ঢাকা, শুক্রবার 29 March 2019, ১৫ চৈত্র ১৪২৫, ২১ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কর্মসংস্থানহীন জিডিপিতে সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ

 

এইচ এম আকতার : মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) উচ্চতর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন দেশে কর্মসংস্থানহীন জিডিপি বাড়ছেই। ফলে কর্মসংস্থানহীন জিডিপিতে সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। চলতি অর্থবছরে প্রাক্কলিত জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে তুলনামূলক বিচারে বাড়েনি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। তাই এই প্রবৃদ্ধি কিভাবে সম্ভব তা প্রশ্নসাপেক্ষ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ছাড়া শুধু সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে এর সুফল সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তারা।

চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রথমবারের মত ৮ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রাক্কলন করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। অর্থবছরের প্রথম আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যে হিসাব করেছে, তাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে এবার বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করছে সরকার।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর গত অর্থবছর বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৭৫১ ডলার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেন তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

তবে গত জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মত সরকার গঠন করার পর থেকেই নতুন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলে আসছিলেন, প্রবৃদ্ধির হার এবারই আট শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। প্রায় এক দশক ৬ শতাংশের বৃত্তে ‘আটকে’ থাকার পর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ‘ঘর’ অতিক্রম করে। এরপর তা ৮ শতাংশের ঘরে পৌঁছাতে সময় লাগলো মাত্র তিন বছর।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়াবে প্রায় ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৭ কোটি টাকায়। গত অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রাক্কলিত যে হিসাব দিয়েছে, তাতে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত অর্থবছরের এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এছাড়া কৃষি খাতে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং সেবা খাতে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে এবার, যা গতবার যথাক্রমে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ ও ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল। অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশ বিনিয়োগে আসছে বলে এই হিসাবে ধরা হয়েছে। গত অর্থবছর এই হার ছিল ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ। এবারের বিনিয়োগের মধ্যে সরকারি খাতের অবদান ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ, আর বেসরকারি খাত থেকে ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ আসছে বলে তথ্য দেন মন্ত্রী।

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যে নির্ণায়ক সূচক প্রয়োজন সেখানে অনেক ঘাটতি রয়েছে। প্রবৃদ্ধি যে হিসেবে বলা হচ্ছে তা অন্যান্য সূচকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি যদিও কম মাত্রায় দেখানো হয়েছে, এটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

পিআরআই নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের জাতীয় আয়ের যে মূল্যায়ন করা হচ্ছে তা সঠিকভাবে হচ্ছে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় উপাদান বিনিয়োগ। অর্থনীতিবিদদের মতে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিনিয়োগ দরকার জিডিপির অন্তত ৩৫ শতাংশ। সেখানে রয়েছে মাত্র সাড়ে ৩১ শতাংশ।

বিশ^ব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ স্থবির, সেখানে তেমন কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। প্রবৃদ্ধির সাথে বিনিয়োগের ধারায় একটি অসঙ্গতি রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং আয় বৈষম্য কমিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন হবে টেকসই নীতি কাঠামো।

আগে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি থাকলেও এখন আয়হীন কর্মসংস্থান হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) উচ্চতর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন দেশে আয়হীন কর্মসংস্থান হচ্ছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে চললেও তা সত্যিকার অর্থে মানুষের আয় বাড়াচ্ছে না। তিনি উল্লেখ করেন, প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়, এই চারটি সূচকের মধ্যে সামঞ্জস্য না হওয়ায় দেশের যে উন্নতির কথা বলা হচ্ছে তার কোনও সুফল মানুষ পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, সরকারের হিসাব থেকে আমরা দেখছি, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। পাশাপাশি আমরা দেখছি, দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। প্রবৃদ্ধি দিয়ে তো আমাদের কিছু হবে না। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্ক করতে পারি, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, এর ফলাফলটা কী। মানুষের কর্মসংস্থান হলো কিনা, আয় হল কিনা সেটাই বড় বিষয়।

মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈষম্যও বেড়েছে বলে মনে করেন সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয়। তার মতে, বাংলাদেশে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে। আয় কমেছে উত্তর বাংলায়, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এতদিন আমরা উচ্চতর প্রবৃদ্ধির জন্য তাগাদা দিয়েছি। এই উচ্চতর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আজকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে শোভন কর্মসংস্থান। কারণ যে কর্মসংস্থানটুকু তৈরি হয়েছে, সেটুকু হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। সেখানে আয় কম। ফলাফলটা হলো কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির বিপরীতে আমরা এখন আয়হীন কর্মসংস্থান পাচ্ছি।

দেবপ্রিয় বলেন, প্রায় এক দশক ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে থাকার পর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ অতিক্রম করে। এরপর গত দুই অর্থবছর ধরেই প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাও সরকারি বিনিয়োগের কারণে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ গত তিন বছর ধরে প্রায় একই জায়গাতে স্থবির। তাহলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে বেসরকারি ঋণপ্রবাহ যে বাড়ছে, সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশে ধরাবাহিকভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এতে করে দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়ছেই। জিডিপি বৃদ্ধির অন্যতম উপাদান হলো সাধারন মানুষের কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিতভাবে বেড়েই চলছে জিডিপি। কিন্তু এর সুফল পাচ্ছে না সাধারন মানুষ। তাহলে এই জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে কি হবে।

দেশে যেহারে প্রতি বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাতে বেকার থাকার কথা নয়। তাহলে এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে কি হবে। দেশে মাথা পিছু আয়ের পরিমাণও বাড়ছে। সেহারে বিনিয়োগও হওয়ার কথা। আর বিনিয়োগ হলে কাংখিত কর্মসংস্থানও হওয়ার কথা। কিন্তু তা যেহেতু হচ্ছে না। তাহলে বুঝতে হবে গোড়ায় গলদ রয়েছে। 

পরিসংখ্যানের নানা মারপ্যাচে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের এই হিসাব থেকে হয়তো সাধারণ জনগণ বাদ পড়ছে। আর তা না হলে হিসাবে বড় ধরনের কোন গোজা মিল রয়েছে। কোন দেশের কর্মসংস্থানের দিকে তাকালেই বুঝা যাবে সেদেশের জিডিপির পরিমাণ কত হতে পারে। যে দেশের জিডিপির ৮ শতাংশের ওপরে সে দেশে বেকার থাকতে পারে না। প্রতিটি শ্রমিকের আয়ের পরিমানও বাড়বে। তাহলে কিভাবে আয়হীন জিডিপি বাড়ে। একই সাথে কর্মসংস্থানহীন জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে এর গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ