ঢাকা, শনিবার 16 March 2019, ২ চৈত্র ১৪২৫, ৮ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে ভয়াবহ জঙ্গী হামলা ॥ ৩ বাংলাদেশীসহ নিহত ৪৯ 

সংগ্রাম ডেস্ক : নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় দু’টি মসজিদে ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী হামলায় অনেক মুসল্লি নিহত হয়েছেন। পুলিশ একথা জানিয়েছে। হামলায় নিহতের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশী। গুরুতর আহত ৪৮ জন।

এদিকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা অর্ডেন এ হামলাকে জঘন্য সন্ত্রাসী হামলা উল্লেখ করে এ দিনকে ‘নিউজিল্যান্ডের অন্ধকারতম দিন ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা সেখানে রক্তাক্ত অনেক লাশ দেখার কথা বলেছেন। এদের মধ্যে শিশু রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে এ হামলার ঘটনার ‘একেবারে পীড়াদায়ক ভিডিও ফুটেজ’ ইন্টারনেটে না দিতে পুলিশ সতর্ক করে দিয়েছে। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছে।

এই দুই মসজিদের একটিতে নামাজ পড়তে যাওয়া এক ফিলিস্তিনী নাগরিক জানান, তিনি কোনো এক ব্যক্তিকে মাথায় গুলী করতে দেখেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এএফপি’কে বলেন, ‘আমি পরপর তিনটি গুলীর শব্দ শুনতে পাই। এর প্রায় ১০ সেকেন্ডের মাথায় আবারো গুলী শুরু হয়।’ তিনি বলেন, ‘এরপর লোকজন চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করে। এদের অনেকের শরীরে রক্ত ছিল।’

তিনি আরো জানান, ভয় পেয়ে লোকজনের সাথে তিনিও ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় সাউথ আইল্যান্ড নগরীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, সশস্ত্র কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে। এ হামলার সময় ক্রাইস্টচার্চের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মসজিদ আল-নূরে মুসল্লিদের উপচেপড়া ভিড় ছিল।

এদিকে দ্বিতীয় যে সমজিদে হামলা চালানো হয় সেটি লিনউড উপশহরে অবস্থিত।

যেভাবে হামলা চালানো হয় মসজিদে

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে রক্তাক্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে। মসজিদে হামলায় প্রধান অভিযুক্ত একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক। তার নাম ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। এদিকে পার্শ্ববর্তী সাউথ আইসল্যান্ড শহরের লিনউড মসজিদেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় এই মসজিদে ১০ জন মুসল্লি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ নিয়ে দু’টি মসজিদে আলাদা হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৯ জন। প্রত্যক্ষদর্শীরা মসজিদের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত অবস্থায় মানুষকে পড়ে থাকতে দেখেছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এখনো কিছু বলা হয়নি। অনেককে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এদিকে নিউজল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে চালানো হামলাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ প্রচার (সরাসরি সম্প্রচার) করেন এই হামলাকারী। ভিডিওতে হামলাকারী নিজেকে ব্রেন্টন ট্যারেন্ট বলে পরিচয় দিয়েছেন। ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান-বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ তিনি।

ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারী মসজিদ আল নূর-এর সামনে তার গাড়ি পার্ক করার মধ্যে দিয়ে লাইভস্ট্রিম শুরু করে। হামলাকারী চালকের আসনে বসে ছিল এবং এসময় তার পাশের সিটেই অন্তত তিনটি অস্ত্র দেখা যায়।

ধারণা করা হচ্ছে হামলাকারী ক্যামেরাটা তার মাথার সাথে বেঁধে রেখেছিলেন। সঙ্গে থাকা অস্ত্রগুলোর মধ্যে অন্তত একটি সেমি-অটোমেটিক ছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, মসজিদে ঢুকেই নির্বিচারে গুলী চালাতে শুরু করে এই হামলাকারী। অতর্কিত এই হামলায় তিনি সামনে যাকেই পেয়েছেন, হিং¯্রভাবে গুলী করতে থাকেন। এ সময় একজন পালানোর চেষ্টা করলে হামলাকারী আরও হিং¯্র হয়ে তাকে গুলী করেন।

মসজিদ থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়ে এই হামলা চালানো হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, মসজিদের বিভিন্ন কোনায় মানুষের লাশ আছে আর বন্দুকধারী ঘুরে ঘুরে লাশের ওপরই গুলী চালাচ্ছে।

মসজিদে মাত্র তিন মিনিটের অবস্থান করে নির্বিচারে মানুষের ওপর গুলী চালিয়ে মসজিদের সামনের দরজা দিয়েই বের হয়ে যান তিনি। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় উঠে সেখানেও নির্বিচারে গুলী চালান তিনি।

টিভি নিউজিল্যান্ড (টিভি এনজেড) এর রিপোর্টার স্যাম ক্লার্ক। তিনি হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন মানুষের সাথে কথা বলেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, একজন সন্ত্রাসী একটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে মসজিদ আল নূর-এ প্রবেশ করার সাথে সাথেই মুসল্লিদের ওপর গুলীবর্ষণ শুরু করে।

ক্লার্ক বলেন, ‘হামলাকারী সন্ত্রাসী কালো পোশাক পরিহিত ছিল, তার মাথায় ছিল হেলমেট এবং হাতে মেশিনগান। মসজিদের পিছন দিকের গেইট দিয়ে প্রবেশ করার পর হামলাকারী নামাজরত মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে গুলীবর্ষণ শুরু করে।’

হামলার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী লেন পেনেহা বলেন, কালো পোশাক পরা একজন সন্ত্রাসীকে তিনি মসজিদে প্রবেশ করতে দেখেছেন এবং এরপরই কয়েক ডজন গুলীর শব্দ শুনতে পান তিনি। এরপরই কয়েকজন মুসল্লিকে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যেতে দেখেন।

মসজিদের পাশেই বসবাসরত পেনেহা আরো বলেন, পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থা পৌছানোর পূবেই অস্ত্রধারী হামলাকারী পালিয়ে যায়। তার ভাষ্য, ‘এরপর আমি সাহায্য করতে মসজিদের ভেতরে ছুটে যায়। কিন্তু আমি সেখানে সর্বত্রই লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি।’

মসজিদে নামাজ পড়ার সময় সন্ত্রাসীর গুলীতে আহত হয়েছেন এক ব্যক্তি। শরীরের রক্তে তার কাপড় পুরো ভিজে গেছে। তিনি বলেন, হঠাৎ গুলী শুরু হলে তিনি একটি বেঞ্চের নিচে আশ্রয় নেন। মসজিদে এসময় ৫০ জনের অধিক মুসল্লি ছিলেন বলে জানান তিনি।

ক্লার্ক বলেন, হামলার পর কিছু মানুষ মসজিদের দরজা ও জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও অনেক মানুষই নিহত হয়েছে এবং নিহতদের মধ্যে ১৬ বা তারও কম বয়সীও রয়েছে।

ক্লার্ক বলেন, ‘ঘটনার পর ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তিকে মসজিদের বাইরে দেখতে পাওয়া যায়, তাঁদের কেউ বেঁচে ছিলেন, কেউ ছিলেন মৃত।’

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য! আমি ২০ জন ব্যক্তিকে দেখেছি, তাঁদের কেউ ছিলেন মৃত, কেউ বা অনেক কাতরাচ্ছিলেন।’

আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘আমি মেঝেতে শতাধিক বুলেটের শেল দেখতে পাই। এবং দেখি একজন জানালা দিয়ে পালাতে চেষ্টা করতে গিয়ে গুলীতে ঘটনাস্থলেই মারা যান।’

 

দেশের অন্ধকারতম দিনগুলোর একটি আজ : আর্ডেন

ক্রাইস্টচার্চের দুইটি এলাকার মসজিদে শুক্রবার বন্দুকধারীর হামলার পর একে ‘নিউজিল্যান্ডের অন্ধকারতম দিনগুলোর একটি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন। নিউজিল্যান্ডে এ ধরনের হামলাকে ‘নজিরবিহীন সহিংস কর্মকা-’ বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

পুলিশের তরফ থেকে বেশ কয়েক জন হতাহত হওয়ার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি। এরইমধ্যে এক সন্দেহভাজন বন্দুকধারীকে আটক করেছে পুলিশ। আর কোনও বন্দুকধারী পালিয়ে আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে অভিযান চলছে। হামলার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডেন। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে প্রাণহানির সংখ্যা আমি নিশ্চিত করতে পারব না। তবে এটা স্পষ্ট করে বলতে পারি যে এ দিনটি নিউজিল্যান্ডের অন্ধকারতম দিনগুলোর একটি।’

জাসিন্ডা আরও বলেন, নিউজিল্যান্ডে ‘দুষ্কৃতকারীদের কোনও জায়গা নেই’। তার দাবি, অভিবাসী, শরণার্থীসহ হামলার শিকার হওয়া সবাই নিউজিল্যান্ডের অংশ, কিন্তু দুষ্কৃতকারীরা নয়। নিউজিল্যান্ডের সমাজে এ ধরনের সহিংস হামলার কোনও জায়গা নেই বলেও হুঁশিয়ার করেন তিনি।

জাসিন্ডা জানান, ক্রাইস্টচার্চে হামলার শিকার হওয়া মানুষদের কাছে তার মন পড়ে আছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, কথা বলার সময় কোনওরকমে কান্না আটকে রাখছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী।

 

হামলা সুপরিকল্পিত --নিউজিল্যান্ড পুলিশ

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে চালানো হামলা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিলো বলে জানিয়েছেন দেশটির পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ। তিনি জানান হামলার পর দেশজুড়ে সব মসজিদই এখন পুলিশী নিরাপত্তায় ঘিরে রাখা হবে। হামলাকারীরা কেন পুলিশের সন্দেহভাজন তালিকায় ছিলো না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আটক চার সন্দেহভাজনের কেউই কোনও অস্ট্রেলীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহভাজন তালিকায় ছিলো না।

স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৫ মার্চ) নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা হয়। শহরের হাগলি পার্কমুখী সড়ক দীন এভিনিউতে আল নূর মসজিদ এবং লিনউডের আরেকটি মসজিদের কাছ থেকে গুলীর শব্দ শোনা যায়।পরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডেন জানান, এই ঘটনায় ৪০ জন নিহত হয়েছে। পরে দেশটির পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ জানান, এই ঘটনায় ৪৯ জন নিহত হয়েছে। হামলার পর চার সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে এক অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমে হামলার পর বেশ কয়েকটি যানবাহনে ব্যাপক বিধ্বংসী ডিভাইস (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস-আইইডি) পাওয়ার কথা বলা হয়। তবে পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ জানান, এক হামলাকারীর একটি গাড়ি থেকেই দুটি আইইডি পাওয়া গেছে।

এর আগে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন জানান, হামলাকারীর গাড়িতে বিস্ফোরক লাগানো ছিলো। তবে এটা আত্মঘাতী হামলা ছিলো কিনা সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। তারও আগে পুলিশের তরফে জানানো হয় হামলার পর খুঁজে পাওয়া বিস্ফোরকগুলো নিস্ক্রিয় করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।

 

নিউজিল্যান্ডে ইসলামের দ্রুত সম্প্রসারণে বিদ্বেশ॥ ট্যারেন্ট যা বলেছে

ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটি মসজিদ এবং ইসলামিক কেন্দ্রে শুক্রবারের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন ৪৯ জন মুসল্লী। হামলার পরেই এই নিহতদের সংখ্যা নিশ্চিত করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন। তবে এই হামলা মোকাবিলায় আর্ডেন সরকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ লিনউড এবং আল নূর মসজিদে হামলাকারীদের একজন অস্ট্রেলিয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারেন্ট হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই অনলাইনে নিজের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ শীর্ষক ৭৭ পৃষ্ঠার ওই ম্যানিফেস্টোতে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে অন্তর্নিহিত ইসলাম ভীতি, অভিবাসনের বিপক্ষে বর্ণবাদি মনোভাব পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

ডেইলি মেইল, সিএনএন।

সন্ত্রাসী হামলায় অংশগ্রহণকারী ব্রেন্টন ট্যারেন্ট (২৮) জানায়, ২০১১ সালে নরওয়েতে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলী করে ৭৭ জন মানুষকে হত্যাকারী অ্যান্ড্রু বেহরিং ব্রেভিকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই সে এই হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নিউজিল্যান্ডে ইসলামের দ্রুত সম্প্রসারণ দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পরিবর্তন করছে, সংখ্যালঘুতে পরিণত করছে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে, আর এই কারণেই অভিবাসন প্রতিহত করাকে সে নিজের কর্তব্য হিসেবে বেছে নেয়। ম্যানিফেস্টোতে তার অনুপ্রেরণার উৎস ব্রেভিককে একজন নাইট বা বীর ধর্মযোদ্ধা বলেও সম্বোধন করেছে ট্যারেন্ট।

অবশ্য, ট্যারেন্টের এই নাইট উক্তির পেছনে আরো গভীর সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়েছে। ১২ শতাব্দীর নাইটস টে¤পলার নামক কট্টরপন্থী খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধা গোষ্ঠীর প্রতি নরওয়ের সমর্থনের ঐতিহাসিক সংযোগ এই সম্বোধনের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।

 ‘আমি একজন সাধারণ শ্বেতাঙ্গ নাগরিক। জন্ম নিয়েছি এবং বড় হয়েছি একটি দরিদ্র, খেটে খাওয়া পরিবারে। তবে আমি এমন একজন ব্যক্তি, যে নিজ জনগোষ্ঠী এবং তাদের সংস্কৃতিকে অনাহূত বিদেশীদের হাত থেকে রক্ষা করতে একটা কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা এবং জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এই ধরণের পদক্ষেপ নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিলোনা এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হওয়ার কোনো ইচ্ছেও ছিলোনা ট্যারেন্টের, একথা সে ¯পষ্ট করেই লিখেছে। সে আরো জানায়, তার সহযোগীদের সঙ্গে প্রথমে ডিউনডিন এলাকার আল হুদা মসজিদে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর এবং লিনউড মসজিদে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ, আল হুদা মসজিদের চাইতে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদ দুটিতে সবচাইতে বেশি ‘বিদেশী দখলদারদের’ সমাগম হয়।

 

হামলাকারী একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক!

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলায় এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় এক নারীসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে মসজিদে হামলায় প্রধান অভিযুক্ত একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক বলে জানা গেছে।

আটককৃত অভিযুক্ত অস্ট্রেলীয় নাগরিকের নাম ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। তিনিসহ আরো একজন সন্ত্রাসী অস্ত্র নিয়ে এই হামলা চালায় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে হামলায় এক নারীসহ তিন বাংলাদেশী নাগরিক গুলীবিদ্ধ হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যম।

হামলার সময় মসজিদটির খুব কাছেই ছিলেন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদ আল নূর-এ যাচ্ছিলেন ক্রিকেটাররা। তবে মসজিদে পৌঁছাতে ৫ মিনিট দেরি হওয়ায় হামলা থেকে বেঁচে যান ক্রিকেটাররা। এই ঘটনার পর ক্রিকেটাদের কেউই নিউজিল্যান্ডে থাকতে চাইছেন না বলে জানা গেছে।

এ দিকে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলাকে ‘গুরুতর ঘটনা’ উল্লেখ করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শহরের হাসপাতাল ও সব স্কুলে যে যেভাবে আছে, সেভাবেই ভেতরে থাকতে নির্দেশে দেয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের না হতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে লোকজনকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।

স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে মসজিদে নামাজ শুরুর ১০ মিনিটের মধ্যে একজন বন্দুকধারী সিজদায় থাকা মুসল্লিদের ওপর গুলী ছোড়ে। হামলাকারীর হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। হামলা চালিয়ে বন্দুকধারী জানালার কাচ ভেঙে পালিয়ে যায়।

এদিকে শহরের আরো একটি মসজিদ থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ক্যাথেড্রাল স্কয়ারে হাজার খানেক শিশুর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে শোভাযাত্রা হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ বলেছেন, ক্রাইস্টচার্চে একজন বন্দুকধারীর হামলার কারণে গুরুতর এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ তার সর্বশক্তি নেয় কাজ করছে, কিন্তু এখনো এখানে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।

 

হামলাকারী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ব্লাক সান’ এর সদস্য 

ক্রাইস্টচার্চে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নব্য নাৎসিবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ব্লাক সান’ জড়িত বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রেন্টন টারান্ট নামের ওই হামলাকারী কুখ্যাত ব্লাক সানের সদস্য। হামলার আগে টুইটারে তার প্রকাশিত এক ইশতেহারে ব্লাক সানের সঙ্গে তার সম্পর্ক পরিষ্কার করেন। টুইটারে তিনি ৮৭ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার দিয়েছিলেন। যেখানে হামলার পূর্বাভাসও দেয়া হয়েছিল।

২০১১ সালে নরওয়েতে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা থেকে ব্রেন্টন টারান্ট অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে টুইটে দাবি করেন। নরওয়েতে সেই ভয়াবহ হামলায় ৭৭ জন নিহত হয়েছিল। ব্রেন্টন টারান্ট টুইটারে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিলেন তার প্রচ্ছদে ব্লাক সানের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর 'ব্লাক সান' নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার হইচই শুরু হয়েছে। ব্লাক সান কী? জার্মানির উত্তরাঞ্চলে ওয়েলসবার্গ নামক দুর্গ নির্মাণ হয় ১৬০৩ সালে। ১৬০৯ সালে সেটি উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন শাসকের দুর্গপ্রাসাদ হিসেবে এটি ব্যবহার হতো। জার্মান শাসক হিটলারের সময় থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই দুর্গটি হিটলারের বাহিনীর (এসএস) জেনারেলদের জন্য ব্যবহার হতো।

ওয়েলসবার্গ দুর্গের মেঝেতে ১৯৩৩ সালে হিটলারের সময়ে একটি লোগো স্থাপন করা হয়। লোগোতে কালো গোলাকৃতির মধ্যে ১২টি সাদা রঙের ফাঁকা অংশ রয়েছে। তৎকালীন জার্মানিতে হিটলারের পরে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল হেনরিক হিমলারের নেতৃত্বে এই লোগোটি বসানো হয়, যা দেখতে অনেকটা চাকার মতো। লোগোটি নাৎসি বাহিনীর দলীয় লোগোর সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ব্লাক সান ওয়েলসবার্গের ওই চিহ্নটিই তাদের লোগো হিসেবে ব্যবহার করছে। 

হেনরিক হিমলার ওই দুর্গটির ডিজাইনও পরিবর্তন করেন। পরিবর্তিত ডিজাইনেই পরে লোগোটি স্থাপন করা হয়। এটিকেই মূলত ব্লাক সান বলা হয়। তৎকালীন  ব্লাক সানের অনুসারীরাই বর্তমান ব্লাক সান নামক সংগঠন পরিচালনা করছে। সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনটিকে নব্য নাৎসিবাদীদের সংগঠন হিসেবে সজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে। 

 

রক্ত মাখা পোশাকেই নামাজ পড়লেন তারা

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের ওপর হামলা চালায় এক বন্দুকধারী। এ সময় বন্দুকধারীর ব্রাশ ফায়ারে ৩ বাংলাদেশীসহ নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৯ জন। আহত হয়েছেন ৪৮ জন। ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে ১ নারীসহ ৪ জনকে। এদিকে হামলার সময় আটকে পড়া দুজনকে পরে মসজিদের পাশের রাস্তায় নামাজ পড়তে দেখা গেছে।

নিউজিল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্টাফ এক প্রতিবেদনে হামলার পরবর্তী মুহূর্তের একাধিক ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানকার একটি ছবিতে দুই মুসলিম ব্যক্তিকে রক্তমাখা পোশাকে নামাজ পড়তে দেখে গেছে।

এদিকে হামলাকারীর কাছে একটি বড় বন্দুক ও কয়েকশ রাউন্ড গুলী ছিলো।  তিনি গায়ে মিলিটারিদের মতো পোশাক পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন হামলার সময় আটকে পড়া এক ব্যক্তি।  

প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘তিনি (বন্দুকধারী) ভিতরে ঢুকলেন এবং মসজিদের সবাইকে শ্যুট করা শুরু করলেন। তিনি আরও জানান, কমপক্ষে ৫০ বার গুলী ছুঁড়েছেন তিনি। তার সঙ্গে একাধিক ম্যাগজিন ছিলো। কয়েকশ রাউন্ড হতে পারে। তিনি আরও জানান, হামলাকারী মাথায় হেলমেট থাকায় তার সম্পূর্ণ চেহারা দেখতে পারেননি তিনি।

হাতের রক্ত কাপড় দিয়ে আটকে তিনি আরও জানান, হামলার সময় মসজিদের একটি গ্লাস হাত দিয়ে ভেঙ্গে তিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ সময় গ্লাসের সঙ্গে লেগে তার হাত কেটে যায়।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরও বলেন, ‘আমার জানালা ও দরজার গ্লাস ভেঙ্গে সবাইকে বের করতে হয়েছিলো। আমরা চেষ্টা করছিলাম, যেভাবেই হোক সবাইকে এই এলাকা থেকে দৌড়ে দূরে পাঠানোর। কিন্তু আমরা সবার জন্য দরজা খুলতে পারিনি।’

নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় সময় শুক্রবার দেড়টার দিকে মসজিদে হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভও করেন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী ওই শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী। ক্রাইস্টচার্চে ভিডিওটি অনলাইনে না ছড়াতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ইতোমধ্যে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সরিয়ে নেয়ার কাজ করেছে পুলিশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ