ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 March 2019, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৫, ৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ডাকসুর পুনর্নির্বাচন দাবিতে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

 

 

স্টাফ রিপোর্টার : ডাকসুর পুনঃ নির্বাচনের দাবিতে গতকাল বুধবার সারাদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উত্তাল। ছাত্রনেতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। গতকাল সকাল থেকে সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। এতে একাত্বতা প্রকাশ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এরপর বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে দেখা করেন ছাত্রলীগ বাদে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিকে পুন:তফসিলের জন্য তিন দিনের আল্টিমেটাম দেন এবং ৩১ মার্চের মধ্যে পুন: নির্বাচন দাবি করেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মো: আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচন ফের সম্ভব নয়। 

গতকাল বিকালে ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর, লিটন নন্দী, এআরএম আসিফুর রহমানসহ দশজনের একটি প্রতিনিধি দল ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় তারা ভিসির কাছে নিজেদের দাবি দাওয়া জানান এবং সব পদেই আবার নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানান। 

এদিকে বুধবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন নবনির্বাচিত ভিপি নরুল হক। তিনি বলেন, শত কারচুপির পরও আমাকে এবং আখতার হোসেন আমার প্যানেল থেকে হারাতে পারেনি। তবে অন্যদের হারিয়ে দিতে পেরেছে তারা নীলনকশা করে। এখন আমরা দেখছি যে ছাত্রলীগ বাদে অন্য সব সংগঠন পুনর্নির্বাচন চাইছে এবং সে লক্ষ্যে তারা আন্দোলন করছে।

তিনি বলেন, ভিসি স্যারকে তিন দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছি। আমি তাদের প্রতিনিধি হিসেবে, এত কারচুপির মধ্যেও যেখানে নির্বাচিত হয়েছি, আমি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করছি। আমিও চাই, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বাতিল করে ৩১ মার্চের মধ্যেই পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে।

গত সোমবার নির্বাচনের দিন রোকেয়া হলে নিজের ওপর হামলার বিষয়ে নুরুল হক বলেন, ‘ রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারিকে ফোন দেন এবং তারা আমার ওপর হামলা চালিয়েছিল। তাদের লেডি মাস্টার বাহিনী রয়েছে, শোভন ভাইয়ের নেতৃত্বে তারা আমার ওপর হামলা চালিয়েছিল।

নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে জানিয়ে নুরুল হক বলেন, ছেলেদের হলগুলোয় যেটা দেখেছি, বিশেষ করে, প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের জোর করে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন তাঁরা, যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো অলিখিতভাবে ইজারা নিয়েছেন, সেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন। তাদের বলেছে, তারা প্রত্যেকে যেন ভোট দিতে গিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নষ্ট করে। এ ধরনের অনিয়ম আমরা দেখেছি।

এদিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে যদি ডাকসু নির্বাচন বাতিল করে পুনঃ তফসিল দেওয়া না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দিতে বাধ্য হব বলে হুঁশিয়ারি দেন বাম ছাত্রজোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী। তিনি বলেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে যদি ডাকসু নির্বাচন বাতিল করে পুনঃ তফসিল দেওয়া না হয়, একই সঙ্গে এই নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁরা যদি পদত্যাগ না করেন এবং মামলা প্রত্যাহার না করা হয়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব রক্ষার্থে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দিতে বাধ্য হব।

লিটন নন্দী বলেন, আমরা উপাচার্যকে বলেছি। আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ করে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। বরং তাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল অ্যাক্টের মামলা দেওয়া হবে। আমরা বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে এত দিন যারা ক্রিমিনাল অ্যাক্ট করলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি কোনো উত্তর দেননি।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঢাবি ভিসি মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচন ফের সম্ভব নয়। ভিসি বলেন, ডাকসু নির্বাচন সফল করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে চারশ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর শ্রম-সময় ও মেধার যে খরচ হয়েছে তার প্রতি অসম্মান জানাতে পারি না। তাদের শ্রমকে অসম্মান করার এখতিয়ার আমার নেই। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা মেনে নেবে না।

 রোকেয়া হলের আন্দোলনে তিন হলের নির্বাচিত স্বতন্ত্রদের একাত্মতা :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং নির্বাচনের প্রার্থীসহ ৭ জন ও অজ্ঞাতনামা ৪০ জনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত বিক্ষোভ হয়েছে৷ ছাত্রীদের দাবি, রোকেয়া হল সংসদে পুনর্নির্বাচন, মামলা প্রত্যাহার ও হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদার পদত্যাগ। এবার রোকেয়া হলের আন্দোলনরত ছাত্রীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানালেন তিনটি ছাত্রী হল সংসদের নির্বাচনে জয়ী হওয়া ২১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই একাত্মতা প্রকাশ করা হয়। কবি সুফিয়া কামাল হল, শামসুন নাহার হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সংসদে ভিপি, জিএসসহ বিভিন্ন পদে নির্বাচিত ২১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রোকেয়া হলের ছাত্রীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান শামসুন নাহার হল সংসদে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আফসানা ছপা। রোকেয়া হলের ঘটনায় উদ্বেগ ও শঙ্কা জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি যে ৪০ জনের বিরুদ্ধে অজ্ঞাতনামা মামলা করা হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা হল সংসদে নির্বাচিত স্বতন্ত্র প্যানেল ও প্রার্থীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং তাঁদের দাবিগুলোর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি।

সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে শামসুন নাহার হল সংসদে নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) শেখ তাসনিম আফরোজ, কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদে নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) তানজিনা আক্তার সুমা ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মনিরা শারমিন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সংসদে নির্বাচিত সংস্কৃতি সম্পাদক তাসনিম হালিম মিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে রোকেয়া হলের বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা হল সংসদে স্বতন্ত্র প্যানেল রোকেয়া পরিষদের ভিপি প্রার্থী মৌসুমী বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত বিক্ষোভ করেছি। মঙ্গলবার রাতে আমরা হলের প্রায় ১০ জন আবাসিক শিক্ষককে অবরুদ্ধও করেছি। কিন্তু প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদা আমাদের ফোনে জানিয়েছেন, আমরা কী করছি না করছি, তাতে তাঁর কিছুই যায় আসে না। এবিষয়ে রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদা বলেন, ‘তাঁরা যেসব দাবি জানাচ্ছে, তা পূরণের এখতিয়ার আমার নেই। আমি কারও বিরুদ্ধে মামলা করিনি। অহেতুক মিথ্যা গুজব রটিয়ে মঙ্গলবার রাতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারী ছাত্রীদের ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা সহযোগিতা না করায় তাঁদের সঙ্গে বসতে পারেনি প্রক্টরিয়াল বডি।

প্রসঙ্গত, ডাকসু নির্বাচনের পরদিন মঙ্গলবার দিনটি ছিল নাটকীয়তায় ভরা। গত সোমবার গভীর রাতে যখন সহসভাপতি (ভিপি) পদে বিজয়ী হিসেবে নুরুল হকের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। নুরুলকে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলেন তাঁরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ক্যাম্পাসে এলে তাঁকে ধাওয়াও দেওয়া হয়। এরপর হঠাৎ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী এসে নুরুলকে বুকে জড়িয়ে ধরলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক তখন বলেন, ‘ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের যে ঘোষণা দিয়েছিলাম, তা থেকে আমরা সরে এসেছি। কিন্তু ভোট বর্জনকারী অন্যান্য সংগঠন তাঁর এ ঘোষণা মেনে নেয়নি। তোপের মুখে পড়েন নুরুল। পরে রাতে ঘোষণা দেন, অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন তিনি, চান পুনর্ন্বর্ািচন।

ডাকসুর নির্বাচিতদের ঢাবি ভিসির অভিনন্দন :

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি-জিএসসহ নির্বাচিত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। একইসঙ্গে তিনি দীর্ঘ প্রায় আড়াই যুগ পর অনুষ্ঠিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ধন্যবাদ জানান। গতকাল বুধবার ঢাবির জনসংযোগ বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মাহমুদ আলম (ভারপ্রাপ্ত) স্বাক্ষরিত ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন উপাচার্য। একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ