ঢাকা, শনিবার 9 March 2019, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ক্যাপসিক্যাম চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

* বাজারে এসেছে নতুন সবজি ক্যাপসিক্যাম বা মিষ্টি মরিচ
* বেকার যুবকদের ক্যাপসিক্যাম চাষে কোটিপতি হওয়ার অপার সম্ভাবনা
মুহাম্মদ নূরে আলম : বাজারে এসেছে নতুন সবজি ক্যাপসিক্যাম বা মিষ্টি মরিচ। ক্যাপসিকাম বা মিষ্টি মরিচ চাষ করে বেকার যুবকদের কোটিপতি হওয়ার অপার সুযোগ রয়েছে।  দেশের চরাঞ্চলগুলোর সরকারি জায়গা লীজ নিয়ে আপনিও চাষ করতে পারেন ক্যাপসিকাম বা মিষ্টি মরিচের চাষাবাদ। আর হতে পারেন অল্প সময়ের মধ্যে কোটিপতি। ক্যাপসিকাম বা মিষ্টি মরিচ একটি জনপ্রিয় বিদেশী সবজি। বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। এর আকার-আকৃতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তবে সাধারণত ফল  গোলাকার ও ত্বক পুরু হয়। এটি আমাদের দেশের প্রচলিত সবজি না হলেও ইদানিং এর চাষ প্রসারিত হচ্ছে। তবে সারা বিশ্বে টমেটোর পরই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সবজি হচ্ছে মিষ্টি মরিচ। মিষ্টি মরিচ অত্যন্ত মূল্যবান সবজি। প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকার কারণে এবং অতি সহজেই টবে চাষ করা যায় বলে দেশের জনসাধারণকে মিষ্টি মরিচ খাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। সবজি চাষে অপার সম্ভাবনা রয়েছে দেশের চরঞ্চলগুলোতে। আর এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চরাঞ্চলগুলোতে বিদেশী সবজি ক্যাপসিক্যাম চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করছেন আমাদের দেশের কৃষকরা। গত কয়েক বছর ধরে ক্যাপসিক্যাম চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। অল্প সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় বিদেশী এই সবজি চাষের দিন দিন চরের চাষীদের আগ্রহ বেড়েই চলছে। তবে সরকারিভাবে বিশেষ কোন উদ্যোগ না থাকায় দেশের চরাঞ্চলোগুলোতে ক্যাপসিক্যাম চাষের বিপ্লব ঘটনাতে পারছেন না চাষিরা।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলো ধান, সয়াবিনের পাশাপাশি লাউ, শসা, করলা, চিচিঙ্গার পাশাপাশি ক্যাপসিক্যাম সবজি চাষ করে লাভবান হচ্ছিলেন চাষিরা। গত ৪-৫ বছর আগে মেঘনার মধ্যবর্তী মাঝের চরে মনির পাঠান নামের এক ব্যক্তি মাত্র ১০ শতক জমিতে ক্যাপসিক্যাম চাষের উদ্যোগ নেন। প্রথম বছরই তিনি বাম্পার ফলন পেয়েছিলেন। তার দেখাদেখি অন্যরাও ক্যাপসিক্যাম চাষে আগ্রহী হন। বর্তমানে ২০-২৫ জন ক্যাপসিক্যাম চাষ করছেন।
 প্রথম চাষি মো. মনির পাঠান বলেন, ‘আমি গত কয়েক বছর ধরে দেখেছি মাঝের চরে ক্যাপসিক্যাম চাষ করে অনেকে লাখ লাখ টাকা লাভ করেছে। এবছর আমিও নতুন করে ক্যাপসিক্যাম চাষ শুরু করেছি। চাষি মো. ছিদ্দিকুল্লাহ বলেন, আমি গত ৩ বছর ধরে মাঝের চরে ক্যাপসিক্যাম চাষ করছি। এবছর এক একর জমিতে ক্যাপসিক্যাম চাষ করেছি। এতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ক্ষেত থেকে ফলন বিক্রি করতে পারবো।
মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, আমার দেড় একর জমিতে ক্যাপসিক্যাম চাষ করতে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এপর্যন্ত দেড় লাখ টাকার ক্যাপসিক্যাম বিক্রি করেছি। আকাশের অবস্থা ভালো থাকলে আরো ৫ লাখ টাকার ফলন বিক্রি করতে পারবো। চাষি নয়ন মিয়া, জামাল উদ্দিন ও মহিউদ্দিন বলেন, গত বছর অসময় বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা পোকার আক্রমণ ছিল। এবছর বৃষ্টি নেই, তাই পোকার আক্রমণ নেই। গত বছর পাইকারি বাজারে দাম কম ছিল। এবছর কেজি প্রতি ১০০ টাকা। এবার অনেক লাভ হবে। তবে ক্যাপসিক্যাম চাষ ও বিদেশে রফতানিতে সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা পাই না। পেলে চাষে বিপ্লব ঘটতে পারতাম। তবে বর্তমানে দেশের ভোলা জেলায় ক্যাপসিক্যামের বেশি চাষাবাদ হচ্ছে।
 জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১১ হেক্টর জমিতে ক্যাপসিক্যাম চাষ হয়েছিল। এবছর ১৬ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (দায়িত্ব ভোলা জেলা)  বিনয় কুমার দেবনাথ বলেন, বর্তমানে চাষিদের সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। চাষের পরিমাণ বাড়াতে ও সরকারিভাবে সহযোগিতার করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
 যেভাবে চাষ করবেন ক্যাপসিকাম: বীজ বপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। প্রতি শতকের জন্য ১ গ্রাম বীজ দরকার হয়। বীজ থেকে প্রথমে চারা তৈরি করে নিতে হয়। এ জন্য বীজগুলোকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে আগে থেকে তৈরি করে রাখা বীজতলায় ১০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে লাইন করে বীজ বুনতে হবে। মিষ্টি মরিচ চাষের জন্য দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি ভালো। মিষ্টি মরিচ খরা ও গোড়ায় পানি জমা কোনটিই সহ্য করতে পারে না।
 বেড তৈরি: বীজ বপণের ৭-১০ দিন পর চারার ৩-৪ পাতা হলে মাঝারি আকারের পলিথিন ব্যাগে চারা স্থানান্তর করতে হবে। এরপর মূল জমি চাষ ও মই দিয়ে ভালোভাবে তৈরি করে নিতে হবে। এরপর বেড তৈরি করে নিতে হবে। প্রতিটি বেড চওড়া ২.৫ ফুট রাখতে হয়। দুই বেডের মাঝখানে নালা রাখতে হবে। সাধারণত ৩০ দিন বয়সের চারা তৈরি করা বেডে ১.৫ ফুট দূরে দূরে লাইনে রোপণ করা হয়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায় বলে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে রাখলে ভেতরের তাপমাত্রা বেশি থাকে।
সার: প্রতি শতক জমির জন্য গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ১.৪ কেজি, এমওপি ১ কেজি, দস্তা ২০ গ্রাম এবং জিপসাম ৪৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। এরমধ্যে অর্ধেক গোবর সার জমি তৈরির সময়, বাকি অর্ধেক গোবর সম্পূর্ণ টিএসপি, দস্তা, জিপসাম, ১/৩ ভাগ এমওপি এবং ১/৩ ভাগ ইউরিয়া চারা রোপণের গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ২/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং এমওপি পরবর্তীতে দুইভাগ করে চারা রোপণের ২৫ এবং ৫০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।
 সেচ: ক্যাপসিকাম খরা ও জলাবদ্ধতা কোনটাই সহ্য করতে পারে না, তাই প্রয়োজন অনুসারে জমিতে সেচ দিতে হবে। কোনো গাছে ফল ধরা শুরু হলে খুঁটি দিতে হবে, যাতে গাছ ফলের ভারে হেলে না পড়ে। জমি সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
ফসল: মিষ্টি মরিচ পরিপক্ক সবুজ অবস্থায় লালচে হওয়ার আগেই মাঠ থেকে উঠানো যায়। সাধারণত সপ্তাহে একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের পর ঠান্ডা অথচ ছায়াযুক্ত স্থানে বাজারজাতকরণের পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ফল সংগ্রহের সময় প্রতিটি ফলে সামান্য পরিমাণে বোটা রেখে দিতে হবে।
রোগ-বালাই: মিষ্টি মরিচে কিছু পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে আছে জাবপোকা, থ্রিপস পোকা, লালমাকড়, অ্যানথ্রাকনোজ রোগ, ব্লাইট রোগ ইত্যাদি। এসব রোগের আক্রমণ হলে নিকটস্থ কৃষিকর্মীর সঙ্গে পরামর্শ করে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ