ঢাকা, শনিবার 16 March 2019, ২ চৈত্র ১৪২৫, ৮ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এলএনজির ধারে কাছেও নেই তবু বাখরাবাদ ও সুন্দরবনের প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি

 

স্টাফ রিপোর্টার: ধারে কাছেও নেই তবুও  এলএনজি দোহাই দিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বাখারাবাদ ও সুন্দরবন। এর মধ্যে বিইআরসি এই দুই বিতরণ কোম্পানির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে শুনানি করেছে অথচ এলএনএজি’র জন্য বাখরাবাদ এখনো পাইপলাইন নির্মাণ করেনি। অন্যদিকে এলএনজির ধারে কাছেও নেই সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। ফলে গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিকে জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা অযৌক্তিক বলছেন। 

জানা গেছে, এপ্রিলে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আসবে এই অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। কিন্তু এখনও পাইপলাইনই নির্মিত হয়নি। ফলে এলএনজি আসবে না। এই অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনও যুক্তি নেই। বরং প্রি-পেইড মিটার দিয়ে গ্যাস সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। গণ ১৩ মার্চ বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবিত মূল্য বাড়ানোর আবেদনের শুনানিতে বক্তারা এসব কথা বলেন।

শুনানিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সালেক সুফি বলেন, ‘বিতরণ কোম্পানিগুলো এলএনজি আমদানির যৌক্তিকতা তুলে ধরছে, কিন্তু তারা সেটা পারে না। তারা বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছে। এটা কোন নীতিতে দিয়েছে তারা? তারা কি ব্যবসায়ী নীতি পরিবর্তন করেছে?’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা বলছে, পেট্রোবাংলার নির্দেশে দিয়েছে। এপ্রিল থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসবে বলা হচ্ছে। কিন্তু পাইপলাইনের কাজই শেষ হয়নি।’ গ্যাস আসবে না তাই ধরে নিয়ে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ৬০০/৭০০ টাকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আবাসিকে মিটার না দিয়ে গ্যাসখাতকে দুর্নীতির মধ্যে রাখা হচ্ছে। মিটার যুক্ত গ্রাহকের ৩০০/৪০০ টাকা বিল আসে। মিটার বিহীনরা দিচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। কিন্তু তারা ৫০ ভাগও গ্যাস ব্যবহার করে না। এটা বন্ধ করতে হবে।’

বাংলাদেশ হাউজ অ্যান্ড ফ্ল্যাট ওনার্স এসোসিয়েশনের নেতা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আপনারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারবেন না। তাহলে দাম বাড়াবেন কেন? দুর্নীতি ছাড়া গ্যাসের কোনও কাজ হয় না। এই দুর্নীতি বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়া দরকার। এখনই কোম্পানিগুলো লাভজনক জায়গায় আছে। দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে গ্যাসের দাম না বাড়িয়েই আরও লাভ করতে পারবে কোম্পানিগুলো।’

সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্শন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নুর বলেন, ‘অন্য কোনও জ্বালানিকে প্রনোদনা দেওয়ার জন্য যেন সিএনজি’র দাম বাড়ানো না হয়। এতে হলে শুধু সিএনজি খাতেরই ক্ষতি হবে না, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হবে।’

এদিকে শুনানিতে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আবাসিকে এক চুলা বর্তমান দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩শ’ ৫০ টাকা, দুই চুলা ৮শ’ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪শ’ ৪০ টাকা, প্রি-পেইড মিটারে ৯.১০ (ঘনমিটার) টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬.৪১ টাকা করার প্রস্তাব করেছে।

অন্যদিকে বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩.১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.৭৪ টাকা, সিএনজিতে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮.১০ টাকা, সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ২.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮.৪৪ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮.০৪ টাকা, শিল্পে ৭.৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪.০৫ টাকা, বাণিজ্যিকে ১৭.০৪ টাকার পরিবর্তে ২৪.০৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সুফল না পেলেও আমদানি ঘাটতি মোকাবিলায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে চায় সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। গত ১২ মার্চ গণশুনানিতে প্রশ্ন তোলা হয়, সুন্দরবনের বিতরণ এলাকার মানুষ এই দাম বৃদ্ধির কোনও সুফল পাবে কি না। আর যদি না পায় তাহলে ওই এলাকার মানুষকে কোন যুক্তিতে বর্ধিত দাম দিতে হবে?

খুলনা ও বরিশালে গ্যাস বিতরণের স্বপ্ন নিয়েই সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি গঠন করা হয়। খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করা হলেও এখনও সেভাবে বিতরণ শুরু হয়নি। আর বরিশাল অঞ্চলে এখনও পাইপলাইনই বসানো হয়নি। ভোলা এলাকায় কোম্পানিটি সীমিত পরিসরে গ্যাস বিতরণ করে। তাও সেই গ্যাসের যোগান পায় তারা ভোলার একটি খনি থেকে উত্তোলিত গ্যাস থেকে।

শুনানিতে চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার পর প্রকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের চার্জ পুননির্ধারণের সুপারিশ করে বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটি। কমিশনের কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন ঠিক থাকলে তাদের বিতরণ চার্জ এখনও বাড়ছে।

আবাসিকে এক চুলার বর্তমান দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা, দুই চুলার ক্ষেত্রে ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ২০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি।

অন্যদিকে যারা গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করে তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটর ৯ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৬৫ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে তারা। এছাড়া বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৬৬ পয়সা, সিএনজিতে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা, সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৭০ টাকা, শিল্পে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ১৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শুনানিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সালেক সুফী বলেন, ‘বিদ্যমান পাইপলাইনে ১০০০ এমএমসিএফডি গ্যাস (এলএনজি) আনা যাবে না। আর আসলেও তা সুন্দরবন পাবে না। ফলে এলএনজির আসার অজুহাতে তাদের গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনও যুক্তি নেই।’ তিনি বলেন, ‘এসব কোম্পানির বোর্ডের অধিকাংশ লোক নন-টেকনিক্যাল। ফলে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা সঠিক হয় না। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই কোম্পানির গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের কোনও দরকারই ছিল না।’

সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি তাদের গ্যাসের দাম বাড়ানোর যে আবেদন করেছে তাতে তারা বলেছে, দেশের বর্ধিত জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করছে এবং পেট্রোবাংলা কর্তৃক আইওসি গ্যাসের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ঘাটতি পূরণ, উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রকৃত রাজস্ব ব্যয়ের ভিত্তিতে প্রাক্কলিত মার্জিন অনুযায়ী গ্রাহক শ্রেণিভিত্তিক প্রতি ঘনমিটারে প্রস্তাবিত মূল্য পুনর্বিবেচনা করে গ্রাহকপর্যায়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

এদিকে বিতরণ মার্জিন শূন্য দশমিক ২৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ২৫৪০ টাকা পুননির্ধাারণ করা প্রয়োজন বলে কোম্পানিটির দাবি। এই মার্জিন বাড়ানোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য, এই কোম্পানির গ্যাস বিক্রয়ের পরিমাণ কম হওয়া, প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া, সরকার ও দাতাসংস্থার কাছ থেকে নেওয়া ঋণের সুদ এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা, উৎসে কর কাটার সঙ্গে প্রকৃত কর আদায়ের সামঞ্জস্যতা এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নমূলক কর্মকা- বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রাহক সেবার মান উন্নয়ন করার লক্ষ্যে এই বিতরণ মার্জিন বাড়ানো প্রয়োজন।

এর বিপরীতে মূল্যায়ন কমিটি বলেছে, গত ১৬ অক্টোবর জারি করা বিইআরসির আদেশের মাধ্যমে কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ প্রতি ঘনমিটারে শূন্য দশমিক ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা গণ ১৮ অক্টোবর ২০১৮ থেকে কার্যকর হয়। এ অবস্থায় ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ হওয়ার পর প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সুন্দরবন গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ পুনর্নির্ধারণ করা যথাযথ হবে বলে টেকনিক্যাল কমিটি মনে করছে।

এদিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের চেয়ে বেশি হওয়ায় দুটির মধ্যে সমন্বয় করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চলমান গণশুনানির বিষয়ে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, বিভিন্ন কোম্পানি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে এবং ভোক্তারাও তাদের মতামত তুলে ধরছেন। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। গ্যাসের দাম সমন্বয় করাটা কমিশনের দায়িত্ব।

তিনি আরো বলেন, গ্যাসের ক্ষেত্রে আমাদের কলকারখানা এবং কৃষিকে আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য আমরা এলএনজি আমদানি করে যাচ্ছি। তবে এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের চেয়ে বেশি হওয়ায় দুটির মধ্যে সমন্বয় করে তা বাজারে দেয়া হবে, যেন ভোক্তাদের জন্য এটি ব্যয়বহুল না হয়।

প্রধানমন্ত্রীরও এমন নির্দেশনা রয়েছে উল্লেখ করে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন ধাপে ধাপে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে, যাতে ভোক্তারা সময় পান এবং সহনীয় পর্যায়ে আসে। এ সময় গ্যাসের বহুবিধ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ