ঢাকা, রোববার 17 March 2019, ৩ চৈত্র ১৪২৫, ৯ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রজবে আমলের মোজাহাদা

অধ্যক্ষ ইয়াছিন মজুমদার:

 আরবী চন্দ্র মাসের রজব মাস অতিবাহিত হচ্ছে। যখন রজব মাসের আগমন ঘটত নবী (স:) আল্লাহর নিকট দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় কর এবং আমাদের হায়াত রমজান পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দাও” (তাবরানী)। নবী (স:) আরো বলেছেন- “রজব হলো বীজ বোনার মাস, শাবান হলো ফসল ঘরে তোলার মাস।” অর্থাৎ রমজানে আমলের সাওয়াব অনেক গুণ বৃদ্ধি করে দেয়া হয় আর এ বর্ধিত সাওয়াব পাওয়ার জন্য রজব ও শাবান এ দুটি মাস বেশী বেশী আমল করে আমলে অভ্যস্থ হয়ে রমজানে বেশী আমল করার জন্য তৈরী হওয়ার মাস। তাই নেক আমলের মুজাহাদা করা প্রত্যেক মোমিনের উচিৎ। অন্যান্য মাসে ও নবী (স:) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলের মুজাহাদা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত। বর্ণিত আছে- “নবী (স:) রাতে এত দীর্ঘ নামাজে দাড়াতেন বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর ফলে নবী (স:) এর পা মোবারক ফুলে যেত। নবী (স:) কে বলা হলো হে আল্লাহর রাসুল আপনারতো কোন পাপ নেই। আপনাকে পূর্বাপর সকল পাপ থেকে নিষ্পাপ করা হয়েছে। নবী (স:) জবাবে বললেন- আমি কি এটা পছন্দ করবনা যে আমি কৃতজ্ঞ বান্দা হব (বুখারী-মুসলিম)।

হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) বলেন- আমি এক রাতে নবী (স:) এর সাথে নামাজে দাঁড়ালাম। নবী (স:) নামাজকে এত লম্বা করলেন আমি খারাপ কিছু চিন্তা করলাম। প্রশ্ন করা হলো, আপনি কি খারাপ চিন্তা করলেন? তিনি বললেন আমি বসে পড়ার বা নামাজ ছেড়ে দেয়ার চিন্তা করলাম (বুখারী-মুসলিম)। হযরত জাবের (রা:)  থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- এক ব্যক্তি উহুদ যুদ্ধের সময় ক্ষুধা নিবারণের জন্য হাতে কিছু খেজুর নিয়ে খাচ্ছিল। সে নবী (সা:) কে প্রশ্ন করল আমি যদি এ যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাই তবে কোথায় থাকব ? নবী (স:) বললেন জান্নাতে, তখন সে দ্রুত জান্নাতে যাওয়ার বাসনায়  (খেজুর খেতে সময় নষ্ট হবে মনে করে) হাতের খেজুরগুলো ফেলে দিয়ে যুদ্ধে শরীক হয়ে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করল (বুখারী- মুসলিম)।

নেক আমলের প্রতিযোগিতায় নবী (স:) এর সাহাবাগণ অনেক অগ্রগামী ছিলেন। তাবুকের যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর জন্য কে কি দান করবে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। ওমর (রা:) তার যা সম্পদ ছিল অর্ধেক দান করলেন, আবু বকর (রা:) তার সকল সম্পদ দান করে দিলেন। ওমর (রা:) বললেন নেক কাজের এ প্রতিযোগিতায়ও আবু বকর (রা:) শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ বিন হোজাইফা (রা:) কয়েকজন সঙ্গীসহ রোম সম্রাটের নিকট বন্দী হলেন। স¤্রাট হোজাইফা (রা:) কে প্রস্তাব দিলেন তুমি যদি খ্রিষ্টান হয়ে যাও অর্ধেক রাজত্ব তোমায় দিয়ে দেব, আমার সুন্দরী কন্যাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব। হোজাইফা (রা:) জবাবে বললেন সমগ্র দুনিয়া দিয়ে দিলেও তা সম্ভব নয়। তাকে জেলে রাখা হলো। কিছুদিন পর স¤্রাট সভাসদের নিকট পরামর্শ চাইলে তারা বলল, বন্দি একজন যুবক, দীর্ঘদিন নারী বঞ্চিত। জেলের নির্জন কক্ষে সুন্দরী একজন নারী পাঠিয়ে তাকে ঈমান হারা করা সম্ভব হবে। একজন প্রশিক্ষিত সুন্দরীকে তার কক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সারারাত সুন্দরী সে কক্ষে অবস্থান করল। ভোরবেলা বের হলে স¤্রাটের প্রশ্নের জবাবে সে বলল আমি আমার সকল চাতুরী ও কলা-কৌশল প্রয়োগ করেছি। কিন্তু সে দুপায়ের মধ্যখানে মাথা রেখে এমনভাবে বসে ছিল মনে হলো সে কোন মানুষ নয় পাথর, আমার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তখন স¤্রাট সভাসদের পরামর্শ মত একটি বিশাল পাত্রে পানি নিয়ে ফুটাতে লাগলো। পানি যখন টগবগিয়ে ফুটছে তখন হুজাইফা (রা:) ও তার সঙ্গীকে নিয়ে আসা হলো এবং হুজাইফা (রা:) এর সামনে তার সঙ্গীকে সে ফুটন্ত পানিতে হাত-পা বেঁধে ছেড়ে দেয়া হলে মুহূর্তে সে সিদ্ধ হয়ে মাংস খসে পড়ল। হযরত হুজায়ফা (রা:) এর চক্ষু থেকে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করল। স¤্রাট ভাবল বন্দী এবার ভয় পেয়ে কাঁদছে। তখন সে আবারো খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করলে অর্ধেক রাজত্ব প্রদানের কথা বলল এবং তা না করলে সঙ্গীর ন্যায় ফুটন্ত পানিতে ফেলে দেয়া হবে বলে হুমকী দিল। হযরত হোজায়ফা (রা:) বললেন স¤্রাট, তুমি ভাবছ আমি মৃত্যু ভয়ে কাঁদছি, তোমার এ ভাবনা ভুল। তুমি আমার যে সঙ্গীকে ফুটন্ত পানিতে ফেলেছ তার সাথে আমার নেক আমলের প্রতিযোগিতা চলত। সে যত রাকাত নফল আদায় করত আমি তার চেয়ে কিছু বেশী আদায় করে তাকে পেছনে ফেলার চেষ্টা করতাম। সে যে পরিমাণ দান করত আমি আরো বেশী দান করে নেক কাজে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করতাম কিন্তু আজ সে আমাকে পেছনে ফেলে আমার আগে জান্নাতবাসী হয়ে গেল আমি পেছনে পড়ে গেলাম সে জন্য আমি কাঁদছি। উল্লেখিত ঘটনা সমূহ আমাদের জন্য সৎকাজে প্রতিযোগিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।   

আল্লাহ পাক বলেন- তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও আকাশ-জমিনের চেয়ে প্রশস্ত জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে (সূরা- আল-ইমরান, আয়াত-১৩৩)। নবী (স:) বলেছেন- তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা কর, কেননা অন্ধকার রাতের মত ফেৎনার আবির্ভাব হবে। ব্যক্তি সকালে মোমিন থাকবে বিকেলে কাফির হবে, বিকালে মোমিন থাকবে সকালে কাফির হবে। তাদের দ্বীনকে দুনিয়ার স্বার্থে বিক্রি করে দিবে (মুসলিম)। নবী(স:)আরো বলেন-  উত্তম ব্যক্তি হলো যে দীর্ঘ আয়ু পেয়ে বেশি সৎকাজ করেছে (তিরমিজি)।

নবী (স:) আরো বলেছেন- যে আমার বন্ধুর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। বান্দা আমার নিকটবর্তী ও প্রিয় হয় আমার ফরযগুলো আদায়ের মাধ্যমে। নফল আদায় আমার বান্দাকে আমার আরো নিকটবর্তী করে দেয়। এমন কি এক পর্যায়ে আমি তাকে (ফরয নফল আদায়কারীকে) ভালবেসে ফেলি। আমি যখন তাকে ভালবেসে ফেলি আমি তার কান হয়ে যাই যা দ্বারা সে শুনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দ্বারা সে দেখে, আমি তার হাত হয়ে যাই যা দ্বারা সে ধরে, আমি তার পা হয়ে যাই যা দ্বারা সে চলে, সে আমার কাছে যা চায় আমি প্রদান করি। আমারে কাছে আশ্রয় চাইলে আমি আশ্রয় দেই (বুখারী)। অর্থাৎ তার সকল অঙ্গ আমার অনুগত হয় এবং আমি তার সকল চাওয়া পূরণ করি। নবী (স:) আরো বলেন, আল্লাহ বলেছেন- যখন বান্দা আমার দিকে এক বিঘৎ এগিয়ে আসে আমি বান্দার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। বান্দা আমার দিকে একহাত এগিয়ে এলে আমি দুই হাত এগিয়ে যাই, বান্দা আমার দিকে হেটে এলে আমি বান্দার দিকে দৌড়ে যাই (বুখারী)

রজব মাস আমাদের মাঝে চলছে, শাবান ও রমজান সামনে, আমরা দুনিয়াবী বেহুদা কাজে সময় ব্যয় না করে প্রস্তুতি নেই, নেক আমলের মুজাহাদা করি, সৎকাজের প্রতিযোগিতায় অভ্যস্থ হই যেন এ অভ্যস্ত হওয়ার কারণে তার ধারাবাহিকতা সারা বছর বিরাজমান থাকে এবং তা আমাদের পরকালের উত্তম পাথেয় হয়।

 

লেখক : অধ্যক্ষ ফুলগাঁও ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, লাকসাম, কুমিল্লা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ