ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 March 2019, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৫, ৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ

ইবনে নূরুল হুদা : [গত কালের পর] : চুলচেরা বিশ্লেষণে গণতন্ত্র বলতে জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন বা স্বশাসনকেই বোঝায়। এর মাধ্যমে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজেদেরকে শাসন করে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও একবিংশ শতাব্দীর সূচনার মধ্য দিয়ে বিশ্বে গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা এতেও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের সংকট দেখা দিতে শুরু করছে এবং তা ক্রমবর্ধমানই বলতে হবে। গণতন্ত্রের বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রমনা মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগটি হলো এর মাধ্যমে জনরঞ্জনবাদী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তাধারাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য বেশ যুৎসই বলতে হবে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র বলতে কেবল নির্বাচনকে ও জনগণের ভোটাধিকারকেই মনে করা হয়। কারণ, একটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যসহ যে সকল বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায়, তা কেবল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। মূলত গণতন্ত্রের সাফল্যের প্রথম এবং প্রধান শর্তটির নাম নাগরিকদের সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা; মানুষকে গণতন্ত্রমনা, চিন্তাশীল ও আত্মসচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করা। গণতন্ত্রকে সফল ও সার্থক করতে আরো কয়েকটি শর্ত যেমন, রাজনৈতিক সচেতনতা, মানুষের অধিকার সচেতনতা, স্বাধীনতা, সাম্য, আইনের শাসন প্রয়োজন হলেও শিক্ষার সম্প্রসারণ ব্যতীত তা অর্জন সম্ভব নয়। 

এক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা বেশ প্রকট। এ বিষয়ে একজন মধ্যযুগীয় শাসকের অভিব্যক্তির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি জিজ্ঞাসিত হয়েছিলে যে, তিনি তার রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন ? তার সাদামাটা জবাব ছিল, তিনি তার দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রভূত সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাল্টা প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য কী কাজে আসবে ? তার ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ জবাব, জাতি শিক্ষিত হলেই তারা আত্মসচেতন হয়ে উঠবে। আর আত্মসচেতন মানুষই হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অনুসঙ্গ।

মূলত শিক্ষাই একজন নাগরিককে পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নিজ বিচার-বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করার মাধ্যমে ত্যাগ, সহানুভূতি, স্বার্থহীনভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের সেবা, নিয়মানুবর্তীতা, কর্তব্য পরায়ণতা ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মূলত শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকের মানসিক, নৈতিক ও মূল্যবোধের স্ফূরণ ঘটে। তাই গণতন্ত্রের জন্যও নাগরিকদের প্রস্তুত করতে শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অনস্বীকার্য। বর্তমান সময়ের গণতন্ত্রের সাফল্যে বাধাসৃষ্টিকারী নানা সমস্যাসংক্রান্ত আলোচনায় শিক্ষার প্রসঙ্গটি অব্যক্ত ও অমূল্যায়িত থেকে যাচ্ছে। আসলে আমরা এখনও সমস্যার কেন্দ্রেই পৌঁছতে পারিনি। মূলত গণতন্ত্রের সঙ্কটটা তো সেখানেই।

প্রাচীন গ্রিসে প্লেটো ও এরিস্টটল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন। কারণ, তৎকালীন গ্রিসে কেবল যোদ্ধা ও ভূমির মালিকদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হতো। এরা ছিল মোট জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। অন্যদের অধিকাংশই ছিল অশিক্ষিত। প্লেটো তার `Republic’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘প্রশাসন হলো এমন একটি কলা যা সাধারণ মানুষের দ্বারা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। শুধু বুদ্ধিমান ও যোগ্য মানুষের পক্ষেই প্রশাসনকে অনুধাবন করা সম্ভব।’ বস্তুত একজন মানুষকে অসাধারণ, বুদ্ধিমান ও যোগ্য করে তুলতে শিক্ষার আলো সম্প্রসারণের কোন বিকল্প নেই। আর কোন সমাজ-রাষ্ট্রের মানুষকে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা গেলেই কেবল সে সমাজ-রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সহ সকল ইতিবাচক প্রচেষ্টাই সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রের প্রধান দু’টি শর্ত হিসেবে শিক্ষা ও উত্তম নৈতিক চরিত্রের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মিল তার `Considerations on Representative Government’’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘জনগণের জন্য সার্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পূর্বে সার্বজনীন শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’

মূলত গণতন্ত্র বলতে কোনও জাতিরাষ্ট্রের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরীর ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তা প্রত্যক্ষ নয় বরং পরোক্ষ। মূলত একটি সফল ও সার্থক গণতান্ত্রিক সমাজ স্বপ্নবাস্তবায়ন করতে হলে সুশিক্ষিত, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং সমঝদার জনগোষ্ঠী আবশ্যকতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। 

আমরা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্যই এক সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার শর্তগুলো অপূরণীয় থাকায় স্বাধীনতার অন্যতম চেতনা ‘অবাধ গণতন্ত্র’ আজও আমাদের কাছে অধরায় রয়ে গেছে। সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন, ডিএনসিসি উপনির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়  অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত এসব নির্বাচনে গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার তেমন কোন প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেল না। এজন্য আমরা বিশেষ গোষ্ঠীকে দায়ি নিজেদের দায় শেষ করার চেষ্টা করছি।  কিন্তু এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি। আমাদের দুর্ভাগ্যটা সেখানেই।

আসলে আমরা গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার নিয়ে অনেক লম্বা-চওড়া কথা বললেও নিজেরা যেমন গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠিনি, ঠিক তেমনিভাবে আমরা গণতন্ত্রমনাও নই। আর অন্তরে কদর্যতা নিয়ে শুধু গণতন্ত্র নয় বরং সুন্দর ও সুকুমারবৃত্তির চর্চা হয় না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য যে ধরনের হওয়া দরকার আমরা তার ধারের কাছেও নেই। মূলত শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাদপদতা, আত্মসচেতনা বিমূখতা, মূল্যবোধের সঙ্কট সর্বোপরি অবক্ষয়ের জয়জয়কারটাই আমাদের দেশের গণতন্ত্রকে মারাত্মক সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। এজন্য বিশেষ গোষ্ঠীকে দায়ি করা যেমন সঙ্গত, ঠিক তেমনিভাবে জাতি হিসেবেও আমরা এ দায় এড়াতে পারি না। [সমাপ্ত]   inhuda71@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ