ঢাকা, শনিবার 23 March 2019, ৯ চৈত্র ১৪২৫, ১৫ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : গত ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং সেখানকার বৌদ্ধধর্মানুসারীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে ভয়াবহ হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ এবং গ্যাংরেপ চালিয়েছে তা ধারণার চেয়েও ভয়াবহ ও লোমহর্ষক। গেরুয়া পরিহিত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের দলবেঁধে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। ছেলেমেয়ের সামনে মাকে অথবা বাবা-ভাইকে গাছের সঙ্গে হাতপা বেঁধে তরুণীদের সম্ভ্রম ছিনিয়ে নিয়েছে মিয়ানমার সেনাসদস্য ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী যুবকরা। সেনাসদস্য ও তরুণদের সম্মিলিত যৌননির্যাতনের দাপটে রোহিঙ্গা নারী শিশুদের জীবনবিপন্ন হবার পরও রেহাই দেয়া হয়নি। এরপর তাদের টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। জীবন থাকতেই অনেককে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। অনেক রোহিঙ্গা তরুণীকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে গাছের সঙ্গে বেঁধে গ্যাংরেপ চালানো হয়। এমন ঘটনার বীভৎস ছবিও ইন্টারনেটে দেখা গেছে।
গত ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জান বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা সবকিছু ফেলে এসেছেন। অনেক পরিবারের বহু লোককে সেখানকার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা হত্যা করেছে। মা ও শিশুদের রেপ করে মেরেছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। লুটে নিয়েছে তাঁদের সম্পদ, দোকানপাট ও ব্যবসাবাণিজ্য। যারা চলে এসেছে তাদের প্রাণটা ব্যতীত কিছুই নেই। হাজার হাজার বিধবা ও এতিম শিশু প্রতিবেশীদের সঙ্গে চলে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) সেসময় জানায়, নিখোঁজ পিতামাতার সংখ্যা ৪৩ হাজার ৭০০। এসংখ্যা কেবল যাদের মা-বাবা সঙ্গে নেই। এর কারণ হচ্ছে এসব মা-বাবাকে মিয়ানমার সেনাসদস্য ও অস্ত্রধারী বৌদ্ধরা হত্যা করেছে অথবা তাঁরা কোথাও রয়েছেন যাদের খোঁজ জানা নেই। এক হিসেবে জানা যায়, নিধনযজ্ঞ শুরুর প্রথম কয়েকদিনেই ৬,৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হন।
ফোর্টিফাই রাইটস এর ম্যাথিও স্মিথ বলেন, চলমান নিষ্ঠুরতার মাত্রার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন হতে শুরু করেছে নিখোঁজ পিতামাতার সংখ্যার মাধ্যমে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী সেসব অঞ্চলে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছ তার প্রত্যক্ষদর্শী এবং যারা পালিয়ে এসেছে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দেয়া হয়েছে। হতে পারে, নিখোঁজ পিতামাতার উল্লেখযোগ্য অংশকেই হত্যা করা হয়েছে। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের আগস্টে যে তিনটি শহরতলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে নির্বিচারে গণহত্যা ও গ্যাংরেপ চালানো হয়।
উল্লেখ্য, এসোসিয়েটেড প্রেস গত ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতার কেন্দ্র ও দারপিয়িনের কাছে একই স্থানে কমপক্ষে ৫টি গণকবরের বিস্তারিত সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা বলেছেন, ওই একটি গ্রামেই নিহত রোহিঙ্গার সংখ্যা মিয়ানমার সরকারের দেয়া নিহতের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি ডাইরেক্টর (এশিয়া) ফিল রবার্টসন বলেন, সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৪০০ নিহত হয়েছে বলে মিয়ানমার সরকারের দেয়া তথ্য একটি ‘বাজে কৌতুক’। প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিতে তারা তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান চালানো অব্যাহত রেখেছে। আর এটা করা হচ্ছে নিষ্ঠুরতার ঘটনায় স্বাধীন অনুসন্ধানের গুরুত্বকে হালকা করবার জন্য।
গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ৬ লাখ ৭১ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে শিবিরে গাদাগাদি করে ঠাঁই নিয়েছেন। এদের অনেকেই শরীরে বুলেট ও যৌননির্যাতনের ক্ষত সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের শিবিরে আশ্রয় নেয়াদের ৬০ শতাংশই শিশু। এদের সিংহভাগেরই মা-বাবা নেই। এরা মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক তাদের মা-বোনদের যৌননির্যাতনের শিকার হওয়াসহ আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবার ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে।
মালয়েশিয়ান পার্লামেন্ট মেম্বার ও এপিএইচআর এর চেয়ারম্যান চার্লস সান্টিয়াগো বলেন, আমরা অনেক অনেক শিশু প্রত্যক্ষ করেছি, যাদের মা-বাবা উভয়কেই হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাসদস্য ও তাদের বৌদ্ধ সহযোগিরা। এ হতভাগ্য শিশুদের কক্সবাজার নিয়ে এসেছেন ওদের প্রতিবেশী কিংবা কোনও পথচারী।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, ৫,৬০০ শিশু যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তারাই এখন তাদের পরিবারের প্রধান বনে গেছে। তারাই এখন ছোটছোট ভাইবোনদের দেখভাল করছে। এছাড়া তাদের উপায়ও নেই। আগে মনে করা হচ্ছিল, ২,৬৮০ শিশু তাদের মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ কিংবা এতিম। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দেয়া নতুন তথ্য বলছে, এসংখ্যা আরও অনেক বেশি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, শিবিরের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পলিথিন ও কাঁচাবেড়ার ঘর অল্প বৃষ্টিবাতাসে উড়ে যায়। অনেকের মাথার ওপর সামান্য ছাউনিও নেই।
চার্লস সান্টিয়াগো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শিবিরগুলো থেকে শুরু হবে মানবপাচার। এর কারণ হচ্ছে, রোহিঙ্গারা ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা অন্য যেকোনও দেশে চলে যাবার জন্য বদ্ধপরিকর।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সেনানির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা গ্রাম ও জমিতে ঘাঁটি স্থাপন করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, গত ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়িঘর বাজারহাট বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেবার পর সেখানে এখন সেনাঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জায়গাজমি দখল করে নেয়া হয় সেনাঘাঁটি স্থাপনের নামে। অন্তত ৩ টি সেনাঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে গত ১২ মার্চ এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। -দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ মার্চ, ২০১৮।
বলতে দ্বিধা নেই, মিয়ানমার থেকে এখনও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে। সেখানে এখনও জুলুম-নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী বৌদ্ধ অস্ত্রধারীরা। অথচ বিশ্ববাসীকে দেখানো হচ্ছে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে প্রস্তুত হচ্ছে।
জাতিসংঘসহ বিশ্ববাসীর চাপের মুখে বসতভিটা ও দেশ থেকে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে ঠেলে দেবার পর আর যাতে ফেরৎ নিতে না হয় বা রোহিঙ্গারা নিজেই না ফেরে সেজন্য সব ফন্দিফিকির করছে মিয়ানমার সরকার এবং সেনাবাহিনী। নোবেল বিজয়ী মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। বিশ্ব তাঁকে ধিক্কার জানালেও তিনি নির্বিকার। বরং মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার বৌদ্ধদের নরহত্যা এবং নারীশিশু ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী কর্মকা- সমর্থন করে যাচ্ছেন। অথচ সেদেশের সেনাশাসিত সরকার যখন তাঁকে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী করে রেখেছিল তখন বিশ্ববাসী সুচির পক্ষে ছিল সোচ্চার। কী অদ্ভুত দ্বৈতনীতির প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ালেন এখনকার মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি! নিজেকে তিনি এতোটা ‘অশুচি’ করে তুলবেন তা কি কারুর জানা ছিল এদ্দিন?
বৌদ্ধরা তাদের ধর্মবিশ্বাসকে অহিংসার ধর্ম বলেন। বুদ্ধদেবকে অহিংসার দেবতা বা ভগবান বলে সম্মান করেন। পূজো করেন তাঁর। কিন্তু একী নারকীয় আচরণ তাঁর অনুসারীদের? সত্যই লজ্জাজনক মনে হয় গেরুয়া ঘাগরার ভেতর ধারাল কৃপাণ লুকিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা যখন রোহিঙ্গা নারীশিশু ধর্ষণসহ নরহত্যার হোলিউৎসবে মেতে ওঠেন। বৌদ্ধদের রক্তমাখা হাত দেখে বিবেকবান মানুষের মুখ লুকোবার জায়গা থাকে না।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার বৌদ্ধসন্ন্যাসীরা ব্রাসফায়ার করে রোহিঙ্গা পুরুষ ও যুবকদের হত্যা করে নদীতে নিক্ষেপ করেছে। কুকুর দিয়ে খাইয়েছে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ। গণকবর দেয়া হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে। গর্ভবতী রোহিঙ্গানারীদের পেটে লাথি অথবা বেয়নেটের খোঁচা মেরে বাচ্চা বের করে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা শিশু, তরুণী কিংবা বৃদ্ধাকেও রেহাই দেয়নি বৌদ্ধ পশুরা। ২০/৩০ জন সেনাসদস্য ও বৌদ্ধ অস্ত্রধারী পর্যায়ক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একেক নারীর ওপর। আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অনেকেরই মাতৃদ্বার। এমন অমানবিক জুলুম-নিপীড়নের শিকার হয়েই রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। কবে তারা দেশে ফিরতে পারবেন কে বলবে? ওদেরতো সবই শেষ করে দেয়া হয়েছে সেখানে।
বাংলাদেশ মানবতার খাতিরে সাময়িকভাবে আশ্রয় দিলেও এভাবে আর কদ্দিন সম্ভব হবে রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ করা? এছাড়াও প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গাশিশু জন্মগ্রহণ করছে শরণার্থীশিবিরগুলোতে। এদের অনেকেই তখন মাতৃগর্ভে আসে মিয়ানমার সেনাসদস্য, বৌদ্ধযুবক ও গেরুয়া ঘাগরা পরিহিত সন্ন্যাসীদের যৌননিপীড়নের ফলে। এখন স্বাভাবিকভাবেই বহু শিশু জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন শিবিরগুলোতে। তার মানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। পক্ষান্তরে ধীরেধীরে বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা হ্রাস পাচ্ছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন। বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা! কীভাবে এদের সামলাবে বাংলাদেশ? রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য পাওয়া যায় বটে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাও যা আসে তা ওদের কাছে যায় না। অভিযোগ উঠেছে, ওরা পায় মাত্র ২৫ শতাংশ। বাকিটা খায় ভুতে এবং এনজিও কর্মকর্তারা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যতো বিলম্ব হবে এনজিওগুলো ততো লাভবান হবে। এছাড়া প্রকৃত অর্থে মিয়ানমারও চায় না বিতাড়িত রোহিঙ্গারা আবার নিজবাসভূমে ফিরুক। এই হচ্ছে রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডির রহস্য। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মূলত বাংলাদেশ এখন একা। চীন ও রাশিয়া নেই। বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি পাশে না পেছনে তাও রহস্যঘেরা। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে থাকতে হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ