ঢাকা, শুক্রবার 15 March 2019, ১ চৈত্র ১৪২৫, ৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার মাস 

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীনতার মাস মার্চের পঞ্চদশ দিবস আজ শুক্রবার। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশী পতাকা উত্তোলন অব্যাহত থাকে। প্রতিবছর মার্চ এলেই তাই বীর মুক্তিযোদ্ধা-প্রবীণরা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হন এবং নতুন প্রজন্ম এক দুর্নিবার তাগিদ থেকে ইতিহাস চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়। যদিও সে ইতিহাস নানাগোষ্ঠী, নানাভাবে ‘রচনা’ করার প্রয়াস পায়, স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। নির্লজ্জ রাজনীতিকরণের হাত থেকেও রেহাই পায়নি স্বতঃপ্রণোদনায় সংঘটিত ইতিহাসের ঘটনার প্রবাহ।

একাত্তরের এদিন বেলা ২টা ২০ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করেন। ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান তাকে অভ্যর্থনা জানান। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ইয়াহিয়া খানকে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে কোনো সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো এদিন করাচীতে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রের ক্ষমতা দুই অংশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে এবং প্রদেশগুলোর ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপির) চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ভুট্টোর এ দাবিকে অভিনব, অবাস্তব ও  নৈরাজ্যজনক অভিহিত করে বলেন, এক পার্লামেন্টে দুইটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকতে পারে না। বর্তমান জাতীয় পরিষদের আওয়ামী লীগই একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং কেন্দ্রে ক্ষমতা একমাত্র আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান এ দাবিকে ক্ষমতার জন্য ‘পাগল এক ব্যক্তির প্রলাপ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এরপর আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। এদিন দেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নেতা পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়ে সামরিক সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের আহবানে এদিন দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা ও অধুনালুপ্ত) সম্পাদক ও রাজনীতিক আবুল কামাল শামসুদ্দীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী পাকিস্তানী খেতাব বর্জন করেন। পরিষদ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গণে এক বিশাল জনসভায় ১১৫ নম্বর সামরিক আইনের নির্দেশকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে জোরালো বক্তব্য রাখেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে চেকপোস্ট প্রত্যাহার করে নেয়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দীন আহমেদ এক বিবৃতিতে ১৪ মার্চে দেয়া বিধি-নিষেধের ব্যাখ্যা দেন। ঢাকাস্থ পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের ক্লিয়ারিং হাউজ বসে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত চিকিৎসকদের এক সভায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান মেডিকেল সমিতি (পিএমএ), পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল সমিতি (ইপিএমএ) ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার সমিতি (টিডিএ) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

এদিকে করাচীতে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি নবনির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের এক যৌথ সভায় ভুট্টোর ঐ প্রস্তাবকে ‘ক্ষতিকর’ মন্তব্য করা হয়। এই সভায় গৃহীত প্রস্তাবে জাতীয় পরিষদে যোগদান না করার হুমকির দ্বারা বর্তমান সংকট সৃষ্টির জন্য ভুট্টোর প্রতি দোষারোপ করা হয়। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, ভুট্টোর কথিত পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কোনো অস্তিত্ব নেই। পিপিপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা শুধু পাঞ্জাবেই সীমাবদ্ধ বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রধান খান আবদুল ওয়ালী খান ভুট্টোর প্রস্তাবের সমালোচনা করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের কাউন্সিল মুসলিম লীগ এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল এসেম্বলী) পীর সাইফুদ্দীন এদিন ঢাকায় বলেন, ভুট্টোর প্রাদেশিক সরকার গঠনের মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র’ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভুট্টোর এই অভিনব প্রস্তাবকে কার্যত দেশের উভয় অংশের নেতারা ‘মেকিয়াভেলীর রাজনীতির’ উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

২০১৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারপপ্রপ্ত মুক্তিসেনানী লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী তার ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১’ শীর্ষক গ্রন্থে একাত্তরের ১৫ মার্চের ঘটনাবলী সংক্ষেপে তুলে ধরে বলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রশাসন ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য ৩৫টি বিধি জারি করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তৃতাকালে নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য সকল শ্রেণীর বাঙালীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন। ছাত্রনেতা আ স ম আব্দুর রব বলেন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। আমাদের দেশের জনগণ একমাত্র শেখ মুজিবের নির্দেশই মেনে চলবে। আবদুল কুদ্দুস মাখন বলেন, বাংলাদেশে যদি কোনো আইন জারি করতে হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই তা করবেন। শাজাহান সিরাজ বলেন, প্রতিপক্ষ এখনো নিশ্চুপ রয়েছে, কিন্তু চরম আঘাত হানার জন্য তারা হয়তো অপেক্ষা করছে। তাদেরকে প্রতিহত করতে না পারলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা যাবে না।

সভাপতির ভাষণে নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ২৩ বছরে যারা সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করেছে তাদের সাথে আমাদের আপস নেই। ছয় দফা দিয়ে সংহতির ফুটো কলসীতে আমরা সিমেন্ট লাগাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের সে চেষ্টাও ব্যর্থ করে দিয়েছে। তাই বাংলার মানুষ সে কলসীকে ভেঙ্গে দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো শক্তিই আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে পারবে না।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ