ঢাকা, শুক্রবার 15 March 2019, ১ চৈত্র ১৪২৫, ৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গ্যাস খাতে ১৫ হাজার কোটি টাকার কর ছাড়॥ তবুও মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব

 

স্টাফ রিপোর্টার: গ্যাসের মূল্য সহনীয় রাখতে চলতি অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কর ছাড় দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ এ ছাড় দিয়েছে সংস্থাটি। কর ছাড় পাওয়ার পরও গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলার অধীন বিতরণ কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে চলছে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি। বিইআরসিতে গত ১১ মার্চ শুরু হওয়ার গণশুনানি গতকাল বৃহস্পতিবারও চলমান ছিলো। 

গতকাল শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেছেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি যত বেশি দাম বাড়ানোর আবেদন করুক না কেন, যৌক্তিক পর্যায়ে তা বিবেচনা করা হবে। কাজেই এ নিয়ে জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জানা গেছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পর গ্যাসের মূল্য যেন না বাড়ে সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই গ্যাসের ওপর প্রযোজ্য সব ধরনের শুল্ক-কর কমানোর উদ্যোগ নেয় এনবিআর। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এ খাতে করছাড় দিয়ে তিনটি এসআরও জারি করে সংস্থাটি। প্রজ্ঞাপনে শুধু গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রেখে ৯৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ আমদানি ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আমদানি শুল্কের শতভাগ অব্যাহতি দেয়া হয়। অগ্রিম ব্যবসা কর ৫ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। গ্যাস খাতে এ অব্যাহতির ফলে চলতি অর্থবছর এনবিআর ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বলে ওই সময় অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানায় সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের আহরণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমেছে।

শিল্প-বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্বিঘœ করতেই গ্যাসের ক্ষেত্রে এ কর ছাড় দেয়া হয়েছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া। তিনি বলেন, বিপুল অংকের রাজস্ব কমলেও মানুষের ভোগান্তি লাঘবে গ্যাসের ক্ষেত্রে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাটে ছাড় দেয়া হয়েছে। মূলত এলএনজি আমদানির পর যেন গ্যাসের দাম না বাড়ে, সে লক্ষ্য সামনে রেখে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল।

যদিও গ্যাসের ওপর রাজস্বে এ ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। উল্টো পেট্রোবাংলার নির্দেশে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এ প্রস্তাবের ওপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে গণশুনানি চলছে। চলমান এ গণশুনানিতে ছয়টি বিতরণ কোম্পানি নতুন প্রস্তাবে সব শ্রেণির গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে সার ও বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহূত গ্যাসের দাম আগের চেয়ে ২০৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৭৪ পয়সা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সারের ক্ষেত্রে ২১১ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৪৪ পয়সা ও ক্যাপটিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে ৯৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সার পরিবর্তে ১৮ টাকা ৬৮ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এ ছাড়া শিল্প খাতে গ্যাসের ঘনমিটারপ্রতি বর্তমান দাম ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১৩২ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৪ পয়সা ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ৪১ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ২৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া আবাসন বা গৃহস্থালির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে এক চুলায় ১ হাজার ৩৫০ টাকা ও দুই চুলার জন্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের স্বপক্ষে পেট্রোবাংলা বলছে, এলএনজি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় এনবিআরের করছাড় অপ্রতুল। ফলে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করার বিকল্প নেই।

 পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, এক হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস আমদানিতে এক অর্থবছরে আমাদের ঘাটতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ কারণেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। 

গ্যাসের এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা গভীর সংকটে পড়বেন। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যখন-তখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা যায় না। গ্যাসের দাম এত না বাড়িয়ে সরকারকে ভর্তুকি দেয়ার দাবি করছি। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকে থাকলে সরকারের আয় আসবে।

এলএনজি ব্যয়বহুল হলেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিপক্ষে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও। কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, এলএনজি আমদানির পর সরকারকে প্রতি ঘনফুট গ্যাসে ১ টাকা করে ভর্তুকি দিতে বলা হয়েছিল। এতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার তা দেয়নি। ফলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রয়েছে। গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে সরকারের ভর্তুকি পাওয়ার আগে ওই তহবিলের অর্থ দিয়ে এলএনজির ব্যয় নির্বাহ করা যেতে পারে।

জানা গেছে, প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ শুরু করেছে পেট্রোবাংলা। প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজি ১০ ডলারে আমদানি করে ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরের পর তা সরবরাহ করা হচ্ছে। সব ধরনের প্রক্রিয়া শেষে এলএনজির প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ৩২ টাকা। যদিও গ্রাহক পর্যায়ে বর্তমানে সব শ্রেণীর গ্যাসের গড় দাম ৭ টাকা ৩৫ পয়সা।

বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, অতীতে কোম্পানি যাই বলুক, যৌক্তিক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। ২০১৭ সালে ৯৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল, বিইআরসি ১১ শতাংশ বাড়িয়েছিল। ২০১৮ সালে ৭৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিপরীতে কোনো দাম বাড়ানো হয়নি।

মনোয়ার ইসলাম বলেন, আমি বিতরণ কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ করব যেন সঠিক পরিমাণে প্রস্তাব করে। প্রবাদ আছে, এলএমজি চাইলে কমপক্ষে পিস্তল তো পাওয়া যাবে! এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

তিনি বলেন, আমরা সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। নোটও করা হয়েছে। কমিশন পুরোপুরি স্বাধীন ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে আমরা কখনও কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি। দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবে ভোক্তাদের উপর চাপ বেড়ে যায়। সে কারণে তারা অসন্তুষ্ট হন।

স্থানীয় পর্যায়ে গিয়ে গণশুনানি করার প্রস্তাব বিইআরসি বিবেচনা করবে বলেও জানান চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম-সচিব জহির রায়হান বলেন, বিইআরসিকে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হবে। একদিকে যেমন ভোক্তা না থাকলে কোম্পানির কোনো দাম নেই, তেমনি কোম্পানি না থাকলে ভোক্তা সেবা পাবেন না। দুই পক্ষকেই বাঁচাতে হবে।

 গত ১১ মার্চ শুরু হয় গণশুনানি। প্রথম দিনে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির হুইলিং চার্জ বৃদ্ধির আবেদনের উপর শুনানি নেয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ছয়টি বিতরণ কোম্পানির দাম বৃদ্ধির উপর গণশুনানি করা হয়। প্রত্যেকে ১০২ শতাংশ হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। প্রধান কারণ দেখানো হয়েছে- চড়া দরে এলএনজি আমদানির কথা। তবে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে তীব্র বিরোধিতা করা হয়। গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ভোক্তারা বিশেষ ক্ষমতা আইন বন্ধ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা ও দেশীয় গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করার প্রস্তাব দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ