ঢাকা, শনিবার 30 March 2019, ১৬ চৈত্র ১৪২৫, ২২ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অরক্ষিত হয়ে পড়েছে সরকারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সার্ভার সিস্টেম

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : সরকারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সার্ভার অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। কারসাজির সাথে জড়িত রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমান সরকারের সময়ে আর্থিক শৃঙ্খলার এমন বেহাল দশা যে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার এ জায়গা থেকেও অর্থ চুরি হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের চলতি সময়ে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন (৮ কোটি ১০ লাখ) ডলার বাংলাদেশি টাকায় ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ফিলিপাইনের হ্যাকাররা। সরকারের আরেক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ প্রতিষ্ঠানের সার্ভারও অরক্ষিত। এনবিআরের সার্ভারে অনুপ্রবেশ বা হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সরকারি আইডি ও পাসওয়ার্ড চুরি করে পণ্য পাচারে জড়িত সংঘবদ্ধ একটি চক্র তিন বছরের বেশি সময় ধরে এই সার্ভারের অবৈধ ব্যবহার করেছে। আর এ সময়ে চক্রটি শত শত কোটি টাকার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় করে নিয়েছে। সরকারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের এমন ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনাকে ভয়াবহ নিরাপত্তা ঘাটতি হিসাবে দেখছেন।
জানা গেছে, রিজার্ভের চুরি টাকা ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার এখনো পর্যন্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ অর্থ চুরির সাথে যারা জড়িত তাদেরও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রিজার্ভ চুরির অর্থ ফেরাতে আজও পর্যন্ত কোনো কূল-কিানার করতে পারেনি সরকার। রিজার্ভ চুরির সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি চক্র জড়িত আছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, ব্যাংকের ভিতরের লোক জড়িত না থাকলে এতো বড় ঘটনা ঘটা সম্ভব না।  
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০০ কোটি ডলার সরাতে মোট ৩৫টি অনুরোধ পায় নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ। এর প্রথম চারটি অনুরোধে তারা ফিলিপিন্সের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ৮১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করে। পঞ্চম আদেশে শ্রীলঙ্কায় প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে একটি ‘ভুয়া’ এনজিও’র অ্যাকাউন্টে ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হলেও বানান ভুলে সন্দেহ জাগায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।
এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫)-এর ৪ ধারাসহ তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৪ ধারায় ও ৩৭৯ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। পরে ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ তদন্তকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৭৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। কমিটি নির্ধারিত মেয়াদের আগেই অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট জমা দেয়। কমিটি যে রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দেয় ওই রিপোর্ট আজও প্রকাশ করা হয়নি। ফিলিপাইন সরকারও ওই রিপোর্টটি চেয়েছে বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু সে সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন ফিলিপাইনকে দেয়া হবে না। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
এ দিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য ফাঁসে বাংলাদেশ ব্যাংকে তোলপাড় শুরু হয়। এফবিআই বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার রিজার্ভ চুরিতে ব্যাংকটির ভেতরকার ব্যক্তিদের যোগসাজশ ছিল। এবং এফবিআইয়ের এজেন্টদের দাবি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এফবিআইয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্যের পর ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি) জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিজেদের গাফিলতির দায় এড়াতে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসিকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাতে চাচ্ছে। ব্যাংকটি অভিযোগ করে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দেশের অভ্যন্তরের একটি চক্র জড়িত থাকার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার প্রতিবেদন দাখিলের সময় গত বছরের জুন পর্যন্ত ২৪ বার পিছানো হয়েছে। সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খান বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন। রিজার্ভ চুরির এ ঘটনা দেশের মানুষের মনকে চরমভাবে ব্যথিত করে। সর্বক্ষেত্রে তৈরী হয় নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি। এটাকে দেশের আর্থিক শৃঙ্খলার চরম ঘাটতি হিসাবে দেখা হয়।
রিজার্ভ চুরির ঘটনার ক্ষত থাকতেই আরেকটি বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে। সরকারের আরেক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ প্রতিষ্ঠানের সার্ভারও অরক্ষিত। এনবিআরের সার্ভারে অনুপ্রবেশ বা হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সরকারি আইডি ও পাসওয়ার্ড চুরি করে পণ্য পাচারে জড়িত সংঘবদ্ধ একটি চক্র তিন বছরের বেশি সময় ধরে এই সার্ভারের অবৈধ ব্যবহার করেছে। আর এ সময়ে চক্রটি শত শত কোটি টাকার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় করে নিয়েছে। সরকারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের এমন ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনাকে ভয়াবহ নিরাপত্তা ঘাটতি হিসাবে দেখছেন। তাদের প্রশ্ন তাহলে সরকারের সব প্রতিষ্ঠান কি একই রকম অবস্থায় আছে। এসব ঘটনা রীতিমতো আতঙ্কের বলে মন্তব্য করেন তারা। 
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমি দেখেছি এ ধরণের ঘটনা আগেও ঘটেছে। কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটা আমরা নেবো। আমার মনে হয়, আগে থেকেই আমাদের এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। এনবিআরে এই ঘটনার শুরু ২০১৬ সালে- এ বিষয়ে মুস্তাফা কামাল বলেন, এটা একই রকমভাবে হচ্ছে। অফিসারদের আইডি কার্ড ইউজ করে কনসাইনমেন্টগুলো রিলিজ করা হয়। সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয়, সার্ভার আরও অনেক বেশি সংরক্ষিত হওয়া দরকার। ফ্রাঙ্কলি বলছি, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্ভার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ‘শত শত কোটি টাকার পণ্য’ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করে নেওয়া জালিয়াত চক্রটিকে চিহ্নিত করা বলে জানিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। ইতিমধ্যে চক্রটি চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের সংশ্লিতার নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে, মামলা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুল হাকিমের নেতৃত্বে একটি তদন্ত টিম কাজ করছে।
শহিদুল জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাসের ঘটনায় রমনা থানায় গত ১৬ জানুয়ারি একটি মামলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ৩০টি কনটেইনার ছাড় করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে। পণ্য খালাসে জড়িত দুইটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মালিককে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন- মো. মিজানুর রহমান চাকলাদার ওরফে দীপু ও  অপু চাকলাদার। এই ঘটনায় ২২টি পণ্যের চালান বেরিয়ে গেছে। যেখানে ঘোষণা ছিল স্টিল জাতীয় পণ্যের। তবে কি জাতীয় পণ্য বেরিয়ে গেছে তা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি।
জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাসের ঘটনা আব্দুল হাকিমের নেতৃত্বে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে কমিটি ছাড়াও আরও তিনটি কমিটি কাজ করছে বলে জানান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত কমিটির প্রধান কমিশনার (আপিল) ফখরুল আলম, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) কমিটির প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিচালক খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেন এবং চট্টগ্রাম কাস্টমসের গঠিত কমিটির প্রধান যুগ্ম কমিশনার এইচ এম শরিফুল হাসান। এ ঘটনায়ও জড়িত রাঘব-বোয়ালরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন কি-না সেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, টেকনোলজি যত ডেভেলপ করবে এই বিপদগুলো তত থেকে যাবে। আমরা আমাদের টেকনোলজি শুধু বাড়াচ্ছি, কিন্তু এগুলোর সেইফটি-সিকিউরিটি বাড়াচ্ছি না। প্রত্যেকটির পেছনে একাধিক ফায়ারওয়াল রাখতে হবে। একটা ভাঙ্গতে পারলে আরেকটা...আমরা যেন সিকিউরড থাকি। ওই ওয়ালগুলো আমাদের তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু আমরা ফলাফল খুব কমই পাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ