ঢাকা, শনিবার 2 March 2019, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বহু ভাষাসৈনিক আজও বঞ্চিত অবহেলিত

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : দেখতে দেখতে বাংলাভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি অতিবাহিত হয়ে গেল। উল্লেখ্য, আমার এ লেখাটি যেদিন বেরুবে তার আগের দিন রক্তস্নাত স্বাধীনতার মাস মার্চ শুরু হয়ে যাবে। তবে বাংলাভাষা আন্দোলনের মাস যদি বাংলাসন হিসেবে ধরা হতো তাহলে সেটা হতো ফাগুন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাসটা ধরা হয়েছে ইংরেজি। অথচ ফাগুনের আগুনঝরা ভাষা আন্দোলনের মাস বাংলাসন হিসেবেই গণনা হওয়া সমীচীন ছিল। আর ফাগুনেরে আগুনরাঙা পলাশ-শিমূলের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি ঠিক মানায়ও না। মানায় ফাগুনকেই। তবে আগে বাংলা পঞ্জিকার একটা গরমিল ছিল বলেই ২১ ফেব্রুয়ারিকে ভাষাদিবস হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আর এখনতো একুশ শুধু আমাদের একার ভাষাদিবস না। এটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। কাজেই ফাগুনে ফিরে যাবার আর অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। তবে আমরা বাঙালি জাতি ইংরেজি মাস ফেব্রুয়ারিতেও ফাগুনের আগুনঝরা উত্তাপ অনুভব করতে জানি। উষ্ণতাও ছড়াতে পারি অবলীলায়। ফাগুন না ফেব্রুয়ারি তা আমরা ভুলে যাই প্রায়শ।
ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি এলে আমরা আন্দোলিত হই। উৎফুল্ল হই। বাংলাভাষার প্রতি প্রেম দেখাই। বাংলা একাডেমির আয়োজনে বিরাট বইমেলা বসে প্রতিবছর।  সভা-সেমিনার হয়। বাংলাভাষার প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে অনেক গুণীজন বক্তৃতা করেন। বায়ান্নর ভাষাসৈনিকদের সম্পর্কে আলোচনাও করেন কমবেশ। তবে যারা শহিদ হয়েছেন তাঁদের সম্পর্কেই বেশি। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আরও যারা অংশ নিয়েছিলেন এবং এখনও বেঁচেবর্তে আছেন তাঁদের আদৌ খোঁজখবর নেন না কেউ। এমনকি ভাষা আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছিলেন তাঁদের আপনজনরা কে কোথায় আছেন তারও কোনও খোঁজখবর তেমন রাখা হয় না বলা যায়। তবে শহিদ মিনারে শতকোটি টাকার ফুল দিয়ে সম্মান দেখানোর নামে ভড়ং দেখানো হয়।
কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে দেখানো হলো, ভাষা শহিদ মতিউর রহমানের এক ভাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে। হয়তো ফেব্রুয়ারি মাস বলে টিভি চ্যানেলটির লোক মতিউরের বাড়িতে গিয়ে ভিডিও করেছেন। কবরটা দেখিয়েছেন। এ সুযোগে আত্মীয়স্বজনরা টিভিতে চেহারা দেখাবার সুযোগ পেলেন, এই যা। এতে কি মতিউরের আপনজনদের তেমন কোনও লাভ হয়? সালাম, বরকতের আত্মীয়-স্বজনদের কেউ খোঁজ নেন বলে মনে হয় না। অথচ অনেকেই তাঁদের নাম বেঁচে ব্যবসা করছেন এখনও। 
ভাষা আন্দোলনের পুরোধা প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম সাহেবকে আমি দেখেছি। অল্পকিছুদিন এ মহান ব্যক্তিত্বের সাহচর্য আমি পেয়েছি একটি সংগঠন করবার সুবাদে। এ সাদাসিধে মানুষটি যে বিখ্যাত প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম তা ভাবাই যায় না। তিনি মিরপুরে অবস্থিত সরকারি বাঙলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেবার জন্য তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বাংলাভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ের পাঠ্যবই রচনার ক্ষেত্রেও আবুল কাশেম অমূল্য অবদান রেখেছেন। বাঙলা কলেজের অনারারি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বহুবছর। এ মহান ব্যক্তির যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে কি? হয়নি। আবুল কাশেম সাহেবের সন্তানরা খুব ভালো অবস্থানে ছিলেন বলে মনে হয়নি। এক ছেলের সঙ্গে আগে প্রায়শ দেখা হতো। এখন আর হয় না। বেঁচে আছেন কিনা তাও জানি না।
প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমের সহযাত্রী বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট ইত্তেফাকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আখতার-উল-আলম, অধ্যক্ষ আশরাফ ফারুকী, দেওয়ান মুহম্মদ আজরফ, আশরাফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক আবদুল গফুরসহ আরও অনেকে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আখতার-উল-আলম ও আশরাফ ফারুকী বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যারা প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। আজ তাঁরা প্রায় স্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছেন। আখতার-উল-আলমের জানাযা ও দাফনের সময়ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং প্রতিবেশীদের ব্যতীত অনেককেই দেখা যায়নি। আমি সেদিন বিস্মিত হয়েছিলাম বৈকি। তবে তাঁর বাসায় মরদেহের পাশে দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ড. রেজওয়ান সিদ্দিকীকে দেখেছি অনেকক্ষণ যাবৎ। অনেক সাংবাদিক সহকর্মীকে সেলফোনে খবর দিয়েও পাওয়া যায়নি। প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকীও গ্রামের বাড়িতে শেষবিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তাঁর ছেলে বন্ধুবর সাংবাদিক কবি মুজতাহিদ ফারুকী জানালেন কয়েক দিন আগে। এভাবেই বায়ান্নর ভাষাসৈনিকরা একে একে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের মূল্যায়ন কেউ করছেন না। অথচ এ মনীষীদের অবদান অনেক। জাতি ও সমাজকে অনেক দিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু বিনিময় কিছু চাননি। এঁদের সম্মানিত করলে, মর্যাদা দিলে কেউ নিঃস্ব হবেন এমনও নয়। কিন্তু আমাদের তেমন ঔদার্য কই? তাও ভালো যে, তমুদ্দুন মজলিশের মতো প্রতিষ্ঠান উল্লেখিত মনীষীরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে তাঁদের মাঝেমধ্যে স্মরণ করা হয়। পদক দেবার ব্যবস্থা হয়ে থাকে। এমন ঔদার্য প্রদর্শনের জন্য তমুদ্দুন মজলিশের বর্তমান কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন অনেকে। এদের মধ্যে সেসময় অনেকেই বয়সে ছিলেন তরুণ। রংপুরেও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন করেন মুহাম্মদ আফজাল, শাহ তবিবর রহমান প্রধান, আশরাফ হোসেন বড়দা, মীর আনিসুল হক পেয়ারা প্রমুখ। এদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাও কেউ কেউ। তবে এ ভাষাসৈনিকদের প্রায় সবাই বয়সের ভারে যেমন ন্যূব্জ; তেমনই অবহেলিত এবং উপেক্ষিত।
আরেক বায়ান্নর নিভৃত ভাষাসৈনিক ফজলুর রহমান। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি থানাধীন কাশিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেসময় তিনি বাসুদেবপুর আপগ্রেড হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন নবম শ্রেণির ছাত্র আবদুল মান্নান ও ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে বড় ছাত্রদের নিয়ে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' শ্লোগান দিতে দিতে বাসুদেবপুর স্কুল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গোদাগাড়ি থানা পর্যন্ত অগ্রসর হন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধানশিক্ষক কেফায়েতুল্লাহ ২৩ ফেব্রুয়ারি আবদুল মান্নান ও ফজলুর রহমানকে স্কুল থেকে বহিস্কার করেন। এ ঘটনার পর থেকে ফজলুর রহমানের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। আবদুল মান্নানের কি হয়েছিল জানা যায়নি।
১৯৫৪ সালে জন্মস্থান ফেলে ফজলুর রহমান বাবার সঙ্গে বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার করনাই গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি হাটপাড়া সেরাজিয়া মহাজেরিন জুনিয়র মাদরাসা নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এর পরিচালক এবং শিক্ষক নিয়োগ হন তিনি। সেই থেকে এলাকায় ফজলু মাস্টার নামে তিনি সমধিক পরিচিত। আমারও মুরুব্বি তিনি। ফজলুভাই বলে ডাকি। খুব স্নেহ করেন আমাকে। মাদরাসাটি এলাকাবাসীর সহযোগিতায় চলতো। এখন সেখানে ফাযিল মাদরাসা এবং হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ফজলু মাস্টারের চাকরিও গেছে সেই তখন থেকে। অনেক দিন করনাই বাজারে তিনি দর্জির দোকান চালিয়েছেন। এখন বয়সের ভারে নড়বড়ে। আবেগে কবিতাও লেখেছেন এক সময়। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ফজলু মাস্টারের জীবন প্রায় তছনছ হয়ে গেছে এ খবর কেউ রাখেননি। এমনই অনেক ফজলুর রহমান এখনও বেঁচে আছেন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাঁরা আজও বঞ্চিত ও অবহেলিতই থেকে গেলেন। রাষ্ট্রসহ কেউ তেমন খোঁজখবর নেবার অবকাশ পান না তাঁদের। বায়ান্নর নিভৃত এক বিস্মৃত প্রায় ভাষাসৈনিক ফজলু মাস্টার। আমাদের প্রিয় ফজলুভাই। উপেক্ষা আর অবহেলার শিকার আজীবন। অথচ এঁদের অতুলনীয় আত্মত্যাগের ফসল ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত পথ ধরেই তরান্বিত হয়েছে প্রত্যাশিত স্বাধীনতার সোনালী সূর্যোদয়। সেদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে যারা জীবন দিয়েছেন, আন্দোলন করবার জন্য বিভিন্নভাবে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন কিন্তু কারুর কাছে মাথা নোয়াননি, তাঁদের সবাইকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। হৃদয়নিংড়ানো ভালোবাসা নিবেদন করি নিরন্তর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ