ঢাকা, শনিবার 9 March 2019, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

তিন বছরে পুনঃতফসিল ৯৭ হাজার কোটি টাকা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান :

বেশ কয়েক ধরনের ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল পুনর্গঠন করা হলেও খেলাপি ঋণ আদায় তেমন হয়নি, বরং বেড়েছে।  তিন বছরে ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। পুন:তফসিলের কারণে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র জানা যাচ্ছে না। বাস্তবে খেলাপি ঋণের চিত্র আরো ভয়াবহ বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ কম দেখানোর জন্য নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যাংকগুলো ঋণের পুন:তফসিল করছে। আর এইক্ষেত্রে ঋণ পুন:তফসিল নিয়মের মধ্যে করতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন নিয়ে ঋণ পুন:তফসিল করা হয়েছে। এতে করে অনেক ঋণ আদায় না হলেও খেলাপি ঋণের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে না। ফলে আড়ালে থাকছে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। ফলে বড় বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ নিয়ে টাকা ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। 
জানা গেছে, ২০১৫ সালে বিশেষ বিবেচনায় ডাউন পেমেন্ট ও মেয়াদের শর্ত শিথিল করে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। শুধু গত বছর পুনঃতফসিল করা হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে শেষ তিন মাসেই পুনঃতফসিল হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-২০১৭ এই পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলো থেকে ৮৪ হাজার ৫০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা পেয়েছেন খেলাপি গ্রাহকরা।
২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জারি করা নীতিমালায় সুদহার কমানো, পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি, ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিলসহ নানা সুবিধা পায় পাঁচশ’ কোটি টাকার উপরে ঋণ নেওয়া ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপ। ওই সময় তারা ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করে। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠিত ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়ায় সুদে-আসলে ব্যাংকগুলোর পাওনার পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এটি একটি ক্রাইম, আমাদের এই ক্রাইম বন্ধ করতে হবে। এই ঋণ বাড়ার প্রবণতা আমাদের থামাতে হবে, জাতিকে খেলাপি ঋণ থেকে মুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা, কৃষকের টাকা, এই টাকাকে খেলাপিতে পরিণত করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেই বেশি। তারা ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিয়ে পুনঃতফসিলের সুযোগ খোঁজে। আবার ব্যালেন্সশিটে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে ব্যাংকগুলো নিজেরাও ঢালাওভাবে বড় কিছু গ্রাহককে ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়। দেখা যায় কোনও কোনও ঋণ হয়তো ১০ বারও পুনঃতফসিল হয়েছে। এ জন্য ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জরুরী।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকবাংলাদেশ ব্যাংকের আনুকূল্য পাওয়া কিছু ব্যবসায়ীর জন্য শিথিল করা হচ্ছে ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা। ব্যাংকগুলো তাদের পছন্দের ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন। অর্থাৎ ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য পুনঃতফসিল করা ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ ১০ বছর করে সময় পাবেন। একইভাবে তারা আগের চেয়ে কম ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খেলাপি ঋণ কমানোর অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। গত এক বছরে খেলাপি বেড়েছে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৭ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।
সূত্র বলছে, এই খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে সরকারের গঠিত কমিটির সুপারিশের আলোকে ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। সরকারের গঠন করা কমিটির প্রধান ছিলেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। বর্তমানে একটি মেয়াদি ঋণ সর্বোচ্চ (তিনবার) ৩ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করতে পারে ব্যাংকগুলো। নতুন নীতিমালায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 
জানা গেছে, বর্তমানে একটি মেয়াদি ঋণ পুনঃতফসিল করতে প্রথমবার ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মোট বকেয়ার ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বার ৩০ শতাংশ দিতে হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠিত ঋণ পুনঃতফসিল করতে ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠিত ঋণও খেলাপি হয়ে পড়েছে। এই সব ঋণকে নতুন করে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে চায় সরকার। যদিও এর আগে বেশ কয়েক ধরনের ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন করা হলেও খেলাপি ঋণ আদায় তেমন হয়নি, বরং বেড়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘ঋণখেলাপিরা যেভাবে ব্যাংক খাতে জেঁকে বসেছে, তাতে মনে হচ্ছে ঋণখেলাপিরা আমৃত্যু ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করলেও চলবে। এ অবস্থায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি।
এদিকে খেলাপিদের সুবিধা দিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণও আগের চেয়ে ছয় মাস বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে। বর্তমানে কোনও ঋণ তিন মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সন্দেহজনক এবং নয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে মন্দমানে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়। অচিরেই ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া ঋণকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ১২ মাস মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ সন্দেহজনক এবং দেড় বছর মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা মন্দমানে শ্রেণিকরণ করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের গত ১০ বছরে অর্থ্যাৎ ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম বছর ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ বাড়েনি বললেই চলে। ২০১০ সালে সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, ২০১১ সালে যা নেমে আসে ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায়। ২০১২ সালে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা হয়। ২০১৩ সালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমে ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায় নেমে আসে খেলাপি ঋণ। ২০১৪ সালে আবার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায়। ২০১৫ সালে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে (সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, একই সময়ে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। ফলে দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন চাপের কারণে যাচাইবাছাই না করেই অনেক সময় ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। আর এই কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় না করতে পেরে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে বার বার পুন:তফসিলের দিকে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ