ঢাকা, মঙ্গলবার 19 March 2019, ৫ চৈত্র ১৪২৫, ১১ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কার স্বার্থে বাড়বে গ্যাসের দাম!

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : গ্যাস নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ছোট বেলায় অনেকের কাছে শুনেছি গ্যাসের উপর নাকি ভাসছে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন দেখছি গ্যাসের অভাবে গিন্নির রান্নার চুলায় আগুন জ্বলছে না। এমন হওয়ার কথা না  থাকলেও বাস্তবে গ্যাসের হাহাকার সর্বত্র বিরাজমান। রান্নার চুলায় টিম টিম করে আগুন না জ্বললেও গত ১০ বছরে ৬ বার গ্যাসের  দাম বাড়ানো হয়েছে। জনগণের কল্যাণের কথা সব সরকারই চিন্তা করে এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে উন্নয়নের তকমা লাগিয়ে জনগণকে ফতুর করার সব আয়োজন সম্পন্ন করে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল যে সময়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করার গণশুনানি করছে ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তৈরি ২০১৮ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনের রিপোর্টে বলা হয়েছে,  বাংলাদেশে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। এই নির্বাচনে ভোটবাক্সে ব্যালট ভরা, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট  বলেছে, বাংলাদেশে আরও কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে গুম, খুন, নির্যাতন, অযাচিত সেন্সরশিপ, সাইট ব্লক করা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন প্রভৃতি বিষয়। (সূত্র প্রথম আলো ১৫ মার্চ)
একটি সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে, সরকার জনগণের সেবক হয়ে কাজ করবে। কিন্তু সরকার যখন তার উল্টো কাজ করে তখন জনগণের ভোগান্তি ব্যতীত অন্য কিছু ভাগ্যে জুটে না। যে দেশের রাজনীতিতে সরকারি দল আর বিরোধীদল একই কোরাস গায় সে দেশে গ্যাসের দাম বাড়ালেও টুঁশব্দ করার সাহস কেউ করবে না। কারণ ক্ষমতার অস্ত্রের কাছে নীতিকথা, হক কথা অচল। তবে এটাও ঠিক কাউকে ঠকিয়ে যারা নিজেকে বড় ভাবে, তারাও একদিন ঠকবে। অপেক্ষা শুধু সময়ের! একটি শক্তিশালী বিরোধীদল দেশের উন্নয়নের পেছনে ছায়া সরকার হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকার দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে ভুল করবে না এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। সরকার জনবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধী দল জনগণের হয়ে প্রতিবাদ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এ সরকারের আমলে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। জনগণের যৌক্তিক দাবির পক্ষে কথা বলার লোকের অভাব দেখা দিয়েছে। সরকার তার ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত জনগণের মাথার ওপর চাপিয়ে দিতে পারছে। জনগণও তা বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হচ্ছে। যদিও আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯ এর (২) বলা হয়েছে যে, মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধা দান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমাগত কমে অর্ধেকে নেমে আসলেও বাংলাদেশে জ্বালানির মূল্য কমানো হয়নি। বিশ্ব বাজারে যখন তেলের দাম বেড়েছিল তখনো বাংলাদেশে সমন্বয়ের কথা বলে দাম বাড়ানো হয়েছিল। এমনিতে ব্যয়ের চাপে দিশাহারা মানুষ। এহেন পরিস্থিতিতে যদি এখন গ্যাসের দাম আবারো বাড়ানো হয় তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্বিষহ যন্ত্রণার অমাব্যশার অন্ধকার নেমে আসবে। তিতাস গ্যাসের ২৭ লক্ষাধিক গ্রাহকের অধিকাংশই খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ। কোন যুক্তিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গ্যাসের দাম ১০২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, তা বোধগম্য নয়! তারা আবাসিক একচুলা বর্তমান মূল্য ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫০ টাকা এবং দুই চুলা ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৪০ টাকার প্রস্তাব করেছে। অথচ এখনো মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বসবাস করছে। অপর দিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি তিতাস গ্যাস লোকসানী কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। তাহলে কার স্বার্থে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর অশুভ চিন্তা সরকার করছে। তিতাসের দুর্নীতি এখন অপেন সিক্রেট। বছরে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির পরও কোটি টাকা লাভ করছে তিতাস। দেশের সাধারণ জনগণ মনে করে তিতাসের অপচয়, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, অবৈধ সংযোগবন্ধ করতে পারলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে কমানো সম্ভব।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের আবেদনের উপর গণশুনানিতে অংশ নেওয়া বক্তারা গ্যাসের দাম বৃদ্ধি না করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে। দাম বাড়ানোর সময় গণশুনানি করা হয়। অথচ বিশ^বাজারে যখন দাম কমে তখন কমানোর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি বিশ^বাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কমেনি। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সবেমাত্র গ্যাস সংযোগ পেতে শুরু করেছে। এখন এই দাম বৃদ্ধি কার স্বার্থে তা জাতির সামনে উন্মোচন করা প্রয়োজন। গত বছরের অক্টোবরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসি গ্রহণ করেছিল। আইনগত প্রক্রিয়ায় আটকে যাওয়ার কারণে প্রস্তাবিত বাড়তি দাম গ্রাহককে দিতে হয়নি। কিন্তু নতুন করে আবার বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে, যা সত্যিই বেদনাদায়ক। গ্যাস ও জ্বালানির সহজলভ্যতা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাণিজ্য সক্ষমতার অন্যতম মানদ- হওয়ায় গ্যাসের দাম বাড়ালে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে দুরূহ করে তুলবে। তিতাস গ্যাসের ২৭ লক্ষাধিক গ্রাহকের বেশীরভাগ মানুষই সাধারণ দরিদ্র। গ্যাসের দাম বাড়ালে সবচেয়ে বেশি মাসুল দিতে হবে নি¤œমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মানুষকে। গ্যাসের দাম বাড়ালে একদিকে কলকারখানার বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হবে তেমনি কর্মসংস্থান ও বাধাগ্রস্ত হবে। এমনিতে সারা দেশের ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। ফলে ঘরে ঘরে বেকারের কারখানা হবে।
সেবাপণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাধারণত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের লোকসানের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোমস্পানিগুলো লাভে থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি করেছে। গ্যাস বা যেকোনো সেবাপণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচারে কী লাভ হচ্ছে সে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গ্যাসের দাম বাড়ালে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়বে ঠিক। কিন্তু গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুতের দাম বাড়বে, বাসা ভাড়াসহ অন্য সব দ্রব্যসামগ্রীর দাম, বাড়বে শিল্প কৃষির উৎপাদন ব্যয়। যেসব ব্যবসায়ী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পান, কিংবা বড় ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও যাঁদের জন্য ব্যাংকের সিন্দুক সব সময় খোলা থাকে তাদের বাদে বাকি সব উদ্যোক্তার জন্যই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মানে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। হঠাৎ করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এটা সরকারের অজানা থাকার কথা নয়। গ্যাসের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়ায় যে বাড়তি খরচ মানুষকে বহন করতে হবে, তার জন্য সরকার কি তাদের বেতন বাড়ানোর দায়িত্ব নেবে? নেবে না। সীমিত আয়ের মানুষের কান্নার আওয়াজ কান পাতলেই শোনা যায়। কেননা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। এসব মানুষের জীবন আসলে কীভাবে চলে তার খোঁজ সরকারের কোনো সংস্থার কাছে কী আছে? রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্বে যারা নিয়োজিত রয়েছেন তাদের কাছে বাসা বাড়ির গ্যাসের এ মূল্যবৃদ্ধি সামান্য কিছু টাকার ব্যাপার হতে পারে! কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় এমন লাখ লাখ পরিবারের কাছে চুলা প্রতি একশ টাকা বৃদ্ধি করা পাহাড় সমান কষ্টের তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। এখন কোনো বাড়িওয়ালাই আর গ্যাস, পানি-বিদ্যুতের বিল নিজে বহন করেন না- চাপিয়ে দেন ভাড়াটিয়ার ঘাড়ে। আর ভাড়াটিয়ারা নিরুপায় হয়ে সে বোঝা বহন করতে বাধ্য হন। নইলে বাসা ভাড়া মেলে না। এ অবস্থায় গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভাড়াটিয়াদের উপরই গিয়ে পড়বে। এতে করে ভাড়াটিয়াদের উপর বাড়তি চাপ বাড়বে।
সরকারের কাজ হচ্ছে দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জীবনযাপনকে সহজ করার জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা। তাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। আমরা সরকারের মধ্যে এধরনের প্রবণতা দেখছি না। সরকার জনগণকে ভর্তুকি না দিয়ে নিজের ভর্তুকি পূরণ করার জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে যত রকমে পারা যায় আদায় করে নিচ্ছে। সরকার জনগণের উপর একের পর এক যে মূল্যবোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মনে হয় গ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবহারকীরা এ দেশের নাগরিক নন। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কেবলমাত্র গ্যাস ব্যবহারকীদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে বিষয়টি এমন নয়,তা ক্ষতিগ্রস্ত করবে সবশ্রেণী পেশার সব ধরনের মানুষকে। দেশে গ্যাসের মজুদ নিয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতেও হিসাবের গরমিল রয়েছে। আমাদের সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
প্রতিবেশী দেশের সাথে গ্যাস নিয়ে যেসব চুক্তি হচ্ছে তা থেকে আমাদের উপকৃত হবার সুযোগ কতটা রয়েছে তা পরিষ্কার নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এক থেকে অন্য দেশে গ্যাস রফতানি করছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এবং মিয়ানমারে অতিরিক্ত গ্যাসের মজুদ থাকার পরেও আমরা তা আমদানি করতে পারছি না। সেদিকে নজর না দিয়ে এলপিজি চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা কেন এই বিষয়টির বিশদ বিবরণ থাকা দরকার। গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করতে একদিকে দামবাড়ানোর পাঁয়তারা অন্যদিকে সরবরাহের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা দুঃখজনক। আমরা মনে করি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কেননা চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের মন্দাবস্থার মধ্যেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে ১৬ কোটি মানুষের জীবনে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার ক্ষত সৃষ্টি হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ