ঢাকা, বুধবার 13 March 2019, ২৯ ফাল্গুন ১৪২৫, ৫ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ডাকসু নির্বাচন

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসুর নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু নয়, সারাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল। বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ ছাড়াও বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন দলগত ও জোটগতভাবে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। সব মিলিয়ে প্যানেলের সংখ্যা ছিল সাতটি।
সে কারণে ১১ মার্চের নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠার কথা ছিল। হওয়া উচিতও ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ডাকসু নির্বাচনেও সরকার অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা প্রায় প্রত্যক্ষভাবেই হস্তক্ষেপ করেছেন। তাদের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর তো বটেই, বিভিন্ন আবাসিক হলের প্রভোস্টসহ ক্ষমতাবান অন্য শিক্ষকরাও ভূমিকা পালন করেছেন। ভোটগ্রহণসহ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব যারা পেয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগই ছাত্রলীগের সমর্থনে ন্যক্কারজনকভাবে ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
বলা যায়, নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই তারা ছাত্রলীগের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার জন্য তৎপর থেকেছেন। কেন্দ্রীয় তথা ডাকসুর ক্ষেত্রে শুধু নয়, তাদের তৎপরতা ছিল হলগুলোতেও। মূলত সে কারণেই কোনো একটি বিষয়েই ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের কোনো দাবি পূরণ করা দূরে থাকুক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিবেচনা পর্যন্ত করেনি। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবলই ছাত্রলীগকে সন্তুষ্ট করা। সন্তুষ্ট তারা করেছেনও সম্পূর্ণরূপে।
এসব বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে প্রচারণা চালানোর দিনগুলোতে। একমাত্র ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের পক্ষেই আবাসিক কোনো হলে বাধাহীনভাবে মিছিল করা এবং প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়নি। ভিপি ও জিএস প্রার্থীরা পর্যন্ত আক্রান্ত ও আহত হয়েছেন। ক্যাম্পাসের অন্য অনেক স্থানেও ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালিয়েছে। কিন্তু লিখিতভাবে প্রতিবাদ জানিয়েও কোনো সংগঠন কোনো প্রতিকার পায়নি। ভিসিসহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিকারের আশ্বাস শোনানোর বাইরে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি হলই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দখল করে নিয়েছিল। ফলে ছাত্রলীগ বিরোধী ভোটারদের পক্ষে নির্বিঘেœ ভোট দেয়া সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সুকৌশলে ছাত্রলীগের পক্ষেই ভূমিকা পালন করেছে। একটি উদাহরণ হিসেবে ভোট দেয়ার সময়ের কথা উল্লেখ করা যায়। ৪৩ হাজারের বেশি ভোটারের ভোট দেয়ার জন্য সময় দেয়া হয়েছিল মাত্র ছয় ঘণ্টাÑ সকাল আটটা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত। এর মধ্যেও প্রায় সব হলেই প্রধানত ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়েছে, যার ফলে ভোট দেয়ার কার্যক্রম শুরু হতেই অনেক বিলম্ব ঘটেছে। কোনো কোনো হলে এক ঘণ্টারও বেশি পার হয়ে যাওয়ার পর ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছে শিক্ষার্থীরা।
অস্বচ্ছ স্টিলের ব্যালট বাক্স নিয়েও প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থী তথা ভোটাররা বারবার দাবি জানালেও কোনো হলেই ভোট গ্রহণ শুরুর আগে ব্যালট বাক্স খুলে দেখানো হয়নি। বিশেষ কয়েকটি হলে আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ উঠেছিল। এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে একটি ছাত্রী হলে। সেখানে ছাত্রীরা প্রভোস্টের উপস্থিতিতে আগের রাতে ভোটকেন্দ্র এবং তার পাশের রুমের মধ্যবর্তী দরোজায় তালা লাগিয়ে দিলেও ভোটের দিন সে তালা ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে ছাত্রীদের দাবি ও প্রতিবাদের মুখে থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে। দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি বস্তায় ভোট দেয়া ব্যালট পেপার বেঁধে রাখা হয়েছিল। সময় ও সুযোগ বুঝে সেগুলোকে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়া হতো। বলা বাহুল্য, ব্যালট পেপারগুলোতে ছাত্রলীগের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেয়া হয়েছিল।
আরো অনেকভাবেই অনিয়ম ও জালিয়াতি করা হয়েছে। এসবের প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল ছাত্র সংগঠনই বেলা ১২টার মধ্যে নির্বাচন বর্জন করেছে এবং সেদিনের ভোট ও ফলাফল বাতিল করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলো ধর্মঘট ও পরীক্ষা বর্জনসহ আন্দোলনের আহ্বানও জানিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্নসাপেক্ষ একটি বিশেষ কারণে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভিপি পদে কোটা বিরোধী আন্দোলনের নির্যাতিত নেতা নূরুল হক বিজয়ী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর প্রথমে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেও ছাত্রলীগ পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে মেনে নিয়েছে। ছাত্রলীগের পরাজিত প্রার্থী তাকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়েই কেটে গেছে ডাকসু নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রাথমিক সংকট ও অনিশ্চয়তা। আশা করা হচ্ছে, সকল ছাত্র সংগঠনই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে।
অমন সম্ভাবনার সৃষ্টি হলেও আমরা মনে করি, সব মিলিয়ে ডাকসু নির্বাচন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নয়, সাধারণভাবে দেশের জনগণকেও ক্ষুব্ধ ও নিরাশ করেছে। সামগ্রিক কর্মকান্ডের কারণে ভিসিকে সিইসি তথা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী অন্য শিক্ষকদেরকেও নির্বাচন কমিশনারদের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল শিক্ষার্থীরা। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে বোঝানো হয়েছে যে, জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন নির্বাচনে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন যেভাবে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ভূমিকা পালন করে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও ছাত্রলীগের পক্ষে একই রকম ভূমিকা পালন করেছে।
এজন্যই একদিকে ডাকসু ও সকল হল সংসদে যেমন ছাত্রলীগের জয়জয়কার পড়ে গেছে অন্যদিকে তেমনি শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে স্লোগানের মতো উচ্চারিত হয়েছে ‘সিইসি এবং ভিসি’! বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের স্লোগানের মধ্যে কেবল লজ্জিত হওয়ারই উপাদান রয়েছে। গর্বিত বোধ করার কোনো সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও আমরা আশা করতে চাই, এবারের নির্বাচন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলে শিক্ষা নেবেন এবং ভবিষ্যতে ডাকসুর কোনো নির্বাচনকেই আর বিতর্কিত ও কলংকিত করা হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ