ঢাকা, বৃহস্পতিবার 28 March 2019, ১৪ চৈত্র ১৪২৫, ২০ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

৭ বছরেও সম্পন্ন হয়নি পেট্রোল থেকে অকটেন রুপান্তর প্রকল্প

স্টাফ রিপোর্টার: দেশে বর্তমানে বছরে এক লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন প্রয়োজন। দৈনিক চাহিদা দুই হাজার ৭৫৬ ব্যারেল। জ্বালানী তেলের এ চাহিদা মাথায় রেখে ২০১২ সালে নেয়া হয়েছিল পেট্রলকে অকটেনে রূপান্তর প্রকল্প। এরই মধ্যে সময় পেরিয়েছে প্রায় ৭ বছর। একদিকে বাড়ছে সময় অন্যদিকে বাড়ছে ব্যয়। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪৯৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
জানা গেছে, পেট্রল ও অকটেন দুটোই গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে পেট্রলের তুলনায় অকটেন গাড়ির ইঞ্জিন বেশি ভালো রাখে। দেশে অকটেনের চাহিদা মেটাতে বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এজন্য দামও পড়ে বেশি। অথচ পেট্রলকে অকটেনে রূপান্তর করতে পারলে যানবাহনের ইঞ্জিন ভালো থাকবে, সঙ্গে আমদানি খরচ না থাকায় কমবে অকটেনের দাম।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ২০১২ সালের মার্চ থেকে পেট্রলকে অকটেনে রূপান্তর করতে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সরকার। পেট্রলকে অকটেনে রূপান্তরের জন্য সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের অধীনে রশিদপুরে দৈনিক ৩০০০ ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিট স্থাপন’ নামে ওই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের জুনে। তবে তা শেষ হয়নি। এরপর সময় বাড়ানো হয়, কিন্তু তারপরও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ সময় বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বিধায় আবারও চলছে সময় বাড়ানোর আবেদন!
প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘এখন আর সমস্যা হবে না। আশা করি, জুন-জুলাইতে এটি ভিজিবল (দৃশ্যমান) হবে।’
পিডির তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীন বাংলাদেশে পেট্রলকে অকটেনে রূপান্তরের এটিই একমাত্র সরকারি উদ্যোগ। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নবেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১৭ দশমিক ৫১; বাস্তব অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৯১ শতাংশ।
দুবার সময় বাড়ানোর পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী জুনে। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) চলতি বছরের জানুয়ারির এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রকল্পের কাজ শেষ হতে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘আমরা এ বছরই শেষ করব, ইনশাআল্লাহ। ইতোমধ্যে আমরা সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছি। আবেদন অনুমোদন পর্যায়ে আছে।’ সময় বাড়লেও প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় বাড়ছে না বলেও জানান তিনি।
প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪৯৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ব্যয় বাড়া প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এ প্রকল্পের প্রথমে যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, সে সময় এর আকার ছোট ছিল। আস্তে আস্তে প্রকল্পের আকার বড় হয়েছে, এ কারণে ব্যয়ও বেড়েছে।’
২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সিলেট গ্যাস ফিল্ডে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত প্রকৌশলী মো. শোয়েব। এখন পর্যন্ত প্রকল্প শেষ না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পেট্রল অকটেনে রূপান্তরের ইউনিট স্থাপনের জায়গা দুবার পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বশেষ তৃতীয়বারে এসে ২০১৫ সালে জায়গা পাওয়া গেছে। চারবার দরপত্র আহ্বানের পর জুটেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ ইউনিট স্থাপনের জন্য বিশেষায়িত কিছু যন্ত্রপাতিও যথাসময়ে পাওয়া যায়নি। এসব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে এত দেরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম মনে করেন, পেট্রল অকটেনে রূপান্তর করার এ প্রকল্পের যৌক্তিকতা রয়েছে। তার মতে, ‘পেট্রল তো বাংলাদেশে তৈরি হয়। কিন্তু এর আর ডিমান্ড (চাহিদা) নেই। পেট্রলে গাড়ি কম চলে, অকটেনে বেশি চলে। অকটেন আমাদের আমদানি করতে হয়। আমাদের পেট্রল যেটা অতিরিক্ত আছে, সেটাকে যদি অকটেনে রূপান্তর করতে পারি, তাহলে আর আমদানি করতে হবে না। অকটেনে রূপান্তর করা গেলে অকটেন ও পেট্রল- দুটোই আমদানি থেকে রেহাই পাব।’
অকটেন ও পেট্রলের দামের মধ্যে পার্থক্য কম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ দুটোর দামের পার্থক্য বেশি নয়। তবে পেট্রলের চেয়ে অকটেনের চাহিদা বেশি। আমাদের নিজস্ব যে পেট্রল, সেটা থেকে যে অকটেন উৎপাদন হয় তার গুণগত মান ভালো নয়। এটা ৮৭ মাত্রার হওয়া উচিত। কিন্তু তা হয় না, হয় ৮৩-৮৪ মাত্রার। এটাও একটা সমস্যা। পেট্রলটা সরাসরি বিক্রি করাও কঠিন।’
‘পেট্রল ও অকটেনের দামের পার্থক্য বিশ্বের কোথাও বেশি নয়। তবে আমাদের পেট্রলের ওপর মানুষের আস্থা কম’- মন্তব্য এ অধ্যাপকের।
দামের পার্থক্য খুব বেশি না হলেও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ করে ‘পেট্রলকে অকটেনে রূপান্তর’ প্রকল্পের কাজ চলছে। এ বিষয়ে মোহাম্মদ তামিম বলেন, ‘এখন দেখতে হবে, প্রতি বছর আমরা কত কোটি টাকার অকটেন আমদানি করি। যদিও সে তথ্য আমি জানি না। ৫০০ কোটি টাকা খরচ করে যদি আমরা আমদানি খরচ কমাতে পারি, সেটা তো অবশ্যই ভালো।’
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সভার ওই কার্যপত্র থেকে জানা যায়, রশিদপুর কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে প্রকল্প সাইট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার চার ইঞ্চি ব্যাসের মোটর স্পিরিট পাইপলাইন স্থাপন শেষ হয়েছে। স্থাপিত পাইপলাইনগুলো নাইট্রোজেন দিয়ে প্রেসারাইজড করা হচ্ছে। ইক্যুইপমেন্ট ফাউন্ডেশনের ২৬৪টি পাইলিং এবং ১৬২ মিটার ড্রেনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তিনটি কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে এবং রাস্তার কাজ চলমান আছে। পাইপ ও পাইপ ফিটিংসের ৪০ শতাংশ মালামাল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। প্লান্টের পাইপলাইন ফেব্রিকেশন কাজের আইসো মেট্রিক ড্রয়িং পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে পিডি মো. শোয়েব বলেন, ‘কাগজে-কলমে ২০১২ সালে প্রকল্পের শুরু দেখালেও আমরা জায়গা পেয়েছি ২০১৫ সালে। এলাকার লোকজন জায়গা দিতে চায় না। সরকারি জায়গা অ্যাকুইজিশন (অধিগ্রহণ) করা বিরাট টাফ (কঠিন) একটা কাজ।
তিনি আরও বলেন, ‘আসলে এটা একটা বিশেষায়িত প্রকল্প। এটা ইআরএল (বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড) করেছিল পাকিস্তান আমলে। তারপর আর সরকারিভাবে এ ধরনের প্লান্ট হয়নি। যেহেতু এটা কনভেনশনাল প্ল্যান্ট (গতানুগতিক প্রকল্প) নয়, এ কারণে টেন্ডার করে প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান পাইনি। প্রত্যায়নে গিয়ে আমরা প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান পেয়েছি। তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’
ইন্দোনেশিয়ার একটা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদারির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
‘মূলত কেনাকাটায় দেরি হয়ে গেছে’ উরেøখ করে এ প্রকৌশলী বলেন, ‘এখানে কিছু বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ছিল, সেগুলো যখন অর্ডার করে কন্ট্রাক্টর (ঠিকাদার), আসলে ওই কোম্পানিগুলো সেগুলো সরবরাহ করতে পারেনি। আমরাও বলেছিলাম, আমরা যেসব যন্ত্রপাতি চেয়েছি, সেগুলোই আনতে হবে। এজন্য একটু পিছিয়ে গেছি।’
‘এখন আর সমস্যা নাই’ উল্লেখ করে পিডি আরও বলেন, ‘আমাদের ফাউন্ডেশনের কাজ শেষ। প্রকিউরমেন্টও (কেনাকাটা) প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ। মালামাল সব অর্ডার হয়ে গেছে। জাহাজে রয়েছে সব মাল। সাইটে কিছু কিছু আসা শুরু করেছে। এখন তারা (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) বসাবে সব। এখন আর সমস্যা হবে না। আশা করি, জুন-জুলাইতে ভিজিবল (দৃশ্যমান) হবে।’
২০১৮ সালের নবেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেয়া হয়েছে মোট বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। এ বিষয়ে মো. শোয়েব বলেন, ‘যখন প্রকল্প শেষ হবে, তখন ফাইন্যান্সও (টাকা দেয়া) একবারেই শেষ হয়ে যাবে। নিয়ম হলো, মাল এলে পেমেন্ট (টাকা পরিশোধ) আস্তে আস্তে হয়ে যাবে। যখন প্ল্যান্ট বসানো হবে, তখন ফুল পেমেন্ট পেয়ে যাবে ওরা।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ