ঢাকা, শুক্রবার 15 March 2019, ১ চৈত্র ১৪২৫, ৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আমাদের ভাষার দরজাটা খোলা পশ্চিমবঙ্গেরটা বন্ধ : আল মাহমুদ

সরদার আবদুর রহমান : (গত সংখ্যার পর)

আশরাফ উদ্দীন আহমদ : হাসান আজিজুলের কথাটা বলছিলাম।

আল মাহমুদ : হাসানের লেখা হলো, তার দু’একটা গল্প আমার ভাল লাগে যেমন, শকুন, তবে পরের দিকেরগুলো ভাল লাগেনি। আত্মজা একটি করবী গাছ। এতে মৃত্যুকে প্রধান্যে নিয়ে আসা হয়েছে, কোন সাহিত্যিক মৃত্যুকে প্রাধান্যে নিয়ে আসে না। এজন্য এটাকে সময়ের বাস্তবতাও বলি না। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম বলেও স্বীকার করি না। এখানে এদের সঙ্গে আমার বিরোধ।

নাজিব ওয়াদুদ : তাঁর ভাষা....?

আল মাহমুদ : ভাষা তো একেবারে বাজে। এ ভাষা তো আমি চিনিই না। আমি বাঙালী মুসলমান। ঢাকায় বসবাস করি। হাসান কোথাকার গদ্য লেখে? এ গদ্যগুলো গদ্যই না। এটা আমাদের গ্রাহ্য গদ্য নয়।

সরদার আবদুর রহমান : তিনি তো রাঢ়ের লোক।

নাজিব ওয়াদুদ : রাঢ়ের ভাষা ব্যবহার করে....। 

আল মাহমুদ : এরা হাসানকে উঠানোর বহু চেষ্টা করেছে, ওঠে না কেন? হাসান আজিজুল হককে তুলবার জন্য এরা যে কাজ করেছে, তার তুলনা আছে? কারো লেখা পড়ে যদি আমি আনন্দ না পাই, তবে কি আমি বলবো যে, আমি আনন্দ পেয়েছি? এই যে একটা লোক (মতিউর রহমান টিপু) এতোগুলো বইয়ে আমার অটোগ্রাফ নিয়ে গেলো, পড়ে আনন্দ পেয়েছে বলেই তো সে আমার কাছে আসলো, হাসান আজিজুুল হকের ‘তত্ত্বগত আনন্দ’। যেহেতু তিনি আমাদের ‘দলের লোক’ সেই জন্য তাকে বলা হয় বড় লেখক। কিন্তু তার বই পড়ে দেখেছে কেউ?... 

নাজিব ওয়াদুদ : এখন তো সাহিত্যে একটা বিষয় ‘উত্তর-আধুনিকতা’ বলে...

আল মাহমুদ : আমার মনে হয় যে উত্তর-আধুনিকতা বলতে, আমাদের দেশে আগে কতোগুলো মূলবোধ ছিল, সেই মূল্যবোধগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। বিষয়টা তেমন একটা বুঝিনা, তাই ওটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি মনে করি যে, আমাদের দেশে আধুনিকতার কাজই শেষ হয়নি। ইশারফরা যে উত্তর-আধুনিকতার তত্ত্ব খাড়া করতে চাচ্ছে ইউরোপে সেটা উত্তর-আধুনিকতা নয়, সেটা ইউরোপের নিজস্ব লৌকিক তত্ত্ব। এটা দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যে থেকে যদি একজন প্রতিভাবান কবি বেরিয়ে আসে, তবে সেটা দাঁড়াতে পারে। না যদি আসে, তবে এই তত্ত্ব মাঠে মারা যাবে। 

সরদার আবদুর রহমান : নাকি অন্যদের থেকে পৃথক হবার একটা বাসনা থেকে এটা হচ্ছে?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, এটাও হতে পারে। এরা ধর্ম-টর্ম বিশ^াসও করতে চায়, এই আর কি।

সরদার আবদুর রহমান : একটা মাঝামাঝি পন্থা নিয়ে।

নাজিব ওয়াদুদ : এরা একটা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং লৌকিক ঐতিহ্য-এ দু’টোকে মিলাতে চাচ্ছে।

আল মাহমুুদ : আমি বলতে চাই যে, উত্তর-আধুনিকতা একটা নতুন কথা।

সরদার আবদুর রহমান : তাহলে তো ফররুখ আহমদের উত্তর-আধুনিকতার তত্ত্ব থেকে বাদ দেয়া যায় না।

আল মাহমুদ : ফররুখ তো নিজেই ইংরেজির ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের যে আবহ... আমারা যে বলি তিনি পুঁথি ভেঙে লিখেছেন, কিন্তু তার মধ্যের রোমান্টিকতাগুলো ইউরোপীয় রোমান্টিকতা। এই যে কবিতাগুলো, ইংরেজি সাহিত্যে এই যে Sea ‘সমুদ্র’, এটাই তার মধ্যে কাজ করেছে। এটাকে তিনি ইংরেজি পুঁথি সাহিত্যের মধ্যে থেকে নিয়েছেন। এতে জীবনের বিস্তার রয়ে গেছে। এদের আগেই মুসলমানেরা সে কাজটা করেছিলেন। এটা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন। আরেকটা কথা, সেটা অনেকেই বোঝে না, আমার কথাকে পাত্তা দেওয়া হয় না, ফররুখ ভাই আসলে ইসলামি সাহিত্য যতটা চর্চা করেছেন, তার চেয়ে বেশি ইংরেজি সাহিত্য চর্চা করেছেন। যেহেতু তিনি ইংরেজি বিষয়ের ছাত্র তার আবৃতি তো তোমরা শুননি। অসাধারণ আবৃত্তি করতেন। পড়তেন ইংরেজি সাহিত্য, তার সরাসরি শিক্ষক বিষ্ণু দে। ফররুখ আহমদ খুব বড় কবি। ... সিন্দাবাদের যে সমুদ্র কল্পনা, মধ্যযুগীয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের যে একটা জীবন ছিল সেটাকে খুব সার্থকভাবে লেখায় নিয়ে এসেছেন। খুব মৌলিকভাবে নিয়ে এসেছেন। এরকম কবিতা আমি এর আগে পড়িনি। এগুলো তার নিজস্ব বিষয়। ফররুখ ভাই যেমন কবিই থাকেন, তিনি যেটুকু লিখেছেন, সেটুক তাঁর নিজস্ব।... আমি ইসলাম বিশ^াস করি। এক মডার্ন, আধুনিক ইসলাম- যা পুঁজিবাদকে অপসারিত করে পৃথিবীকে দখল করতে আসছে, এবং খনিকটা রোমান্টিকতা থাকতেও পারে। কিন্তু আধুনিক যুগ ইসলাম ও পুঁজিবাদের লড়াই-এর যুগ। আমি ফররুখ ভাইদের ইসলামে বিশ^াসী না। ফররুখ ভাইদের ইসলাম হলো রোমান্টিক ইসলাম।...‘দেখা যায় হেরার রাজতোরণ...অতীত গৌরবের জন্য কান্নাকাটি। কিন্তু আমি মনে করি ইসলাম হলো Rising star, পুঁজিবাদের উপর যা বিজয়ী হতে চাচ্ছে।

নাজিব ওয়াদুদ : আসলে শামসুর রাহমানের সঙ্গে বিরেধের ব্যাপারটা... এটা ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি নিয়ে বিরোধ, নাকি আদর্শিক বিরোধ, নাকি কোথাও থেকে ফাটল ধরিয়ে দেয়া হয়েছে?

আল মাহমুদ: আমি মনে করি, শামসুর রাহমান প্রথম অবধি আমার লেখা সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। আমি যখন প্রথম লিখতে আসি, নাগরিক কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছিলাম, আমি, শামসুর রাহমান দু’জনেই লিখি। তখন তিনি আমাকে ‘গ্রাম্য’ বলে গালিগালাজ করা শুরু করলেন। গ্রামকে নিয়ে এসেছি সাহিত্যে। আবার এই গ্রাম জসিম উদ্দীনের নয়। এটা এদের খুব চোখে পড়েছে। এরা প্রথম থেকেই আমার প্রতি বিরক্ত ছিল। নানাভাবে এটা করা হয়েছে। পরে তা আদর্শগত বিরোধের রূপ নিয়েছে। প্রথমে ছিল জেলাসি, এখন তো আদর্শগত বিরোধ। সৈয়দ শামসুল হক অতোটা আমার বিরোধী নয়। কিন্তু শামসুর রাহমান একেবারে আমার ঘোর বিরোধী।

সরদার আবদুর রহমান : আপনি কি শামসুর রাহমানের ঘোর বিরোধী?

আল মাহমুদ : না, আমি অতোটা ঘোর বিরোধী নই। আমি শামসুর রাহমানকে কেয়ারই করি না। এক, আমি আর শামসুর রাহমান একই ধরনের কবিতা লিখি না। এটা আমার অতীতের ব্যাপার। আর দুই, আমরা একই আদর্শে বিশ্বাস করি না। এটা বর্তমানের ব্যাপার। 

তারপর, একই রকম দেশাচারে বিশ্বাস করি না। শামসুর রাহমান মনে করেন, উভয় বঙ্গ একটা। কিন্তু আমি এটা মনে করি না। আমি মনে করি পূর্ববঙ্গ চিরদিনই আলাদা। এই অঞ্চল যেটা এখন বাংলাদেশ- এটুকু চিরকাল আলাদাই ছিল। মোগলরা বশে আনতে পারেনি। প্রাচীনকালেও দেখা যায় যে, এই অঞ্চলটা আলাদাই ছিল। আমি এটারই কবি।

সরদার আবদুর রহমান : শেষ কথা যে, মানুষ তো আত্মপক্ষ সমর্থন করবেই। করতে হবে তাকে। তবু তো মানুষের ভুল হতে পারে। ভ্রান্তি হতে পারে, পরিবর্তন হতে পারে। এগুলো তো স্বীকার করতে হবে। যেমন, আপনার লেখক জীবনটা। এমন একটা পরিবর্তন আপনার আবারও আসতে পারে কি-না?

আল মাহমুদ : আমি মনে করি ঈমানের ব্যাপারটা একটা চিরস্থায়ী ব্যাপার। আমার তো ঈমানই ছিল না। পরিবর্তন তো হয়ই। এরপরেও আমার অনেক পরিবর্তন হবে। কিন্তু একটা জিনিসের পরিবর্তন হবেনা বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, আমি যে বিশ^াস নিয়ে জীবন-যাপন করছি এটার কোন পরিবর্তন হবে না। এ বয়সে এসে আর হবে না। এটা আমি অনেক ত্যাগ স্বীকারের মধ্যে দিয়েই অর্জন করেছি, এ পর্যন্ত পৌঁছেছি। নবীরা হলেন মাসুম। তাদের বিষয়ে আল্লাহ প্রতি মুহূর্তে সংশোধন করে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের তো নিজেদের ভুল-ত্রুটি নিজেদেরই দেখিয়ে দিতে হবে। তবে ভুল-ত্রুটির সমালোচনার আগে দশবার চিন্তা করে দেখতে হবে।

-আপনাকে ধন্যবাদ। 

-তোমাদেরকেও ধন্যবাদ। 

(সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ