ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 March 2019, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৫, ৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় কার লাভ?

ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর ক্রমবর্ধমান নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বেসেলেট জেরিয়া ভারত সরকারের বিভাজনের নীতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোতি এজেন্ডার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুসলিম নিপীড়ন অব্যাহত রাখায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ৬ মার্চ বুধবার ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। রয়টার্স পরিবেশিত খবরে আরো বলা হয়। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বার্ষিক প্রতিবেদনে ভারতে মুসলিম নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরেন চিলির দুইবারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বেসেলেট জেরিয়া। গত ৬ মার্চ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে, মিশেল জেরিয়া বলেন, ভারত সরকারের বিভাজন নীতির কারণে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা ইতিমধ্যে ভারতের প্রান্তিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য অসমতার সমাজ তৈরি করেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা এমন তথ্য পেয়েছি যে, ভারতে সংখ্যালঘুরা নিপীড়িত এবং টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। বিশেষ করে মুসলিম এবং অনগ্রসর দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। মিশেল এমন সময় এ কথা উচ্চারণ করলেন, যার একদিন আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছিল, ভারতে ধর্ষণ, হত্যাসহ বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ বেড়েছে ২০১৮ সালে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ভারতে মুসলমান ও দলিতরা নির্যাতিত এবং তারা টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। ভারতের মত একটি বড় দেশের এমন অনাকাক্সিক্ষত চিত্র যে কোনো সবেচতন মানুষকেই ভাবিয়ে তুলবে। ভারতের মুসলমান ও দলিতদের সংখ্যা কম নয়। কোটি কোটি এই নিপীড়িত মানুষরা ভারতের নাগরিক। সংবিধান তাদের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। এখন তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। কিন্তু জাতিসংঘের প্রতিবেদন থেকে উপলব্ধি করা যায়, নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম ও দলিতদের অধিকার রক্ষিত হচ্ছে না, বরং তাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে এবং তারা টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতে এখন ‘বিভাজনের নীতি’ প্রচলন। এই নীতি শুধু যে সংখ্যালঘু মুসলিম ও দলিতদের স্বার্থই ক্ষুণœ করছে তা নয়, এতে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষুণœ হবে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। 

ভারতের শাসকরা তো দেশটিকে একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে অভিহিত করে থাকে। এর সাথে সরকারের ‘বিভাজনের নীতি’ কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?

বিদ্বেষ বিভাজন বলপ্রয়োগ কিংবা ধর্মান্ধতায় কখনো মানুষের কল্যাণ হয় না।

সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষপটে বুকার জয়ী লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট অরুন্ধতী রায় হাফিংটন পোস্ট-এ একটি নিবন্ধ লেখেন। লেখায় তিনি কাশ্মীর পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন এবং প্রকাশ করেছেন কাশ্মীরবাসীর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া হৃদয়ের আর্তি। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়নে পঙ্গুত্ব-অন্ধত্ব আর গুম কিংবা খুনের শিকার হওয়া কাশ্মীরী তরুণদের হৃদয়ে জন্ম নেওয়া স্বাধীনতার আর্তি কেমন করে জঙ্গীবাদে উন্মত্ত হয়, কেমন করে তা সমস্ত কাশ্মীরবাসীর আহত হৃদয়কে আন্দোলিত করে; সেই কথাগুলোই বলার চেষ্টা করেছেন অরুন্ধতী তার ছোট্ট নিবন্ধটিতে। তিনি দেখিয়েছেন, সংকট নিরসন প্রচেষ্টার নামে সামরিক বল প্রয়োগ জোরালো করার মধ্যদিয়ে কী করে নরেন্দ্র মোদির সরকার ভবিষ্যতের সমাজকে সেই ভগ্ন-হৃদয়ের উন্মত্ত তারুণ্যের হাতে তুলে দিচ্ছে প্রতিদিন।

অরুন্ধতী রায় তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, দশকের পর দশক জুড়ে ভারতের পূর্ববর্তী শাসকরা যে পথে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন; আক্রান্ত হওয়ার অজুহাতে পাকিস্তানের বালাকোটে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়ে সেই পথ থেকে নিজের অজান্তেই সরে গেছেন নরেন্দ্র মোদি। ১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীরের সংঘাতকে অভ্যন্তরীণ বিষয় দাবি করে ভারত আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার যে কোন প্রস্তাবের প্রতি তাদের উন্নাসিকতা দেখিয়ে আসছে। আর পাকিস্তানকে পাল্টা হামলায় তাড়িত করে এবং পারস্পরিক বোমা বর্ষণের নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মধ্যদিয়ে মোদি এবার কাশ্মীর বিতর্ককে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছেন। বিশ্বের সামনে তিনি কাশ্মীরকে হাজির করেছেন পরমাণু যুদ্ধের আশংকাপূর্ণ সব থেকে ঝুঁকিপ্রবণ এক অঞ্চল হিসেবে। ফলে পরমাণু যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে যাদের চিন্তা-ভাবনা আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তি, রাষ্ট্র কিংবা সংগঠনেরই কাশ্মীরে হস্তক্ষেপের অধিকারের প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।

অরুন্ধতী রায়ের এমন বিশ্লেষণের আলোকে প্রশ্ন জাগে, বালাকোটে বিমান হামলার মাধ্যমে মোদি কারও কল্যাণ করতে সমর্থ হয়েছেন কী, এতে ভারতের কোন কল্যাণ হয়েছে কী? ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আধাসামরিক বাহিনীর গাড়ি বহরে আত্মঘাতী হামলার জের ধরেইতো এবারের পাক-ভারত সংঘর্ষের সূচনা। জইশ-ই-মুহাম্মদের হয়ে আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে কাশ্মীরের ২০ বছর বয়স্ক তরুণ আদিল আহমেদ দার। অরুন্ধতীর মতে, যুদ্ধাবস্থার মধ্যে কাশ্মীরে জন্ম হয়েছে শত শত আদিল আহমেদের। তারাও হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর আত্মঘাতী। প্রশ্ন জাগে, মোদি এখন চলবেন কোন্্ পথে? ভারতের পূর্ববর্তী শাসকদের পথে, নাকি সামরিক বল প্রয়োগের নিষ্ঠুর পথে? এছাড়া উদার ও মানবিক তৃতীয় কোন পথ আছে কী?

আমরা দেশে শান্তি চাই, শান্তি চাই আমাদের এই উপমহাদেশেও। কারণ উপমহাদেশের অশান্তির অভিঘাত এসে লাগে আমাদের প্রিয় স্বদেশেও। সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীরকে নিয়ে উত্তেজনা চলে আসছে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে। এই উত্তেজনা কখনও রূপ নিয়েছে সংঘর্ষে, কখনওবা যুদ্ধে। সম্প্রতি আমরা তা লক্ষ্য করলাম বালাকোটে বিমান হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায়। ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তো সংগ্রাম করেছে এই উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র জনতা। জনতার সংগ্রামের কাছে মাথা নত করে বিদায় নিতে হয়েছে অত্যাচারী ও শোষক ইংরেজ শাসকদের। কিন্তু যাওয়ার আগে তারা কেমন কা- করে গেলেন? ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির মাধ্যমে তো হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বকে উস্কে দিয়ে ইংরেজরা ২০০ বছর শাসন করেছে আমাদের এই উপমহাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ইংরেজরা আসলে গিয়েছে কি? ওরা আসলে যায়নি, কাশ্মীর সংকট উদ্ভাবনের মাধ্যমে উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ জিইয়ে রেখে তারা এখনও ‘ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি’ জীবন্ত রেখেছে পাকিস্তান ও ভারতের শাসককূলের মধ্যে। তাই প্রশ্ন করতে হয়, ইংরেজ আসলে গিয়েছে কী? আর একটি প্রশ্ন, জাতিসংঘ কখনও কাশ্মীরে গণভোটের ব্যবস্থা করতে পারলো না কেন?

দেশ দুটির শাসকরা যদি স্বাধীনতার মর্মবাণীর আলোকে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন, তাহলে তারা হয়তো যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় এতটা উৎসাহী হতেন না। রাজনীতির খেলোয়াড়রা ক্ষমতায় যাওয়ার ও থাকার পলিটিক্সে বার বার ব্যবহার করেছেন কাশ্মীর ইস্যুকে। এমন পলিটিক্সে তিতবিরক্ত হয়ে উঠেছেন উপমহাদেশের বিবেকবান ও স্বাধীনচেতা মানুষেরা। তাদের মনে এখন যেই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো কাশ্মীর কি কাশ্মীরীদের হতে পারে না? কারণ কোনো সুস্থ মানুষই চাইবে না যে, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তান জড়িয়ে পড়ুক পারমাণবিক যুদ্ধে। এতে বিপদগ্রস্ত হবেন পুরো উপমহাদেশের মানুষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ