ঢাকা, শনিবার 2 March 2019, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাতৃভাষা আল্লাহ প্রদত্ত মহা নেয়ামত

এইচ এম আব্দুর রহিম : সাড়ে ৬ দশক আগে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি আদায় এবং এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যে আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল তার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ববঙ্গবাসী বাঙালি সমাজের মধ্যে এক নতুন চেতনা ও মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। বায়ান্নর একুশ ফেব্রুয়ারি ও অয়োময় প্রত্যয় অর্জিত হয়। যে জাতি হিসেবে দেশ সমাজের সার্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সর্ব প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ভাষা কৃষ্টি প্রত্যেক জাতির প্রকৃষ্ট সম্পদ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতির জন্য মাতৃভাষা খোদা প্রদত্ত দান, এক মহা নেয়ামত। ভাষার মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘পরম করুণাময় আল্লাহ, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে। ’(সূরা রাহমান) এই আয়াতে ভাব প্রকাশ করতে মাতৃভাষাকে বুঝানো হয়েছে, যা বিশেষ শিক্ষাগ্রহণ ছাড়াই প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে নিজেই বলতে পারে এবং মনের ভাবকে প্রকাশ করতে পারে। পৃথিবীর সকল প্রাণীর নিজস্ব ভাষা আছে। সকল প্রাণী তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য ধ্বনি বা আওয়াজ দিয়ে থাকে। অন্য প্রাণীর মুখ নিঃসৃত শব্দ অর্থাৎ তাদের মুখের ভাষা আমরা বুঝতে পারি না। তাদের নিজেরা পরস্পরের ভাষা বুঝতে পারে। ভাষা মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। একমাত্র মানুষ অর্থবোধক শব্দ দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্য যে ধ্বনি বের করে তার নাম ভাষা। পৃথিবীর এক এক স্থানের ভাষা এক এক রকম। যেমন বাংলা, উর্দুু, হিন্দি, ইংরেজি, তুর্কি ইত্যাদি ভাষায় মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে। আল্লাহ তায়ালা তার কুদরত প্রদর্শনের জন্যই সুন্দর এই পৃথিবী, বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত মানুষ ও ভাষার সৃষ্টি করেছেন। এ সম্পর্কে মহাগ্রন্থে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন ‘এবং তার (আল্লাহর কুদরতের) নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা রূম-২২) আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এরশাদ করেছেন ‘আমি কোন নবী এমন পাঠায়নি,যা তার (মাতৃ) ভাষায় (আমার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছায়নি) এতে জ্ঞানীদের জন্য যাতে করে সে তাদের কাছে (আমার আয়াত) স্পষ্ট করে দিতে পারে।’ সূরা : ইব্রাহিম-৪) মাতৃভাষা কত গুরুত্বপূর্ণ এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যত নবী প্রেরণ করেছেন সবাইকে স্বজাতি ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছেন, যাতে তারা আল্লাহর বিধান সহজভাবে বুঝাতে পারেন। মানুষ ও আল্লাহর বিধানকে সহজভাবে বুঝতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কুরআনকে আমি তোমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছি যাতে তোমরা বুঝতে পার। একথাটি আল কুরআনের সূরা ক্বামারের চার জায়গায় বলেছেন ১৭, ২২, ৩২, ৪০নং আয়াতে। রাসূল (সা.)-এর মাতৃভাষা ছিল আরবী। এ জন্যই মহান রাব্বুল আলামিন কুরআনের ভাষাকে আরবী হিসেবে মনোনীত করেছেন। যাতে আরব সমাজের মানুষ কুরআনের বাণীকে সহজে অনুধাবন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “হে নবী কুরআনকে আমি তোমাদের ভাষায় সহজ করে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা আদ-দোখান : ৫৮) মহানবী (সা.) নিজের ভাষা আরবীকে এত বেশি ভালোবাসতেন যে, তিনি বলেছেন আমি তিনটি কারণে আরবী এত ভালোবাসী যে, তন্মধ্যে একটি হলো মাতৃভাষার কারণে। মহানবী ছিলেন স্বীয় মাতৃভাষায়  অতুলনীয়। তিনি মাতৃভাষাকে শুদ্ধ এবং সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে দান করা হয়েছে সর্বমর্মী বচন।’ (মুসলিম-৫২৩)। আমরা বাঙালি। বাংলায় আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করি। তাই আমাদের ভাষার নাম বাংলা ভাষা। বাংলা আজ আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা। পৃথিবীতে ৬ সহস্রাধিক ভাষার মধ্যে আমাদের ভাষা ষষ্ঠ। আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসী। ভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকার করেছি, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ও অনন্য ঘটনা। প্রত্যেক জাতির জীবনে একটি গৌরব উজ্জ্বল দিন থাকে। সেই দিনটি জাতীয় জীবনে তাৎপর্য ম-িত। বাংলাদেশের এমন একটি দিন ২১ মহান শহীদ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালির এক মহাকাব্যের নাম। শোক, শক্তি প্রেরণার উৎস। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকার রাজপথে রফিক শফিক, জব্বার, বরকত সালামসহ নাম না জানা অগণিত সৈনিকের আত্মোৎসর্গে রচিত হয় এই মহাকাব্য। মহান একুশের বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল বীরত্বগাথা নাম। যা বাঙালি ঐতিহ্যের চেতনা অংশ নয়, সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের অনন্ত প্রেরণার উৎস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এর উত্তরণ আমাদের অর্জনকে করেছে আরও মহান আর ও গৌরবসিক্ত। ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেন্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়াারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। যার প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২১ ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি তার মাতৃভাষা বাংলার মান রক্ষার জন্য প্রথম রক্ত দেয়। সে ঘটনার সাত চল্লিশ বছর পর দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। এ জন্য আমরা গৌরবান্বিত। আমাদের উপেক্ষিত মাতৃভাষা আমাদের প্রিয়ভাষা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাভাষার হাত ধরে যে একই রকম একটি বিপুল গৌরবদিপ্ত ঘটনা আমাদের শিহরিত করে। যারা জাতীয় ভাষা বাংলার দাবি আন্দোলনের বিরোধিতা করে গুলি ছুঁড়ে ছিল সেই পাকিস্তান ও বিশ্বের অন্যন্য দেশের ন্যায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে। মাতৃভাষা একটি জনগোষ্ঠির অস্তিত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠির ভাষার মৃত্যু হলে গোষ্ঠিভুক্ত মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। যে জাতির মাতৃভাষা স্বীকৃত তার আত্মপরিচয় স্বীকৃত। বাংলাদেশে আমাদের বাংলাভাষার সঙ্গে সঙ্গে অন্যন্য জাতিসত্তার যে ভাষা রয়েছে যেসব আদিবাসী। যেমন চাকমা, মারমা, গারো, খাসি, সাওতাল, ত্রিপুরা ওদের ভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার শিক্ষা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। অন্য কোন ভাষা আমাদের মাতৃভাষাকে গ্রাস না করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা। আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত গিরি নির্ঝরীনি, ঝিড়ি ঝর্ণা ও অরণ্যবেষ্টিত প্রকৃতির লীলানিকেতন পার্বত্য চট্টগ্রাম। এ অঞ্চলে বসবাস করে জনসংখ্যায় ছোট বড় ১৪টি অধিবাসী গোষ্ঠি। এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠির মধ্যে জনসংখ্যার বৃহৎগোষ্ঠী হচ্ছে চাকমা প্রায় ৫ লাখ। অন্যন্য জাতিসত্তা হলো মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা, ¤্রাে, খিয়াং, পাংখোয়া, লুসাই, চাক, খুমি, বম, গুখট, অহমিয়া ও সাওতাল। এ জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বহুজাতি, সাংস্কৃতি এবং বহু ভাষাভাষির মিলন ক্ষেত্র। প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা প্রযোজ্য না হলে ওই ভাষাগুলো শুধু যে বিকশিত হতে পারবে না তাই নয়, কালের কঠিন নিষ্পেষণে এক সময় হয়তো বিলুপ্ত হবে। তাহলে তা হবে এক চরম ট্র্যাজেডি। প্রতিটি ভাষার উপর পৃথক পৃথক পুস্তক প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষা কোর্স চালু করে এগুলোকে জীবন্ত রাখতে হবে। একুশ শতকে বিশ্বায়নে, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে পৃথিবীর অধিকাংশ মাতৃভাষা অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। একুশ শতকের শেষে বর্তমান প্রচলিত হাজার হাজার মাতৃভাষার অধিকাংশই হয়তো আত্মরক্ষা করতে পারবে না। অনগ্রসর সম্প্রদায়ের উপভাষা রক্ষায় নিজেদের ভাষা, সাহিত্য, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে হীনম্মন্যতা ছেড়ে শ্রদ্ধাশীল রক্ষণশীল হওয়া। কোন অবস্থায় মাতৃভাষার বিকল্প ভাষারূপে বিদেশী ভাষা গ্রহণ না করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা অনেক দিন ধরে উন্নতমানের সাহিত্য সৃষ্টি করে আসছেন। অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের কাছে আমরা তা পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। সময় নষ্ট করার মত সময় আমাদের নেই। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানী, রুশ, হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, ইরাকি আরবি প্রভৃতি ভাষা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা এ ক্ষেত্রে উজ্জল ভূমিকা পালনে সমর্থ হবে। বিদেশী কূটনৈতিক মিশনে কর্মকর্তারা কেবল ইংরেজি নির্ভর। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী সাংস্কৃতিক সেন্টার বা হাইকমিশন ওভাষার উপর বিছিন্ন মান, মেয়াদে বিছিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এত সঠিক কোন কাজ সম্পন্ন হচ্ছে না। সুর্নিদিষ্ট শিক্ষা কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন করে একটি নীতিমালার আলোকে ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু করা উচিত। আকর্ষণীয় নীতির দেশের তরুণরা দেশী-বিদেশী ভাষা জ্ঞান রপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা পাবে।
ফেব্রুয়ারি মাস। এই মাসটি আমাদের কাছে ভাষার মাস হিসেবে পরিচিত। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি মাতৃভাষার মর্যাদা। সেই দিনের আন্দোলন কৃষক শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীসহ সকল স্তরের অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন, জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন, কারা বরণ করেছেন অনেকে। সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকে এ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন অনেকে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির ভাষার প্রতি সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শনের অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ছিল যেমনটা বিশ্বের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া বিরল। বাঙ্গালি জাতির স্বাধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষার ইতিহাস নিয়ে কবি সাহিত্যিকরা হৃদয়ের শুভ্রতা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কাব্য রচনা করেছেন। তাইতো ফেব্রুয়ারী মাস এলেই বাঙ্গালীর মুখে ধ্বনিত হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি তাই ভুলিতে পারি।’ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের এই ইতিহাসটি শুধু আমরা নই। বিশ্ববাসী ও যথাযথ মর্যদার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে। ১৭ নভেন্বর ১৯৯৯ সাল ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে ‘আন্তর্জাাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের ব্যাখ্যা করে বলা হয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। মাতৃভাষার প্রচলন কেবল মাত্র ভাষাগত বৈচিত্র, বহু ভাষাভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিক করে না। তা সাংস্কৃতিক ঐতিয্যের অনুধাবন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবনের তাৎপর্য হলো প্রতিটি মাতৃভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া। এ দিবসে প্রত্যেক বাংলা ভাষাভাষীকে যেমন ভালবাসবে তেমনি অন্য জাতির মাতৃভাষাকে মর্যাদা দেবে। এভাবে একুশকে ধারন করে মাতৃভাষাকে ভালবাসার প্রেরণা পাবে মানুষ। ২১ শে ফেব্রুয়ারী ২০০০সাল থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো যথযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করে যাচ্ছে। প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারী আমরা হৃদয়ের শুভ্রতা উৎসাহিত করে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি আমাদের ভাষা শহীদদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সেই দিনে বাঙালিদের আত্মত্যাগের যথার্থ অতুলনীয়। আমরা গর্বিত জাতিআমাদের মাতৃভাষার জন্য। শহীদরা আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের সম্মানজসক স্থানে। স্বার্থক হয়েছে রক্তদান। তাই মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। এবং এত যারা শহীদ হয়েছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। ভাষার প্রতি ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করা হয় বই মেলা। লেখক পাঠকদের মহাসম্মেলনে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হয় বাংলা ভাষায় রচিত কাব্য, নিবন্ধ, উপন্যাস, সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে বিশ্বের কবি সাহিত্যিক, লেখক, গবেষকদের রচিত নতুন নতুন বই মেলায় নিয়ে আসা হয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র। একুশের বই মেলায় ইসলামি বই অপর্যাপ্ত। তবে আশার দিক হলো এবারের বই মেলায় মাদরাসায় পড়–য়া তরুণ লেখকদের কিছু বই এবার দেখা গেছে। এ দেশে ইসলামি ভাবধারায় অসংখ্য লেখক পাঠক রয়েছেন। যারা বাংলা সাহিত্যে বই লেখেন। একুশের বই মেলায় এ ধরনের বই আমাদের বেশি বেশি আনতে হবে। শুধু মাতৃভাষা চর্চা করতে হবে শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে নয়। সারা বছর ইসলামী সাহিত্যা চর্চা বাড়াতে হবে। বাংলা ভাষা শুদ্ধ ও শুদ্ধ বানানের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বাংলা অপ্রতিরোধ্য বিস্তার ধীর গতি হওয়ার অন্যতম দুটি কারণ। এক ঐতিহাসিক কারণ আর রাজনৈতিক কারণ। ঐতিহাসিক কারণ বাংলাভাষার ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলা ভাষার সৃষ্টি কারকরা হলেন, নবাব বাদশাহ। সে হিসেবে বাক্সগালী মুসলমানদের নিজস¦ ভাষা। কিন্তু এ দেশে ইংরেজরা দুই শত বছর একাধারে শাসন করার ফলে বাংলাভাষাকে নির্মমভাবে ধ্বংস করছে। ভাষা সাহিত্যের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন হয়েছে। ইতিমধ্যে আধুনিক উন্নয়নশীল ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। অন্যান্য ভাষার মতো বাংলা ভাষা জীবন ও প্রাণবন্ত। রাজনৈতিক কারণ একেবারে আলাদা আধুনিক। এক বাংলা দুইটি স্বতন্ত্র রূপ নিয়েছে, এতে বাংলা সাহিত্যে ও ভাষার যে পরিবর্তন হল এর জন্য মুলত তারা দায়ী। বাংলা ভাগ হওয়ার আগে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটা ভাষাহত পার্থক্য ছিল। মুসলমান লেখকরা সামাজিকও সাহিত্যিক প্রয়োজনের খাতিরে প্রচলিত বহু সংখ্যক মুসলমানি শব্দসাহিত্যে চালু করে ছিলেন। কিন্তু হিন্দু লেখকরা একগুয়েমীভাবে তা তারা মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় কারণ হল, ভাগ বাটোয়ারার আগে বাংলার রাজধানি সাহিত্য কেন্দ্র ছিল কলিকাতা। এখন সে স্থান দখল করেছে ঢাকা। ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষাগোষ্ঠীর এক সজীব শাখা বঙ্গ-কামরুপি থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি। বাংলাভাষার প-িতগণ মনে করেন, এ ভাষায় কথা বলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীতে এর স্থান ষষ্ঠবা সপ্তম। যার দুনিয়ার এক বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের ভাষা নিয়ে কাল কালাস্তরে ফার্সি, ইংরেজী, হিন্দীও নানাভাবে আধিপত্য বিস্তার চালায়। যে চেষ্টা এখন ও অব্যাহত রয়েছে। যার (হিন্দিও প্রচ্ছন্ন আগ্রাসনের) ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমাদের বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় ও অভিভাবক মন্ডলী উৎকন্ঠার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আসন্ন বিপদ রুখে দিয়ে ছিল আমাদের ভাষা সেনানিরা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমনটি আর কোন দিন হয়নি। বৃটিশ কব্জা থেকে পাক ভারতমুক্ত হলেও সাংস্কৃতিক ভাষা দাসত্বের রেশ তখন ও যথেষ্ট পরিমাণ বিদ্যমান ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট। এর মাত্র ১৫ দিনের মাথায় গঠিত হয় তমুদ্দিন মজলিস। এর অন্যতম দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। তখন রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে অনেককে নাজেহাল হতে হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সংবর্ধনা সভায় ভাষন দেন। তখন তার ছিল বিপুল জনপ্রিয়তা। কিন্তু ঢাকায় আগমণের আগে ক্ষমতাসীন মহল থেকে তাকে ভ্রান্ত ধারনা দেয়া হয়। জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। সে ঘোষণায় সকলের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। প্রতিবাদের ঝড় উঠে। এ বিষয়ে মোহাম্মাদ মোদাব্বের রচিত ‘ইতিহাস কথা কয়’ বইতে উল্লেখ করেন, জিন্নাহ সাহেব এটা ভুল ঘোষণা দিয়ে ছিলেন তিনি স্বীকার করে গেছেন। তিনি বলে ছিলেন আমি জীবনে দুটি ভুল করেছি একটি হল লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে আর একটি উর্দু ভাষা ঘোষণা দিয়ে। ১৯৪৯ সালে অক্টোবরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় সফর করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমনেসিয়াম মাঠে এক ছাত্র সভায় ভাষণ দেন। ছাত্রদের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসুর) সাধারণ সম্পাদক জনাব গোলাম আযম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের দাবি সন্বলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মেমোরেন্ডামের খসড়া তৈরি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন তুখোড় ইংরেজি জানা ছাত্রনেতা আব্দুর রহমান চৌধুরি। ডাকসুর জি এস হিসেবে এ মেমোরেন্ডাম পাঠ করেন (অধ্যাপক) গোলাম আযম। রাষ্ট্র ভাষার প্যারাটি তিনি দুবার পড়েছিলেন। এটি পড়ার সময় ছাত্র সমাজে তুমুল করতালি পড়ে। ঐ সময় বেগম লিয়াকত আলীও উপস্থিত ছিলেন। অবশেষে অনেক প্রাণ ও ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময় আমরা আমাদের মায়ের মুখের ভাষাকে ফিরে পেয়েছি।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ