ঢাকা, রোববার 24 March 2019, ১০ চৈত্র ১৪২৫, ১৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি মনোমুগ্ধকর ইমারত ‘ছোট কাটরা’ এখন অস্তিত্ব সংকটে

মনোমুগ্ধকর ইমারত ‘ছোট কাটরা’ -সংগ্রাম

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি মনোমুগ্ধকর ইমারত ‘ছোট কাটরা’ প্রাচীন ঐতিহ্যম-িত পুরান ঢাকার চকবাজারে নির্মিত হয়। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সুন্দর ও ছিমছাম ঢাকা শহরের পত্তন ঘটে এখান থেকেই। তবে নানা অবহেলায় পুরান ঢাকা ধীরে ধীরে তার সুশ্রী, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। বিশেষ করে চকবাজারের ছোট কাটরা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এখানে আর সহজে মিলবে না ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর। স্থাপনাটি বংশগত সূত্রে ৬৪ জন ব্যক্তির নামে লিজ দেওয়া হলে পরবর্তীতে তারা নিজেদের মালিক দাবি করে ভবনের সামনে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছেন। এমনকি ডিআইটি ও রাজউকের ম্যাপ থেকেও ছোট কাটরা, বড় কাটরা ও ভাওয়াল জমিদার বাড়ি মুছে ফেলা হয়েছে।
ছোট কাটরা : ছোট কাটরা সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি একটি ইমারত। আনুমানিক ১৬৬৩ - ১৬৬৪ সালের দিকে এ ইমারতটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং তা ১৬৭১ সালে শেষ হয়েছিল। এটির অবস্থান ছিল বড় কাটরার পূর্বদিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। ইমারতটি দেখতে অনেকটা বড় কাটরার মত হলেও এটি আকৃতিতে বড় কাটরার চেয়ে ছোট এবং এ কারণেই হয়তো এর নাম হয়েছিল ছোট কাটরা। তবে ইংরেজ আমলে এতে বেশ কিছু সংযোজন করা হয়েছিল। ১৮১৬ সালে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক লিওনার্দ ঢাকার প্রথম ইংরেজি স্কুল খুলেছিলেন। ১৮৫৭ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকার প্রথম নরমাল স্কুল। উনিশ শতকের শেষ দিকে অথবা বিশ শতকের প্রথম দিকে ছোট কাটরা ছিল নবাব পরিবারের দখলে। এবং তাতে তখন কয়লা ও চুনার কারখানার কাজ চলত। বর্তমানে ছোট কাটরা বলতে কিছুই বাকি নেই শুধু একটি ভাঙা ইমারত ছাড়া। যা শুধু বিশাল তোরনের মতন সরু গলির উপর দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে অসংখ্য দোকান এমন ভাবে ঘিরে ধরেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে মুঘল আমলের এমন একটি স্থাপত্য ছিল। ছোট কাটরা আকৃতি : ছোট কাটরা  ঢাকার বড় কাটরা হতে প্রায় ১৮৩ মি. পূর্ব দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি নওয়াব শায়েস্তা খান ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন। বড় কাটরা যে উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল, প্রায় সে উদ্দেশ্যেই ছোট কাটরা নির্মিত হয়েছিল। পরিকল্পনায় ও নির্মাণ কৌশলে ছোট কাটরা অবিকল বড় কাটরার মতো। কিন্তু আকারে ছোট। আয়তাকৃতির ছোট কাটরার পরিমাপ বাইরে থেকে ১০১.২০ মি/ ৯২.০৫ এবং ভেতরে ৮১.০৭ মি/ ৬৯.১৯মি। এর বাইরের প্রাচীর ০.৯১ মি থেকে ১মি পুরু এবং এর প্রতিরক্ষা বুরুজের দেওয়াল যেখানে সবচেয়ে পুরু সেখানে হলো ১.২২ মিটার। ছোট কাটরার উত্তর ও দক্ষিণে রয়েছে দুটি প্রবেশপথ। এর মধ্যে দক্ষিণেরটি প্রধান প্রবেশপথ।
ছোট কাটরার খিলানসমূহ তিনভাঁজ বিশিষ্ট। মিনারগুলি মজবুত এবং অন্যান্য মুগল মিনারের তুলনায় মোটা। প্রাসাদের সিঁড়ি ও মেঝে কাঠ দিয়ে তৈরী। কাঠের সিঁড়িগুলি ছিল বেশ চওড়া। একতলায় একটি কক্ষকে বিভক্ত করা হয়েছে আড়াআড়িভাবে-একটি লম্বা ও অপরটি চওড়া দ্বিতল অত্যুচ্চ প্রবেশপথ দুট সংস্কার করা হলেও এখনও প্রবেশপথ দুটি চিত্তাকর্ষক। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণবেষ্টিত চারপাশের ভবনাদি বহুবার নবায়ন, পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। আদি ভবনে অনেক আধুনিক সম্প্রসারণ হয়েছে। নদীর দিকে তিনতলা বিশিষ্ট প্রবেশপথে কিছু ঔপনিবেশিক বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। ত্রয়ী জানালায় ও সুউচ্চ পার্শ্ব বুরুজে পরবর্তী সংস্কারের সময় ঔপনিবেশিক প্রভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। বিবেচনাহীন পরিবর্তন ও অনাকাঙ্খিত নবায়ন এবং প্রাঙ্গণে দোকান-পসারের ঘেঁষাঘেঁষিতে এর পূর্ব আকৃতি ও সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে ছোট কাটরাকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এখনও এর ধ্বংসাবশেষ দেখলে বোঝা যায় মোঘল আমলে নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা কাটরাকে কী সুন্দরই না দেখাত।
ছোট কাটরার সাথে বিবি চম্পার স্মৃতিসৌধ অবস্থিত ছিল। এক গম্বুজ, চার কোণা, প্রতিপাশে ২৪ ফুট দীর্ঘ ছিল স্মৃতিসৌধটি। তায়েশ লিখেছেন পাদ্রী শেফার্ড ওটা ধ্বংস করে দিয়েছেন। শেফার্ড বোধহয় কবরটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। বিবি চম্পা কে ছিলেন তা সঠিক জানা যায় নি। তবে কারো মতে তিনি শায়েস্তা খাঁর মেয়ে। তবে এখানে বড় কাটরা এবং ছোট কাটরা নামে সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। তাই স্থাপনা না থাকলেও সড়কের নামের মাধ্যমে বেঁচে আছে মুঘল আমলের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা দুটির নাম।
বর্তমান অবস্থা : সরেজমিন দেখা গেছে, ছোট কাটরার কিছু অংশ দখল করে আছেন স্থানীয় কিছু সাবান ও প্লাস্টিক ফ্যাক্টরির মালিকরা। ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজার বাড়িটিরও পুরনো চিত্র বের করা প্রায় দুরূহ হয়ে পড়েছে। যার দেওয়াল ও ভবন দখল করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এটি বংশগত সূত্রে ৬৪ জন ব্যক্তির নামে লিজ দেওয়া হলে পরবর্তীতে তারা নিজেদের মালিক দাবি করে ভবনের সামনে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছেন। এমনকি ডিআইটি ও রাজউকের ম্যাপ থেকেও ছোট কাটরা, বড় কাটরা ও ভাওয়াল জমিদার বাড়ি মুছে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন বহুতল ভবনের আধিক্যে আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন। যেগুলো খুঁজে বের করতে ঐতিহ্যপ্রেমীদের বেশ বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণ ও দখল চলছে কয়েকশ’ বছরের পুরনো মোগল স্থাপত্য ছোট কাটরার ভিতরে ও বাইরে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ