ঢাকা, রোববার 24 March 2019, ১০ চৈত্র ১৪২৫, ১৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য করার প্রস্তাব ভিপি’র ভিন্নমত

গতকাল শনিবার ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম কার্যকরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পদাধিকারবলে ডাকসু সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সভাপতিত্ব করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর, জিএস গোলাম রাব্বানীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় ডাকসুর নবনির্বাচিত ২৫ সদস্যের সবাইও উপস্থিত ছিলেন -সংগ্রাম

# পুনর্নির্বাচনের যৌক্তিক দাবি আদায়ে দায়িত্ব নিয়েছি -নূর
স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের অভিষেককে স্মরণীয় করে রাখতে বর্ণাঢ্য অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে যাচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অতিথি করা হবে। এ দিকে প্রথম সভায় তিন দশক পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন ডাকসুর প্রথম সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য করার প্রস্তাব উঠলে তাতে ভিন্নমত জানিয়েছেন ভিপি নুরুল হক নূর। পুনর্নির্বাচনের দাবিতে মৌন মিছিল করেছে ছাত্রদল।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে দেড়টা পর্যন্ত ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম কার্যকরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম সভা ছিল এটি। এতে পদাধিকারবলে ডাকসু সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সভাপতিত্ব করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর, জিএস গোলাম রাব্বানীসহ অন্যান্য নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় ডাকসুর নবনির্বাচিত ২৫ সদস্যের সবাই উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ভিপি নূর ও সমাজসেবা সম্পাদক আকতার হুসেন বাদে সবাই ছাত্রলীগের। একই সময় বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে হল সংসদের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে প্রথম কার্যকরী পরিষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভা শেষে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বড় আকারের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তারা করবে। সেখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অথবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে থাকবেন। একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করার দায়িত্ব দিয়েছি কার্যকর পরিষদকে। ভিপি, জিএস, এজিএসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা বিভিন্ন কমিটি করে আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এটি আমাদের বড় দাগের আজকের সিদ্ধান্ত।
ডাকসু কেন্দ্রীয় সংসদের সভা শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ভিসি ও ডাকসুর সভাপতি মো. আখতারুজ্জামান, সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী।
সভা শেষে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, আজকের সভায় আমাদের প্রথম প্রস্তাব ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মান জানিয়ে আজীবন সদস্য পদ দেয়া। ইতিপূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এই সদস্য পদ দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ডাকসুর সর্বসম্মত সমর্থনের পর আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়ে ভিসির কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। ভিসি বলেছেন, পরবর্তী সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব আকারে এ বিষয়ে জানাবেন।
ভিপি নুরুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার ব্যাপারে সভায় আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এটি নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌঁছাইনি। এই নির্বাচন নিয়ে একটি প্রশ্নবিদ্ধ জায়গায় যেহেতু আমরা রয়েছি, সে রকম একটি জায়গা থেকে আমি মনে করি না এখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য পদ ঘোষণা করা উচিত। সেই জায়গা থেকে আমিসহ কয়েকজন বিষয়টির বিরোধিতা করেছেন।
নুরুল হক যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখনই পাশ থেকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলে ওঠেন, ‘কয়েকজন না, শুধু আপনি (একজন) বিরোধিতা করেছেন।’ নুরুল হক রেগে গিয়ে বলেন, ‘আমি কিছু বলব না। আমার কথা আপনিই বলেন।’ রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডাকসু একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান...’ তখন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নূর, আপনি শেষ করেন। রাব্বানী, আপনার বক্তব্য আমরা শুনব।’
নুরুল হক এরপর বলতে শুরু করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান। ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ তার জন্য বড় কিছু না। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যখন আমরা দায়িত্ব নিচ্ছি, তখন আমার ভাইয়েরা মিছিল করছে, পুনঃনির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। ভিপি হিসেবে আমি তাদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছি। সভায় ভিসি স্যারকে অনিয়মের বিষয়ে আমি বলেছি। বলেছি যে পুনর্নির্বাচন হওয়া দরকার। যেহেতু নির্বাচনটি সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নির্বাচনটিকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী আটজন নিরপেক্ষ শিক্ষকও পুনরায় নির্বাচন চেয়েছেন। আমরা চাই না, এমন একটি বিতর্কিত নির্বাচনে আজীবন সদস্য ঘোষণা করা হোক।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক বলেন, ‘পুনর্নির্বাচনের দাবিসহ শিক্ষার্থীদের যেসব যৌক্তিক আন্দোলন রয়েছে, সেগুলো আদায় করার জন্যই আমি দায়িত্ব নিয়েছি। আমি কিন্তু বলিনি, আমি পুনর্নির্বাচন চাই না। পুনর্নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত যেহেতু ডাকসু কার্যকর থাকবে, সেহেতু যেখান থেকে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে কথা বলা যাবে, সেখান থেকে আমি কথা বলব। সে জন্যই আমি দায়িত্ব নিয়েছি।’
এরপর ভিপি নুরুল হক চলে গেলে গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ডাকসুর ২৫ জনের মধ্যে ২৩ জন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেছেন। একমাত্র ভিপিই দ্বিমত পোষণ করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে (২৩:২ অনুপাতে) গৃহীত হয়ে গেছে, এটি মীমাংসিত ইস্যু। সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনও প্রস্তাবের পক্ষে ছিল। বেসিক্যালি, ২৪:১ অনুপাতে সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে। আমাদের সংসদের সভাপতি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। যেহেতু অনুপাত আমাদের পক্ষে, আশা করি ইতিবাচক ফলাফল পাব।’
সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে নির্বাচিত ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্যপদ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ দেওয়ার বিষয়ে ভিসি মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রী ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে যে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছেন, যে আশ্বাস তিনি আমাদের দিয়েছেন, সেটির সফল বাস্তবায়ন তিনি করেছেন, যার ফলে আমরা এই নির্বাচন আয়োজনে আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছি এবং নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী অনুভব করেছি। সে জন্য ডাকসুর কার্যকরী পরিষদের সবাই একেবারে সহমত জ্ঞাপন করেছেন যে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে ডাকসুর আজীবন সদস্য পদ দেব। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রস্তাবটি ধন্যবাদের সঙ্গে গৃহীত হলো। গঠনতন্ত্র দেখে পরবর্তী সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ্যাজেন্ডা আকারে নিয়ে এসে এই মহৎ কাজটি করব।’
সভার বিষয়ে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বৈঠকে যেসব বক্তব্য শুনলাম, সেগুলো এতই আশাপ্রদ এবং তাদের যে মূল্যবোধ, সেগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেছে। সম্পাদকীয় পদগুলোতে যাঁরা রয়েছেন তাদের সাধারণ সম্পাদকের (জিএস) সঙ্গে সমন্বয় করে নিজেদের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে। ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে একেবারেই আস্থাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখে এত বড় একটি নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম’ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।
যখন ডাকসুর কার্যকরী সভা চলছিল, সেই মুহূর্তে ডাকসুর পুনর্নির্বাচন ও নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের পদত্যাগ দাবি করে ক্যাম্পাসে কালো ব্যাজ ধারণ করে মৌন মিছিল করে ছাত্রদল।  ছাত্রদলের কর্মসূচির বিষয়ে ভিসি মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এখানে সবারই মত প্রকাশের অধিকার আছে।
সিনেটে ডাকসু থেকে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে বলে জানান ভিপি নুরুল হক। তিনি বলেন, ভিসি স্যার ভিপি, জিএস ও এজিএসকে সিনেটের জন্য পাঁচজন প্রতিনিধি নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছেন। সভায় সব প্যানেলেরই সাধারণ দাবি ছিল, হলে গণরুম- গেস্টরুম এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সিট দেওয়া বন্ধ করা।
এদিকে সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশা ও সাইকেলের জন্য একটি আলাদা লেন এবং ক্যাম্পাসে রিকশা ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন ছাত্রলীগের প্যানেলের প্রার্থীরা। এ বিষয়ে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী বলেন, বিভিন্ন আবাসিক এলাকার মতো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন থেকে সাড়ে তিন শ’ রিকশাকে প্রাথমিকভাবে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হবে এবং নির্দিষ্ট পোশাক দেয়া হবে। এ ছাড়া, পরবর্তী সভায় আমরা ক্যাম্পাসে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ