ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 March 2019, ৭ চৈত্র ১৪২৫, ১৩ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা

এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান :  [গত কালের পর]
দেশে অনেকগুলো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ভকেশনাল ইনস্টিটিউট আছে। প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষিবীদ কৃষি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে বের হচ্ছেন। কৃষি সেক্টরের নুতন নুতন গবেষনা হচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে বা জাতীয় পর্যায়ে এ কথা কি আমরা ভেবে দেখেছি যে, কৃষকরা যদি তাদের ফলানো ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে যদি কিছু লাভ করতে না পারে, তার পরেও তারা কি এ সেক্টরে টিকে থাকবে? কৃষকরা কতকাল লোকসানের ঝুঁকি নেবে? আমাদের দেশের কৃষি মন্ত্রণালয় একটি গতানুগতিক ধারার মন্ত্রণালয় হিসাবে টিকে আছে। আমাদের জাতীয় দৃষ্টি ভঙ্গিটা এমন, যে কৃষি মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় থাকা উচিত। তাই এ মন্ত্রণালয় আছে। দেশের কৃষক সম্প্রদায় বলে যদি কোন সম্প্রদায় থাকে, তাহলে হয়ত কৃষি মন্ত্রণালয় থাকবে। কৃষিবীদ হিসাবে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী নিয়ে বের হচ্ছেন তাদের এ নিয়ে কোন চিন্তার কারণ নাই। কেননা তারা ঐ ডিগ্রী বলে সরকারি বা বেসরকারি যেকোন একটা চাকরির সংস্থান অবশ্যই করতে পারবে। এদেশের যে মুষ্টিমেয় পরিবারের মানুষ এখনও জমি আর কৃষিকাজে নিয়ে পরে আছে, সার্বক্ষনিক চিন্তা আর টেনশন তাদের। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসল ফলানোর খরচ যোগানো আর কৃষি শ্রমিক যোগার করা যে কি পরিমান দুরুহ হয়েছে তা ভুক্তভোগীরা ছাড়া কেউ বুঝবে না। উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ,  ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ, সার্বক্ষণিক পানি সেচ, বীজ লাগানোর সময় থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকদিন পর পর সার, কীটনাশক ব্যবহার, তারপর ফসল বাজারজাত করনে কত টাকা খরচ হয়, তার কোন পরিসংখ্যান কৃষি মন্ত্রণালয় কখনও করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কৃষি সেক্টরে অনেক বিপ্লব ঘটেছে। বিগত সরকারগুলোর অনেক সরকার যে বছর কৃষকরা আল্লাহর রহমতে তাদের মেহনতে বেশি ফসল ঘরে তুলতে পেরেছিল, তৎক্ষণাৎ সেটা তাদের দেশ শাসনের সুফলের ফলে হয়েছে বলে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কৃষি সেক্টরে বিপ্লব ঘটানো মানুষ গুলো বরাবরই থেকে গেছে অনাদর অবহেলায়। গত ৩০ বছর দেশে আলুর উৎপাদন ব্যাপক হারে বেড়েছে। এছাড়াও আরও যেসকল ফসল যেমন বেগুন, পটল, শষা, ঝিঙ্গা, করল্যা, মুলা, কাচা মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাধাকপি, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, লাউয়ের উৎপাদন বেড়েছে কয়েক হাজার গুণ। কলা, পেঁপে, পেয়ারা, আমের উৎপাদন দিন দিন বেড়েই চলেছে। সারা দুনিয়ায় সবজির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে যেভাবে মনসংযোগ দিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি যদি কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য যাতে দেশে বাজারজাত করে বা বিদেশে রফতানি করে তারা উৎপাদন খরচের পরেও আশানরুপ লাভবান হতে পারে সেদিকে মনযোগ দিত, তাহলে কৃষকদের এ দুর্দিনে পরতে হতো না। এখন দেশে প্রচুর পরিমাণ সুগন্ধি চালের ধান উৎপাদিত হচ্ছে। তার পরেও পাকিস্তান, ভারত থেকে কালজিরা, বাসমতি চাল আমদানী হচ্ছে। দেশে প্রচুর আখ উৎপাদন হচ্ছে। চিনিকলগুলো যথেষ্ট চিনি উৎপাদন করছে। তার পরেও দেদারসে তরল চিনি আমদানী করে ঝরঝরে চিনি উৎপাদন করে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে দেশের চিনিকলগুলোতে উন্নতমানের চিনি অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। চিনি কলগুলো বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। এখন বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন আলু, পিয়াজ, কলা, পেয়ারা, আম, মাছ, শাকসবজি রফতানি করা সম্ভব। বাংলাদেশে আর একটি মন্ত্রণালয় আছে যার নাম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়টির কাজ কি এদেশের জনগণ জানে না। প্রতি বছর রমজানের আগে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয় দেশবাসীর সামনে দু’চারটি নীতি বাক্য উচ্চারণ করেন। এই মন্ত্রণালয়টি যদি কৃষি মন্ত্রলালয়ের সাথে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষকদের রফতানিযোগ্য পণ্যগুলোর বাজার খুঁজে বের করে তাদের ফসল রফতানির কিছু রাস্তা খুঁজে বের করতে পারতো, তাহলে হয়তো কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পেত। আর কৃষি সেক্টরের মানুষরা ঐ সেক্টর থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিত না।
বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর একটি চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কৃষি পণ্যের বাজার উৎপাদন খচের চেয়ে অনেক কম হওয়া, উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক এর অভাব, শ্রমিকদের মজুরির উচ্চ মূল্য, কৃষিখাতকে ঘুন পোকার মত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিজীবী মানুষরা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ধরনের অসহায় অবস্থায় চলে গেছে। তারা অত্যন্ত কষ্ট করে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। তাদের যদি চাকরি জুটে যায় তাহলে তারা কৃষি থেকে অবসর নেয়ার প্রতিক্ষায়। বাংলাদেশের স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইনস্টিটিউট থেকে যারা ডিগ্রী নিয়ে বের হচ্ছেন তাদের ৯৫% ভাগই কৃষক পরিবারের সন্তান। তাদের শতকরা এক ভাগও কৃষি সেক্টরে ফিরে আসছে না। তারা প্রায় সবাই চাকরিমুখী। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার চাকরিজীবী বান্ধব সরকার। বর্তমান সময়কালে দেশের ছোট বড় চাকরিজীবীদের বেতন তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে চাকরিজীবী পরিবারগুলোর, বাড়ি ঘর, পোষাক পরিচ্ছদ, গাড়ি বা যানবাহন চোখে পড়ার মতো। এদেশের কৃষকরা করুন চোখে চাকরিজীবীদের দিকে চেয়ে থাকে। আর সব সময় ভাবে আহা তার ছেলে মেয়েদেরও যদি এমন একটা চাকরি জুটতো। কৃষকরা এখন স্বপ্নদেখে তাদের স্কুল,মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মেয়েদের মাঝে। তাদের বাপ দাদার রেখে যাওয়া কৃষি জমি নিয়ে এখন আর তারা স্বপ্ন দেখে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পরিষদ এর কাছে এদেশের অবহেলিত কৃষক সম্প্রদায়ের পক্ষ হয়ে আবেদন করবো-বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী কৃষক সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখার জন্য, বাংলার সোনা ফলানো ভূমিকে বার বার সোনার ফসলে ভরে তোলার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজানো হোক। মন্ত্রণালয়টির নাম করণ করা হোক কৃষি ও কৃষি পণ্য বিপণন মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয় একদিকে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার, মানসম্মত স্বাস্থ্য ঝুকি মুক্ত, ফসল উৎপাদন করবে। তারপর দেশের চাহিদা মিটানোর পর উদ্বৃত্ত ফসল বিদেশে রফতানি বা বিপণনের ব্যবস্থা করে দেবে। তাছাড়াও দেশের কোথায় কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে তার তথ্য কৃষকদের নিকট প্রতিনিয়ত সরবরাহ করবে। যাতে করে বাংলার কৃষকদের জীবনে আবার সেই পুরনো আমলের নবান্ন উৎসব এর আনন্দ ফিরে আসে। কৃষকরা যেন আনন্দ উদ্দীপনা নিয়ে কৃষি সেক্টরে যুগের পর যুগ শতকের পর শতক টিকে থাকে। এটা করা না গেলে আগামী ৪০-৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি চাকরিজীবীদের স্বর্গরাজ্য। আমরা লক্ষ্য করছি এখনকার যুব সমাজের স্বপ্ন শুধুমাত্র একটি চাকরি। তা দেশে হোক আর বিদেশে। এমনটা চলতে থাকলে আগামীতে দেশটা হবে একটি আমদানি নির্ভর দেশ। তখন দেশের হাজার হাজার অটো রাইস মিল, কয়েক শত পাট কল বন্ধ হয়ে যাবে। আলু রাখার কোল্ড স্টোরেজ সমূহে তালা ঝুলবে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয়ভাবে এখনই চিন্তা, গবেষণার সময় এসেছে। এ দায়িত্ব যারা দেশ চালাচ্ছেন তাদের। দেশ পরিচালনাকারী মন্ত্রীপরিষদ, এমপি পদ লাভকারী বা সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভকারীরা সুখ নিদ্রায় বিভোর হয়ে থাকলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ভবিষ্যতে যে প্রজন্ম জন্ম লাভ করবে তারাতো আমাদেরই রক্তের উত্তরাধীকার। তাদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনা করে যাওয়া আমাদের এই প্রজন্মের নৈতিক দায়িত্ব। [সমাপ্ত]
ইমেইল: asprodhan61@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ