ঢাকা, শুক্রবার 1 March 2019, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাদকের ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ

এইচ এম আব্দুর রহিম : মাদকদ্রব্য সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর লাগাম টেনে না ধরতে পারলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে সন্তান এম এ পাস করে এসে মদের বোতল পিতার মাথায় ভাঙ্গবে, মেয়ে এম এ পাস করে এসে জারজ  সন্তান পেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে!  কারো কিছু করার থাকবে না। দেশের  ৬৮ হাজার গ্রামে মাদক দ্রব্য বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। স্কুল  কলেজগামী ছেলে মেয়ে এমনকি চাকরিজীবীরা ও বৃদ্ধারা  পর্যন্ত মাদক দ্রব্য সেবন করছে বলে জানা গেছে।  দেশে কি পরিমাণ মাদকাসক্ত আছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৭০ লাখের মত মাদকাসক্ত আছে। এর মধ্যে ৭৪ শতাংশ হলো ছেলে আর ২৬ শতাংশ মেয়ে। গবেষণায় দেখা গেছে,এদের ৯৮ শতাংশ ব্যক্তির প্রথম ধাপ সিগারেট। তবে দেশে লাখ লাখ বেকার যুবক রয়েছে তারা কর্ম সংস্থানের অভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এক পর্যায়ে নেশার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে । তবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো এদিক থেকে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদক দ্রব্য প্রতিরোধে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা কাজে আসছে না ।কারণ তাদের বিভিন্ন রূপ ও পরিচয় আছে। যেমন রাজনৈতিক রূপ, সামাজিক রূপ, ব্যবসায়িক রূপ, এমন কি প্রশাসনিক রূপও আছে। এটা বন্ধ করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ইদানীং শহরের একটি নামীদামি মাদক দ্রব্যের নাম ‘সিসাবার’ ইতিপূর্বে আইন নেই বিধায় সিসাবারের বিরুদ্ধে কোন  কিছু করতে পারছে না প্রশাসন। আশার কথা হলো, সরকার ইতিমধ্যে মৃত্যুর বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ পাস হয়েছে। কোন ব্যক্তি ৫ গ্রামের বেশী ইয়াবা, অন্যদিকে হেরোইন, সীসা বা কোকেনের ক্ষেত্রে ২৫ গ্রামের বেশী বহন, সেবন বিপনন মদদ দান ও পৃষ্ঠপোষকতা করলে তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও মৃত্যুদন্ডেরও বিধান রাখা হয়েছে । তবে এর পরিমাণ ৫ গ্রামের নীচে হয়,সর্বনি¤œ শাস্তি এক বছর এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর কারাদন্ড। এর সঙ্গে অর্থদন্ডে দন্ডিত করা যাবে । যদি ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ  আইন ১৯৯০ এ মাদক অপরাধিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড ছিল। বিগত আইনে কোন ব্যক্তির দখল, কর্তৃত্ব বা অধিকারে মাদকদ্রব্য না পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার সুযোগ নেই । ফলে মাদক ব্যবসায় জড়িত মুল পরিকল্পনাকারীরা সহজে পার পেয়ে যায়। নতুন আইনে মাদক ব্যবসায়ে পৃষ্ঠপোষক ও মাদকের গডফাদারসহ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনে মাদক দ্রব্যে ও পৃষ্ঠপোষণকারী কোন ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষমতায়িত করা হয়েছে ।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে সাড়াঁশি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। এটা কতটুকু বাস্তবায়ন করা হয় তা এখন দেখার বিষয় । মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা আইন শৃংখলা বাহিনী থেকে বলা হচ্ছে, সেটি যদি সত্য ওয়ার অন ড্রাগস হয়ে থাকে, তবে সে ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। মাদক যে কত ক্ষতিকর হতে পারে এবং একটি জাতিকে অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে, সে সম্পর্কে সবার কিছু না কিছু ধারনা রয়েছে । কাজেই এটি একটি জরুরী বিষয় । যে কোন সভ্য রাষ্ট্র মানবাধিকারের এ শর্তগুলো সমর্থন করে, মানুষকে তার অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তার যে শাস্তি প্রাপ্য তার চেয়ে বেশী কিছু প্রদান বা আদালতে যে শাস্তি প্রদানের কথা,তা ছাড়া অন্য কেউ শাস্তি প্রদান করতে পারেন না। এটা আমাদের সংবিধানের ৩১ থেকে ৩৫ ধারার মধ্যে সন্নিবেশিত আছে । সে জন্য তথাকথিত বন্দুক যুদ্ধের মাধ্যমে মানুষ হত্যা করছে, আজ এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে একই কাহিনী। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদেরকে পুলিশ র‌্যাব ধরতে গেছে তারা আক্রমণ করেছে আর আইন শৃংখলাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তারা মৃত্যুবরণ করেছে। কারো কারো পরিবার অভিযোগ করেছে, তাদের কিছুদিন আগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ্এবং পরিস্থিতি সাজিয়ে তাদেরকে বন্দুক যুদ্ধে  হত্যা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দেনদরবারে অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। দেশে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান কার্যকরভাবে চললে ও মাদকাসক্তদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থার কার্যক্রমে কোনো গতি নেই। ডোপ টেস্ট চালু না করায় সরকারি চাকুরিসহ বিভিন্ন পেশায় থাকা মাদকাসক্তরা শনাক্ত হচ্ছে না। মাদকাসক্তরা সহজে চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। যদিও নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সন্দেহভাজন সবাইকে ডোপ টেস্ট করা যাবে এমন বিধান করা হয়েছে সরকারী চাকুরিতে নিয়োগের সময় । ডোপ স্টেট বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। কিন্তু এসব বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলছে ঢিমেতালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় চালু করা হয়নি ডোপ টেস্ট। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার সময় এই পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেই। মাদক আমাদের দেশের তিন শ’ বছরের পুরানো সমস্যা। ১৭৭৫ সালে পলাশির আ¤্রকাননে যে যুদ্ধ হয়েছিল; ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতবর্ষে আধিপত্য করার মুল কারণ ছিল মাদক ব্যবসা। মাদক একটি বড় সমস্যা এতে বিশেষ করে আমাদের যুব  সমাজ ধ্বংস করে দিচ্ছে । মাদকের ক্ষেত্রে আমাদের সফল হওয়ার কথা ছিল আমরা সেভাবে সফল হতে পারছি না, এ কথা আমাদের সকলকে অকপটে স্বীকার করতে হবে।  মাদকদ্রব্য যে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে এখন তা কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে সেটা বিচার বিশ্লেষণ করা দরকার । প্রায় ২১৭ কিলোমিটার সীমান্ত হচ্ছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের সাথে। এর মধ্যে ৬৩ কিলোমিটার হচ্ছে জলপথ । বাকীটা স্থলপথ । মাদক এক এক সময় তার রূপ বদলায়। আজকের যে মাদকটিকে ইয়াবা বলছি, সময়ের বিবর্তনে এই ইয়াবা আর এক নামে আসবে। এক সময় ফেনসিডিল ছিল ব্যাপক প্রচলিত মাদক এবং তার ছিল রমরমা ব্যবসা । তার আগে মদ, আফিম, কোকেন, গাঁজা, হেরোইন,ইত্যাদি ছিল। যদিও হেরোইন অত্যন্ত লাভ জনক মাদক । অর্থাৎ এ মাদক বন্ধ আছে তা কিন্তু নয়। ভিন্ন নামে এগুলো আসছে । ফেনসিডিল যতটুকু লাভজনক ব্যবসা, বহন করতে ততটুকু কষ্ট;এর চেয়ে ইয়াবা অনেক সহজ। ইয়াবা এত ছোট ট্যাবলেট সহজে তা বহন করা যায় । ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকে। আর এ প্রমাণিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সরাসরি এর সাথে যুক্ত । এ অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে এমপি পদে এবার নমিনেশন দেয়া হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এর সাথে জড়িয়ে পড়েছে যে কারণে মাদকদ্রব্য চোরাচালান বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের নাকের ডোগায় তারা এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে । ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা –চট্রগ্রাম, টেকনাফে প্রচুর গাড়ী চলাচল করছে। এভাবে কোন না কোন ভাবে মিয়ানমার থেকে মাদক আমদানি হচ্ছে । ধরা যাক টেকনাফ বরাবর কন্ট্রোল করা করা হলো। তখন দেখা গেল নদী পথে বা পটুয়াখালি বা বিকল্প পথে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। বিশাল সমুদ্রে চেক করার ক্ষমতা আমাদের নেই । তাছাড়া মাদক কার কাছে আছে, কে পরিবহন করছে তা বোঝার কোন উপায় নেই। একটা ইয়াবা ট্যাবলেেেটর দাম মিয়ানমার বা টেকনাফ সীমাস্তে ৩০/৪০ বা সর্বোচ্চ ৫০ টাকা   সেই ট্যাবলেট ঢাকার আশে পাশে ২৫০.৩০০,৪০০টাকায় বিক্রি হয় । এটা লাভজনক চোরাচালান। নারী ওশিশুরা এখন এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। এক গবেষনায় দেখা গেছে ,একজন ছাত্র নিজে নিজে এ ব্যবসায় জড়িত হয় না এটি হয় শতভাগ বন্ধু বান্ধবের প্ররোচনায় । কারণ একটা ইয়াবার দাম যেখানে দুই শত আড়াই শত টাকা  একজন ছাত্রের পক্ষে তা যোগাড় করা কখনও সম্ভব নয় । মা বাবার কাছ থেকে চুরি করতে করতে চোর ,ডাকাত, ছিনতাইকারী হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে সব ধরনের অনৈতিক কাজের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে ।  নিজেই মাদক সরবরাহ করে বা মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যায় । ফলে এ পথে ঢোকা সহজ বেরিয়ে আসা কঠিন । যে হারে মাদক দ্রব্য নতুন প্রজন্মকে আক্রমণ করছে, যা ঠেকান দুরুহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেমন পুলিশ,কোস্ট গার্ড,র‌্যাব বিজিবি অন্যান্য বাহিনীর পক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মাদক থেকে বাঁচতে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। আল্লাহপাক মাদক দ্রব্যকে কোরআনে কারীমে হারাম করেছেন । মাদক দ্রব্য নিষিদ্ধের ব্যাপারে আল্লাহপাক সুরা বাকা¡রার ২১৯ নং আয়াত অবতীর্ন করেছেন। যার অর্থ হল “হে রসুল (সা:) মানুষ আপনাকে জিজ্ঞাসা করে মদ জুয়া সম্পর্কে? আপনি বলে দিন এটা মহাপাপ । যদিও মানুষদের জন্য কিছুটা উপকারিতা আছে। কিন্তু তাতে উপকারের চেয়ে পাপের মাত্রা বেশী” এরপর আল্লাহ সুরা মায়েদার ৯০ নং আয়াত অবতীর্ন করেন,“হে ঈমানদারগণ মদ,জুয়া,পুজার বেদী, ও লটারী সব শয়তানের অপবিত্র কাজ,  তোমরা তা থেকে বিরত থাক ।আশা করা যায় তোমরা সাফল্য অর্জন করতে পারবে”। প্রতিদিন বন্দুকযুদ্ধে মাদক কারবারীদের নিহত হওয়ার খবর আসছে ।  কিন্তু মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমছে না। দেশের তরুণ সমাজ মাদকাসক্তদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদকাসক্তদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সরকারি চাকুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশায় ঢুকে পড়েছে মাদকাসক্তরা। অনেক সময় দেখা যায় চাকুরিতে ঢোকার পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেকে কুসংসর্গে হয়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে । কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মধ্যে মাদক ঢুকে পড়েছে। কিন্তু দেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্ত শনাক্ত করার কোন ব্যবস্থা নেই। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল সড়ক, মহাসড়ক। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, বাড়ছে হতাহতদের সংখ্যা। একটি জরিপ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। যানবাহনের চালকদের বড় অংশ মাদকাসক্ত। অনেকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালায়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত করা যাচ্ছে না। সবক্ষেত্রে মাদকাসক্ত শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকত তবে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমে যেত। দেশে গত ২৫ ডিসেন্বর থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ কার্যকরী হয়েছে।এই আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে। মাদকাসক্তদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট করা যাবে। ডোপ টেস্ট পজেটিভ হলে আইনগত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে । কিন্তু মুল বাধা হয়ে গেছে আইনে, মাদক আইনের বলা কয়েকটি বিধির খসড়া তৈরী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠান হলে ডোপ টেস্টের বিধিমালা চূড়ান্ত হয়নি । সরকারী চাকুরিতে প্রবেশ, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানসহ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামুলক প্রয়োজন ।

(লেখক সাংবাদিক ও গবেষক)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ