ঢাকা, বুধবার 20 March 2019, ৬ চৈত্র ১৪২৫, ১২ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা

এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান : আবহমান বাংলার হাজার বছরের কৃষি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় হঠাৎ করে ধ্বংস নামা শুরু হয়েছে। যেকোন সময় বাংলাদেশের কৃষিখাত মুখ থুবড়ে পরতে পারে। প্রাচীন বাংলার আদি সমাজ ব্যবস্থায় কৃষকরাই ছিল মূল ভিত্তি বা চালিকা শক্তি। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত এবং উচ্চ বিত্ত বা জোতদার মোটামুটি এ তিনটি শ্রেণিতে কৃষকরা বিন্যস্ত ছিল। প্রচীন বাংলার অর্থনীতি কৃষক শ্রেণিকে ঘিরেই আবর্তিত হত। বাংলার আদিম সমাজ ব্যবস্থায় কামার-কুমার, নাপিত, পাটনি, ঋষি, তেলী সম্প্রদায়ের মানুষরা মুলত কৃষক সমাজেরই সেবা দানকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ছিল। কুমার বা পাল সম্প্রদায়ের মানুষরা যেসব মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতো তার খরিদ্দার ছিল কৃষকরা। কামারদের তৈরি দা, কুড়াল, হাসুয়া, কাঁস্তে, বটি, চাকু, ছোরার খরিদ্দার ছিল কৃষকরা। নাপিত বা শীল সম্প্রদায়ের মানুষরা সারা বছর কৃষকদের বাড়িতে গিয়ে চুল কেটে দিয়ে আসত। বছর শেষে আমন মৌসুমের ধান কাটার পর কৃষকরা ধান দিয়ে নাপিতদের মজুরি পরিশোধ করত। ঋষি ও পাটনি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বাঁশ বেতের ধামা দোন, ডালি, কুলা, চালুন তৈরি করে হাটে বাজারে বিক্রি করত। এসবের ও খরিদ্দার ছিল মূলত কৃষকরাই। জেলা, সাবেক মহকুমা, থানা শহরসহ গ্রামের অনেক ছোট বড় হাট-বাজারের মুদি দোকানের খরিদ্দারও ছিল মূলত কৃষক বা কৃষি শ্রমিকরা। আমি নিজেও একটি কৃষক পরিবারের সন্তান। ছোট বেলায় দেখেছি আমার বাবা মাত্র একমণ ধান বা পাট বিক্রয় করে এক সপ্তাহের সাংসারিক খরচ নির্বাহ করতে পারতেন। যেমন লবণ, সাবান, সরিষার তেল, মাছ, ডিম, হাস, মুরগী প্রভৃতি। পাট বিক্রয়ের মৌসুমে পাট বিক্রয়ের টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাপড় কেনা হত। পাটের মৌসুমে হাট থেকে বড় মাছ অর্থাৎ নদী, বিলে ধরা রুই, কাতলা, মৃগেল, ইলিশ মাছ কেনা হত। তার পরেও বাবার হাতে কিছু টাকা থেকে যেত। তা দিয়ে ঈদের কেনাকাটা, আত্মীয়-স্বজনের জন্য বাজার করা বা ছেলে মেয়েদের বিয়ের খরচ নির্বাহ হত। এখন একমণ ধানের টাকায় একটা ইলিশ মাছ কেনা যায় না। আজ কৃষকদের সেই সুদিন আর নেই। পাটের দামের ওঠানামার কারণে পাট চাষ প্রায় তলানীতে পৌঁছেছে। বাংলার এককালের গর্ব Golden Fiber বা সোনালী আশের আর আগের সুদিন নাই। এখন নাইলন এবং প্লাষ্টিক এর সুতা তৈরি, বস্তা, সুতলী পাটের স্থান দখল করেছে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে বুট, মুগ, মসুর, মাস কলাই, খেসারীর ডালের চাষ বিদায়ের পথে। টিকে আছে শুধু ধান, আলু, পিঁয়াজ, রসুন, সরিষা আর শাক-সবজির আবাদ। প্রতি বছর যে পরিমাণ পিঁয়াজ, রসুন, আদা বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে, তাতে আর দশ বছরের মধ্যে এদেশ থেকে আদা, পিঁয়াজ রসুনের আবাদ বিদায় নিতে বাধ্য হবে। দেশে উৎপাদিত পিঁয়াজ উৎপাদন মৌসুমে প্রতি কেজি মাত্র ১২-১৫ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। উৎপাদন মৌসুমে রসুন মাত্র ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। এখন দেশে উচ্চফলনশীল ধানের আবাদ হয়। সেচ নির্ভর ধানের আবাদ একটি দীর্ঘ আর জটিল প্রক্রিয়া নির্ভর আবাদে পরিণত হয়েছে। বীজতলায় বীজ রোপণ, জমি চাষ,বীজ উঠায়ে জমিতে রোপণ, তাতে ৩ দফা সার প্রয়োগ, কীটনাশক ওষুধ প্রয়োগ শেষে ফসল কেটে বাড়িতে নিয়ে আসা পর্যন্ত মজুর খরচসহ প্রতিমণ ধানের উৎপাদনে যে খরচ হয় তার হিসাব কষলে দেখা যাবে যে, কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্যের একটি সামান্য অংশ কৃষকের পকেটে ঢুকেছে। ধান কেটে বাড়িতে উঠানোর পরই কৃষক নিস্তার পায় তা নয়। ধান সিদ্ধ করা, রোদে শুকানো, মাড়াই মেশিনে নিয়ে চাল বের করা, তার পর ভাত খাওয়া। এখন গ্রাম গঞ্জ প্রায় কৃষি শ্রমিক শুন্য হয়ে গেছে। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা কৃষকদের জন্য এখন দুঃস্বপ্নে পরিনত হয়েছে। এখন গ্রামগঞ্জে কৃষক বা কৃষি শ্রমিকদের ঘরে আল্লাহ যে পরিমাণ সন্তান দান করছেন, তার সবটারই প্রয়োজন বিভিন্ন গার্মেন্টেস শিল্প ও অন্যান্য মিল ফ্যাক্টরী এবং নির্মাণ শিল্পে। এখন উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দিন মজুর পরিবার গুলোর সন্তানদের স্কুলে পড়ানোর হিড়িক পড়ে গেছে। এসব পরিবারের সন্তানরা এস এস সি পাশ করার পর অনেকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারী, আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিচ্ছে। অনেক সাধারণ পরিবারের সন্তান উচ্চ শিক্ষা লাভ করে বিভিন্ন বড় চাকরিতে যোগ দেয়ার সাধনায় নিমগ্ন আছে। এছাড়া এদেশের বেকার জনগোষ্ঠীর বিদেশে শ্রমিক হিসাবে গমণের হারও উল্লেখ্যযোগ্য। রফতানি মুখ গার্মেন্টেস শিল্পে এদেশের নারী পুরুষ, শিশু মিলে প্রায় ৫০ লাখ মধ্য ও নিম্ন বিত্তের মানুষ শ্রমে নিয়োজিত হয়েছে । কৃষি শ্রমিকদের বিরাট একটি অংশ রাজধানীসহ বিভিন্ন মহানগর, জেলা সদরে রিক্সা, অটো রিক্সা, সিএনজি ধরনের যানবাহন চালানোর কাজে নিয়োজিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দিনমজুর শ্রেণির পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের কোন না কোন চাকরিতে প্রবেশ করানোর ইচ্ছায় লেখাপড়া করাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাকি অংশ বিভিন্ন মিল, ফ্যাক্টরি ও নির্মাণ শিল্পে চাকরি গ্রহণ করেছে। বিদেশ গমণ তো আছেই। হাজার হাজার বছর ধরে যে শ্রমিক শ্রেণিটি বাংলার কৃষি ব্যবস্থাকে সচল রেখেছিল, তারা এখন গ্রাম ছেড়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর বা শিল্প এলাকায় সপরিবারে কর্মজীবী হয়ে বসবাস করছে। উদাহরণস্বরূপ বলছি একটি গরীব পরিবারে যদি চারজন সদস্য থাকে। সবাই যদি মাসে গড়ে ৬০০০/- টাকা রোজগার করে, তাহলে একযোগে তা ২৪,০০০/- টাকা হয়। পরিবারটির ২৪,০০০/- টাকায় সংসার চালাতে বেগ পেতে হচ্ছে না। একটি গরীব পরিবারের জন্য এটি একটি বিশাল কিছু। কৃষি জমিতে সাড়া বছর কাজ থাকে না। এখন সারা বছর নগদ টাকায় দেশের বিভিন্ন শহর বন্দরে কাজের সন্ধান মিলে যাওয়ায়, কৃষি শ্রমিকরা ব্যাপক হারে গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছে। এখন গ্রামের কৃষিভিত্তিক কৃষক পরিবারগুলো তাদের সন্তানাদি লেখাপড়া করাচ্ছেন। এক সময় যেন তাদের ছেলে মেয়েদেরও চাকরি হয়। ছেলে মেয়েদের চাকরি হলে তারাও কৃষি নির্ভরতা থেকে অবসর গ্রহণ করবেন এটাই তাদের ভবিষ্যতের প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে অনেক কৃষক পরিবার কৃষি খাত থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। এর মূল কারণ কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া না যাওয়া, আর উৎপাদিত পণ্যে কোন ধরনের লাভ না থাকা। উৎপাদন মৌসুমে এক কেজি কাঁচা মরিচ ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হয়। আলুর অবস্থাও একইরূপ। দু’একটি জাত বাদে সাধারণভাবে যেসব আলুর ফলন বেশি সেগুলো উৎপাদন মৌসুমে ৫-১০ টাকায় কেজি বিক্রি হয়। কেজি প্রতি বেগুন কখনও কখনও ৩-৫ টাকায় বিক্রি হয়। উৎপাদন খরচ বাদে কৃষকরা কত টাকা আয় করেন সে খবর কে রাখে। বাংলার মাটি আল্লাহর এক অবারিত রহমত এর উদাহরণ। তাই এ মাটি বেশি উদার বা অকৃপণ। এদেশের মাটি প্রতি বছর যে কোন ফসল একই পরিমাণ বা কোন ক্ষেত্রে বেশিই ফলন দিতে কার্পণ্য করে না। বর্তমান সময়কালে এদেশের এককালের কৃষিনির্ভর মানুষ যেভাবে চাকরি বা বিদেশে পাড়ি জমানোর দিকে মনসংযোগ করেছে, তাতে মনে হয় বাংলার সোনা ফলানো জমিন হয়ত অনাগতকালে আবার বন জংগলে ভরে যাবে। জমি চাষ করে ধান, পাট, শাক সবজি ফলানোর মত কোন মানুষ হয়তো একদিন এদেশে থাকবে না। কৃষক সম্প্রদায় বলে কোন শ্রেণীও হয়ত এদেশে থাকবে না। আমাদের বাংলাদেশে কৃষি মন্ত্রণালয় আছে। যার অফিস এবং কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বিস্তৃতি রাজধানী, মহানগর, জেলা সদর, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং ওয়ার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ