ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 March 2019, ৭ চৈত্র ১৪২৫, ১৩ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর

সংগ্রাম ডেস্ক : ডানপন্থী বর্ণবাদী মতাদর্শকে নির্মূল করতে আন্তর্জাতিকভাবে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন। ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে বন্দুকধারীর হামলার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাসীর প্রতি এ আহ্বান জানান তিনি। বিবিসি/রয়টার্স।
১৫ মার্চ (শুক্রবার) ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট নামের সন্দেহভাজন হামলাকারীর লক্ষ্যবস্তু হয় নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুইটি মসজিদ। শহরের হাগলি পার্কমুখী সড়ক ডিনস এভিনিউয়ের আল নুর মসজিদসহ লিনউডের আরেকটি মসজিদে তার তাণ্ডবের বলি হয় অর্ধশত মানুষ। ট্যারান্ট তার হামলার দৃশ্য ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিং করে। স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হাতে হামলাকারীর এগিয়ে যাওয়া, মসজিদের প্রবেশকক্ষ থেকে বিভিন্ন কক্ষে নির্বিচারি গুলী বর্ষণ আর রক্তাক্ত নৃশংস পরিস্থিতির ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আরডার্ন। বিবিসির পক্ষ থেকে তার কাছে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। জবাবে আরডার্ন বলেন, ‘সে (ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারী) অস্ট্রেলীয় নাগরিক ছিল। এর মানে এ নয় যে নিউ জিল্যান্ডে এ মতাদর্শের মানুষ নেই। তবে নিউ জিল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একে ঘৃণা করে।’
জাসিন্ডা আরডার্ন মনে করেন, ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের অস্তিত্ব খুঁজে বের করে একে নির্মূল করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের মতাদর্শের উত্থানের পরিবেশ যেন সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বকে ডানপন্থী বর্ণবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে জাসিন্ডা বলেন, ‘অন্য কোথাও বড় হয়ে ওঠা ও সেখানকার মতাদর্শকে ধারণকারী ব্যক্তির সহিংস কর্মকা-ের বলি হয়েছে নিউ জিল্যান্ড। আমরা যদি আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপদ, সহিষ্ণু ও সম্মিলিত জগত নিশ্চিত করতে চাই, তবে সীমানার মধ্যে আটকে থেকে তা চিন্তা করা যাবে না।’
এর আগে মঙ্গলবার (১৯ মার্চ) পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে দেয়া ভাষণে জাসিন্ডা আরডার্ন ক্রাইস্টচার্চ হামলাকারীর নাম মুখে না নেওয়ার শপথ নেন। বলেন, ‘সন্ত্রাসী কর্মকা- সংঘটনের মধ্য দিয়ে সে অনেক কিছু চেয়েছে। এর একটি হলো নিজের অপকর্মের প্রচার চাওয়া। সেকারণে আপনারা আমার মুখে কখনও তার নাম শুনবেন না।’
অন্যদেরকেও হামলাকারীর নাম মুখে না আনার অনুরোধ জানান জাসিন্ডা। বলেন,‘আমি আপনাদেরকে অনুরোধ করছি: যে ব্যক্তি অন্যদের জীবন কেড়ে নিয়েছে তার নাম না নিয়ে যারা জীবন হারিয়েছে তাদের নাম নিন।’
ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলায় নিহতদের দাফন শুরু
নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসীর হামলায় নিহত ৫০ জনের মধ্যে দুজনের লাশ দাফন করা হয়েছে।
বুধবার জানাজার পর ক্রাইস্টচার্চ মেমোরিয়াল পার্ক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সাদা কাফনে জড়ানো এক বাবা ও তার ছেলের লাশ নতুন খোঁড়া একটি কবরে কাবার দিকে মুখ করে শুইয়ে দেওয়া হয়।
নিউ জিল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এ সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের এই কবরস্থানেই দাফন করা হবে।
জানাজা ও দাফনের সময় সেখানে কয়েকশ লোক উপস্থিত ছিলেন। টুপি পরা পুরুষদের পাশাপাশি সালোয়ার, কামিজ ও হিজাব পরা অনেক নারীও ছিলেন।
এই শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য অকল্যান্ড থেকে ক্রাইস্টচার্চে আসা গুলশাদ আলি বলেন, “লাশ কবরে শুইয়ে রাখা হচ্ছে, আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, খুব কষ্ট হচ্ছে।”
পার্কের ভিতরে একটা এলাকায় ওজু করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো এলাকা নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা পুলিশের রিভলভারের হোলস্টারে ও তাদের অত্যাধুনিক রাইফেলে গোঁজা ছিল ফুল।
হামলাকারী জঙ্গি শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারেন্ট (২৮) নিউ জিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডের ডানেডিনে বসবাস করতেন। গত শুক্রবার দুই মসজিদে চালানো নির্বিচার হত্যাকা-ের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নরহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ রিমান্ডে থাকা ট্যারেন্টকে আগামী ৫ এপ্রিল ফের আদালতে হাজির করা হবে। তখন তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনা হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিউ জিল্যান্ডের পুলিশ প্রধান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ও অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ব্রিটেনসহ বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্দেহভাজন জঙ্গির প্রোফাইল তৈরি করছে।
রাজধানী ওয়েলিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ বলেছেন, “এটি পুরোপুরি একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত তা আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি আমি।”
হামলাকারী জঙ্গি পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করেছে এবং কোথাও বেশি দিন বাস করেনি বলে জানিয়েছেন নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ’ডুর্ন।
মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ২১ জন নিহতকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের লাশ দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বুধবার রাতের মধ্যে শনাক্তকরণ শেষ করার কথা রয়েছে।
ইসলামিক রীতিতে মারা যাওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দাফন করার বিধান থাকায় এই দেরিতে নিহতের পরিবারগুলো হতাশ হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ প্রধান বুশ বলেছেন, বিচারক ও ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করতে পুলিশকে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করে দেখাতে হবে তাই বিষয়টিতে সময় লাগছে।
 “মৃত্যুর কারণ বাদ দিয়ে অপরাধ সাব্যস্ত করা যাবে না। তাই এটি একটি ব্যাপক প্রক্রিয়া যা সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে সম্পন্ন করতে হয়,” বলেছেন তিনি।
ওই ঘটনায় আহত ২৯ জন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, তাদের মধ্যে আট জন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আছেন।
নিউজিল্যান্ডের টিভি-বেতারে শোনা যাবে জুমার আজান
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে গত শুক্রবার যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছিল, তাতে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল পুরো বিশ্ব। শুক্রবার ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পূর্ণ হবে। ওই হামলায় হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে আগামী শুক্রবার দেশটির সরকারি টেলিভিশন (টিভিএনজেড) ও বেতারে (আরএনজেড) আযান সরাসরি সম্প্রচারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বুধবার ক্রাইস্টচার্চের একটি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে এ ঘোষণা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্টা আরডার্ন। তিনি আরো জানান, শুক্রবার হামলায় নিহতদের স্মরণে ওইদিন দুই মিনিটের নীরবতাও পালন করা হবে।
 দেশটির ইংরেজি দৈনিক নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড জানায়, স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের ঘটনায় এক মিনিটের নীরবতাই পালন করা হয়। কিন্তু ক্রাইস্টাচার্চের হামলার ভয়াবহতা বুঝাতেই নীরবতার পরিধি দ্বিগুণ করে দেয়া হচ্ছে। ২০১০ সালেও পাইক রিভার বিস্ফোরণে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করেছিল নিউজিল্যান্ড।
হিজাব পরে সংহতি ও প্রতিবাদ জানাবেন নিউজিল্যান্ডের নারীরা
শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডে গত শুক্রবার ঘটে যায় স্মরণকালের বর্বরোচিত হামলা। জুমার নামাজের জন্য উপস্থিত হওয়া নিরস্ত্র মুসল্লিদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় এক বন্দুকধারী। দুটি মসজিদে তার হামলায় নিহত হয় নামাযের জন্য আসা বিভিন্ন দেশের ৫০ জন নারী-পুরুষ-শিশু।
ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে এবং মুসলমানদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে আগামী শুক্রবার (২২ মার্চ) হিজাব পড়বেন নিউজিল্যান্ডের সব ধর্মের নারীরা। এ কর্মসূচির নাম দেয়া হয়েছে ‘সম্প্রীতির জন্য হিজাব’।
মুসলিমদের সাথে দীর্ঘদিন করে কাজ করে আসা থায়া আশমান নামের এক নারী এ আয়োজনের উদোক্তা। এ আয়োজনের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমি এক আতঙ্কিত নারীর কথা শুনেছি যিনি ওই হামলার পর হিজাব পরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ হিজাব পরার কারণে সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।
আশমান বলেন, আমি বলতে চাই, ‘আমরা আপনার সঙ্গে আছি, আমরা চাই আপনি ঘরের মতো রাস্তাতেও যেন নিরাপদবোধ করেন, আমরা আপনাকে ভালোবাসি, সমর্থন ও শ্রদ্ধা করি।’
আশমান এ কর্মসূচি সফল করতে আগামী শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের সব নারীকে হিজাব পরার আহ্বান জানিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত সব মুসলিম সম্প্রদায় এই ধারণাকে সমর্থন দিয়েছে। ইসলামি উইমেন’স কাউন্সিল অব নিউজিল্যান্ডের নেতারা বলেছেন, সংহতির এই উদ্যোগ আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষেরা ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। নিউজিল্যান্ড মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইখলাক কাশকারি এ কর্মসূচিকে ‘সুন্দর ধারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আশমানসহ অন্য আয়োজকরা জানান, আমরা গত শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারানো ৫০ জন মা, বাবা, সন্তান, সহকর্মী ও বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা ও সমর্থন ও সহমর্মিতা জানাতে চাই। মুসলিম কমিউনিটি যে অসহনীয় অবস্থার স্বীকার হয়েছে, এ কঠিন দুঃসময়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। নিউজিল্যান্ডের মানুষ এই শোকে শোকাহত।
বাবা-ভাইয়ের দাফন অনুষ্ঠানে গুলীবিদ্ধ জাইদ
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নিহতদের দাফন করার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে বুধবার। সিরিয়া থেকে আসা অভিবাসী পিতা-পুত্রের দাফন সম্পন্ন হয় সবার আগে। গত বছর তারা নিউজিল্যান্ডে এসেছিলেন শরণার্থী হিসেবে। নিহত ৪৪ বছর বয়সী খালেদ মুস্তাফা এবং তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে হামজা সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন। খালেদের আরেক পুত্র জাইদ গুলীবিদ্ধ হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
বুধবার হুইল চেয়ারে করে বাবা ও ভাইয়ের দাফন অনুষ্ঠানে হাজির হন আহত জাইদ। দাফনের পর কবরের কাছে মুনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাইদ। দাফন শেষে তিনি বলেন, ‘আমার তো এখানে দাড়িয়ে থাকার কথা ছিল না, তোমাদের পাশে আমারও শুয়ে থাকার কথা ছিল’। ওই দিনের নৃশংস হামলা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান জাইদ। তবে তিনি এখনো সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারেননি।
দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় সহায়তা করতে এবং নিহতদের পরিবারকে সমর্থন জানাতে নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রাইস্টচার্চে এসেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। ইসলামিক রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশ কবর দেয়া উচিত, কিন্তু নিহতদের পরিচয় যাচাই করার জন্য এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে।
গত শুক্রবার হামলার শিকার লিনউড মসজিদের কাছে একটি কবরস্থানে জড়ো হন শতাধিক মানুষ।
বুধবারের জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠান নিহতদের পরিবারের সদস্যদের যেন বিরক্ত না করা হয় সেজন্য ক্রাইস্টচার্চ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে সতর্ক করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ