ঢাকা, সোমবার 25 March 2019, ১১ চৈত্র ১৪২৫, ১৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সুপরিকল্পিতভাবে ভাঙনের অপচেষ্টা চলছে -মির্জা ফখরুল

গতকাল রোববার আইডিইবি মিলনায়তনে কেএম ওবায়দুর রহমান স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত ওবায়দুর রহমান স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

# যতদিন তাকে সরিয়ে দিতে না পারছি ততক্ষণ লড়াই চালাব --- মান্না
# ড. কামালের কঠোর সমালোচনায় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন
স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সুপরিকল্পিতভাবে ভাঙন সৃষ্টির অপচেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রোববার বিকেলে এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আজকে খুব সুপকিল্পিতভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে জনগণের ঐক্যকে ভেঙে ফেলার। যে ঐক্য তৈরি হয়েছে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, জনগণ যেভাবে নির্বাচনে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছে এই স্বৈরাচারি আওয়ামী লীগ সরকারকে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে, সেই ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, দেশনেত্রীর নির্দেশে আমরা এই ঐক্যকে আরো সুদৃঢ় করবো এবং সমগ্র বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারকে আমরা পরাজিত করবো।
কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে কেএম ওবায়দুর রহমান স্মৃতি সংসদ আয়োজিত বিএনপির সাবেক মহাসচিব কেএম ওবায়দুর রহমানের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি টিএম গিয়াস উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সম্রাটের পরিচালনায় আলোচনা সভায় জেএসডি সভাপতি আ স ম রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মরহুম নেতার মেয়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়দুল ইসলাম রিংকু বক্তব্য রাখেন।
দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশেই জাতীয় ঐক্য হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে বাংলাদেশে একটা গণতন্ত্রহীন অবস্থা বিরাজ করছে। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে ভুলন্ঠিত করে শুধুমাত্র কর্তৃত্ববাদী শাসনকে আজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে আমরা নির্বাচনকে আমাদের আন্দোলনের একটা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। এটা বেছে নিয়েছিলাম আমাদের গণতন্ত্রের মাতা আমাদের দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশে। আমাদের যে নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়েছিল সেখানে দেশনেত্রী পরিষ্কার করে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে, দলমত নির্বিশেষে সকলকে গণতন্ত্রের পক্ষে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে এবং এই স্বৈরাচারকে পরাজিত করার জন্য সেই ঐক্যকে নিয়েই লড়াই করতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার পূর্বেও আমরা নেত্রীর সঙ্গে কারাগারে যোগাযোগ করেছি। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, নির্বাচনে যেতে হবে এবং ঐক্য গড়ে তুলতে হবে জনগণের মধ্যে। এমনকি নির্বাচনের পরেও তিনি (খালেদা জিয়া) এই নির্দেশই দিয়েছেন যে, এই ঐক্যকে ধরে রাখতে হবে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আবেগ দিয়ে শুধু যুদ্ধ জয় করা যায় না।
নেতাদের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আজকে এখানে অনেকে অনেক কথা বলছেন। আমরা দেখেছি, আমাদের নেত্রীর গ্রেপ্তারের পরে যখন আমরা কর্মসূচি দিয়েছি আমরা তো সবচেয়ে ভালো দেখেছি, কতজন এসেছেন, কতজন আসেননি। আমরা তো দেখেছি কারা কারা সেই কর্মসূচির মধ্য থেকে আস্তে আস্তে চলে গেছেন। আমরা তো দেখেছি, এই নির্বাচনের মধ্যে কারা বেরিয়ে এসেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, প্রতিবাদ করেননি। শুধুমাত্র কথা বলে, শুধুমাত্র একটা বন্ধ আবদ্ধ ঘরের মধ্যে নিরাপদ জায়গায় এসব কথা বলে আমরা সেই শত্রুকে (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে পারবো না। 
মির্জা ফখরুল বলেন, একটা কথা বলি, কথা সবাই বলতে পারেন কিন্তু কাজ করতে হবে। কে কত জন নিয়ে আসছেন বা না আসছেন, কে কতটুকু বিপ্লবের পথে যাচ্ছেন, বিদ্রোহের পথে যাচ্ছেন সেই বিষয়গুলো অবশ্যই আপনাদের মানতে হবে। এ সময়ে নেতা-কর্মীদের আসন থেকে দুই-একজন কর্মী কথা বলতে চাইলে ফখরুল বলেন,  ইয়েস কে কথা বলছেন আসেন। মঞ্চে আসেন।
ছাত্রদলের ঢাকা কলেজের একজন কর্মী মহাসচিবের কাছে এসে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের যে সর্বশেষ কর্মসূচি দেয়া হয়েছে সেখানে ম্যাডামের মুক্তি চাওয়া হয়নি কেনো?
মির্জা ফখরুল বলেন,  প্রশ্নই উঠে না। কে বলেছে একথা। প্রথমে কর্মসূচি গেছে, মুক্তির কথা ছিলো। এখনো কর্মসূচি চলছে। এসব মিথ্যা কথা বলবে না।
মাইকে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,  কখনোই জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। আমি যে কথা বার বার বলি, যারা জনগণকে বিভ্রান্ত করি, জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না, উচিত নয়। রাজনৈতিক শক্তি যারা আছেন, সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক যারা আছেন তাদেরকে এসব উপলব্ধি করতে হবে।
আজকে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, এই ভয়ংকর ফ্যাসিবাদকে সরাতে হবে ক্ষমতা থেকে। সেই সরাতে গিয়ে সেই ঐক্য ভেঙে গেলে আর কোনো দিন তাদের সরাতে পারবেন না। আজকে আমাদের ছোট-খাটো সমস্যাকে বড় করে না দেখে অটুট ঐক্য গড়ে তুলে হবে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের এগুতে হবে। আসুন এই দখলদার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করি। দলের সাবেক মহাসচিব মরহুম কেএম ওবায়দুর রহমানের আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান বিএনপির মহাসচিব।
বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকে বলেন যে, বিএনপি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমি বলি বিএনপি কোনো দিন নিঃশেষ হবে না। কারণ বিএনপি জনগণের দল, এই দেশের মাটির গন্ধ হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি, এদেশের জনগণের শ্রমের যে ঘাম, সেটা হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি। একথা মনে রেখে আমাদেরকে সামনের দিকে এগুতে হবে।
এরশাদ আমল থেকে বিএনপিকে ভেঙ্গে ফেলার নানা ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, অনেকবার বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু কেউ সফল হয়নি। বহু চেষ্টা হয়েছে এখন পর্যন্ত বিএনপির একজন কর্মীকেও কেউ সরিয়ে নিতে পারেনি।
প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, কেনো এই নির্বাচনে আমরা গেলাম। কথা হলো- নিদর্লীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না, কিন্তু তাতো হলো না। দলীয় সরকারের অধীনেই হলো। কথা হলো খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন হবে না কিন্তু খালেদা জিয়া ছাড়া আমরা নির্বাচনে গেলাম। তারপরেও কেনো সেই নির্বাচন। কেনো এই অবস্থা হলো? কেনো আজো খালেদা জিয়া জেলে? কেনো একটা দাবিও সরকার মানলো না, কী কারণে এটা হলো? এর কারণ অবশ্যই বের করতে হবে। যদি বের করতে ব্যর্থ হই আবার ব্যর্থ হব। আমার অনেক প্রশ্ন আছে আজকে এখানে করব না। দলীয় মিটিংয়ে বলব।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নাম উল্লেখ না করে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আমি স্বাধীনতার ইতিহাস জানি। সে সময়ে কেযায় নাই ভারতে আমরা সব চলে গেলাম। এনটায়ার কেবিনেট চলে গেলো। গর্ভনর হাউজে (বর্তমানে বঙ্গভবন) ইয়াহিয়া খানের সাথে কথা বলার সময়ে যে ব্যক্তি ছিল সর্বক্ষণ, সে গেলো না। তাজউদ্দিন আহমেদ সাহেবের রিসেন্টলি একটা বই বেরিয়েছে সেটা আপনারা পড়বেন- সেটাতে লেখা আছে তার যাওয়ার কথা ছিল আমাদের সাথে। সে যায়নি। আমি নাম বলতে চাই না এই মুহূর্তে। ১৪ জুন পর্যন্ত ঢাকা থাকলেন, তারপর জিওসি টেলিফোন করে বললেন, আমাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দাও। পাঠিয়ে দেয়া হলো। তার স্ত্রী একজন সিন্দি..।
তিনি বলেন, আমরা তার (ড. কামাল হোসেন) ইতিহাস জানি। বাংলাদেশে তার কোনোদিন কোনো আসন ছিলো না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে এক সময়ে সে (ড. কামাল হোসেন) বৃদ্ধ সাত্তার সাহেব (বিচারপতি আবদুস সাত্তার) আমার চাচা শ্বশুর দুঃসম্পর্কে তার কাছে এক কোটি ভোটে হেরেছিলেন। আমরা তাকে নেতা মানলাম। কেনো ফখরুল (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) কী দোষ করেছিল? মহাসচিব ফখরুল, আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আমাদের তো অন্য কারো দরকার নেই। আমাদের কারো দরকার ছিল না। আমরা যা পারি করবো, না পারলে করবো না- নির্বাচন করবো না। কিন্তু এটা কী হলো? ঠাটা পড়লো সমগ্র জাতির উপরে। এ সময়ে মঞ্চে বসা রব, মান্না, বিএনপি মহাসচিবসহ নেতৃবৃন্দদের বিব্রত দেখাচ্ছিল।
জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব সরকারের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মনে করছেন, এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এভাবে টিকে থাকবেন। আমি বলছি, অসম্ভব। হিটলার নাই, মুসোলিনী নাই, ফেরাউন নাই, সাদ্দাম হোসেন নাই, আপনারাও থাকবেন না। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সকল মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে যেমন জনগণ বের করে নিয়ে এসেছে, খালেদা জিয়াও সেভাবেই মুক্ত হবেন। আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয় না। মনে করেন, ৪/৫ দিনে আন্দোলন থেমে গেছে। আমি বলি, আন্দোলন জমা থাকে। সকল আন্দোলন পুঞ্জীভূত হয়ে যখন বিস্ফোরিত হবে সেদিন তারা ভেসে যাবে। হতাশ হওয়ার কিছু নাই।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি মনে করি, যতক্ষণ পর্যন্ত এই অনাচার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে না পারছি, জিততে না পারছি, তাকে সরিয়ে দিতে না পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চালাব। আমি আহ্বান জানাবো ঐক্যবদ্ধভাবে দৃঢ়ভাবে লড়াই চালাতে হবে তার বিকল্প নাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ