগ্রামের কেটিএস কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলে আগুন লেগে মারা যায় ৯১ জন।  ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বরে রাজধানীর হাজারীবাগের বউবাজার বস্তিতে লাগা আগুনে ১১ জন নিহত হন। 

ফায়ার সার্ভিসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ৮৮ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রাণহানি হয়েছে ১৪০০ জন,আহত হয়েছে অন্তত ৫০০০ জন মানুষ (সূত্র:বিবিসি বাংলা)। বাংলাদেশ দমকল বাহিনী বা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয় ২০১৮ সালে সারা দেশে ১৯ হাজার ৬৪২টিরও বেশি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ১৩০ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছে। ফারার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান মতে প্রতি বছর গড়ে ১৯ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ বছরে সারাদেশে ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৫টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৫৮ জন। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৮২৫ জন। আর ক্ষতির পরিমাণ সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংঘটিত অগ্নিকান্ডের ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ বৈদ্যুতিক ক্রুটির কারণে ঘটেছে।

উন্নয়নের স্লোগানে যখন জাতি বুঁদ তখন দু চার পাঁচটি আগুনের ঘটনা মামুলি ব্যাপার ব্যতিত আর কিছইু না। অন্যায়,অবিচার,জুলুম নির্যাতন সবই গা সওয়া যে জাতির সে জাতির ভাগ্যে এরকম দুর্ঘটনা আসবে এটাই তো স্বাভাবিক! শাসকেরা কয়েকটি বিরাট বিরাট ভবন আর সেতু বানিয়ে বগল বাজাইতে বাজাইতে সোনা বন্ধুর গান গায় আর বলে উন্নয়নের রোল মডেল নাকি বাংলাদেশ। একটি নগরীকে নিরাপদ না রেখে কিভাবে উন্নয়ন হয় তা বোধগম্য নয়! যেখানে দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকের জীবনের নূন্যতম নিরাপত্তা নেই সেখানে উন্নয়নের দিয়ে জনগণ কী করবে? যে মানুষের ঘাম আর রক্তে উপার্জিত টাকায় দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে, সে মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের মুখ থুবড়ে পড়বে। অর্থনীতির চাকাকে যারা ঘুরিয়ে দেয় সেই অর্থনীতির সোনার ডিম দেয়া মানুষগুলো যখন লাশ হয়ে যায় তখন প্রতিকার ও প্রতিরোধহীন নির্বিকার অকৃতজ্ঞ রাষ্ট্রকে ধিক্কার জানায় সারি সারি কফিনগুলো। আজ উন্নয়নের স্লোগানের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের  কেমিক্যাল গুদাম স্থানান্তর করা। দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ