ঢাকা, শুক্রবার 15 March 2019, ১ চৈত্র ১৪২৫, ৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জনগণ ভোটের অধিকার ফিরে পেতে চায়

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : বাংলাদেশ একটি স্বাধীন জনপদের নাম। এক স্বাধীন জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি সবুজ ব-দ্বীপ এ জনপদ। রক্ত সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করেছে স্বাধীনতা আর স্বকীয়তা। যে জনপদের লড়াকু জনগণের স্বাধীনতা আর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের রক্ত নদীতে বহু স্বৈরশাসক, জবরদখলকারী, অন্যায় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী আর একচোখা দৈত্যরা পরাজয়ের তরী ডরি ডুবে হারিয়ে গেছে। যেখানে স্বৈরশাসকের দন্ত-নখর বার বার জনগণকে আক্রমণ করলেও জনগণ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একনায়কতান্ত্রিকতা এবং স্বৈরতান্ত্রিকতার প্রবল পরাক্রান্ত শক্তিকে জনগণ বার বার পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করিয়েছেÑ সেই গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের গন্তব্য আজ কোনদিকে রাজনৈতিক বেত্তারা যেন তা নির্ণয় করতে পারছেন না। জীবন এখানে এখন অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢাকা। গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলা এখন বড় অন্যায়। ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে নির্বাচনী নাটকীয়তা এবং প্রহসনের মাধ্যমে। বিনা ভোটের এমপি মন্ত্রীরা মুখে গণতন্ত্রের ফাঁকা বুলি আওড়ায়। আজব এক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাজনীতির তরী আটকে আছে। পল্টন ময়দান, রেসকোর্স মাঠ, শাপলা চত্বর, মানিক মিয়া এভিনিউতে রাজনৈতিক জনসভায় জনতার ঢল এখন তথাকথিত অনুমতির শেকলে বন্দি। রাজনৈতিক নেতারা আমলাদের অনুমতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণে হতাশ মনে ফিরে আসে বার বার। তারা কি কথা বলবে আর কি করতে পারবে তা নির্ধারণ করে জনগণের কর্মচারীরা। জনগণের মনের কথা বলার জন্য পুলিশের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হৃদয়ের জানালা তালাবদ্ধ। রাজনীতি করার অবাধ স্বাধীনতার জানালাগুলো খিল আটকে দেয়া। রাজনীতির মুক্ত বিহঙ্গে ডানা ঝাপটানো পাখিরা আজ ডানা ভাঙা পাখির মতো শুধু ওড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। কাকের ডানা ঝাপটানোকে ময়ূর নাচ আখ্যায়িত করে বাক স্বাধীনতার দুয়ারে বাধ্য-বাধকতার দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে। ভোট আর ভাতের শ্লোগানে যারা আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করত তারাই বিরাজনীতিকরণের রাস্তাকে অবারিত করে দিয়েছে। রাজনীতির চিরচেনা গতিপথ পাল্টে গেছে। লগি-বৈঠার তা-বের পর বাংলাদেশ যে খাদের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। এখন সে আর খাদের কিনারে নেই। তাকে গর্তের বহু গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ এখন আকাশ-কুসুম কল্পনা হয়ে গেছে। মঈন-ফকরের দুঃশাসনে যারা খুশি হয়ে বলেছিল এ সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল। তারাই আজ রাষ্ট্রের দ--মু-ের কর্তা। গণতন্ত্রকে বুর্জোয়াদের ক্ষমতার সিঁড়ি বলে যারা গালি দিত, যারা বলতো সংসদ হচ্ছে শুকোরের খোয়াড়Ñ তারাই বিনাভোটে সংসদ সদস্য পদ বাগিয়ে নিয়ে সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে বুর্জোয়তন্ত্রের জাহাজের যাত্রী হয়ে তথাকথিত গণতন্ত্রের বুলি কপচায়। ভাবনাটা এমন সমাজতান্ত্রিক একনায়কতান্ত্রিকতার  চেয়ে গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র খারাপ নয়। জনগণের ভাবনার সাথে ক্ষমতাসীনদের ভাবনার কোনো মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ অবারিত রাখা হয়নি। কম গণতন্ত্র, বেশি উন্নয়নের শ্লোগান অতীতের স্বৈরশাসকরা উচ্চারণ করেছিল। আইউব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো কিংবা পতিত স্বৈরাচার এরশাদ উন্নয়নের বুলি কপচিয়েছেন ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদকাল পর্যন্ত। মুগাবে, সাদ্দাম, কিংবা গাদ্দাফী কেউই কম উন্নয়ন করেননি। কিন্তু জনগণ জেলখানার শেকলে বন্দি থাকাকে কোনো যুগ এবং কালেই পছন্দ করেনি। জেলখানায় পোলাও কোর্মার চেয়ে মুক্ত বাতাসে ডাল-ভাত অনেক বেশি সুস্বাদু। শেকলবন্দি ব্যক্তির কাছে পৃথিবীর সেরা খাবারটিও অনেক বেশি তিক্ত এবং বিস্বাদ লাগে। জীবনের মানে কী? তার ব্যাখ্যা এখন হরেক রকম। গণতন্ত্র সুশাসন আর ভোটাধিকারের ব্যাখ্যাও ক্ষমতাসীন মহল তাদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ না করার কারণেই মুক্তি সংগ্রামের শুরু হয়েছিল। যেই ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনাÑ তা আজ জনগণ কতটুকু ভোগ করছে? ভোটাধিকারের জন্য দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে যে জনপদের মানুষেরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে, একটি মানচিত্র পেয়েছে, একটি পতাকা পেয়েছে সে দেশের জনগণের স্বাধীন ভোটাধিকার অদৃশ্য সুতোয় বন্দি। আজব এক নির্বাচনী সিস্টেম এ জাতি প্রত্যক্ষ করছে বার বার। রকিব কমিশন ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের যে রাস্তা ইন্মুক্ত করেছে। তার শ্রেণিচরিত্র কত প্রকার হতে পারে তাকে আরো বেশি খোলাসা করেছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। সাম্প্রতিক নির্বাচনের শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণের জন্য কোনো বোদ্ধা, বিশ্লেষক ও অনুসন্ধানি পর্যবেক্ষক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাদের প্রস্তুতিপর্ব এবং সমাপনী পর্ব সবই ছিল চরমভাবে শঠতাপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো আশা করেছিল নির্বাচন কমিশন এবং সরকার যে আশ্বাস বাণী এবং ওয়াদা দিয়েছে তার অন্তত অর্ধেক হলেও রক্ষা করবে। কিন্তু ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ জাতীয় নির্বাচনে ছিল বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ক্ষমতাসীন মহল যেনতেনভাবে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে ক্ষমতার মসনদকে নিজেদের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য লোক দেখানো প্রচারণা চালিয়েছে। বলা হয়, পুলিশ বাহিনী একদলীয় নির্বাচনের প্লট তৈরির কাজে মহাব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। পুলিশ রাজনীতির রসায়নে আষাঢ়ে গল্পের নিত্যনতুন প্লট তৈরি করেছে। গল্পের বুননে কোথাও কোথাও ফাঁক থেকে গেলেও আওয়ামী লীগের নেতাদের চাপার জোর, বশংবদ মিডিয়ার সীমাহীন দালালি আর পুলিশের গ্রেফতার অভিযানে গল্পগুলো রসালো না হলেও বেদনার ব্যপ্তি ছড়িয়েছে ভালোই। জন্মগতভাবেই অকর্মক্ষম ও জীবন-জীবিকার তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়া তারা মিয়া বিকলাঙ্গ হাতেই নাকি বোমা মেরেছেন, রড, লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে আক্রমণ করেছেন। এসব আষাঢ়ে গল্প আমাদের রাজনীতির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে কি না, জানি না। তবে ভিক্ষুক তারা মিয়াকে আইন, বিচার ও অমানবিকতার ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। তাকে তো হাইকোর্টে এসেই জামিন নিতে হয়েছে। এসব গল্পের রচয়িতারা তাই হুমায়ূন আহমেদ হতে না পারলেও সরকারের প্রিয়ভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় দিনরাত পরিশ্রম করছে। মৃত মানুষগুলো যখন বোমা হামলার মামলার আসামি হয়েছে তখন রবীন্দ্রনাথের কাদম্বীনীকে আবার স্মরণ করতে হচ্ছে। কাদম্বীনীকে মরিয়া প্রমাণ করিতে হইয়াছে সে মরে নাই। বিরোধী দলের মৃত নেতাদের মামলার আসামি হয়ে প্রমাণ করতে হয়েছে তারা এখন আর জীবিত নেই। জাতীয় নির্বাচনে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং এবং গণসংযোগ অভিযান পরিচালনা করেছে। প্রতিদিন মিডিয়ায় তাদের প্রচারণার সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। নির্বাচনী এ প্রচারণা অবশ্য একতরফাভাবেই হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেই সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং সরকারের সকল অরগান ব্যবহার করে আগেভাগেই একটি বিজয়ের আবহ তৈরি করে রাখে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন ও জনসমর্থনহীন যে সরকার গঠিত হয় তার পুরোটাই বৈধতার প্রশ্নে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ। ৫ জানুয়ারির ইলেকশন নাটকে ব্যালটের পরিবর্তে বুলেটের মাধ্যমে ক্ষমতার মেয়াদকে আর একদফা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। বিজয়ী ঘোষিত ১৫৩ জন সংসদ সদস্যকে কোনো প্রকার নির্বাচনী কার্যক্রমেই অংশগ্রহণ করতে হয়নি। বাকিরা ভোটকেন্দ্রে ভোটার আনতে না পারলেও কুকুর, বেড়াল দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। ২০১৮ সালে সেই একই নাটকের অবতারণা করা হয়েছে। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শোনেন যে তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। কোথাও বেলা দুটোর আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট শুরু আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি ছিলÑ যার সচিত্র প্রতিবেদন বিবিসি প্রকাশ করেছে। ডেইলি স্টারের একজন প্রতিবেদক একজন বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ রাজধানীর একটি ভোটকেন্দ্রে গেলে সেখানে তারা ভোটকেন্দ্রের গেট বন্ধ পেয়েছে। গেট বন্ধ কেন, এর জবাব দিতে সেখানে দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তা রাজি হননি। এমন আজব নির্বাচনী দৃশ্য গোটা দেশেই বিরাজমান ছিল। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে আসলে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না। নাটকের দৃশ্যপটে এবং মঞ্চের ভিন্নতা থাকলেও মূল কাহিনী একই রয়ে গেছে। আজব এ নির্বাচনী সিস্টেমের পর প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপির এ ঘোষণার পর বাম রাজনৈতিক দলসমূহ, বিএনপির রাজনৈতিক জোট বিশদলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও দলীয় সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান এবং এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণার পর পরই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদসহ উত্তর ও দক্ষিণের অনেকগুলো ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। উত্তর সিটির নির্বাচনে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীর বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ সাহেবের দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমদ। তিনি নির্বাচনের দিন অনেকগুলো ভোট কেন্দ্রে গিয়েছেন। কিন্তু কোনো ভোটকেন্দ্রেই ভোটার খুঁজে পাননি। সাংবাদিকরা সারাদিন অলস সময় কাটিয়েছেন। রাজধানীর উত্তর অংশের বিভিন্ন কেন্দ্রে। তবে তাঁদের এসাইনমেন্ট পূর্ণ করার জন্য সারাক্ষণ অপেক্ষায় ছিলেন কখন কাক্সিক্ষত ভোটাররা আসেন। ভোটার আসবে তারা লাইনে দাঁড়াবে। তাদের ছবি তুলবেন। স্যাটেলাইট চ্যানেলের সাংবাদিকগণ তাদের সাক্ষাৎকার নিবেন এ প্রত্যাশায় দিন গুজরান করেছেন। কিন্তু তাদের অনেককেই আশাহত হতে হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে ভোটার নেই কেন? এ প্রশ্নের জবাবে সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমেদ  স্পষ্টতই বলেছেন, অতীতের নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এবং জনগণ তাদের কাক্সিক্ষত  প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারায় জনগণের মাঝে নির্বাচন নিয়ে আর কোনো আশা-আকাক্সক্ষা এবং আগ্রহ নেই। সিটি নির্বাচনের দিন সাংবাদিকগণ  সিইসিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভোটার উপস্থিতি নেই কেন? তিনি উত্তরে বললেন, ভোটার উপস্থিত করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। নির্বাচনে কমিশন অবশ্যই ভোটারদের বাড়ি থেকে ধরে এনে ভোটকেন্দ্রে দাঁড় করিয়ে দেবে না। তবে ভোটার অনুপস্থিতির দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ তাদের নেই। তাদের অধীনে যে কয়টি স্থানীয় নির্বাচন এবং বিশেষ করে একাদশ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে তা দেখে ভোটাররা আর  ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কোনো আগ্রহ রাখছেন না। ভোটারদের সকল আগ্রহ, আশা-আকাক্সক্ষা নির্বাচন কমিশন এবং সরকার ৩০ ডিসেম্বর ভূলুণ্ঠিত করেছে। উত্তর সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি না হওয়ার কারণ কাউকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো দরকার পড়ে না। ভোটার উপস্থিত না হওয়া মানে তারা বর্তমান নির্বাচন কমিন এবং সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন চায় না। উপস্থিত না হওয়াও এক ধরনের প্রতিবাদ। সংবাদপত্রে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচনে কোনো কোনো বুথে ৪০০ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। যদিও নির্বাচন কমিশন ৪০% ভোট কাস্টিংয়ের কথা বলেছে। ভোট কাস্টিং-এর হিসাব এখন জনগণের মুখস্থ হয়ে গেছে। কারণ নির্বাচন কমিশন যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে। এটা চ্যালেঞ্জ করার মতো যেমন কেউ নেই, তেমনি চ্যালেঞ্জের পর তার ফলাফর পাবার কোনো সুযোগও আর অবারিত রাখা হয়নি। উন্নয়নের ডুগডুগি বাজিয়ে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা যায় কিন্তু জনগণের সমর্থন পওয়া যায় না, যার সর্বশেষ প্রমাণ সিটি করপোরেশন ইলেকশন। কারণ জনগণের মাঝে নির্বাচনের ভোট প্রদানের ন্যূনতম কোনো আগ্রহই এ নির্বাচনে পরিলক্ষিত হয়নি।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের দগদগে ক্ষত এবং ঢাকা সিটি নির্বাচনে জনগণের অভিনব প্রতিবাদের পর নির্বাচন কমিশন পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করেছে।  এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যয়ের বাজেট ধরা হয়েছে ৯১০ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এর ব্যয় ছিল ৪০০ কোটি। ২০১৪ সালের চেয়ে  এবারে ৫১০ কোটি টাকা ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগই। এটাই স্বাভাবিকভাবে ভোটার এবং প্রার্থীরা ধরে নিয়েছেন।নির্বাচন তার ঐতিহ্য এবং কৌলিণ্য হারিয়ে ফেলার কারণে এসব নির্বাচনের প্রতি জনগণের এখন আর কোনো আগ্রহ নেই। তবে উপজেলায় যেহেতু চেয়ারম্যান পদ ব্যতীত আরো দু’টি ভাইস চেয়ারম্যান পদ আছে যাতে ক্ষমতাসীন দল দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেনি। যার কারণে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরা কিছুটা ভোটার উপস্থিত করার চেষ্টা করছেন। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচন হয়ে গেলো ১০ মার্চ। প্রথম ধাপেই যারা চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে বেশ কয়েকজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকী যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারাও সবাই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। প্রথম ধাপের পর আরো ৫ ধাপে নির্বাচন হবে। মোট ছয় ধাপে এ নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলাফর এবং বাস্তবতা হচ্ছে ক্ষমতাসীন মহলের মনোনীত প্রার্থীরাই হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অথবা নির্বাচনী নাটকের মাধ্যমে বিজয়ী হবেন। তবে কেন রাষ্ট্রের এতগুলো টাকা খরচ ? সরকার কথায় কথায় উন্নয়নের স্লোগান শোনানÑ তারা এরই ৯১০ কোটি টাকা উন্নয়ন কাজে ব্যয় করতে পারতেন। কজনগণের পকেটের ৯১০ কোটি টাকা এই নির্বাচনী নাটকে ব্যয় না করে সরকারের তরফে ঘোষণা দিলেই হতো যে তারা কাকে কোন উপজেলায় চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে দেখতে চান। এতে অন্তত রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকাগুলো সেভ হতো।

উন্নয়নের ডুগডুগি শুনতে শুনতে আম জনতার কান ঝালাপালা। উন্নয়নের কিছু বাস্তব চিত্রও আছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষার একটি জরিপে দেখা গেছে অতি দ্রুত ধনী হওয়া এবং মাল্টি বিলিওনার হওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ এক নাম্বারে। মাল্টি বিলিওনার কিছু তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হাজার কোটি টাকার মালিক। একটি সরকারি অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সম্পদের পাহাড়ের খোঁজে নেমে দুদক কর্মকর্তারা অবাক। এমন নব্য ধনীদের সংখ্যা কত, তার হিসেব হয়তো কারো কাছেই নেই। নব্য মাল্টি বিলিয়নাররা নিজেদের অর্থ সংরক্ষণের জন্য বিদেশী ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ জায়গা ভাবে বিধায় অর্থ পাচারে বাংলাদেশ প্রথম কাতারে চলে এসেছে। প্রতিবাদের সব দরোজা যখন বন্ধ হয়ে যায় অন্যায় এবং অগণতান্ত্রিকতার সব রাস্তা তখন উন্মুক্ত থাকে। এখন ঘরের মধ্যে কথা বলতেও মানুষ ভয় পায়- কারণ দেয়ালেরও নাকি কান আছে। অন্যায় এবং অগণতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে কথা বললে বলা হয় উন্নয়ন এবং অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

জনগণ স্বাধীনতার সুখ পাখিটাকে খুঁজছে। আনন্দ, কান্না, হাসি বেদনার মাঝে সে তাঁর চিরচেনা সুখের নীড় ফিরে পেতে চায়। লাল গোলাপের মাঝে সুয়োপোকা নয়, প্রজাপতির লাল-নীল ডানার ঝাপটানি দেখতে চায়। কাকের নাচন নয়, ময়ূরের পেখম দোলানি দেখে নয়ন জুড়াতে চায়। উন্নয়নের ডুগডুগি নয় গণতন্ত্রের ঝংকার শুনতে চায়। মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চায়। স্বাধীনতার মূল চেতনা তো ছিলো গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদা। জনগণ তাদের এ অধিকারগুলো ফিরে পেতে চায়। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাগুলো বাস্তব রূপ ধারণ করুক- স্বাধীনতার মাসে এ কামনাই করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ