ঢাকা, সোমবার 4 March 2019, ২০ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আমার স্মৃতিতে কবি কাদের নওয়াজ

 

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল: কবি কাদের নওয়াজ ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল কাজী আলী নওয়াজ। তাঁর মাতার ফাতেমুন্নেসাও কাব্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এগারো ভাই বোনের মধ্যে কাদের নওয়াজ ছিলেন সবার বড়। তিনি শৈশবকাল থেকেই আরবী ও ফার্সী শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছিলেন পারিবারিক পরিবেশেই। মাথরুন উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্টিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯২৩ সালে। সে সময়ে এই স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। কবি কাদের নওয়াজ বহরমপুর কলেজ থেকে ইংরেজিতে বি. এ অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন ১৯২৯ সালে। মেধাবী ছাত্র হিসাবে তিনি ম্যাট্টিক থেকে বি, এ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং কৃতিত্বের সাথে ১৯৩২ সালে বি,টি (বর্তমান বি, এড) পাশ করেন। ১৯৩৩ সালে স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর কলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক পদে যোগ দেন ডেপুটেশনে। দীর্ঘ বারো বছর সেখানে চাকরীর পর ১৯৪৬ সালে সহকারী প্রধানশিক্ষক রূপে পদোন্নতি পান। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে ঢাকায় এসে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। নবাবপুর, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও নবকুমার ইন্সটিউটিটে চাকুরী করেছেন সুনামের সঙ্গে। ১৯৫২ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রধানশিক্ষক নিযুক্ত হন দিনাজপুর জিলা স্কুলে। ১৯৬৬ সালের ৩০ জুন এই স্কুল থেকেই অবসর গ্রহণ করেন সরকারি চাকুরী থেকে। দিনাজপুর জিলা স্কুল এর আগে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন ১৯৫০-১৯৫১ পর্যন্ত।

প্রকৃতিবাদী কবি কাদের নওয়াজ ছিলেন সৌন্দর্যের অনুরাগী। ফুল, পাখি, নদী, বৃক্ষলতা এসবই ছিল তাঁর কবিতার প্রেরণার উৎস। কবির প্রথম লেখা কবিতা প্রকাশিত হয় মাসিক শিশু সাথী পত্রিকায়। ১৯৩৪ সালে কবির প্রথম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “মরাল” প্রকাশিত হয় কোলকাতা থেকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার এই কাব্যগ্রন্থটির তৎকালনি ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কবি কাদের নওয়াজের বিখ্যাত দুটি কবিতা হলো “ওস্তাদের কদর” ও “মা”। তৎকালীন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ডে বার্ষিক পাঠ্যসূচীতে কবির বিখ্যাত কবিতা “হারানো টুপি” অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও তাঁর লিখা প্রায় দু’হাজার কবিতা বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অনেক কবিই “মা কে” নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কবিতা লিখেছেন। কিন্তু কবি কাদের নওয়াজের ‘মা’ কবিতার মতো এতো দরদ ভরা কবিতা কমই দেখা যায়Ñ 

 

মা’ কথাটি ছোট্ট অতি/ কিন্তু জেনো ভাই,

ইহার চেয়ে নাম যে’ মধুর/ তিন ভুবনে নাই।

সত্য মায়ের ধর্ম থাকুক/ মাথার পরে আজি,

অন্তরে ‘মা’ থাকুক মম/ করুক স্নেহরাজি।

বিদেশ গেলে সেই মধু নাম/ জপ করি অন্তরে,

মন যে কেমন করে আমার/প্রাণ যে কেমন করে।

মা’ যে আমায় ঘুম পাড়াতো/ দোলনা ঠেলে ঠেলে,

শীতল হতো প্রাণটা মায়ের /হাতটা বুকে পেলে।

পালিয়ে যেত মশা যে মার / ঘুম পাড়ানি গানে,

 শৈশবে সেই মধুর স্মৃতি / জাগছে আজি প্রাণে।

তোমায় স্মরি চোখ ফেটে মোর/ অশ্রু যে আজ ঝরে,

প্রাণ যে কেমন করে আমার /মন যে কেমন করে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে কবি কাদের নওয়াজ মাগুড়া জেলার শ্রীপুরের মজুদিয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তিনি লিখেছেন নীল কুমুদীনামক কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া ছোট ও শিশুদের জন্য লিখেছেন “দাদুর বৈঠক” ও “দস্যু লাল মোহন”। দু’টি উপন্যাস লিখেছেন “উতলা সন্ধ্যা” ও “দুটি পাখি দুটি তীরে।” ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান আমলে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার। এছাড়াও তৎকালীন পাকিস্তার সরকার থেকে পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুরস্কার। কবি কাদের নওয়াজের একজন ছাত্র হিসাবে জিলা স্কুলে আমি তাঁর সাহচর্য পেয়েছিলাম দীর্ঘ নয় বছর। (জিলা স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৫৮-১৯৬৬ খ্রি.)। জিলা স্কুলে অধ্যয়নরত ক্লাশ “থ্রি” থেকে “ম্যাট্রিক” পর্যন্ত আমি তার স্নেহ সান্নিধ্য পেয়েছি অকৃত্রিমভাবে। গৌরবান্বিত মনে করেছি নানা দিক থেকে। সেই জিলা স্কুলে ছোট বেলা থেকেই কবিতা আবৃত্তি ও কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম স্যারের স্নেহ সান্নিধ্য থেকেই। কোন কোন দিন হঠাৎ স্যার ক্লাসে ঢুকেই পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে অনর্গল হাত নেড়ে নেড়ে ছন্দে ছন্দে কবিতা বলে চলতেন অবলীলাক্রমে। স্যারের এই স্বরচিত কবিতা সবাই ক্লাশে মন্ত্রমুগ্ধের মত তন্ময় হয়ে শুনতাম। তাঁর কবিতা প্রকাশের সাবলীল ভাষা, ছন্দ আমার মনকে ছোট বেলায় গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। আমাদের কৈশরে সে আমলে মাওলানা আকরম খাঁর দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছোটদের জন্য মুকুলের মহফিলে সাপ্তাহিক “বাগবানের সাজি” নামে বাগবান ভাইয়ের (ছদ্মনাম) সাহিত্য পাতা বের হতো। সেই পত্রিকার পাতায় সম্ভবতঃ ১৯৬৫ সালে “বর্ষা” নামে আমার একটি দীর্ঘ ছন্দময় কবিতা বের হয়েছিল। আমার প্রিয় হেড মাষ্টার কবি কাদের নওয়াজ আমাকে ক্লাশে ডেকে বললেন, তোমার “বর্ষা” কবিতাটা সুন্দর হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালের দৃশ্য বর্ণনা ও ছন্দের গাথুনিটা সুন্দর। এরপর তিনি মাঝে মাঝে আমাকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে কবিতার কথা বলতেন ও নতুন নতুন কবিতা পড়ে শোনাতেন। সে সময় তাঁর কক্ষে ঢুকতেই দেখতে পেতাম কবি নুরুল আমিন স্যারের সঙ্গে কবিতা নিয়ে আলোচনা করছেন। কি সুন্দর ছিল সে সব দিনের অনুভূতি। 

একদিন তিনি তাঁর লিখা শিশুদের উপযোগী একটা স্বরচিত কবিতা আমাকে দিয়ে বলেছিলেন তুমি এটা জিলা স্কুলের অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করবে। (বলা বাহুল্য আমি ছোটবেলা থেকে জিলা স্কুলের অনুষ্ঠানের কবিতা আবৃত্তি করতাম)। স্যারের এই স্বরচিত কবিতাটা আমি সে সময় আমাদের বার্ষিক স্কুলের ফাংসনে আবৃত্তি করে সবার প্রশংসা পেয়েছিলাম। কবিতাটা আমি অত্যন্ত যত্নের সাথে স্যারের স্মৃতি হিসাবে আমার কাছে রেখেছিলাম। কিন্ত ৭১’ এর স্বাধীনতার যুদ্ধে অনেক কিছুর সঙ্গে কবিতাটাও আমার হারিয়ে যায়। সেই জন্য আজও আমার মনে খুব অনুশোচনা হয়। কবিতাটির সামান্য কিছুটা অংশ আজও আমার হৃদয়ে গাঁথা রয়েছে। সম্মানিত পাঠক পাঠিকারা সামনে কবিতাটির আংশিক অংশটুকু তুলে ধরা হলো -

টুপটাপ টুপ বৃষ্টি পড়ে,

গাছের পাতা নড়ে চড়ে।

তার পানে কোন টক্কা টরে,

শশক পালায় শঙ্কা ভরে,

কৃষানী ধান রক্ষা করে- বাড়ায় ঘরে শ্রী,

তবু যেনো হুক্কা আমার প্রাণের সামগ্রী।

সকাল বেলা উঠেই খোকন খায় বুঝি গুড় মুড়ী?

গুড়ের চেয়েও মিষ্টি খেতে আমার এ গুড় গুড়ী।

কুহুর ডাকে পাগলকবি,

শিল্পী আঁকেন অরূপ ছবি।

আমার কালো কোকিল হুকা 

ডাক ছাড়ে গুড় গুড়,

মধুর চেয়ে মধুর তারি সুর।

সন্ধ্যা হলে, সাঝ-সকালে হুক্কা আমার

তেমনি ডাকে রে।

কবি কাদের নওয়াজ স্যারের পারিবারিক জীবন সুখের ছিল না। ১৯৩৪ সালে পিতা মাতার ইচ্ছানুসারে চাচা কাজী নওয়াজ খোদার জেষ্ঠা কন্যা নাসেরা খাতুনের সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, কিন্তু এ পরিণয় তাঁর সুখের ছিল না। কবির জীবন কেটেছে দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ একাকী। নিঃসন্তান অবস্থায় ১৯৮৩ সালের ৩রা জানুয়ারি যশোর সদর হাসপাতালে কবি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ