ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 March 2019, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৫, ৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে

গ্যাস সংক্রান্ত সকল ক্ষমতার অধিকারী সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আবারও গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। এ ব্যাপারে যথারীতি তথাকথিত গণশুনানির আয়োজনও করেছে বিইআরসি। সেখানে মূল্য না বাড়ানোর পক্ষে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন তথ্যাভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞসহ অংশগ্রহণকারীরা। কিন্তু তিতাস, বাখরাবাদ ও কর্ণফুলিসহ গ্যাস সরবরাহে সংশ্লিষ্ট ছয়টি কোম্পানির উপস্থাপিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিইআিরসি কর্তৃপক্ষের একবাক্যে জানিয়ে দিয়েছেন, এবার মূল্য তারা বাড়াবেনই!

শুধু তা-ই নয়, মূল্য যে পরিমাণে বাড়ানোর কথা জানানো হচ্ছে সেটাও সকল বিচারে অস্বাভাবিক এবং অগ্রহণযোগ্য। যেমন সিঙ্গেল বার্নার বা এক চুলার জন্য বর্তমানে যেখানে মাসে ৭৫০ টাকা দিতে হচ্ছে সেখানে বাড়ানোর পর দিতে হবে ১,৩৫০ টাকা। একইভাবে ডাবল বার্নার বা দুই চুলার জন্য বর্তমান ৮০০ টাকার স্থলে দিতে হবে ১,৪৪০ টাকা। সত্যিই বাড়ানো হলে আবাসিকসহ সব ধরনের গ্যাসের মূল্য বেড়ে যাবে ১০২ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে।

অন্য্যদিকে তিতাসসহ বিভিন্ন কোম্পানির দাবির মুখে মূল্যবৃদ্ধির এ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন সকল মহল। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি বলেছেন, গত কয়েক বছরে শিল্প-কারখানায় মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে ২৯ শতাংশ। তার ওপর যদি অতি উচ্চ হারে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হয় তাহলে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবেন। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যও মুখ থুবড়ে পড়বে। 

উল্লেখ্য, সিঙ্গেল ও ডাবল এ দুটি চুলার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে হারে অর্থাৎ যথাক্রমে ৭৫০ এবং ৮০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল গত বছর ২০১৭ সালের পহেলা মার্চ থেকে। তার আগে পর্যন্ত দিতে হতো যথাক্রমে ৬০০ এবং ৬৫০ টাকা। অর্থাৎ সেবার এক দফাতেই ১৫০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। এই দাম বাড়ানোর সময় বিইআরসির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, ২০১৭ সালেরই জুন থেকে গ্যাসের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৯০০ এবং ৯৫০ টাকা ধার্য করা হবে। দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে রিট করেছিলেন একজন নাগরিক। মাননীয় বিচারপতিরা দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়ার ফলে বিইআরসিকে পিছু হঠতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও মাঝখান দিয়ে এক দফায় ১৫০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কিন্তু ঠিকই কার্যকর করেছিল বিইআরসি। সেবার জনগণের ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপানো হয়েছিল মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে। বর্তমান পর্যায়েও আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি অটোরিকশা ও কারসহ সিএনজি চালিত সকল যানবাহনের পাশাপাশি শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রেও গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে আনুপাতিক হারে।

আমরা বিইআিরসির মাধ্যমে সরকারের মূল্য বাড়ানোর এই চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে মোটেই সমর্থনযোগ্য মনে করি না। কারণ, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাসাবাড়িতে তথা আবাসিক খাতে মোট উৎপাদিত গ্যাসের সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়িত হয়। সে কারণে আবাসিক খাতে মূল্য বাড়ানোর কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রাসঙ্গিক দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের গ্যাস যাচ্ছে বিশেষ করে ভারতে। এর ফলেই আসলে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কার্যক্রমও প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, বিভিন্ন উপলক্ষে মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের অনেকেই জনগণকে বাসাবাড়িতে বোতলজাত করা এলপি গ্যাস ব্যবহার করার পরামর্শ শুনিয়ে বেড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও এলএনজির কথা শোনা যাচ্ছে। 

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, এলপি গ্যাস ও এলএনজি ব্যবহারের পক্ষে প্রচারণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অনুসন্ধানেও তেমন কিছু তথ্যই বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, বেশ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি বহুদিন ধরে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি ও এলপি গ্যাস বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করছে। বলা হচ্ছে, মূলত তাদের স্বার্থেই এলএনজি ও এলপি গ্যাসের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, জনগণ যাতে আবাসিক খাতে এই গ্যাস ব্যবহার করে এবং কোম্পানিগুলো যাতে যথেচ্ছভাবে মুনাফা লুণ্ঠন ও জনগণকে শোষণ করতে পারে। বর্তমান পর্যায়েও বিইআরসির মাধ্যমে সরকার এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, জনগণ যাতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এলএনজি ও এলপি গ্যাস কিনতে বাধ্য হয়। 

আমরা মনে করি, গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো জা¡লানি খাতে সিস্টেম লসের নামে চুরি ও লুণ্ঠন বন্ধ করা এবং এলএনজি ও এলপি গ্যাসের আমদানিতে দলীয় লোকজনকে প্রশ্রয় ও অগ্রাধিকার না দেয়া। সরকারকে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সংকট কাটিয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপও নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, কেবলই দাম বাড়ানো কোনো সমাধান হতে পারে না। এর ফলে সমস্যা বরং আরো জাটিল হতে থাকবে। সুতরাং সরকারের উচিত বিইআরসিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার নির্দেশ দেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ