ঢাকা, শুক্রবার 8 March 2019, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ৩০ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আবারও প্রশ্ন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে

বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আবারও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এবার এর কারণ সৃষ্টি করেছেন এক সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক এবং বর্তমানে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন। মাত্র ক’দিন আগে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মাহদী নামের এক যুবকের কথিত বিমান ছিনতাই চেষ্টা এবং কমান্ডো অভিযানে তার মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বেও যখন হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছিল তেমন এক সময়ে গত মঙ্গলবার নতুন এক ঘটনা ঘটেছে ইলিয়াস কাঞ্চনের কারণে। 

দৈনিক সংগ্রামসহ গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, সেদিন দুপুরে চট্টগ্রামগামী বিমানে ওঠার প্রাক্কালে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ব্যাগে একটি ৯ এমএম পিস্তল এবং ১০ রাউন্ড গুলি পাওয়া গেছে। এই অস্ত্রের বিষয়ে জানা গেছে নিরাপত্তা তল্লাশির দ্বিতীয় পর্যায়ের সময়। তার আগে ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম পর্যায় নির্বিঘেœ পার হয়ে এসেছিলেন। তখন স্ক্যানিং মেশিনে তার ব্যাগ  বা লাগেজে পিস্তলের সন্ধান পাননি দায়িত্ব পালনকারী অফিসাররা। তারা নাকি ইলিয়াস কাঞ্চনের শরীরও তল্লাশি করেছিলেন। 

বিষয়টি ধরা পড়েছে দ্বিতীয় দফায় স্ক্যানিং করার সময়। এ নিয়ে অবশ্য পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষÑ বেবিচকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর পেছনে রয়েছে স্ক্যানিং-এর দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসারদের অবহেলা এবং সে কারণে একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বেবিচক একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। অন্যদিকে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, ভুলটা নাকি তিনিই করেছেন। উচিত যেখানে ছিল পিস্তলটি বাসায় রেখে আসা সেখানে একদিকে তিনি তা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অন্যদিকে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানাতে ভুলে গিয়েছিলেন। ইলিয়াস কাঞ্চন দাবি করেছেন, প্রথম স্ক্যানিং মেশিনে ধরা না পড়ায় তিনি নিজেও নাকি বিস্মিত হয়েছিলেন এবং ব্যাগ ও লাগেজ দ্বিতীয় মেশিনে ঢোকানোর আগে তিনি নিজেই নাকি পিস্তল ও গুলির বিষয়ে অফিসারদের অবহিত করেছিলেন। ভুলের জন্য ইলিয়াস কাঞ্চন নাকি দুঃখও প্রকাশ করেছেন। এরই পাশাপাশি বেবিচকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একজন সম্মানিত ব্যক্তি হওয়ার কারণে প্রথম স্ক্যানিং মেশিনের দায়িত্ব পালনকারীরা সম্ভবত ইলিয়াস কাঞ্চনকে ছাড় দিয়েছিলেন। তাছাড়া পিস্তলটি লাইসেন্সকৃত ছিল বলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

বেবিচক এবং ইলিয়াস কাঞ্চনের মধ্যে যার বক্তব্যই সঠিক হয়ে থাকুক না কেন, হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে বলেই আমরা মনে করি, বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। পিস্তল এবং ১০ রাউন্ড গুলি সঙ্গে রাখার কারণে তো বটেই, এ বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আগে থেকে ঘোষণা না দেয়ার এবং কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার কারণেও নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন অপরাধের দায় এড়াতে পারেন না।

দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে স্ক্যানিং মেশিনের দায়িত্ব পালনকারী অফিসারদের অবহেলা। কারণ, যত জনপ্রিয়, সম্মানিত বা ক্ষমতাবানই হোন না কেন, কাউকেই জেনে-বুঝে কথিত ছাড় দেয়ার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। সকলের ব্যাপারেই আইনের সমান প্রয়োগ করা উচিত। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী অফিসাররা ছাড় দেয়ার আড়ালে প্রকৃতপক্ষে দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা দেখিয়েছেন। একজন মাত্র অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত করার কিংবা লোক দেখানো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করাই এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে না।

স্মরণ করা দরকার, মূলত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং ২০১৬ সালে ব্রিটেন বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পরিবহন করা পণ্য নেয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। নিষেধাজ্ঞায় দেশগুলো বলেছিল, বাংলাদেশের সকল পণ্য প্রথমে তৃতীয় কোনো দেশের বিমান বন্দরে নামাতে হবে। সেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষার পর বিপদজনক বা ঝুঁকিপূর্ণ নয় মর্মে সার্টিফিকেট দেয়া হলেই কেবল বাংলাদেশি পণ্যকে ওইসব দেশের বিমান বন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। দেশের রফতানি আয়ও অনেক কমে গেছে। 

ওদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সে দেশের এভিয়েশন আইন অনুযায়ী বাংলাদেশকে ক্যাটাগরি ২-এর অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশ বিমানের পক্ষে বহুদিন ধরে ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। য়ুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পেতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই ক্যাটাগরি ১-এর তালিকায় উন্নীত হতে হবে। এজন্যও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা দরকার। অন্যদিকে বাংলাদেশে ঘটে চলেছে সম্পূর্ণ উল্টোরকমের ঘটনা। শুধু খেলনা পিস্তল নয়, আসল পিস্তল নিয়েও মানুষ বিমান বন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনি পার হয়ে যেতে পারছে। এর ফলে হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে এসে পড়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন অবস্থা চলতে থাকলে এবং অনতিবিলম্বে নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আস্থা তৈরি করা সম্ভব না হলে কোনো দেশই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে না। পরিবর্তে বরং বাংলাদেশকে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হবে। এজন্যই সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া, যাতে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল দেশের বিমানই শংকামুক্তভাবে বাংলাদেশে যাতায়াত করতে পারে এবং বাংলাদেশের বিমানকেও যাতে ওইসব দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করতে দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ