ঢাকা, রোববার 17 March 2019, ৩ চৈত্র ১৪২৫, ৯ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইসলামের দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহ

 এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান:

॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥

আয়েশা (রা.) কে রসুলুল্লাহ (দ.) ব্যতীত যদি অন্য কোন যুবক বিবাহ করত, তবে কি আয়েশা (রা.) বর্তমানের মত অমর হয়ে যেতেন? অন্যের সাথে বিবাহ হলে আয়েশা (রা.) কি দুই হাজার দুইশত দশটি হাদিস মুসলিম উম্মাহকে কি উপহার দিতে পারতেন ? আল্লাহ রব¦ুল আলামিন স্বয়ং আয়েশা (রা.) কে রসুলুল্লাহ (দ.) এর স্ত্রী বানিয়ে মুসলিম উম্মাহ কে বিশাল একটি হাদিসের ভান্ডার উপহার দিয়েছেন। হযরত আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর বিবাহ আল্লাহর ইচ্ছায় সম্পাদিত হয়েছিল। এ বিষয়ে আয়েশা (রা.) কে রসুলুল্লাহ (দ.) বলেন যে তোমাকে দুবার আমাকে স্বপ্নযোগে আমাকে দেখানো হয়েছে। এক ব্যক্তি তোমাকে রেশমী কাপড়ে জড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে সে বলল এ হচ্ছে আপনার স্ত্রী। তখন আমি পর্দা খুললাম (দেখলাম সেটা হচ্ছ তুমি)। আমি বললাম এ স্বপ্ন যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তবে তিনি তা বাস্তবে করবেন। (সহীহ বুখারী,হাদিস নং ৫০৭৮)। তিরমিযি শরীফে হাদিসটির বর্ণনা একটু ভিন্ন। আয়েশা (রা.) বলেন রসুলুল্লাহ (দ.) বলেছেন জিবরাইল (আঃ) সবুজ রেশমের একটি কাপড়ের টুকরায় জড়িয়ে আয়েশা (রা.) কে (স্বপ্নযোগে) রসুলুল্লাহ (দ.) এর নিকট আনেন এবং বলেন ইনি হবেন দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার স্ত্রী। পবিত্র কোরআন এবং হাদিস থেকে আমরা জানতে পেরেছি বিচার দিবসের বিচার শেষে যখন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন পুরুষদের বয়স হবে বাইশ থেকে ছাব্বিশ এবং মেয়েদের বয়স হবে সতের থেকে আঠারো বৎসর। যদি মেনে নেয়াহয় আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর ছয় বৎসর বয়সে বিবাহ হয়েছিল আর নয় বৎসর বয়সে তার বাসর হয় এবং আঠারো বৎসর বয়সে আয়েশা (রা.) বিধবা হন। এখানে আয়েশা (রা.) এর ত্যাগ হলো তার  যৌবনকাল ভোগ করতে না পারা। অপরদিকে আল্লাহর নবী (দ.) এর হাজার হাজার সাহাবী তাদের সর্বাপেক্ষা প্রিয় সম্পদ জীবন আল্লাহর রাহে কুরবানী দিয়েছেন। সেই কুরবানী বা ত্যাগের তুলনায় আয়েশা (রা.) এর কুরবানী খুবই নগণ্য। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে কি আয়েশা (রা.) এর বিবাহ ছয় বৎসর বয়সে সম্পাদিত হয়েছিল? এ ব্যাপারে বিষয়টি সম্পর্কে একটি ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা তুলে ধরা হলো।

ইতিহাস গবেষণায় প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত যে আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর বিবাহের সময় তার বয়স ছিল কমপক্ষে ১৪ থেকে ১৬ বৎসর : একটি তথ্যমতে আয়েশা (রা.) এর রসুলুল্লাহ (দ.) এর বিবাহের সময় আয়েশা (রা.) এর বয়স ছিল ছয় বছর। প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে নয় বৎসর বয়সে রসুলুল্লাহ (দ.) এর সাথে আয়েশা (রা.) এর বাসর হয়। আঠারো বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। সহীহ বুখারীর বিবাহ অধ্যায়ে উদ্বৃত দুটি হাদিস এ বিষয়ের দলিল। সৈয়দ সোলায়মান নদভী (র) তার সিরাত গ্রন্থে তাবকাতে  ইবনে সা’দ এর বরাতে উল্লেখ করেন যে, নবী করিম (দ.) এর নবুয়ত প্রাপ্তির শুরুতে নবুয়তের চতুর্থ বৎসরে আয়েশা (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। তার বিবাহ ছয় বৎসর বয়সে নয় সাত বৎসর বয়সে হয়েছিল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও হাফেজুল হাদিস ইমাম যাহাবী বলেন যে আয়েশা (রা.) ফাতেমা (রা.) এর চেয়ে আট বৎসরের ছোট ছিলেন। একথা সত্য হলে হযরত ফাতেমা (রা.) এর বিবাহকালে যেহেতু তার বয়স ছিল ১৯ বৎসর। সে কারণে আয়েশা (রা.) এর ঐ সময় বয়স ছিল ১১ বৎসর। ফাতেমা (রা.) এর বিবাহের এক বৎসর আগে প্রথম হিজরীতে আয়েশা (রা.) এর বাসর হলে ঐসময় তার বয়স ছিল ১০ বৎসর। রসুলুল্লাহ (দ.) এর ৩৬ বৎসর বয়সের সময় আয়েশা (রা.) এর জন্ম হলে ঐ বয়স থেকে আয়েশা (রা.) এর বিধবা হবার বয়স ১৮ বৎসর যোগ করলে রসুলুল্লাহ (দ.) এর মৃত্যুকালে বয়স হতে হয় ৫৪ বৎসর। অথচ রসুলুলল্লাহ (দ.) এর ইন্তেকাল হয়েছে ৬৩ বৎসর বয়সে। তাবকাতে ইবনে সা’দের আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায় আয়েশা (রা.) এর বড় বোন আসমা (রা.) আয়েশা (রা.) থেকে ১০ বৎসরের কিছু দিনের বড় ছিলেন। হিজরতের ২৭ বৎসর আগে আসমা (রা.) এর জন্ম হয়। সে হিসেবে রসুলুল্লাহ (দ.) এর ওহী প্রাপ্তির সময় আসমা (রা.) এর বয়স ছিল ১৪ বৎসর। রসুলুল্লাহ (দ.) এর নবুয়ত প্রাপ্তির সময় আয়েশা (রা.) এর বয়স ছিল ৪ বৎসর। একই বর্ণনা হাফেজ যাহাবী রচিত সিয়ারু আালাম আন্নুবালা এবং ইবনে আব্দুল বার রচিত “উসুদুল গাবায় পাওয়া যায়। আসমা (রা.) এর জন্মের সময় আবু বকর (রা.) এর বয়স ছিল কুড়ি বৎসর। সিয়ারু বালাম আন্নুবালা ২য় খন্ড পৃষ্ঠা ২৮৮। এই হিসাব মতে ফাতেমা (রা.) এর জন্মের এক বৎসর পর রসুলুল্লাহ (দ.) এর বয়স যখন ৩৬ বছর চলছে তখন আয়েশা (রা.) জন্ম হয়। ইতিহাস পর্যলোচনায় আরো জানা যায় হযরত খাদিজা (রা.) এর ইন্তিকালেরপর রসুলুল্লাহ (দ.) প্রথমতঃ হযরত আয়েশা (রা.) কে এবং পরে সাওদা (রা.) কে মক্কায় বিবাহ করেন তখন রসুলুল্লাহ (দ.) এর বয়স ছিল ৫০ বৎসর। রসুলুল্লাহ (দ.) এর বয়স যখন ২৫ বছর তখন তিনি ৪০ বৎসর বয়সী হযরত খাদিজা (রা.) কে বিবাহ করেন। তাদের বয়সের ব্যবধান ছিল ১৫ বৎসর। নবুয়তের দশম বর্ষে খাদিজা (রা.) ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। খাদিজা (রা.) এর মৃত্যুর পর রসুলুল্লাহ (দ.) এর দূর সম্পর্কের ভাই সাহাবী উসমান ইবনে মাযউনের স্ত্রী খাওলা বিনতে হাকিম (রা) রসুলুল্লাহ (দ.) কে বলেন ইয়া রসুলুল্লাহ (দ.) আবার বিয়ে করুন। তিনি জানতে চাইলেন কাকে। খাওলা (রা.) বললেন বিধবা না কুমারী, দু ধরনের পাত্রীই আছে। কাকে আপনার পছন্দ হয়। রসুলুল্লাহ (দ.) জানতে চাইলেন তারা কারা। খাওলা (রা) বললেন কুমারী পাত্রি হচ্ছে আয়েশা (রা) এবং বিধবা পাত্রী হচ্ছে সাওদা (রা)। রসুলুল্লাহ (দ.) বললেন ভাল প্রস্তাব। কথা বলে দেখতে পারো। খাওলা (রা.) রসুলুল্লাহ (দ.) এর সম্মতি পেয়ে আবুবকর (রা.) এর নিকট আয়েশা (রা.) এর সহিত রসুলুল্লাহ (দ.) এর বিবাহের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি শুনে আবু বকর (রা.) বললেন খাওলা (রা) রসুলুল্লাহ (দ.) তো আমার ভাই। কিভাবে আমার ভাইয়ের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে হবে। আবু বকর (রা.) এর বক্তব্য রসুলুল্লাহ (দ.) কে জানানো হলে রসুলুল্লাহ (দ.) খাওলা (রা.) কে বলেন আবু বকর (রা) তো আমার দ্বীনি ভাই। আর দ্বীনি ভাইয়ের সাথে কিভাবে মেয়ের বিয়ে দেয়া যায়। রসুলুল্লাহ (দ.) এর সাথে বিয়ের প্রস্তাবের আগে আয়েশা (রা.) এর সাথে যুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) এর  বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। ঐসময় পর্যন্ত যুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) ইসলাম গ্রহন করেননি। সেকারনে তার পরিবারের মতামত জানাও দরকার ছিল। আবু বকর (রা.) যুবাইর ইবনে মুতইম এর পিতা মুতইম ইবনে আাদীর নিকট গিয়ে তার মেয়ে আয়েশা (রা.) এর সাথে যুবাইর ইবনে মুতইম এর বিবাহের বিষয়ে সবশেষ মতামত জানতে চাইলেন। মুতইম তার স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করলেন। আবু বকর (রা.) এর ইসলাম গ্রহন করার কারনে মুতইমের স্ত্রী আয়েশা (রা.) এর সাথে তার পুত্রের বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করার পরামর্শ দিলে মুতইম তার ছেলের সাথে আয়েশা (রা.) এর বিবাহের প্রস্তাবটি নাকচ করেন। ঐ প্রস্তাবটি নাকচ হবার পর আবু বকর (রা.) আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর বিবাহ পড়িয়ে দেন। তারপর রসুলুল্লাহ (দ.) সাওদা (রা.) কে বিয়ে করে মক্কায় ৩ বৎসর ঘর সংসার করেন। বিবাহের ৩ বৎসর পর প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে আয়েশা (রা.) কে রসুলুল্লাহ (দ.) তার নিজের সংসারে নিয়ে আসেন। আয়েশা (রা.) এর ব্যাপারে তার বিবাহের সময় খাওলা (রা.) এর উক্তি “কুমারী পাত্রী” এবং যুবাইর ইবনে মুতইমের সাথে আয়েশা (রা.) এর বিবাহের প্রস্তাব হওয়ার মাধ্যমে এটাই প্রমানিত হয় যে আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) বিবাহের আলোচনার সময় আয়েশা (রা.) বিবাহের বয়সে উপণীত হয়েছিলেন। তা ১৪ থেকে ১৫ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে। স্বামীর ঘর সংসার পরিচালনার মত তিনি বুদ্ধিমান না হওয়ায়  রসুলুল্লাহ (দ.) তাকে ঘরে তোলেন নি। আয়েশা (রা.) এর বোন আসমা (রা.) এর পুত্র উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রা.) সূত্রে সহীহ বুখারীর একটি হাদিসে আয়েশা (রা.) বয়সের উল্লেখ  রয়েছে। উরওয়া ইবনে যুবাইর (রা.) বলেন নবী (দ.) আয়েশা (রা.) কে ৬ বৎসর বয়সে বিবাহ করেন। যখন দাম্পত্য জীবন শুরু করেন তখন তার বয়স ছিল নয় বৎসর এবং তিনি নয় বৎসর রসুলুল্লাহ (দ.) এর সাথে সংসার জীবন কাটান। আয়েশা (রা.) সূত্রে এই বর্ণনাটি একাধিক হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনাটির সত্যতা বিষয়ে সন্দেহ করা না গেলেও বর্ণনাটিতে দুটি শব্দ বর্ণনাকারীদের কাহারও দ্বারা বাদ যাওয়া অসম্ভব নয়। ছয় এর আরবী শব্দ ছিত্তা আর নয় এর আরবী শব্দ তিসয়া। আরবী ভাষায় হিসাব গণনার সময় দশ বিশ চল্লিশ ষাট সত্তর আশি নব্বই এর মধ্য হইতে যেকোনটি বর্ণনার ক্ষেত্রে এক হইতে নয় পর্যন্ত অঙ্কগুলিকে প্রথমে বলা হয়। যেমন ষোল আরবী হল ছিত্তা আশারা এবং ঊণিশ  তিসয়া আশারা। খুব সম্ভবত এই হাদীসের এবং এই বিষয়ে উল্লেখিত অন্যান্য হাদিসের মধ্যে আশারা শব্দটি বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন এক পর্যায়ে বাদ পড়েছে। ছয় বা ছিত্তার সাথে আশারা যুক্ত হলে  বিবাহকালে আয়েশা (রা.) এর বয়স ছিল ১৬ বৎসর। এবং তিসয়ার সাথে আশারা যোগ হলে বাসর হবার সময় আয়েশা (রা.) এর বয়স হয় ঊনিশ বৎসর। ঊনিশ বৎসর বয়সে ফাতেমা (রা.) এর বিবাহ ও বাসর হয়। এরুপ হলে মেয়েদের ঊনিশের আদর্শ বয়স মিলে যায়। বর্ণনাটির মতন বা মূল অংশে একটি মারাত্বক রকমের হিসাবের গড়মিল রয়েছে। সকল হাদীস গ্রন্থ সংকলক এবং ইসলামের ইতিহাসবিদ ও সীরাত ও তাবকাত রচয়িতাগণ সবাই একটি ব্যাপারে একমত যে রসুলুল্লাহ (দ.) ৬৩ বৎসর বয়সে ইন্তেকাল করেন। উদ্ধৃত হাদীসে দেখা যায় যে রসুলুল্লাহ (দ.) এর ইন্তেকালের সময় আয়েশা (রা.) এর বয়স ছিল আঠারো। ৬৩ বৎসর বয়স থেকে ১৮ বৎসর বাদ দিলে রসুলুল্লাহ (দ.) এর ৪৫ বৎসর বয়সে সময় আয়েশা (রা.) এর জন্ম হবার কথা। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর যখন বিবাহ হয় তখন রসুলুল্লাহ (দ.) এর বয়স ছিল ৫০ বৎসর। এ ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতাগণ একমত। এই হিসেব মতে রসুলুল্লাহ (দ.) এর নবুয়তের পঞ্চম বৎসরে আয়েশা (রা.) এর জন্ম হবার কথা। কিন্তু নবুয়তের পঞ্চম বৎসরে আয়েশা (রা) এর জন্ম হবার কোন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। আসমা (রা.) এর জন্মের বয়সের চেয়ে আয়েশা (রা.) এর বয়স দশ বৎসর কম ধরলে রসুলুল্লাহ (দ.) এর নবুয়ত লাভের  ৪ বছর আগে আয়েশা (রা.) জন্মগ্রহন করেন। সে হিসেবে আয়েশা (রা) এর বিবাহকালে তার বয়স ছিল ১৪। প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর বাসর হয়। সে হিসেবে রসুলুল্লাহ (দ.) এর সাথে আয়েশা (রা.) এর বাসরের সময় বয়স ১৮ বৎসর ছিল প্রমাণিত হয়। উরওয়া (রা.) থেকে ইমাম বুখারী (রা.) পর্যন্ত চার জন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে আয়েশা (রা.) এর বয়স সংক্রান্ত হাদিসটি সহীহ বুখারীতে স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে কোন এক বা দুই বর্ণনাকারীর মাধ্যমে হাদিসটির মতনের দু একটি শব্দ বাদ পড়া বিচিত্র কিছু নয়। নবী (দ.) রসুল হিসাবে ১৩ বৎসর যাবৎ মুশরিকদের সাথে অবস্থান করে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। তারা তাকে পাগল, জ্বীনগ্রস্থ, জাদুকর প্রভূতি দুর্ণামে ভূষিত করেছিল। কিন্তু বিস্ময়কর ভাবে ছয় বছর বয়সী শিশু আয়েশা (রা.) কে বিয়ে করার ব্যাপারে তারা একেবারে নিরব। বিষয়টি চিন্তা করলে অনেক কৌতুহল সৃষ্টি হয়। মদীনার মুনাফিকরাও এ ব্যাপারে একেবারে নিরব ছিল কেন ? তাহলে আয়েশা (রা.) এর বিবাহকালে তার বয়স ছয় ছিল না বলে দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়। এছাড়া সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাফসিরে আয়েশা (রা.) থেকে আরেকটি হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে। ঐ হাদিসে দেখা যায় কোরআন মজিদের ৫৪ নং সুরা আল ক্বামার নাজিলের সময় আয়েশা (রা.) কিশোরী ছিলেন, তিনি ঐ সময় খেলাধুলা করতেন। (হাদিসটির নং ৪৮৭৬)। হাদিসটির আরবী ইবারত নিম্নরুপ “আন ইউসুফ বিন মাহিক ক্বলা ইন্নি ইনদা আয়িশাতা উম্মুল মুমিনীনা ক্বলাত লাক্বাদ আনযালা আলা মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বি মাক্কাতা  অ-ইন্নি লাযারিয়াতুল্লায়িবি। “বালিস সায়াতু মাওয়িদুহুম ওয়াসসায়াতু আদহা ও আর্মারু” (অর্থ- বরং কিয়ামত তাদের জন্য প্রতিশ্রুত সময় এবং কিয়ামত ঘোরতর বিপদ ও তিক্ততর)। (সুরা আল ক্বামার আয়াত নং ৪৬)। 

হাদিসটির অর্থ : আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন সুরা আল ক্বামারের “বালিস সায়াতু মাওইদাহুম ওসসায়াতু আদহা ও আর্মারু” অংশটি রসুলুল্লাহ (দ.) এর প্রতি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তখন আমি কিশোরী এবং খেলাধুলা করতাম। সমস্ত তাফসীরকারক এ ব্যাপারে  একমত যে, সুরা আল ক্বামার হিজরতের পাঁচ বৎসর পূর্বে নাযিল হয়। চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হবার ঘটনাটি ঐ সুরা  নাযিলের কিছুদিন আগে মিনায় সংঘটিত হয়েছিল। হাদীসটিতে আয়েশা (রা.) ঐ সময় “জারিয়া” ছিলেন মর্মে উল্লেখ আছে। “জারিয়া অর্থ কিশোরী”। যাদের বয়স ১১-১৪ বৎসর পর্যন্ত হয়ে থাকে। যেহেতু হিজরতের পাঁচ বৎসর পূর্বে সূরা আল ক্বামারের অংশ বিশেষ নাজিল হবার ব্যাপারে আয়েশা (রা.) জ্ঞাত ছিলেন। তাতে দেখা যায় যে তিনি ঐ সময় সাবিয়া বা শিশু ছিলেন না। আরবী ভাষায় মেয়ে শিশুদেরকে ২ বৎসর বয়স পর্যন্ত  তিফিল বলা হয়। তিন বৎসর থেকে নয় বৎসর বয়স পর্যন্ত মেয়ে শিশুদেরকে সাবিয়া বলা হয় আর দশ থেকে চৌদ্দ বৎসর বয়স পর্যন্ত মেয়েদেরকে জারিয়া বা কিশোরী বলা হয়। এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে হিজরতের পাঁচ বৎসর আগে আয়েশা (রা.) এর বয়স দশ হইতে চৌদ্দ বৎসর ছিল। চন্দ্র দ্বি- খন্ডিত হবার দু বৎসর পর আয়েশা (রা.) এর সাথে রসুলুল্লাহ (দ.) এর বিবাহ হয়। যদি ঐ সময়ে আয়েশা (রা.) এর বয়সকে চৌদ্দ বৎসর ধরা হয় তার চার থেকে পাঁচ বৎসর পর প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে আয়েশা (রা.) এর বয়স কমপক্ষে আঠারো ছিল। এছাড়াও বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে আয়েশা (রা) ১৭ ই রমজান ৫৮ হিজরী সনে ৭৩ বৎসর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ৭৩ থেকে ৫৮ হিজরী বৎসর বাদ দিলে হিজরতের সময় আয়েশা (রা.) এর বয়স কমপক্ষে ১৫ বৎসর ছিল।

সুদীর্ঘ আলোচনা শেষে একথা প্রমাণিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত যে পনের শত বৎসর পূর্বে এখনকার মত জন্ম নিবন্ধন পদ্ধতি চালু ছিল না। মানুষ বয়সের হিসেব স্মৃতিতে ধরে রাখত। সুতরাং আয়েশা (রা.) এর জন্ম তারিখও লিখিত বা নিবন্ধিত হয় নি। সে কারনে তার বয়স গণনায় বিভ্রান্তি ঘটেছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রমাণিত যে আয়েশা (রা.) এর রসুলুল্লাহ (দ.) এর সাথে বিবাহকালে তার বয়স ছিল চৌদ্দ বা পনের বা ষোল। আর দাম্পত্য জীবন শুরুর বয়স ছিল আঠারো বা ঊনিশ। সুতরাং রসুলুল্লাহ (দ.) কোন ছোট শিশুকে বিবাহ করেন নি। তাঁর প্রতি এই অপবাদ ইসলামের শত্রুদের উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

শেষকথা : লেখাটি শুরু করার পর সমাপ্ত করতে পারব কিনা দ্বিধাদ্বন্দে ছিলাম। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত পেয়ে যাই। সে কারণে মহান রব্বুল আলামিনের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। মুসলীম উম্মাহকে বিব্রতকারীদের মোকাবেলায় লেখাটি একটি দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করছি। বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়ার ইসলামী স্কলাররা এ বিষয়ে আরো গবেষণা করে  আরো তথ্য সমৃদ্ধ লেখা উপস্থাপন করবেন বলে আশা রাখছি। হাশরের ময়দানে লেখাটি যেন নাজাতের ওসিলা হয় সেই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করছি। (আমীন) (সমাপ্ত)

লেখক : এম.এম. (ডাবল হাদীস, তাফসীর), বি.এস.এস (সম্মান), এম.এস.এস (রাষ্ট্র বিজ্ঞান), এল.এল.বি, এ্যাডভোকেট, জেলা জজকোর্ট, রংপুর।

ইমেইল : asprodhan61@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ