ঢাকা, শুক্রবার 22 March 2019, ৮ চৈত্র ১৪২৫, ১৪ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন এবং পাহাড়ে রক্তপাত

এইচ এম আব্দুর রহিম : দ্বিতীয় ধাপে উপজেলা নির্বাচনে এক মর্মান্তিক হত্যাকা- ঘটে গেল। দিনটি ছিল ১৮ মার্চ। ভোটগ্রহণ শেষে সরঞ্জামাদি নিয়ে জেলা সদরে ফেরার সময় দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের নয় মাইল এলাকায় ব্রাশফায়ারে আবার রক্তাক্ত হল পাহাড়। পাহাড়ে রক্তপাতের বিষয়টি নতুন কিছু না হলেও সোমবারের মর্মন্তুদ ঘটনাটি সংঘাত ও পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানির বিষয়টি নতুন করে ভাবনার উদ্বেগ ঘটিয়েছে। 

 রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচন শেষে দায়িত্বপালনরতরা ফেরার পথে দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের নয় মাইল এলাকায় দুর্বৃত্তদের সশস্ত্র হামলার শিকার হন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ৭ জন নিহত হয়। ১৬ জন মতান্তরে ২০ জন আহত হয়। তবে বিবিসির সংবাদে সংখ্যা চিত্র আরো বেশি। শেষ পর্যন্ত যেটুকু জেনেছি তা হলো। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রাথমিক ধারণা। কিন্তু একই সঙ্গে এ সন্দেহও রয়েছে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কারণে ফের এ ঘটনা ঘটল কিনা। পাহাড়ী এলাকায় ২০১৭ সাল থেকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত মার্চ পার্বত্য এলাকা পান ছড়িতে ইউপিডিএফ নেতাকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এও জেনেছি, ২০১৭ সালের ওই মাস থেকে তখন পর্যন্ত ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে প্রাণহানি ঘটেছে ৫২ জনের। এর সাথে যুক্ত হবে বর্তমানের সংখ্যাচিত্র। সংখ্যাটি যাইহোক মানুষের হাতে মানুষ হত্যা কাম্য নয়। পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক দলগুলো বিগত প্রায় দু’বছর ধরে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে আছে এবং একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে, পাল্টাপাল্টি ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরস্পর বিরোধী কয়েকটি পক্ষ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। 

দলীয় প্রতীকে হয়ে যাওয়া এই নির্বাচনে বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। এর ফলে কয়েক ধাপে হতে যাওয়া এই নির্বাচন হয়ে পড়েছে একতরফা। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বলতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বনাম তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী। কোথাও কোথাও সরকারি জোটভুক্ত অন্য দলের প্রার্থী থাকলেও এ সংখ্যা নগণ্য। কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি প্রার্থী অংশ নিলেও তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ২০ দলীয় জোট এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচনটি একবারে একতরফা হয়ে গেছে। একতরফা নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ কমেছে এবং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই প্রশ্ন ও বিস্ময়সূচক হয়ে পড়েছে। 

১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়া উপজেলা নির্বাচনে ভোটার খরা লক্ষ্য করা গেছে। ভোটার শূন্য নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য কতটা বিব্রতকর জানি না। আমাদের জন্য সুখকর নয়। তবে বর্তমান সরকারের নির্বাচন হাস্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছরে হয়তবা এমন নির্বাচন কেউ দেখেনি। এমন নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত বলা যায়। ভোটার বিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্যে সৌন্দর্যহানি ঘটায় এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যতকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। দেশের পঞ্চমধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত ১১৬ উপজেলার একতরফা নির্বাচনে বল প্রয়োগ, ভোট কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া ইত্যাদি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আর বিস্ময়কর উদ্বেগের বিষয় হলো, খোদ নির্বাচন কমিশনেই এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এও নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং রাজনীতির জন্য অশুভ বার্তা। ভোট কেন্দ্রগুলোতে বহুবিদ অনিয়ম আর ভোটদানে ভোটারদের অনীহার দায়টা কার? এই প্রশ্নের জবাবটা জটিল কিছু নয়। নির্বাচন কমিশন এই দায় এড়াতে পারে না। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সংবিধান অনুযায়ী যে রকম করা দরকার দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দায়িত্বশীলরা তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কোনো স্থানীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত নয়। ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে এ নিয়ে প্রশাসনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি আর লুকানো নয়। ভোটাধিকার প্রয়োগে ভোটদাতাদের উৎসাহে ভাটা পড়া কিংবা উৎসাহে ভাটা পড়ার চিত্র যেভাবে উৎকটরূপ নিচ্ছে, তা জাতির জন্য নেতিবাচক লক্ষণ। জাতীয় নির্বাচন থেকে এ স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচন পর্যন্ত জনগণের প্রতিনিধিত্বের নীতি হুমকির মুখে পড়েছে। সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের যদি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না করা যায় এবং নির্বাচন যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হয় ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সবার সমানাধিকার নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে ভোটারদের হৃত আস্তা পুনরুদ্ধার করা যাবে না। 

 নির্বাচন কমিশন, সরকারি দল কিংবা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্য সব মহলেরই এ ব্যাপারে দায় থাকলেও মুখ্য ভূমিকাটা তো পালন করতে হবে নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে এই বাংলাদেশে যে নির্বাচন প্রত্যক্ষ করছি, তা হতাশার মাত্রা যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি ভবিষ্যত নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক প্রশ্নও দাঁড়িয়েছে। 

 এদিকে পাহাড়ি এলাকায় যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে সেখানে ১১টি নৃগোষ্ঠি রয়েছে। ফলে আন্তঃসম্পর্কের বিষয়টি জটিল হওয়ার কথা সকলেরই জানা। বাঘাই ছড়িতে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত। একথা দৃঢ়ভাবে বলা যায়। 

এসব নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোতে অর্থাৎ জনসংহতি সমিতি ও ইউডিপিএফের সব গোষ্ঠীর সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নেই। কারণ লোকসংখ্যা, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক অবস্থান। এসবের নিরিখে নৃগোষ্ঠীগুলোর অবস্থান সমানুপাতিক নয়, সেটলারদের বিষয়টিতো রয়েছেই; ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনগোষ্ঠিগুলোর মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় অসন্তোষ কাজ করে। নৃগোষ্ঠিগত অসন্তোষ সাংঘর্ষিক মাত্রায় নেই, তবে আছে। থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের প্রতিনিধি রাজনৈতিক গোষ্ঠিগুলোর দ্বন্দ্ব সাংঘর্ষিক। শান্তিচুক্তির পরও সরকার নির্ভয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি। এসবের জন্য কে দায়ী পাহাড়িরা, বাঙালিরা, নাকি বর্হিদেশীয় কেউ, নাকি সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান? অনিরাপত্তা, ভয়ের কারণগুলো স্পষ্ট করতে পারছে না সরকার। আওয়ামী লীগ বিএনপি বিভিন্ন বাম সংগঠন, অধিকার সংক্রান্ত সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা পার্বত্য এলাকায় সহিংসতা বন্দের ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে, অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলে। সরকার মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়; কিন্তু অস্ত্র উদ্ধারে আমলযোগ্য নয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, ক্ষমতার রাজনীতি প্রসূত বিরোধ থামছে না। পাহাড়িদের ভিতরে যেমন দ্বন্দ্ব সংঘাত রয়েছে, পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব ও সংঘাত রয়েছে। কখনো পাহাড়ি এক অংশের উপর আর এক অংশের উপর হামলা চলছে। আবার কখন পাহাড়িরা হামলা করছে বাঙালিদের উপর। এসব ঘটনায় বিভিন্ন পক্ষ জড়িত। কখন বিদেশীগোষ্ঠী ইন্ধনদাতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট থাকছে। কিন্তু কোনো ঘটনার তদন্ত সন্তোষজনক ‎মাত্রায় হচ্ছে না। দায়ী ব্যক্তিরা চি‎ি‎‎হ্নত হচ্ছে না ও আইনের আওতায় আসছে না। এসব কারণে পার্বত্য এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর লোকই হোক বা বাঙালি হোক, ভয় কাজ করে। আক্রান্ত মানুষগুলো মামলা করতে ভয় পায়। 

পাহাড়ি জনপদ বাঘাইছড়িতে যে রক্তগঙ্গা বইয়ে গেল, এর প্রতিকারে দৃষ্টি দিতে হবে উৎসে। পাহাড়ে ফের সংঘটিত এই ঘটনাটি পুনর্বার প্রমাণ করল, অস্ত্রধারী পাহাড়ে এখন শক্তিশালী। এ হামলার জন্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা ) সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফকে দায়ী করলেও উভয় সংগঠনই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ ব্যাপারে নির্বাচনে অংশ নেয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির (এমএন লারমা) প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বলেছেন, ‘সন্তু লারমার জেএসএসের বড় ঋষি নিশ্চিত পরাজয় জেনে সকালে নির্বাচন বর্জন করেন। তাই সরকারি কাজে নিয়োজিতদের উপর হামলা চালিয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা) বাঘাইছড়ি উপজেলার সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এই ঘটনার সাথে আমাদের দূরতম সম্পর্ক নেই। কারণ আমাদের ওই এলাকায় কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। পুরোটা ইউডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। আর আমরা যেহেতু সকলেই নির্বাচন বর্জন করেছি এবং লিখিতভাবে আমাদের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি সেহেতু কেন আমরা এ কাজ করব? আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আমাদের আস্তা আছে। তবে আমাদের বক্তব্য হলো, এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে যেন রহস্য কোনো ভাটা না পড়ে। যে দৃষ্টিকোণ থেকে এ ঘটনা বিশ্লেষণ করি না কেন, এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এই হামলা যে যারাই করে থাকুক এর লক্ষ্য ভালো ছিল না। যাইহোক, চূড়ান্ত অর্থে ঘটনাটি ফের সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, পাহাড় নিয়ে পাহাড় ষড়যন্ত্রের কথা অতীতে অনেক শোনা গেছে। পাহাড় নিয়ে রাজনীতির নানা রকম কূটচাল আছে, এও শোনা যায়। বাঘাইছড়িতে কয়েক বছর আগে রক্তপাত হয়ে ছিল। পাহাড়ি এলাকায় থেমে থেমে এমন মানবিক বিপর্যয়ের জন্য যারা দায়ী হোক, এর শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। আর তা না করতে পারলে সেখানে সহাবস্থান আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ঘাতকদের খুঁজে বের করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর সবাই আশা করেছিল আবার শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে নানা রকম অভিযোগ রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন মতও আছে। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হয়েছিল। কিন্তু এর সুফল তারা পায়নি। তার উপর খোদ চুক্তিই উপজাতি ও পাহাড়ি বাঙালিদের ভয়াবহ বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। পাহাড়ে বিভিন্ন গ্রুপের কাছে অস্ত্র আছে তা উদ্ধার করা জরুরি। ১৮ মার্চের ঘটনার দৃষ্টি শুধু নির্বাচনী কোন্দলের দিকে নিবদ্ধ না রেখে আর ও গভীরে যেতে হবে। পাহাড়ে শুধু রক্ত ঝরছে। গত ১৫ মাস ধর সংঘাত ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটলে ও প্রশাসন কার্যকরি ব্যবস্থা নিতে পারেনি। লেখক : সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ