ঢাকা, বুধবার 13 March 2019, ২৯ ফাল্গুন ১৪২৫, ৫ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছেই

স্টাফ রিপোর্টার : আদায়ের অযোগ্য বা কুঋণের পরিমান বাড়ছেই। ধরনের উপর ভিত্তি করে শ্রেণিকৃত ঋণকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ ধরনটি হচ্ছে ব্যাড লোন (মন্দ) বা কুঋণ। ২০১৮ সাল শেষে মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে বেশিরভাগই কুঋণ। যা আদায় হওয়ার সম্ভবনা খুব কম। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে মন্দ ঋণের পাল্লা ভারি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণিকরণের (খেলাপি) তিনটি পর্যায় রয়েছে। তা হলো নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে মোট খেলাপির ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশই কুঋণ। ২০১৮ সাল শেষে ব্যাংখ খাত থেকে ঋণ বিতরণের স্থিতির পরিমাণ ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ।
এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সন্দেহজনজক ও নিম্নমানের ঋণ গুলোই এক সময় মন্দ ঋণে পরিণত হয়। সময়ের সাথে সাথে এর পরিমাণ বাড়ে। এর কারণ ঋণ দেওয়ার সময় ঠিকভাবে মান যাচায় করা হয়নি। অথবা চাপ সৃষ্টি করার ফলে এই ঋণগুলো দেওয়ার কারণে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে চাপ ও দুর্নীতিকে উপেক্ষা করার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।
তিনি বলেন, যতদিন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন না আসবে ততদিন এরকম হতেই থাকবে। তা বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের দায়িত্ব।
কুঋণ কমাতে আইন সংষোধনের প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন যে আইন আছে তার মাধ্যমেই খেলাপি কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু এর জন্য চাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ। অর্থমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়ায় খেলাপি ও মন্দ ঋন কমছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
 তথ্য অনুযায়ী মোট নিম্নমানের খেলাপি ৮ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, সন্দেহজনক খেলাপি ৪ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা এবং মন্দ বা কুঋণ ৮০ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। হিসাব বলছে কুঋণের তুলনায় নিম্নমান ও সন্দেহজনক ঋণের পরিমাণ খুবই কম। কারণ নিম্ন ও সন্দেহজনক ঋণের হার মাত্র শুন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ ও শুন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ।
আইন অনুযায়ী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ প্রভিশন, ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে হলে সন্দেহজনক ঋণ, যার বিপরীতে ৫০ শতাংশ প্রভিশন এবং ৯ মাসের বেশি হলে তাকে মন্দ বা ক্ষতি মানে বিবেচিত হয়, এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ও ব্যাংকের আয় কমে যাওয়ার ফলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। আলোচ্য সময়ে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ১৫টি ব্যাংক।
উল্লেখ, ২০১৮ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ। সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত খাতের দুই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। এই খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা বা বিতরণকৃত ঋণের ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলো বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বা ২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে।
এবিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ঋণ দেওয়া ও আদায়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কুঋণ বৃদ্ধিতে সহযোগী ভূমিকা পালন করে। এটা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বেশ উদ্বেগজনক। একটি সময় সন্দেহজনজক ও নিম্নমানের ঋণও মন্দ ঋণে পরিণত হয়। এ সমস্যা সমাধানে ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস, ব্যাংকের সুশাসন ফিরিয়ে আনা ও আইনী জটিলতা নিরসন করা উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ