ঢাকা, শনিবার 30 March 2019, ১৬ চৈত্র ১৪২৫, ২২ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ফতুল্লার ফজলে রাব্বীর পরিবারে শোক

নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা : রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত ২৫ জনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ফজলে রাব্বীর পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ভূইগড় এলাকার জহিরুল হক সেলিমের ছেলে ফজলে রাব্বী। স্বামীর মৃত্যুর খবরে প্রায় আড়াই বছর বয়সী শিশুপুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভুগছেন স্ত্রী সাবিয়া আক্তার। আর একমাত্র উপার্জনকারী ফজলে রাব্বীকে হারিয়ে হতবাক অসহায় হয়ে পরেছে পরিবার। জীবনে বেঁচে থাকা আর সন্তানের ভবিষ্যতের সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন স্ত্রীর।
রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত ২৫ জনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূইগড় এলাকায় বাড়ি করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন নিহত ফজলে রাব্বীর পিতা জহিরুল হক সেলিম। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে নিহত ফজলে রাব্বী মেঝ।
শুক্রবার ভোর রাতে ঢাকা  মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহত ফজলে রাব্বীর লাশ নিজ বাড়িতে আনা হয়। তখন থেকেই আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িতে আসতে শুরু করেন। শরীর জ্বলসে যাওয়ায় লাশ রাখা হয় বাড়ির সামনে লাশবাহী গাড়িতে। দূর-দূরান্ত থেকে তার বন্ধুবান্ধব এবং স্বজনরা বাড়িতে ভীড় জমায় শেষবারের মতো মুখটি দেখতে। পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতন। বাদ জুম্মার পর ভূইগড় ঈদগাহ মাঠে জানাযা শেষে ভূইগড় কবরস্থানে দাফন করা হবে।
নিহতের গ্রামের বাড়ি বিবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার সাতমোড়া। নিহত ফজলে রাব্বী ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাস করে ২০১৫ সালে ইউরো ফ্রেড ফরোয়ার্ডিং কোম্পানিতে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মকত ছিলেন। প্রায় চার বছর আগে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে প্রায় আড়াই বছর বয়সী (দুই বছর চার মাস) হৃদয়ান একমাত্র সন্তান। ভাল বেতনে ভালই চলছিল তাদের সংসার। হঠাৎ কালো ছায়া নেমে আসলো কর্মস্থল রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডে। অগ্নিকান্ডে আটকা পড়ে থাকাবস্থায় মৃত্যুর আগে ফজলে রাব্বী পাশের ভবনে থাকা তার ছোট ভাই রিফাত আলম ও তার বন্ধুর সাথে বারবার আগুনের অবস্থা সর্ম্পকে খোঁজ নিচ্ছিল। বাঁচার জন্য বারবার ভাইয়ের কাছে জানতে চাচ্ছি লাফিড়ে পড়বে কিনা। উপযুক্ত সার্ভিসের অভাবে ফজলে রাব্বি মারা  গেছে এমন অভিযোগ করে ভাই ও বন্ধু। ফজলে রাব্বীকে বলি উপরে উঠে বসে থাকতে। একটা ৫৩ মিনিটে তার সাথে সর্বশেষ কথা হয়। ধোয়ার কারণে সে কোথাও মুভ করতে পারছিলো না। তার পর আর কোন কথা হয়নি।
নিহতের বাবা জহিরুল হক ওরফে সেলিম জানান, মেয়ে ফোন করে জানান বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লেগেছে। এরপর ছেলেকে ফোন করি। কিন্তু সে জানায় বাবা আমি বের হওয়ার কোন রাস্তা পাচ্ছি না। যে ফ্লোরে কাজ করি সেখানে আটকা পড়ে আছি। পরে আবার ফোন করি। ফোন রিসিভ করে। কিন্তু সে কোন কথা বলতে পারে নাই। শুধু কান্নার শব্দ। পরে লাশ উদ্ধারের পর ফোন করে তার ফোনটি অন্য একজন রিসিভি করে মৃত্যুর খবর জানিয়ে বলে লোক পাঠান।
একমাত্র উপার্জনকারী ছেলেকে হারিয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ নিহত ফজলে রাব্বীর মা শাহনাজ বেগম পরিবারের অসহায় অবস্থা নিয়ে হতাশ হয়ে পরেছেন। মা শাহানাজ বেগম জানান, সকালে নাস্তা করে অফিসে যাওয়ার সময় বলে মা আমি যাচ্ছি। দুপুর বারোটার দিকে অফিস থেকে নেমে ফোন দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে মা বাবু খেয়েছে কিনা খবর নেয়। পাশের টাওয়ারে ছোট ছেলে কাজ করে। সে ভাইকে ফোন করে বলে ভাই তুই উপরে যা নিজেকে বাঁচা। দুপুর একটার সময় রাব্বি আমাকে ফোন করে। কিন্তু সে কোন কথা বলতে পারেনি। আগুন নেভাতে পারেনি। আমার বাবাকে বাঁচাতে পারেনি।
স্বামীর মৃত্যুর খবরে প্রায় আড়াই বয়সী শিশুপুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভুগছেন স্ত্রী সাবিয়া আক্তার। জীবনে বেচে থাকা আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানান স্ত্রী সাবিয়া আক্তার। তিনি বলেন, আমার স্বামীর উপার্জনেই সংসার চলতো। শ্বশুর তো বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষ। তাকে হারিয়ে এখন আমরা কি করবো, কিভাবে আমার ছেলেকে মানুষ করবো তা বুঝতে পারছি না।
একই আবেদন জানিয়ে শাশুড়ি সখিনা বেগম বলেন, তিন ঘন্টা পর্যন্ত মোবাইলে ফোন ঢুকছে। তারুপর আর মোবাইলে তাকে পাইনি। নিহত রাব্বীর বসবাসরত স্থান ভূইগড় ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার রাশিদা আক্তার পরিবারকে সমবেদনা জানাতে বাড়িতে ছুটে যান। তিনিও নিহত ফজলে রাব্বীর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানান।

শরীয়তপুরে আতিকের বাড়িতে শোক
শরীয়তপুর সংবাদদাতা : ঢাকার বনানী এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহত মির্জা আতিকের শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। গতকাল শুক্রবার সকালে লাশ শরীয়তপুর সদর উপজেলার সারেঙ্গা গ্রামে নিজ বাড়িতে আনার পর এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কান্নায় বাতাশ ভারী হয়ে ওঠে। মা পুত্র শোকে বকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তাকে শেষ বারের মতো দেখার জন্য শত শত উৎসুক জনতা ভীড় জমায়। বাদ জুমআ তার জানাযা শেষে সারেঙ্গা গ্রামের জামে মসজিদ কবর স্থানে দাফন করা হয়।
স্থানীয় ও স্ত্রীর বড় ভাই মুকুল খান জানান, শরীয়তপুর সদর উপজেলার সারেঙ্গা গ্রামের মৃত আব্দুল কাদির মির্জার ছেলে মির্জা আতিকুর রহমান বনানীর স্ক্যান অয়েল কোম্পানীতে প্রায় ১৫ বছর থেকে এক্সিকিউটিভ পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি স্ত্রী এ্যানি আক্তার পলি, চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ুয়া মেয়ে তানহা  (১০) ও ছেলে রাফিউর রহমান (৪) নিয়ে ঢাকার মানিকদি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রতিদিনের ন্যায় গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি এফ আর টাওয়ারের ১৩ তলায় কর্মস্থলে যান। অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর বেলা আনুমানিক ১টার দিকে স্ত্রীকে ফোনে ভবনে আগুন লাগার সংবাদ দেন এবং দোয়া করতে বলেন এবং তিনি বলেন পুরো ভবনে আগুন লেগে ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারছি না। হয়তো আমি আর বাঁচবো না। আমার জন্য দোয়া কর।  মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে দুপুর ১:১০টায় তার স্ত্রীর বড় ভাই মুকুল খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে শেষ কথা হয়। এ সময় তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, এখান থেকে বের হওয়ার কোন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার স্ত্রী-সন্তানদের দেখে রাখবেন। এর কিছুক্ষণ পর আতিকেুর মোবাইল সংযোগ পাওয়া যায়নি আর।
সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ন‘টায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আতিকের কাছে থাকা মোবাইল ফোনের সূত্র থেকে স্বজনদের জানায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে আতিকের লাশ নেয়া হয়েছে। সেখানে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় আতিকের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরে মুকুল খানসহ অন্যান্য স্বজনরা রাত সাড়ে ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতের লাশ সনাক্ত শেষে গ্রহণ করে। শুক্রবার সকাল ১১টায় আতিকের লাশ তার শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে পৌছে। গ্রামের বাড়িতে নেয়ার পর এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কান্নায় বাতাশ ভারী হয়ে ওঠে। মা পুত্র শোকে বকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এরপর বাদ জু’মআ নিজ গ্রামের সারেঙ্গা জামে মসজিদ মাঠে জানাযা শেষে সারেঙ্গা জামে মসজিদ কবর স্থানে দাফন করা হয়।
নিহত আতিকের স্ত্রী এ্যানি আক্তার পলি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, আগুন লাগার পর আমাকে ফোন দিয়ে বলে পলি তুমি কি বাসায় এসেছো। আমার জন্য দোয়া করো। আমার পুরো ফ্লোর অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি নিঃস্বাস নিতে পারছি না।  এই শেষ কথা আর আমার সাথে কথা হয়নি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো।

অনাগত সন্তানকে দেখে যেতে পারলেন না খুলনার লিটন
খুলনা অফিস : রাজধানীর বনানীতে এফ আর টাওয়ারের আগুনে নিহত  মো. মিজানুর রহমান লিটন (৩৩) খুলনার তেরখাদা উপজেলার কোদলা গ্রামের বাসিন্দা। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে তার লাশ নিজ বাড়িতে পৌঁছে। এ সময় স্ত্রী সন্তানসহ স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে কোদলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ছাগলাদাহ ইউপি চেয়ারম্যান দ্বীন ইসলাম এ হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়ে বলেন, বাদ জুম্মা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে লিটনের দাফন দেয়া হয়।
তিনি বলেন, লিটনের পিতা-মাতা নেই। এক ছেলে ও স্ত্রী রয়েছে। স্ত্রী আবার সন্তান সম্ভবা। আগামী ১০ তারিখ তার সন্তান প্রসবের দিন রয়েছে। কিন্তু লিটন তাকে দেখে যেতে পারল না। এই পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন লিটন। এখন লিটনের স্ত্রী সন্তানটিকে নিয়ে কীভাবে চলবে আল্লাহই ভালো জানেন।
তিনি আরও জানান, লিটনের স্ত্রীর নাম তানিয়া বেগম। তার ছেলের নাম মো. তানিম (৫)। লিটনের মৃত্যুর খবরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী।
লিটনের ভাইপো সুমন শেখ বলেন, লিটন চাচা ওই টাওয়ারের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তার লাশ বাড়িতে পৌঁছালে সবাই শোকস্তব্ধ হয়ে যান। তার স্ত্রী এমনিতেই অসুস্থ। তার ওপর লিটনের লাশ আসার পর আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। লিটনের মৃত্যুতে এ পরিবারটির আয়ের কোন উৎস থাকলো না।
উল্লেখ্য, আগুনে পুড়ে নিহত মো. মিজানুর রহমান লিটন ঢাকার বনানীতে হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস, এফ আর টাওয়ারের ১০ তলায় একটি ফার্মে কর্মরত ছিলেন। আগুনে নিহত হওয়ার পর তার লাশ রাখা ছিল সিএমএইচ হাসপাতালে। সেখান থেকে তার ভাই মো. আলম শেখ লাশ বুঝে খুলনার কোদলা গ্রামে নিয়ে আসেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ