ঢাকা, রোববার 17 March 2019, ৩ চৈত্র ১৪২৫, ৯ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সময় ও জীবনের বিনিময় জান্নাত

 

মাওলানা আবুল কাসেম সিকদার:

সময় : মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে সময় সচেতনতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন বয়স (সময় ও জীবন) দান করিনি? যাতে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে, শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত, আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারীও এসেছিল (সূরা ফাতির : ৩৭)।

মহান আল্লাহ পাকের অগণিত নেয়ামতের মধ্যে মৌলিক ও প্রধান হচ্ছে সময়। এটি জীবনের মূলধন, শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সময়ের দৃষ্টান্ত-প্রখর রোদের মধ্যে রাখা বরফ খ-ের মত, যা ব্যবহৃত না হলেও গলে যাবেই। সময়ের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ণীত হয় সময়কে কেন্দ্র করে। তাই সময়ের নিয়ন্তা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মানব জীবনের ধ্বংসলীলা ও মুক্তিনামা তুলে ধরেছেন ‘সময়’ নামক সূরা আসরে। তাই যথাসময়ে কাজ না করলে আখিরাতের আজাব দেখে অনুশোচনা করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিংবা আযাব দেখে বলবে, আমাকে যদি আর একবার সুযোগ দেয়া হতো তাহলে আমিও নেক আমলকারীদের মধ্যে শামিল হয়ে যেতাম। (সূরা যুমার-৫৮)।

রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে’ (তিরমিয়ী)। হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেহ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ না করে মৃত্যুবরণ না করে (মুসলিম)।

(১) যবান বন্ধের আগেই তাওবা : যবান বন্ধ হবার আগেই আল্লাহর কাছে ক্ষমার আবেদন করতে হবে। সময়ের যতœ ও মূল্যায়নে তাওবা বা অনুতাপের সহিত আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা জরুরী। কেননা, আল্লাহতায়ালা সকল মুমিনদেরকে তাওবা করিতে আদেশ করিয়াছেন, তিনি বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর সমীপে তাওবা কর যেন তোমরা সফলকাম হইতে পার’। (সূরা নূর-৩১) আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে আমার জাতি এ দুনিয়ার জীবন তো কয়েকদিনের মাত্র। চিরকাল অবস্থান তো পরকালে’ (সুরা মুমিন-৩৯)।

(২) হিসাব নিকটবর্তী তবুও সে বেখবর : ‘লোকদের হিসাব-নিকাশের সময় খুবই নিকটে এসে গেছে, অথচ এখনও তারা গাফিলতির মধ্যে বিমুখ হয়ে পড়ে আছে’ (সূরা আম্বিয়া-১)।

প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমরা আল্লাহর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। শ্বাস-প্রশ্বাস যেন একটি ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার মত, প্রতিমুহূর্তে বর্তমান থেকে অতীতে নিক্ষেপ করছে। মানুষের জীবনকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে যাচ্ছে। যখন অক্সিজেন গ্রহণের পাত্র আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক শেষ হয়ে যাবে তখন আর নিঃশ্বাস গ্রহণ করা যাবে না। প্রতিটি দিন ও রাত আমাদেরকে এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় করার কাজে নিয়োজিত। আল্লাহর কাছে ফিরে যাবার চেতনা ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করাই হচ্ছে এসবের লক্ষ্য। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ তুমি তীব্র তুমি তীব্র আকর্ষণে নিজের রবের দিকে চলে যাচ্ছ এবং তাঁর সাথেই সাক্ষাত করবে (সূরা ইনশিকাক-৬)। কুরআনে অনেক আয়াতে প্রায় একইভাবে উল্লেখ করেছেন ‘যখন কারো নির্ধারিত সময় উপস্থিত হয়ে যায় তখন এক মুহূর্ত আগে অথবা এক মুহূর্ত পরে বিলম্ব হয় না’ (সূরা ইউনুস-৪৯)। 

(৩) আখেরাতের জন্য পাথেয় প্রেরণ : প্রত্যেক ব্যক্তির দেখা উচিত যে, সে তার আখেরাতের জন্য আগে কি পাঠিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর, আর প্রত্যেক ব্যক্তিই যেন খেলয়াল রাখে যে সে আগামী দিনের জন্য কি ব্যবস্থা করে রেখেছে বা আখেরাতের জন্য কি পাঠাচ্ছে’ (সূরা হাশর-১৮)।

তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম নেক আমল যা পাঠাবে তা আল্লাহর কাছে ঠিকমতই পাবে’ (সূরা মুজাম্মিল-২০)।

(৪) এ দুনিয়ায় সময় ও জীবন সংক্ষিপ্ত : যে কোন সময় মালাকুল মাওত এসে যেতে পারে। প্রস্তুতি নেয়ার সময় খুবই কম। তাই হেঁটে হেঁটে চলার সময় নেই। এখন দৌড়ানোর সময়। আল্লাহর পথে দৌঁড়িয়ে দৌঁড়িয়ে চলতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘ফা ফিররু ইলাল্লাহু’। অর্থ : ‘দৌঁড়াও আল্লাহর দিকে’ (সূরা যারিয়াত-৫০)। তোমাদের রবের মাগফিরাতের দিকে প্রতিযোগিতা করে দৌড়াও (সূরা হাদীদ-২০)।

(৫) আখিরাতের বাণিজ্যে নিজের নাফস প্রস্তুত রাখা :  পৃথিবী নামক গ্রহে বাণিজ্য উপলক্ষেই মানুষের আগমন এবং নাফসের সহিত তাহার কাজ-কারবার। এই বাণিজ্যের লাভ শান্তি সুখের চিরস্থায়ী জান্নাত এবং লোকসান দুঃখ-কষ্টের সীমাহীন আবাস জাহান্নাম। নাফস পারলৌকিক বাণিজ্যের শেয়ার, তাই রুহের অংশীদারের সহিত চুক্তি সম্পাদন আবশ্যক। দুনিয়ার ব্যবসায় অপরকে শেয়ার করে মূলধন বিনিয়োগ করে লাভবান হলে শরীককে বন্ধু বলা চলে। কিন্তু মূলধন নষ্ট করে ফেললে সে শত্রুতে পরিগণিত হয়। তাই চুক্তি সম্পাদন জরুরি আর তা হচ্ছে: উভয়ে চুক্তির শর্ত মেনে নেয়া। আল্লাহতায়ালাকে হাজির নাজির জেনে এই মনে করা যে, তিনি মানুষের কার্যকলাপ দেখছেন এবং মনের খবরও জানেন। নিজেদের কৃতকর্মের পর্যালোচনা, প্রয়োজনে নাফসকে শাস্তি, তিরষ্কার ও বিরুদ্ধাচরণ করা। এ নীতি দুনিয়ার ব্যবসার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য আর পরকালের বাণিজ্যের লাভ চিরস্থায়ী। 

(৬) পরমায়ূ আখিরাত বাণিজ্যের একমাত্র পুঁজি : জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস এক একটি অমূল্য চিরস্থায়ী সম্পদ ভা-ার লাভ করা যায়। আয়ষ্কুালের সময় ছাড়া আর কোন মূলধন নেই। যে মুহূর্ত অতিবাহিত হলো তা আর ফিরে আসবে না। কেননা, মৃত্যু পর্যন্ত যতগুলো নিশ্বাস ফেলবে, তা আল্লাহর নিকট গণনা করা ও নির্দিষ্ট আছে। তদপেক্ষা অধিক একটি নিশ্বাসও ফেলবার অবসর তোমাকে দেয়া হবে না। পরমায়ু শেষ হয়ে গেলে বাণিজ্য সম্ভব নয়। পরমায়ূ অতি সংকীর্ণ। পরকালে অনন্ত দীর্ঘ সময় পাবে বটে, কিন্তু সেখানে কিছুই করার নেই। প্রতিটি দিন ও রাত মানুষের নিকট শিক্ষা নেয়ার জন্য যে, প্রতিদিন আল্লাহতায়ালা দয়া করে নতুন জীবন দান করেন। কারণ ঘুম এক প্রকার মৃত্যু সদৃশ্য। ঘুমন্ত অবস্থায় মরে গেলে আশা থেকে যেত, হায় যদি একদিনের অবকাশ পেতাম, তবে নিজের কাজ কিছুটা সংশোদন করে লইতাম। তাই অদ্যকার প্রতিটি নিঃশ্বাসকে এক একটি অমূল্য রতœজ্ঞানে সদ্ব্যবহার করো এবং একটি মুহূর্তও বৃথা অপচয় করিও না।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে ‘দুনিয়ার রাত ও দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যেক ঘণ্টার বিনিময়ে আখিরাতে মানুষের সম্মুখে এক একটি ভা-ার স্থাপিত হইবে। প্রতিটি ভা-ারের দ্বার খুলিয়া দেখানো হইবে। যে সময়ে নেক আমল করা হয়েছিল, সেই ঘণ্টার বিনিময়ে যে ভা-ার পাওয়া যাবে তা পূণ্যের কারণে নূরে ভরপুর দেখা যাবে। তা দেখে সে খুবই আনন্দ লাভ করবে। সেই আনন্দের কারণ এই, সেই ব্যক্তি জানবে যে, ওই নূর তার পক্ষে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় হবে। আর বদআমলের জন্য অন্ধকার ভা-ার এবং যে সময়ে পাপ-পূণ্য নেই সে জন্য শূন্য ভা-ার দেখতে পাবে। এই শূন্য ভা-ার দেখে বান্দার মনে, তদ্রুপ দুঃখ ও পরিতাপের উদ্রেক হবে। পরমায়ূর প্রতিটি ঘণ্টা পরকালে তদ্রুপ মানুষের সম্মুখে উপস্থিত হবে। অতএব স্বীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গসমূহ নাফসের নিকট অর্পণ পূর্বক অন্যায় হতে রক্ষা করার জন্য তাকীদ করবে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস কর যে, আল্লাহ তোমাদের মনের কথা জানেন। সুতরাং তাকে ভয় করতে থাক (সূরা বাকারা : ২৩৫) ‘যখন তাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে ” ‘হে আমার রব : আমাকে সময় ও জীবন ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এতে আর একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।’ (সূরা মুমিনুন : ৯৯-১০০)।

(৭) সময় ও জীবন : অনেকের নিকট সময় হচ্ছে ওই মুহূর্ত যখন সুযোগ তার সর্বোচ্চ মানে অবস্থান করছে। তারা ভালোভাবে সময় নির্ধারণের উপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করে। সর্বোত্তম সুযোগ প্রদানকারী সময় অনেকের নিকট বিশেষ গুরুত্ব রাখে। অনেকের নিকট সময় হচ্ছে শুধুমাত্র সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা এবং বছরের মাপকাঠি। 

আমরা জানি, সমাজে কিছু বিস্ময়কর ব্যক্তিও আছেন, যারা সময়ের গভীরতার নিকট সময় ঘড়িতে বন্দী বা ক্যালেন্ডারে শৃঙ্খলাবদ্ধ কোনো জিনিস নয়, কোনো ঘণ্টা বা সপ্তাহ দ্বারা নয় বরং আগ্রহ ও আত্মত্যাগের এক মহান স্পৃহা দ্বারা তাদের কার্য সম্পাদিত হয়। যা তারা করে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এক শক্তিশালী আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা সাফল্যের দিকে এগিয়ে যায়, এমনকি সময়কেও তারা স্বীকৃতি দেয় না। ভালবাসে এমন কাজের জন্য তারা তাদের হৃদয় ওয়াক্্ফ করে দিয়েছে এবং তাদের কাজ হচ্ছে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে প্রোজ্জ্বল এক মিশন। আর এটি নবী রাসূল ও তাঁদের অনুসারীগণের ঐতিহ্য। 

(৮) দুনিয়ার জীবন পরীক্ষা কেন্দ্র : ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন। তোমাদেরকে পরীক্ষা করে দেখার জন্যে যে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে সর্বোত্তম?’ (সূরা মুলক-২)। এ আয়াতে বলা হয়েছে, মৃত্যু ও জীবন আল্লাহতায়ালারই সৃষ্টি। তিনিই এর ধারাবাহিকতা সচল রেখেছেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। মানুষ আল্লাহর বান্দা ও খলীফা বা প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। পুরো জীবন তার জন্য পরীক্ষার সময়। মৃত্যুর সাথে সাথেই পরীক্ষার সময় ফুরিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষই মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করবে; অতপর তোমাদের কর্মের প্রতিদান পুরোপুরি কিয়ামতের দিন অর্পণ করা হবে। যাকে আগুন থেকে বাঁচিয়ে দেয়া হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে; সেই সফলতা পাবে। মনে রেখে এই পার্থিব জীবনের চাকচিক্য ছলনা ছাড়া আর কিছুই নয়। (সূরা আলে ইমরান-১৮৫)। আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি এক সময় মৃত ছিল, অতপর আমি তাকে জীবিত করলাম, তদুপরি তার জন্যে নূর বানিয়ে দিলাম, যার আলো দিয়ে সে মানুষের মাঝে চলতে পারছে। (সূরা আনয়াম-১২২)। এ আয়াতে ‘নূর’ হলো ইসলাম, যে তার সার্বিক জীবনে মানে, আল্লাহর ভাষায় সে জীবিত। আর যে মানেনা সে মৃত। নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে আল্লাহর (যিকর) বিধানের স্মরণ রাখে সে জীবিত আর যে স্মরণে রাখে না সে মৃত; (বুখারী ও মুসলিম)। মানুষের সংক্ষিপ্ত আয়ূ ও সময় দিয়েই তার কাক্সিক্ষত জান্নাতের অসীম চিরন্তনতা ও সেই অমরত্ব ক্রয় করতে পারে। 

(৯) সময় ও জীবনের বিনিময়ে জান্নাত : এটি দয়াময় আল্লাহর দেয়া একটি টেন্ডার বা বিজ্ঞপ্তি। ক্রেতা প্রকৃত মুমিনগণ। তাদেরকে বলা হলো, আল্লাহর প্রতি এবং রাসূলের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারীদের জীবন ও সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুমিনদের থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ, এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত; (সূরা তাওবা-১১১)। 

এ পৃথিবীতে মানুষের সময় ও জীবন হচ্ছে পরম পাওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ। সুতরাং তোমাদের সাথে যে বিষয়ে চুক্তি হয়েছে, তা সোপর্দ করে দাও। কেননা, ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিতে উভয় পক্ষের উপরই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করা উচিত। ক্রেতা মূল্য পরিশোধ করবে আর বিক্রেতা পণ্য সোপর্দ করে দিবে। ঈমানদারগণ যখন ক্রেতার সুমহান মর্যাদা, মূল্যের বিশালতা চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতাকারী রাসূলে কারীম (সা.) এর শান ও মহত্ব এবং সেই কিতাবে চুক্তিটি লিখিত আছে, তার মর্যাদা সম্পর্কে জানতে পারল তখন পণ্যটির মর্যাদা ও শান-শওকত সম্পর্কে অবগত হলো। তারা বুঝতে সক্ষম হলো যে, এটি মুমিনের জীবন ও প্রাণ, এমন একটি পণ্য যা পৃথিবীর অন্যান্য পণ্যের মত নয়। সুতরাং তারা দেখল যে, সস্তা মূল্যে এবং সীমিত কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে এটিকে বিক্রয় করে দেয়া মারাত্মক ক্ষতিকর ও ভুল হবে। কারণ দুনিয়ার স্বাদ ও সম্পদ ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু পার্থিব জীবনের কৃতকর্মের ফলাফল সুদূরপ্রসারী। যারা সামান্য স্বাদ ও স্বার্থের বিনিময়ে স্থায়ী সুখ-শান্তিকে বিক্রয় করে দেয় তাদেরকে মুর্খদের কাতারেই গণ্য করা হয়। সুতরাং, ঈমাদারগণ স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ক্রেতার (আল্লাহর) সাথে চুক্তি সম্পাদন করল, প্রকৃত ঈমানদারগণ কখনই এই চুক্তি ভঙ্গ করে না। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাহাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়াছে, উহাদের কেহ কেহ শাহাদাত বরণ করিয়াছে এবং কেহ কেহ প্রতীক্ষায় রহিয়াছে। উহারা তাহাদের অঙ্গিকারে কোন পরিবর্তন করে নাই; (সূরা আহযাব-২৩)। আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত; (সূরা আল ইমরান-১৬৯)। 

(১০) মুমিনরা সময় ও সামর্থ্য বিনিয়োগ করে স্বপ্নের জান্নাতের উত্তরাধিকারী হয়; আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মহান আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়োনা। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না; (সূরা কাসাস-৭৭)

অর্থাৎ, ঈমানদারগণ কারুণকে এই উপদেশ দিল, আল্লাহ তোমাকে যে অর্থ সম্পদ দান করেছেন, তদ্বারা পরকালীন সুখ শান্তির ব্যবস্থা কর এবং দুনিয়াতে তোমার অংশ ভুলে যেয়োনা। দুনিয়ার অংশ কি? এ সম্পর্কে তাফসিরকারগণ বলেন, এর অর্থ মানুষের বয়স এবং এই বয়সের মধ্যে করা হয় এমন কাজ কর্ম, যা পরকালে লাভজনক হবে। আল্লাহর পথে অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয়, আমলে সালেহসমূহ, প্রকৃতপক্ষে দুনিয়াতে তোমার অংশ ততটুকু যতটুকু পরকালে কাজে লাগবে (মায়ারিফুল কুরআন)।

মহান আল্লাহ পাক সূরা আসরে বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে কসম করে বলেন, ‘সময়ের কসম, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু উহারা নয়, যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্য্যরে উপদেশ দেয় (সূরা আসর: ১-৩)। এ সূরার প্রথম আয়াতে মানুষের গোটা জীবন, আয়ুষ্কালের বছর, মাস, সপ্তাহ, ঘণ্টা ও মিনিটকে ‘ক্যাপিটাল’ মূলধন বা পুঁজি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যা বিনিয়োগ করে পরকালে অনন্ত সুখ শান্তির আবাস ‘জান্নাতের উত্তরাধিকারী হওয়া যায়। সময় হচ্ছে সম্পদের ন্যায়। জীবন ও সম্পদ উভয়টির প্রতি যতœশীল হওয়া জরুরি। জীবনের আয়ূ সামান্য, সময় সংক্ষিপ্ত। এ সংক্ষিপ্ত সময় ও সম্পদ দিয়েই মানুষ জান্নাতের জান্নাতের অসীম চিরন্তনতা ও সেই অমরত্ব ক্রয় করতে পারে।

এ সূরায় মানব জাতির মহাক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মহাকল্যাণ লাভ করার ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়েছে। ঈমানের দাবিসহ ঈমানের গুণ বৈশিষ্ট্য অর্জন। আমলে সালেহ তথা সততা ও যোগ্যতার সাথে জীবন গঠন, বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে উপদেশ দেয়া এবং বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে সবর করার উপদেশ দেয়ার মধ্যেই পরকালীন সাফল্য ও বিস্ময়কর মুনাফা ও অর্জন করতে পারে। হায়াতে তাইয়্যেবা তথা স্থায়ী জান্নাত লাভের তাওফিক হয় এবং ভ্রান্ত পথে চললে এটাই তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য হতে পারে। 

(১১) ঈমান ও সৎকর্মের তুলনা ব্যসসায়ের সাথে : আল্লাহতায়ালা বলেন, যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা করে যাতে কখনও লোকসান হবে না। পরিণামে তাদেরকে পুরোপুরি প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশি দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী (সূরা ফাতির : ২৯-৩০)। এ আয়াতে বর্ণিত সৎ কর্মসমূহকে উদাহরণস্বরূপ ব্যবসা বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন অন্য এক আয়াতে ঈমান এবং আল্লাহর পথে জেহাদকেও ব্যবসা বলা হয়েছে। সৎ কর্মের তুলনা ব্যবসায়ের সাথে এ অর্থে যে, ব্যবসায়ী এ আশায় পুঁজি বিনিয়োগ করে যে, এতে তার পুঁজি বৃদ্ধি পাবে এবং মুনাফা অর্জিত হবে। কিন্তু দুনিয়ার প্রতিটি ব্যবসায়ে মুনাফার সাথে সাথে লোকসানেরও আশঙ্কা থাকে। আলোচ্য আয়াতে ব্যবসায়ের সাথে ‘লান তাবুর’ শব্দ যোগ করে ইশারা করা হয়েছে যে, পরকালের এই ব্যবসায়ে লোকসান ও ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই। সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কষ্ট ও শ্রম স্বীকার করে দুনিয়ার সাধারণ ব্যবসায়ের মত কোন ব্যবসা করে না, বরং তারা এমন এক ব্যবসায়ের প্রার্থী, যাতে কখনও লোকসান হয় না। তারা প্রার্থী, একথা বলে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তিনি প্রার্থীদেরকে নিরাশ করবেন না, বরং তাদের প্রার্থনা পূর্ণ করবেন। পরবর্তী বাক্যে আরও বলা হয়েছে যে, তাদের আশা তো কেবল আমলের পূর্ণ প্রতিদান পাওয়া পর্যন্ত সীমিত; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কৃপায় তাদের আশা অপেক্ষাও বেশি দান করবেন।

পৃথিবীর মানুষ ব্যবসা ও মুনাফা প্রিয়, তাই আল্লাহতায়ালা মুমিনদের ঈমান, কুরআন ‘তিলাওয়াত’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

আল্লাহর সাথে বাণিজ্য চুক্তিতে পরকালে মুক্তি! আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ, আমি কি তোমাদের এমন একটি (লাভজনক) ব্যবসার সন্ধান দেবো যা তোমাদের (জাহান্নামের) কঠোর আজাব থেকে বাঁচিয়ে দেবে। (হ্যাঁ যে ব্যবসাটি হচ্ছে) তোমরা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনবে এবং আল্লাহর (দ্বীন প্রতিষ্ঠার) পথে তোমাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে চরম চেষ্টা করবে; এটাই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, যদি তোমরা বুঝতে পারো, আল্লাহ তায়ালা এর ফলে তোমাদের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং আখিরাতে তোমাদের তিনি দাখিল করাবেন এমন এক অট্টালিকা জান্নাতে, যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত থাকবে, তিনি তোমাদের আরো প্রবেশ করাবেন স্থায়ী জান্নাতের পবিত্র ঘরসমূহে, আর এটাই হচ্ছে সব চাইতে বড় সাফল্য। (সুরা সাফ : ১০-১২)

উক্ত আয়াতে ঈমান ও ধন সম্পদ জীবন পণ করে চরম চেষ্টা প্রচেষ্টাকে বাণিজ্য’ আখ্যা দেয়া হয়েছে। কারণ বাণিজ্যে যেমন কিছু ধন সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করার বিনিময়ে মুনাফা অর্জিত হয়, তেমনি ঈমান সহকারে আল্লাহর পথে জান ও মাল ব্যয় করার বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের চিরস্থায়ী নিয়ামত অর্জিত হয়। পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে এই বাণিজ্য অবলম্বন করবে আল্লাহ তায়ালা তার পাপ ক্ষমা করবেন এবং জান্নাতে পবিত্র বালাখানা দান করবেন। এ সব বালাখানায় সর্বপ্রকার আরাম ও বিলাস-বাসনের উপকরণ থাকবে। অতঃপর পরকালীন নেয়ামতের সাথে কিছু ইহকালীন নেয়ামতেরও অঙ্গীকার করা হয়েছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ