ঢাকা, সোমবার 4 March 2019, ২০ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকারের সাথে সম্পর্ক

মুহাম্মদ নূরে আলম:

ড. হাসান আল-তুরাবি নামটি সুদানের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকলেও তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। তিনি সুদান সংসদের স্পিকার, সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, এটর্নি জেনারেল প্রভৃতি নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। সুদানের এই বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ড. হাসান আল তুরাবি ছিলেন সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের একজন মেধাবী ও সৃজনশীল চিন্তাবিদ। সুদানের মূল ধারার ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতা, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, বহু ভাষাবিদ ও ইসলামী আন্দোলনের পাওয়ার শেয়ারিং থিউরির জনক। তার চেয়ে বড় কথা লন্ডন ও সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র তুরাবি একই সঙ্গে ইসলামী ঐতিহ্য ও আইন বিশেষজ্ঞ, পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে সমসাময়িক ইসলামী ভাবনার অন্যতম প্রধান ভাষ্যকার এবং ইসলামী জগতের অগ্রণী তাত্ত্বিক নেতা। তিনি একাধারে আলেম, মুফাসসির, আইনবিদ, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাঁর চিন্তাধারার আলোকেই গড়ে উঠেছে আজকের আধুনিক সুদান। একারণেই তিনি সুদানের একজন  সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তুরাবি একজন গণতান্ত্রিক নেতা ছিলেন। তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন পশ্চিমা গণতন্ত্রের চেয়ে ইসলাম আরও ভালো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উপহার দিতে পারে। 

আজকে ইসলামী ও পশ্চিমা সভ্যতার ঠানাপোড়ন থেকে উঠে আসা সামাজিক রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে তুরাবির নজির টানা জরুরী হয়ে পড়ে। এ কারণেই তাকে আধুনিক ইসলামী মননের অন্যতম সংকট বিশ্লেষক হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলিম বিশ্বের অবিসাংবাদিত নেতা এবং সুদানের বিরোধীদলীয় “পপুলার কংগ্রেস পার্টির” প্রধান ড. হাসান আল-তুরাবি ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের কল্যাণের কথা চিন্তা করে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার থিউরি আবিষ্কার করেন যা আমরা জানি পাওয়ার শেয়ারিং থিউরি নামে। এই থিউরির আলোকে মুসলিম বিশ্বের অনেক ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল দীর্ঘকাল এর কিছু সুফল ভোগ করে। এক সময় সুদানের সামরিক প্রেসিডেন্ট বশিরের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ১৯৮৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন বশির। এরপর থেকেই তিনি বশির সরকারের বিরোধিতা শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট বশিরের দীর্ঘ শাসনামলে তিনিই ছিলেন তার প্রধান সমালোচক। তিউনিসিয়ার আদলে দেশে একটি রাজনৈতিক বিপ্লবেরও স্বপ্ন দেখেছিলেন এই নেতা। তুরাবি ছিলেন একজন উদারপন্থী মুসলিম চিন্তাবিদ। তিনি ইসলামের অনেক বিষয়েই বিতর্ক এড়িয়ে চলতেন। এবং অনেক কঠোর ইসলামী বিধানের ব্যাপারে উদরতার পরিচয় দেন। তুরাবি মনে করতেন মুসলিম রাষ্ট্রের সরকার প্রধান একজন নারীও হতে পারে। এমনকি অন্য যেকোনো ধর্মের নারী হলেও তিনি এতে কোনো সমস্যা আছে বলে বলে মনে করেন। তুরাবি নারী অধিকারের ব্যাপারে একজন সোচ্চার মুসলিম নেতা ছিলেন। বিস্তারিত পড়তে পারেন: [Hasan Turabi, Women in Islam and Muslim Society. London: Mile Stones, 1991.]

সুদানের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ড. হাসান আল তুরাবির মতে মুসলিম রাষ্ট্র মানে মুসলিম আধিপত্যশীল রাষ্ট্র। তবে ইসলামী রাষ্ট্র মানে যে রাষ্ট্রে ইসলামী নীতি-আদর্শকে কেবল ব্যক্তিজীবনে নয়, বরং প্রকাশ্য জনপরিমণ্ডলে চর্চা করা হয়। এর মানে হচ্ছে, যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ সবকিছুই হবে ইসলাম দ্বারা অনুপ্রাণিত। যেহেতু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। খ্রিষ্টানদের বেলায় রাষ্ট্র পরিচালিত হতো তাদের ধর্মীয় যাজকদের মাধ্যমে। কারণ খ্রিষ্টান যাজকরা মনে করত, স্রষ্টা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন না। ফলে তারা নিজেদেরকে স্রষ্টার খাস প্রতিনিধি মনে করত এবং সবসময় গণমানুষের জীবনে হস্তক্ষেপ করত। যদিও খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে রাজনীতির তেমন বিদ্বেষ ছিল না, বিদ্বেষ ছিল ধর্মীয় যাজকদের সাথে বিপ্লবীদের। এর বিপরীতে, ইসলামে কোনো মোল্লাতন্ত্র নেই। এখানে প্রত্যেক মানুষ সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। সুতরাং ইসলাম ধর্মে শুধুমাত্র মোল্লারা নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে আল্লাহ বিশ্বাসী মানুষেরা। মুসলিমরাই ইসলামী রাষ্ট্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে। 

ড.হাসান আল তুরাবি ১৯৩২ সালে সুদানের কাসসালা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের শরিয়াহ আদালতের বিচারক। তিনি শিক্ষাজীবন শুরু করেন গ্রামের একটি মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি ইসলামী শিক্ষা অর্জনের পর সুদানের রাজধানী খারতুমে আসেন আইন পড়ার জন্যে। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন সুদানের বিখ্যাত খারতুম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি সেখানকার ছাত্র সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সংস্পর্শে আসেন। ব্রাদারহুড তাঁর চিন্তা ভাবনার মোড় অনেকটাই ঘুরিয়ে দেয়। তিনি সেদিনকার অভিজ্ঞতার কথা এভাবে বলেছেন, The Islamic movement which I met at the university was quite an experience for me. All of the dead literature that I had learned by heart became alive. I saw everything in a different light.[ John L. Esposito and John O. Voll, Makers of Contemporary Islam. New York; Oxford University Press, 2001.]..এরপর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্যে তিনি গমন করেন লন্ডনে এবং সেখানকার কিংস কলেজ থেকে আইনের উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর গমন করেন ফ্রান্সে; সেখানকার প্যারিসে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রাচীন সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন। তার পিএইচডি’র বিষয় ছিল ‘উদার নৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জরুরি অবস্থায় ক্ষমতা প্রয়োগ কতটা গ্রহণযোগ্য?’ হাসান আল-তুরাবির মত ইসলামী জ্ঞানের সাথে বৈশ্বিক জ্ঞানের এমন অসাধারণ সমন্বয় সৃষ্টিকারী দ্বিতীয়জন সুদানে খুঁজে পাওয়া দায়। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি সুদানের এটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি সুদানের ন্যাশনাল এসেম্বলির স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।

ইসলাম ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা ও সমাজ সংস্কারের উদ্দেশে তিনি প্রচুর কাজ ও লেখালেখি করেন। ‘তাফসীর আত-তাওহীদ’ নামে তিনি একটি তাফসীর লিখেন, যেখানে সমসাময়িক সমস্যাগুলোর কোরআন ভিত্তিক সমাধান তিনি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ইসলামী জ্ঞানের সাথে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় করা এখন খুবই প্রয়োজন। তিনি অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন, ইংরেজি ও আরবিতে তার অনেক বক্তৃতা রয়েছে; এগুলোর মাধ্যমে তিনি সুদানের দারিদ্র্যতা, গোত্রীয় সংকীর্ণতা, মাজহাব নিয়ে ঝগড়াসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার উদার ও আধুনিক সমাধান সুদানের মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেছে। ফলে সুদানসহ বিশ্ববাসীর কাছে তার সম্মান ও মর্যাদা আকাশচুম্বী।

ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমরা যেসব অভিযোগ তোলে, ড. হাসান আল তুরাবি চমৎকারভাবে সেসব খ-ন করেন। বিশেষত, ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে তিনি কিছু অসাধারণ বিষয় তুলে ধরেছেন, যা অমুসলিমদের সকল অভিযোগকে ধূলিসাৎ করে দেয়। নারী বিষয়ে তিনি একটি বিখ্যাত বই লিখেন, ‘Women between the teachings of religion and the customs of society’। এ বইয়ে ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে তুরাবি যে বিপ্লবী ভাষ্য দিয়েছেন তা রীতিমত মৌলবাদী, নারীবাদী, মার্কসবাদী সব তরফের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তুরাবীর এই ভূমিকার ফলেই সুদানে মহিলা ভোটের হাওয়া ঘুরে যায় ইসলামী শক্তির পক্ষে এবং ইসলামিক আইডেন্টিটি ও নারীবাদী চেতনায় বিশ্বাসীরা সুদানে মার্কসবাদীদের ছাড়িয়ে যায়। তুরাবী এ বইয়ে প্রথমে যুগের মুসলিম সমাজে নারীদের ভূমিকার নজির দিয়েছেন এবং এই ভূমিকাকে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশের সাথে সমন্বয়  করে বলতে চেয়েছেন : in the religion of Islam, a women is and independent entity, and thus a fully responsible human being. Islam addresses her directly and does not approach her through the agency of Muslim males.

এ বইটি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকায় রাখা হয়েছে। তিনি কেবল বই লিখেই বসে থাকেননি; ইসলামী ঐতিহ্যের আলোকে সুদানের নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে হাজির করার ক্ষেত্রে অসামান্য ত্যাগও স্বীকার করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ইসলামের প্রতি অনড় অবস্থানের কারণে সুদানের সামরিক সরকার তাকে কারাগারে প্রেরণ করে। ২০০১ সাল থেকে প্রায় চার বছর কারাভোগ করার পর ২০০৫ সালে তিনি মুক্তি পান। এ মানুষটির বহুবিদ প্রতিভা বিশ্ববাসীকে কেবল অবাক করেই দেয় না, আত্মবিশ্বাসী মানুষকে সামনে চলার পথও খুঁজে দেয়।

১৯৬৪ সালে দেশে ফেরার পর ড. তুরাবি খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টিতে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আহ্বান উপেক্ষা করে তৎকালীন সুদানী সামরিক শাসক ইব্রাহিম আবুদের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে এক তীব্র ও ঝাঁঝালো বক্তৃতা দেন। সেই থেকে তুরাবি সুদানী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এসে হাজির হন এবং আজও তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। অনেকের ধারণা ১৯৮৯ সালে সুদানে ইসলামী শক্তির মদদে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে যে উমর আল বশিরের সরকার ক্ষমতায় আসে তার প্রধান তাত্ত্বিক ও নেপথ্যের নায়ক আসলে তিনি। তুরাবির সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কয়েক দশকের মধ্যে সুদানী সমাজ ও রাষ্ট্রের ইসলামীকরণের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইসলামের অন্তর্মুখিতা কাটিয়ে তিনি এটিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রোগ্রাম হিসেবে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন যা অনেকের কাছে চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত। দারফুরে গণহত্যার ঘটনায় বশিরকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করেছিল আদালত। ড. তুরাবি ছিলেন সুদানের একমাত্র রাজনৈতিক নেতা যিনি ওই গ্রেফতারি পরোয়ানাকে সমর্থন করেছিলেন। অবশ্য নিজের ওই কর্মকান্ডের জন্য তাকে মাসুল দিতে হয়েছে। এ ঘটনার দুদিন পরই ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে তাকে গ্রেফতার করেছিল সরকার। এক সময়ের বন্ধু সামরিক শাসক বশিরের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর তিনি নিজের দল ‘পপুলার কংগ্রেস পার্টি’ গড়ে তুলেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত তুরাবির ইংরেজি, ফারসি, জার্মান ও আরবি ভাষায় সমান দক্ষতা ছিল। ভাষাগত পান্ডিত্যের কারণেই বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলোতে তার কদর ছিল। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি সুদানের এটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি সুদানের ন্যাশনাল এসেম্বলি’র স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১৬ সালের ৫ মার্চ ইন্তিকাল করেন।

বর্তমান সময়ে প্রয়োজনের আলোকে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ থিউরি গুলোকে সম্বনয় করা অতি জরুরি। ইসলামের নিয়মগুলোকে বর্তমান সময়ের আলোকে ইন্টারপেইট করতে হবে বলে মনে করতেন তুরাবি। পশ্চিমা বিশ্বের হলেই গ্রহণ করা যাবেনা এমন ধারণা করা ঠিক বলে মনে করতেন না তুরাবি। ভালো কিছু গুলো গ্রহণ করার পক্ষে সব সময় তুরাবি ছিলেন। ১৯৬৪ সালে দেশে ফিরে তিনি প্রথম কাজ করেন খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নীতি-নির্ধারণী বিতর্কে সুদানের তৎকালীন সামরিক শাসক ইব্রাহীম আবুদকে আক্রমন করেন। এটি চলমান আবুদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি দেয় এবং বিরোধী দলের এই আন্দোলনে মুসলিম ব্রাদারহুডের অবস্থানকে আরো মজবুত করে। এর ফলে ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে আবুদ সরকারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের সফলতা এবং তুরাবী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের অভিজ্ঞতা তুরাবির রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ। তুরাবির এই সাফল্য ঠিক সরাসরি ইসলামী কোন অবস্থান থেকে আসেনি বরং একটি সামগ্রিক সমস্যার তিনি একটি ইসলামী অভিব্যক্তি ঘটিয়েছিলেন। তুরাবির নেতৃত্বের এই বিশেষ কৌশলই তাঁকে সুদানী রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যমণি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তুরাবি একই সাথে সুদানের ব্রাদারহুডের নেতৃত্বও দিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে যেয়ে অন্যান্য রাজনীতিবিদদের সাথে তার প্রতিদ্বদ্ধিতায় নামতে হয়েছে। এই প্রতিদ্বদ্ধিতায় তিনি অন্য সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং ব্রাদারহুডের মতো একটি এলিটিস্ট প্রতিষ্ঠানকে রীতিমত জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেছন।

হাসান আল তুরাবির চিন্তাভাবনার মূলে আছে তাঁর ইসলামকে বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। কিন্তু সেই রকম সামর্থ্য অর্জন করতে হলে তুরাবি মনে করেন আধুনিককালে ইসলামের তাজদীদ বা পুনরুজ্জীবন দরকার। এই কাজ করতে হলে প্রথমে চাই একালে মুসলিম সমাজের দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সকল বিশ্বাসীকে এই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া। তুরাবির মুসলিম ইতিহাস চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে তাজদীদ। কারণ প্রতি যুগেই ইসলামের তাজদীদ প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং ইসলাম পরিণত হয় একটি আচারসর্বস্ব জীবনীশক্তিহীন ধর্মে। অবশেষে দেখা যায় ইসলাম বিশ্বাসীরা এমন রীতিনীতি নিয়ে বসবাস করছে যাকে আর কোনভাবেই ইসলামসম্মত বলা চলে না। 

তুরাবি তাই মনে করেন ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে এই তাজদীদ ও তাকলীদের (অতীতের অন্ধ অনুকরণ) পারস্পারিক উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বমানতা বরাবর ছিল। তুরাবি অবশ্য এটা মনে করেন না তাজদীদ মানে হচ্ছে ইসলামের মৌলিক নীতিকে পাল্টে দেয়া কিংবা নতুন পরিস্থিতির সাপেক্ষে কুরআন শরীফের পরিবর্তন ঘটানো। তুরাবির কাছে তাজদীদ মানে হচ্ছে: The revelation in the Qur’an is the comprehensive revelation of God’s eternal truth. However, the implications of that Qur’anic message for specific peoples, times and places do change.[ John L. Esposito and John O. Voll, Makers of Contemporary Islam. New York; Oxford University Press, 2001..]

১৯৬৫ সালে সুদান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেখানকার সাংবিধানিক সংকটের প্রেক্ষাপটে গঠিত কমিটির সদস্য হিসেবে তুরাবী যে মতামত দেন তার মধ্যে এরকম অভিব্যক্তি দেখা যায়। সুদান কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালে আবুদ সরকারের পতনে গুরুতপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের সংসদ নির্বাচনে বেশ কয়েকটি সিট পায়। কিন্তু ব্রাদারহুডের চাপে পার্লামেন্টে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে বিল পাস হয়। এ ঘটনাকে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করলে সেখানকার সুপ্রিম কাউন্সিল তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে সার্বিক পরিস্থিতির সাপেক্ষে রিপোর্ট দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন, যার সদস্য হিসেবে তুরাবি কাজ করেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যের মতো তুরাবিও আইন প্রণয়নে সংসদের চূড়ান্ত ক্ষমতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং একই সাথে তিনি রিপোর্টের সাথে যোগ করে দেন: The Constituent Assembly is the agency entrusted with the exercise of the highest constitutional authority and it is an expression of the sovereignty which the constitutions establish for the Ummah after God.

এখানে তুরাবির ‘খোদার পরে’ শব্দটার ব্যবহার লক্ষণীয়। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বকে তিনি খোদায়ী কর্তৃত্বের আয়ত্তাধীন রেখেছেন যা তাঁর ইসলামী প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ। তুরাবী শুধুরিপোর্ট দিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না, এই সাংবিধানিক সংকটের কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি লেখেন: The Sudanese constitution is simply a collection of limbs amputated from foreign constitutions and imposed on the Sudanese people.

সুতরাং ধার করা ব্যবস্থা নয়; কার্যকর সংস্কার ও পুনর্জীবনের কাজ করতে হলে ইসলামের ভিত্তিতেই করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তুরাবির পুনর্জীবনের জন্য দু’টি বিষয় চিহ্নিত করেছেন। একটি ফিকাহ্র পুনঃনির্মাণ, অপরটি শরীয়াহ্র বাস্তবায়ন। মুসলিম চিন্তার জগতে শরীয়াহ বিবেচিত হয় ইসলামী আইন হিসেবে যার উৎস হলো পবিত্র কুরআন ও রাসূলের (সা.) সুন্নাত। অন্যদিকে ফিকাহ্ হচ্ছে শরীয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, বিশ্লেষণ ও তার ফলাফল। তার মানে ফিকাহ্ হচ্ছে মানবীয় চিন্তাপ্রসূত, শরীয়াহ ঐশী জ্ঞানলব্ধ। ফিকাহ্ হচ্ছে শরীয়াহ্র উপর ভিত্তি করে মানবীয় সমস্যার সমাধান বের করার পদ্ধতি। মুসলিম সমাজের মধ্যকার সমতা ও ইনসাফের ধারণা যা কিনা শরীয়াহ্ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাকে উপেক্ষা করা হলো। এর ফলে জন্ম হলো তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজের। ঐতিহাসিক অবক্ষয়ের ধাক্কায় যে তথাকথিত মুসলিম সমাজ তৈরি হয়েছে তুরাবী মনে করেন এটিকে আজ বদলে ফেলা দরকার এবং ইসলামপন্থীদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই সংগ্রামে এগিয়ে আসা। তার কথা শোনা যাক:  A revolution against the condition of women in the traditional Muslim societies is inevitable and that is the task of Islamists to close the gap between the fallen historical reality and the desired model of ideal Islam.[ Hasan Turabi, Women in Islam and Muslim Society. London: Mile Stones, 1991.] তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে ইসলামী রাষ্ট্র বা সরকার বলতে কি বোঝায়? তুরাবী একটা মডেল খাড়া করেছেন, যদিও এ মডেল প্রশ্নোর্ধ্ব নয়। তবুও বলতে হবে ইসলামী দুনিয়ায় ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল একালে তাঁর মত দু’একজনই সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এখানেই তুরাবীর সাফল্য। ইসলামবাদীরা এ মডেল থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। ভবিষ্যতের ইসলামবাদীরা এ মডেলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো অতিক্রম করে নতুন মডেল উপস্থাপন করবেন এ আশা করা যায়।

তুরাবী বলেছেন ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল হবে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক। কোনভাবেই এটা স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা নয়। এখানে সরকারের ভূমিকা অনেকখানি সীমিত। আইন সামাজিক নিয়ন্ত্রনের একমাত্র চাবিকাঠি নয়। নৈতিক বিধি, ব্যক্তির বিবেকবোধ এসবেরও গুরুত্ব রয়েছে এবং এসবই স্বাধীন মতামতের ব্যাপার। ইসলামের প্রতি মননশীল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে তা মোটেই নিয়ন্ত্রিত বা বিধিবদ্ধ হবে না। মূল ধারণাটা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রে স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অমুসলিমের স্বাধীনতা নয়, মুসলমানদের মধ্যে চিন্তার বহুত্বকেও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ইসলামের মূল তত্ত্বটা তৌহিদবাদী। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সেকুলার রাষ্ট্রের মতো নয়। ইসলামী রাষ্ট্রও সেকুলার নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। ধর্মহীনতা আত্মবিভাজন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পথ পরিষ্কার করে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ