ঢাকা, বুধবার 6 March 2019, ২২ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চীনা মুসলমানদের নিয়ে কথা

এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান : ২০১৪ সালে হজ্ব পালনে গিয়ে মক্কা মুয়াজ্জমার মিসফালাহর হিজরা রোডের হোটেল আল ফারেসে অবস্থান করেছিলাম। আমার হোটেলের আশেপাশের হোটেলগুলোতে অনুমান দশ হাজার চীনা হাজী সাহেবান অবস্থান করেছিলেন। আমার হোটেল সংলগ্ন ইমাম বুখারী (রঃ) মসজিদে একদিন জোহরের নামায আদায় করেছিলাম। মসজিদটি চীনা হাজী মুসল্লীদের দ্বারা ভর্তি ছিল। তাদের সকলের পরনে জামার উপরে স্টিকার লাগানো ছিল। তাতে লেখা ছিল আল হাজ্জি আস্সিনি। নামাযের জামায়াত শুরু হবার আগে তাদের সাথে আরবী এবং ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু ঐ দুটি ভাষায় চীনা মুসলমান ভাইদের কোন দখল না থাকায় তাদের সাথে সালাম বিনিময় করার মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। প্রায় কুড়িদিন যাবত চীনা হজ্বযাত্রী ভাইবোনদের সাথে মসজিদুল হারামে আসা যাওয়া করার সুবাদে মানুষগুলোকে দেখে যতদুর অনুমান করতে পেরেছি, তাহলো চীনা মুসলমান নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অত্যন্ত পরিশ্রমী, অমায়িক এবং ধর্মপ্রাণ। তাদের সাথে সালাম বিনিময়কালে দেখেছি তাদের মুখে হাসি লেগেই আছে। আমার পর্যবেক্ষণে কম্যুনিস্ট চীনে এ ধরনের নীতিবোধ সম্পন্ন, ভদ্র, অমায়িক আর ধর্মপ্রাণ কোন নাগরিক আছে বলে মনে হয় না। চীন সরকারের এ ধরনের নাগরিকদের নিয়ে গর্ববোধ করা উচিত ছিল। কিন্তু চীন সরকার বর্তমান সময়কালে সেদেশের মুসলমানদের সাথে কি ধরনের আচরণ করছে, তা আমাদের অজানা নয়। একদিকে চীন মুসলিম বিশ্বের অনেক বাঘা বাঘা রাষ্ট্রের সাথে গভীর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। গোটা মুসলিম বিশ্বে চীনা পণ্যের উন্মুক্ত বাজার রয়েছে। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রে চীনের মোটা অংকের বিনিয়োগ রয়েছে। হজ্বের সময় মসজিদুল হারামের ঝুলন্ত এসিগুলোতে লেখা দেখেছি Made in China. তার মানে হলো মুসলমাদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবও চীনা পণ্যের আমদানিকারক। সৌদি আরবে চীনের তৈরি টুপি, জায়নামাজ এবং বিভিন্ন পোশাক সামগ্রী বিক্রি হতে দেখেছি। মুসলিম বিশ্বের পরাশক্তি পাকিস্তানের সাথে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বেশ পুরনো। বর্তমানে চীন পাকিস্তানের আরব সাগরীয় সমুদ্রবন্দর গোয়াদর ব্যবহার করছে। পাকিস্তান থেকে চীন পর্যন্ত সরাসরি স্থল পথে যোগাযোগের জন্য কারাকোরাম মহাসড়ক নির্মিত হয়েছে। পাকিস্তান বর্তমান সময়ে চীন থেকে তাদের প্রয়োজনের সবটুকু সমরাস্ত্র ক্রয় করছে। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ চীনা পণ্যের একটি উন্মুক্ত বাজার। বাংলাদেশ তাদের সামরিক বাহিনী, বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র, সাজসরঞ্জাম, ট্যাঙ্ক, বিমান, নৌযান চীন থেকেই সংগ্রহ করে। বাংলাদেশেও চীনের অনেক বড় বড় বিনিয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশের নির্মাণাধীন সর্ববৃহৎ সড়ক সেতু যমুনা ব্রিজের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে চায়না মেজর কোম্পানি লিমিটেড। বাংলাদেশ ছাড়াও মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার চল্লিশ ভাগ নাগরিক হচ্ছে চীনা অভিবাসী। ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনেই দারুস সালামেও প্রচুর চীনা অভিবাসী বসবাস করে। শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের সাথেও চীনের গভীর বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রে চীনের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এতকিছুর পরেও আমরা কেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হতে দেখছি যে, চীনের জিনজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশের দশ লাখ মুসলমানকে মানসিকভাবে অসুস্থ আখ্যা দিয়ে বিশেষ ধরনের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটক রেখে তাদের মন এবং মগজ থেকে আল্লাহর বিশ্বাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে? কেন চাপ সৃষ্টি করে তাদেরকে কম্যুনিষ্ট বা নাস্তিক বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে? সাম্প্রতিককালে জিনজিয়াং তথা গোটা কম্যুনিস্ট চীনে বসবাসকারী মুসলমানদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধর্মীয় নির্যাতনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা মাও সেতুং আমলের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কার নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে চীনে মুসলমানদের দাড়ি রাখা, টুপি পড়া, মেয়েদের আরবীয় রীতিতে হিযাব পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। রহস্যজনকভাবে মুসলিম বিশ্ব চীনে ধর্মীয় কারণে আজকের নির্যাতিত মুসলমানদের বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। চীনা মুসলমানদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ মহাসচিব, হিউম্যান রাইট ওয়াচ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের মুসলমানদের জাতিসংঘ হিসাবে পরিচিত ওআইসির কোন প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। মুসলিম বিশ্বের কোন রাষ্ট্র সরকারীভাবে বা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এখন পর্যন্ত চীনা মুসলমানদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো কিংবা নরম সুরে কোন প্রকার প্রতিবাদ করে নাই। ইরান সরকার প্রায়ই ফিলিস্তিনী মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি দেয়। কিন্তু চীনের মুসলমানদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানকে টুঁ শব্দটি করতে শোনা যায় নাই। চীনের নাস্তিক্যবাদী কমুনিস্ট সরকার সে দেশের সংখ্যালঘু “খ্রিস্টান” এবং সংখ্যাগুরু “বৌদ্ধ” এবং “তাও” ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে বাধা দিচ্ছে এমন কোন অভিযোগ শোনা যায় না। চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বৌদ্ধ ও তাও ধর্মের অনুসারী। ঐ দুটি ধর্ম নিরীঈশ্বরবাদী ধর্ম। সে কারণেই বোধহয় নিরীশ্বরবাদী কমিনিস্টদের ঐ দুটি ধর্মের মানুষদের সাথে পথ চলতে অসুবিধা হচ্ছে না। চীনা রাষ্ট্র পরিচালনাকারী কম্যুনিস্ট পার্টির গলার কাটা হয়ে আছে একেশ্বরবাদী ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি বিশ্বের অন্যতম জালিম রাষ্ট্র মায়ানমার সরকার যখন সেদেশের রাখাইন প্রদেশ থেকে নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে, নারী ধর্ষণ করে ব্যাপকহারে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে সেদেশের আট লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করে, ব্যাপকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল। তখন চীন সরকার জাতিসংঘসহ সর্বত্র মায়ানমার সরকারের পক্ষ অবলম্বন করেছিল। মুসলমানদের প্রতি চীন সরকারের অনুসৃত আচরণ ও নীতিমালা এখান থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান সময়কালের রাশিয়া পৃথিবীর প্রধানতম দুটি বড় পরাশক্তির স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু রাষ্ট্রদুটি ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের তোষননীতি অবলম্বনের কারণে বিশ্বের একশত ষাট কোটি মুসলমানের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে ব্যর্থ হয়। যেহেতু চীনের পররাষ্ট্র নীতি অর্থনীতি কেন্দ্রিক। তারা দুনিয়ার মুসলমানদের সাথে সখ্যতা বৃদ্ধি করলে তাদের অর্থনৈতিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটত। কিন্তু চীনের কম্যুনিস্ট শাসকগোষ্ঠীর মগজে মার্কসবাদের নাস্তিক্যবাদী ভূত সওয়ার হয়ে থাকায় তারা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
চীনা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস-চীনের ইতিহাসের সূত্র মতে খোলাফায়ে রাশেদীনের তৃতীয় খলিফা ওসমান জুননুরাইন (রাঃ) এর খিলাফতকালে উম্মুলমুমীনিন আয়েশা (রাঃ) এর চাচাতো ভাই সাহাবী সা’দবিন আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) খলিফা ওসমান (রাঃ) এর দূত হিসাবে সমুদ্রপথে বাংলাদেশের চট্রগামে এসে অবতরণ করত আসামের কামরুপের রাস্তা ধরে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবারের মতো চীনে পৌঁছেন। সময়টি ছিল রসুলুল্লাহ (দঃ) এর ইন্তিকালের মাত্র কুড়ি বছর পর। তৎকালীন চীনের গুয়াংজু স¤্রাজ্যের সম্রাট খলিফা ওসমান (রাঃ) এর দূত স’াদ (রাঃ) ও তার সঙ্গীদের সাদরে অভ্যর্থনা জানান। গুয়াংজুর সম্রাট পূর্ব চীনের ক্যান্টনে মুসলমানদের বসবাসের অনুমতি দেন। সেখানে মুসলমানরা সম্রাটের অনুমতিক্রমে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। ঐ মসজিদটি ছিল চীনে মুসলমানদের নির্মিত প্রথম মসজিদ। এরপর চীনে আরব ও ইরানী মুসলিম ব্যবসায়ী পর্যটক, কূটনৈতিকদের নৌপথে আগমণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের মাধ্যমে চীনে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অনেক আরব বণিক ও ব্যবসায়ী চীনা নারী বিবাহ করে সেখানে স্থায়ী হয়ে যান। এক হাজার হিজরী সন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। গুয়াংজু সম্রাজ্যে ঐ সময় তেং রাজবংশ রাজত্ব করছিল। ৬১৮ থেকে ৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তেং রাজবংশ গুয়াংজু সম্রাজ্য বা চীন শাসন করে। এরপর চীনে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের জন্য একটি গৃহ যুদ্ধ শুরু হয়। ৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলার পর ৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে সুং রাজবংশ চীনের ক্ষমতা দখল করে। সুং রাজবংশের শাসকগণ ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চীনের ক্ষমতায় বহাল থাকে। সুং রাজবংশের শাসন আমলেও চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ মুসলিম আরব ও পারস্য বণিকদের দখলে ছিল। এরপর দুর্ধর্ষ মঙ্গল বা তাতার রা চীনের ক্ষমতা দখল করে। চীনা ভাষায় তাদের রাজবংশকে মিং রাজবংশ বলা হয়। মিং রাজবংশ সিরিয়া, ইরাক, ইরান এবং সমগ্র তুর্কিস্থান ও চীন পর্যন্ত তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের শাসনকালে মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক সিল্করোড ব্যবহার করে মধ্য এশিয়ার মুসলমানরা চীনে তাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণ করে। মিং রাজবংশের শাসন আমলে চীনে মুসলমানদের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। চীনের বড় বড় শহরগুলোতে মুসলমানদের বড় বড় বসতি গড়ে ওঠে। যেমন বেইজিং, গুয়াংজু, সাংহাই, নানকিং প্রভৃতি। মিং রাজবংশের রাজত্বকালে ব্যাপক হারে আরব, তুর্কি, ইরানী মুসলমানরা চীনে বসতি স্থাপন করে এবং চীনাদের মধ্যে বিয়ে শাদী করে স্থানীয় সমাজে জায়গা করে নেয়। তারা স্থানীয়দের মধ্যে ইসলাম প্রচার অব্যাহত রাখেন। ফলে চীনে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলমানরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মিং রাজবংশের শাসনকালে কমপক্ষে আটটি চীনা প্রদেশের ভাইস গভর্ণর ছিলেন মুসলমান। চীনের বড় বড় শহর গুলোতে মুসলমানরা বড় বড় মসজিদ স্থাপন করে। ১৬৪৪ সাল পর্যন্ত চীনে মিং রাজবংশের শাসন স্থায়ী হয়। ১৬৪৪ সালে মিং রাজবংশকে বিতাড়িত করে চীনের ক্ষমতায় আসে মূল চীনা বংশদ্ভুত কুয়িং রাজবংশ। তাদের শাসনকাল ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কুয়িং রাজবংশের শাসনের আমলেও চীনা মুসলমানরা পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সাথে চীনে বসবাস করতে থাকে। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে চীনা জাতীয়তাবাদী নেতা সানইয়াতসেন চীনা জনগণের নেতৃত্ব দিয়ে রাজতন্ত্র ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে চীনের জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯১১ থেকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চীনে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা একটি জাতীয়তাবাদী সরকার ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। চীনে জাতিয়তাবাদী গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে চীনা মুসলমানরা ধর্মীয় কারনে নির্যাতিত হয়েছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
জিনজিয়াং এর মুসলমানদের ইতিহাস- জিনজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি চীনের উত্তর পশ্চিমকোনে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি সাবেক তুর্কিস্থান বা মধ্য এশিয়ার পূর্বাংশ। যার উত্তরে মঙ্গোলীয়া ও রাশিয়া এবং পশ্চিমে কাজাকিস্তান, কিরগিজস্থান, তুর্কমেনিস্তান এবং পাকিস্তানের কিছু অংশ, দক্ষিণে পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, পূর্বে মূল চীনা ভুখন্ড। এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা দুই কোটি ষাট লাখ। জনসংখ্যার মোট ২৫ শতাংশ বর্তমান কালে চীনা হান বংশদ্ভুত, বাকিরা মুসলমান। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জিনজিয়াংয়ে কোন ধরনের চীনাদের বসতি ছিল না। ১৯৪৯ সালে কম্যুনিষ্টরা জিনজিয়াং দখলের পর ঐ অঞ্চলে মুসলিম প্রাধান্য ক্ষুন্ন করার জন্য সেখানে ব্যাপকহারে চীনাদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় জিনজিয়াং অঞ্চলটি অতীতে চীনের কোন অংশ ছিল না। এ অঞ্চলটি ৮ম খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানদের হাতে বিজিত হয়েছিল। ফলে এই অঞ্চলের আশেপাশের বিভিন্ন তুর্কি জাতীগোষ্টির লোকদের মতো এখানকার বেশির ভাগ লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। অষ্টাদশ খৃষ্টাব্দে কুয়িং রাজবংশের রাজত্বকালে এ অঞ্চলটিতে চীনের আধিপত্য স্থাপিত হয়। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলটি গণতান্ত্রিক চীনের একটি প্রদেশ হিসাবে অস্তিত্ব বজায় রাখে। ১৯৪৯ সালে চীনা গণমুক্তি ফৌজের নেতৃত্বে কম্যুনিষ্ট নেতা মাওসেতুং এর নেতৃত্বে চীনা কম্যুনিষ্ট পার্টি চীনের ক্ষমতা দখল করে। সে সময়ে জিনজিয়াংয়ের নেতৃত্ব কম্যুনিষ্ট চীনের নেতৃত্ব অস্বীকার করে। ঐ সময়কালে একটি মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় জিনজিয়াং প্রদেশের জনগণের রাজনৈতিক নেতৃত্বদানকারী নেতৃবৃন্দ নিহত হন। একমাত্র সাইফুদ্দিন আজিজি কোনক্রমে বেঁচে যান। সাইফুদ্দিন আজিজি পরিস্থিতি বিবেচনায় চীনা কম্যুনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে চীনা গণমুক্তি ফৌজের জেনারেল ওয়াংজুর নেতৃত্বে চীনা গণমুক্তি ফৌজের একটি বিশাল বাহিনী জিনজিয়াংয়ে প্রবেশ করে অঞ্চলটিকে পুনরায় কম্যুনিষ্ট চীনের অন্তর্ভুক্ত করে। সাইফুদ্দিনকে জিনজিয়াংয়ের গভর্ণর করা হয়। কম্যুনিষ্টদের জিনজিয়াং দখলের পর সেখানকার মুসলমানদের ধর্মীয় ও নি¤œ দাবির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং পশ্চিমা বিশ্বে পাড়ি জমায়। সে সময়কার জিনজিয়াংয়ের একজন বিশিষ্ট আলিম মাওলানা আব্দুর রহমান কাশ্গড়ি কম্যুনিষ্টদের নির্যাতনের ভয়ে পাকিস্তানে হিযরত করেন। তিনি পরবর্তীকালে ঢাকা সরকারী আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক হিসেব দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহন করেন।
মাওসেতুং এর যুগের পর চীনে দ্যাং শিয়াও পিং এর নেতৃত্বে যে সংস্কার সাধিত হয়, তার সুফল মুসলমানরা ভোগ করতে পারে নি। বর্তমান সময়ে চীনা মুসলমানরা সেদেশে একরকম অবরুদ্ধ জীবন যাপন করছে। মুসলমানদের আরবি ভাষায় কুরআন পড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে যে চীন সরকার সেখানে মুসলমানদের জন্য একটি চীনা ইসলামী ভার্সন চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। চীনের সাধারন জনগণ কোনদিনই মুসলিম বিদ্বেষী ছিল না, এখনও নাই। মুসলমানদের প্রতি যে জুলুম নির্যাতন চলছে তা শুধু নাস্তিক কম্যুনিষ্ট পার্টির লোকজনের ইসলাম বিদ্বেষের ফলাফল মাত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানীরা পুর্ব চীনে দখলদার হিসাবে অনুপ্রবেশ করেছিল। সে সময়ে জাপানীরা তাদের দখলকৃত এলাকায় মুসলমানদের দুই শতাধিক মসজিদ ধ্বংস করে দেয়। তারা পূর্ব চীনের নানকিং এবং নিনজিয়াং এর অনেক মুসলমানদেরকেও হত্যা করেছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত মুল চীনের কোন চীনা নাগরিক মুসলমানদের উপর কোন প্রকার আক্রমণ করে নি বা তাদের ধর্ম পালনে বাধা  দেয়নি। ১৯৪৯ সালে কমুনিষ্টরা যখন চীনের ক্ষমতা দখল করে তখন তারা সেদেশের বৌদ্ধ, তাও, মুসলমান এবং খ্রিষ্টানদের উপাসানালয় সমূহ বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা পবিত্র কোরআন এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থসমূহ জালিয়ে দিয়েছিল। তারা জবরদস্তিমূলকভাবে আন্তঃধর্ম বিবাহ প্রথা চালু করে মুসলমানদের জাতিসত্বা ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়েছিল। পরবর্তীতে দেং শিয়াও পিং এর নেতৃত্বে চীনের রাজনৈতিক সংস্কারের পর চীনের মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সীমিতভাবে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়া হয়। চীনের মুসলমানরা কম্যুনিস্টদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ভিতরেও তাদের ঈমান, আকিদা ও কৃষ্টিকালচার ধরে রাখতে পেরেছে, এটা আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ। সরকারীভাবে গোটা চীনে মুসলিম জনসংখ্যা সেদেশের মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বলা হয়। সে হিসেবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চীনে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল দুই কোটি ত্রিশ লাখ। কিন্তু যারা চীনের মুসলমানদের বিগত ১৩৬৭ বছরের ইতিহাস জানেন তাদের মতে এ সংখ্যা সাত থেকে আট কোটির কম নয় বর্তমানে চীনা মুসলমানদের উপর যে ভয়াবহ ধর্মীয় নির্যাতন চলছে তার বিরুদ্ধে নরম বা গরম সুরে এখন পর্যন্ত কোন মুসলিম দেশের সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবাদ করেনি। ওআইসির উচিৎ বিষয়টি নিয়ে একটি সম্মেলন আহ্বান করে চীন সরকারের কাছে একটি সম্মিলিত প্রতিবাদ পৌঁছানো। সেই সাথে জিনজিয়াং অঞ্চলে মুসলমানদের অবস্থা দেখার জন্য একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করাও উচিত।
চীনের মুসলমানদের ইতিহাস প্রায় ১৪০০ বছরের। এখনও চীনের বড় বড় শহরে বিশাল বিশাল মসজিদ বিদ্যমান। চীন থেকে মুসলমানদের শিকড় উপরে ফেলা সম্ভব নয়। সুখের বিষয় পাকিস্তানের নুতন ধর্মমন্ত্রী নুরুল হক কাদরী জিনজিয়াং এর মুসলমানদের উপর সরকারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। তিনি চীন সরকারকে অনুরোধ করেছেন যে, চীন যদি জিনজিয়াংয়ের মুসলমানদের সাথে বিবাদ নিরসনের জন্য পাকিস্তানের সহায়তা চায় তা তারা করতে প্রস্তুত। কিন্তু চীন সরকার প্রস্তাবটিতে এখন পর্যন্ত কর্ণপাত করে নাই। ইতিমধ্যেই তুরষ্ক সরকার সরকারিভাবে জিনজিয়াং এর দশ লাখ মুসলমানকে বিশেষ প্রশিক্ষন শিবির নামক বন্দী শিবির থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য চীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ইমেইল: asprodhan61@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ