ঢাকা, শুক্রবার 8 March 2019, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ৩০ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভোটারদের অনীহা দায় কার?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : পৃথিবীর যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জনগণ সর্বাধিক নির্বাচনমুখী। এ অঞ্চলের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য যে সংগ্রাম করেছে ভূ-ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নজির নেই। অথচ সেই গণতন্ত্র আজ শৃঙ্খলিত। মনের আয়নাতে শুধু কল্পনা করা যায়! স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মানবিক মূল্যবোধ তথা পরমতসহিষ্ণুতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। সহমর্মিতা-সহানুভূতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা গণতন্ত্রের মূল খুঁটি তাও আজ নির্বাসিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ কতটা স্বাধীন বা গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের নিকট থেকে পাচ্ছে তা পরিমাপ করার জন্য ব্যারোমিটারের প্রয়োজন নেই। দেশটির জনগণের ভোটাধিকারের চিত্র বিশ্লেষণ করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। যে ভোটের অধিকারের জন্য মানুষ জীবন বিলিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করে না, সে ভোটের উৎসব কেন এত নিরুত্তাপহীন তার তথ্যও জাতির সামনে উন্মোচন করা প্রয়োজন।

জাতীয় ভোটার দিবসের আগে রাজধানীতে হয়ে গেল ভোটারবিহীন সিটি নির্বাচন। ভোটার দিবসের স্লোগান কাউকে আলোড়িত করেনি। কারণ মানুষ যেখানে তার ভোট দিতে পারে না, সেখানে ভোটার দিবস পালন করা হাস্যকর। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির কোন কমতি ছিল না তবু জনগণ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যায়নি। কেন যায়নি সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেচু খুঁড়ে সাপ বের আসবে। অতীতের অনুষ্ঠিত নির্বাচন যতগুলি দলীয় সরকারে অধীনে হয়েছে কোন একটি নির্বাচনও বির্তকের উর্ধ্বে ছিল না। যে কারণে ভোট নিয়ে জনগণের মাঝে চরম অনাগ্রহ ও অনাস্থা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক জনগণের কাছে আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের দুপয়সারও মূল্য নেই। ৩০ ডিসেম্বর হয়ে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মানুষ নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। জনগণ ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের ছায়া হিসেবে দেখেছে।

বাংলাদেশের জনগণ সর্বাধিক গণতন্ত্রমনা বলেই ভোটকে উৎসবের মতো পালন করে। স্বাধীনতার ৪৭ বছরের নির্বাচনী ব্যবস্থা যতটুকু দাঁড়িয়েছিল তা খারাপ হতে হতে একেবাওে এবার তলানীতে পৌঁছেছে, যে কারণে ভোটররা আর এই কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী শপথ নিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন বটে। কিন্তু দেশের জন্য ক্ষতি ছাড়া কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না। কেননা এরকম নির্বাচন একটি দেশের জন্য ভয়ানক বিপদজ্জনক। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকে ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ মানুষ দেখেছে বিগত সংসদ নির্বাচনে কিভাবে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মানুষের মধ্যে একটা ধারনা সৃষ্টি হয়েছে যে আমরা যাকেই ভোট দিই না কেন পাস করবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই। ভোটারদের উপস্থিতি দেখে নির্বাচন কমিশনও বলতে বাধ্য হয়েছে, ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা তাদের কাজ নয়! অবুঝ শিশুও বলবে না ভোটারদের ধরিয়ে আনা নির্বাচন কমিশনের কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে ভোটকে উৎসবের মতো পালন করতো সে ভোট আজ নিরুত্তাপে পরিণত হলো কেন? এটা কমিশনের কাছে যে কেউই জানতে চাইতে পারে? একটা সময় তো বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনকে উৎসবের মতো উদযাপন করতো। নির্বাচন ছিল সবার কাছে প্রিয়। খুবই উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণ ভোট দিতো। কি গ্রাম,কি শহর সর্বত্র ভোটের আমেজ বিরাজ করতো। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার জন্য যেখানে নানারকম প্রলোভন ও আইনকানুন তৈরি করতে হয় সেখানে বাংলাদেশের জনগণ মনের আনন্দে ভোট কেন্দ্রে ছুটে যেত। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির সুতার টানে মানুষ এখন ভোটের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

ভোটার ভোটার ডাক পাড়ি। ভোটার গেল কার বাড়ি। আয়রে ভোটার কেন্দ্রে আয়। ভোটের বাক্স ফাঁকা যায়। সিটি ভোট নিয়ে এ ছড়াটি বেশ জনপ্রিয় ছড়াতে পরিণত হয়েছে। আমার ৫ বছর বয়সী মেয়েও দেখি ছড়াটি বেশ আনন্দে বলছে আর হাসছে। দেশের মানুষ চেয়েছিল সংসদ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। কিন্তু সেটি তারা পারেনি। নির্বাচনের পরে রিক্সা কিংবা বাসে যখনই চড়েছি তখন হাজারো মানুষের ক্ষোভ প্রত্যক্ষ করেছি। মানুষ শুধু বলছে ক্ষমতাসীন দল এত উন্নয়ন করছে তারপরও কেন সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে ভয় পাচ্ছে। তবে ইতিহাসের পাতায় সিটি নির্বাচনের ভোটের কথা লিপিবদ্ধ থাকবে। কারণ এ নির্বাচনে স্মরণকালের সবচেয়ে কম ভোটারের উপস্থিতি ছিল। তবু আইনানুগ ভোট। এ ভোটে নির্বাচন কমিশনের খরচ হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। ভোট পড়েছে ৩১.০৫ শতাংশ। ডিএনসিসির মোট ভোটার ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ৬২১ জন। আওয়ামী লীগের  নিবেদিত উৎসাহী কিছু কর্মী ব্যতীত অন্যরা ভোট কেন্দ্রে যায়নি। একজন নির্বাচন কর্মকর্তা তো আক্ষেপ করে বলেছে ভাই যদি একটা ভোটও পড়তো! এমন নির্বাচন আর কখনোই দেখিনি। তবে ভোটার না থাকলেও একটি টেলিভিশন চ্যানেল লাইভে স্থানীয় লোকজনকে ডেকে এনে দাঁড় করিয়েছে। কিছুক্ষণ পর একজন সাংবাদিক যখন রিপোটারকে জিজ্ঞেস করলেন ভাই এটা কি প্রচার করলেন! সে উত্তর দিল আমাকে যেভাবে বলা হয়েছে আমি সেভাবেই প্রচার করেছি। গুলশানের একটি ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে যা পত্রিকার পাতায়ও মুদ্রিত হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যে দলটি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে সে দলটির প্রার্থী ১ মাসের ব্যবধানে সিটি নির্বাচনে কেন এত কম ভোট পেলেন, সে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলেই অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাফিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন,ভোটে মানুষের আগ্রহ কম। কারণ এর আগে যে নির্বাচন হয়েছে সেগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। অতীতের সেই নির্বাচনের পরিস্থিতিতে ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেই তারা ভোটকেন্দ্রে আসতে চাচ্ছেন না। আর এ কারণেই ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কম। আরেক স্বতন্ত্রপ্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুর রহিম গত সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন উপনির্বাচনে ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি প্রকৃত ভোটার ভোট দিতে আসেননি। সেখানে ৩১ শতাংশের বেশি ভোট দেখানো হয়েছে। প্রতিটি ভোটারের ব্যালট পরীক্ষা করলে জালিয়াতির প্রমাণ মিলবে। ব্যালটে দেখা যাবে কারো আঙুলের ছাপের সঙ্গে টিপ সইয়ের মিল নেই,আবার কারো স্বাক্ষরের মিল নেই। তিনি আরোও বলেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেমন ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবারও তেমনটাই হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, এটা কোনো নির্বাচন নয়। এটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। 

সবকিছু যখন নিজের কব্জায় থাকে তখন মনের অজান্তে মানুষ ভুল করে থাকে। ঢাকা উত্তর সিটির ক্ষেত্রেও তার ব্যতয় ঘটেনি। ক্ষমতাসীন শাসক বিরোধীদলের চেয়ে বেশি ভুল করেছে। কোন দরকার ছিল না এত ভোট দেখিয়ে ফলাফল ঘোষণার। আরও কম দেখালেই বা কী হতো! নৌকার বিজয় জনগণ নিশ্চিত না করলেও প্রশাসনের একশ্রেণীর অতি উৎসাহীরা নিশ্চিত করেছে বলে অনেকের ধারনা। একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দলের কাছে আমলাদের কদর বেড়ে যাওয়া মোটেই শুভ লক্ষণ নয়! কেননা প্রশাসন কারও আপন নয়। তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে যা খুশি তা করে। কিন্তু যাওয়ার আগে শুধু সর্বনাশ-ই করে । আগামী নির্বাচন ও হয়তো আওয়ামী সরকারের পরিকল্পনা মাফিক অনুষ্ঠিত হইবে। তারা আবার ক্ষমতায়ও আসতে পারে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন থেকে ইউপি নির্বাচন পর্যন্ত মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পূর্বশর্ত ভোটাধিকারের যে চিত্র একের পর এক উঠে এসেছে তাতে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক আওয়ামী লীগ তো আর চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে না। তাহলে যখন দলটি বিরোধী দলে যাবে তখন তৃণমূল বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোতে সহিংসতার ক্ষতের দায়ভার কে নেবে। আমরা আশা করব সংশ্লিষ্ট মহল নির্বাচনে ভোটারদের অনীহা দূর করার প্রয়াসে সুষ্ঠু ভোটের ব্যবস্থা করবেন, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ