ঢাকা, সোমবার 1 April 2019, ১৮ চৈত্র ১৪২৫, ২৪ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রশ্ন যখন কোনোভাবে বেঁচে থাকার

আশিকুল হামিদ : এই খবর এরই মধ্যে পুরনো হয়ে গেছে যে, দৃশ্যমান কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকা সত্ত্বেও বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম কেবল লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। মাছ-মাংস থেকে শাক-সবজি পর্যন্ত সবকিছুরই দাম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এসবের দাম আকাশ ছুঁই ছুঁই করছে। কোনো বাজারে ভালো কোনো মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। এতদিন শুধু ফরমালিন মেশানো মাছের কথা শোনা যেতো, এখন সেখানে নষ্ট এবং পচে যাওয়া মাছে বাজার ভরে যাচ্ছে। কিন্তু এমন কৌশলেই বরফ দিয়ে সে সব মাছ ঢেকে রাখা হচ্ছে যে, সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে নষ্ট ও পচে যাওয়া মাছ সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হচ্ছে না। মাছের অবস্থা সম্পর্কে জানা যাচ্ছে বাসায় নেয়ার পর। তাই বলে মাছের দাম কিন্তু কমছে না। ওদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মুরগি ও মাংসের দাম। এক কেজি গোরুর মাংসের দাম সাড়ে পাঁচশ’ টাকায় পৌঁছে গেছে। সব ধরনের মুরগির দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে চলে গেছে। একই অবস্থা চলছে খাশির মাংসের ক্ষেত্রেও। শুধু রাজধানীর বাজারগুলোতে নয়, সারাদেশেই সবজি এবং মাছ-মাংসের দাম কেবল বাড়ছেই।
গণমাধ্যমের কোনো কোনো রিপোর্টে পাইকার ও ফড়িয়াসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দোষারোপ করা হলেও অনুসন্ধানে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার এবং পথে পথে চাঁদাবাজির কথা শোনা যাচ্ছে। এই চাঁদা শুধু গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের নয়, পুলিশকেও দিতে হচ্ছে। পাইকার ও ফড়িয়াসহ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পুলিশ নাকি ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে ‘বিশেষ ভূমিকা’ পালনের দোহাই দিয়ে বলে বেড়াচ্ছে, আগের রাতে ব্যালট বাক্স বোঝাই করে তারাই যেহেতু সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে সেহেতু তাদের তথা পুলিশের বিরুদ্ধে নালিশ করে কোনো লাভ হবে না। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের এই যুক্তি নাকি অস্বীকারও করা যাচ্ছে না! ফলে একদিকে গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি পুলিশকে বিপুল অর্থে চাঁদা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে একই চাঁদার অজুহাত দেখিয়ে যথেচ্ছভাবে দাম বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা। দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে তারা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ নাকি দেশের যেখানে-সেখানে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে দিচ্ছে। আটকে রাখছে এমনকি কয়েকদিন পর্যন্তও। সেজন্যই নাকি শাক-সবজি নষ্ট হচ্ছে, মাছও পচে যাচ্ছে। পচে যাওয়া সেসব মাছই ব্যবসায়ীরা বাজারে বিক্রি করছে।
এভাবেই রাজধানীসহ দেশের সকল বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি জাতীয় দৈনিক সম্প্রতি শিরোনাম করেছে, ‘দ্রব্যমূল্যে দিশেহারা মানুষ’। এর দু’দিনের ব্যবধানে অন্য একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল, ‘খরচের চাপে হিমশিম জীবন’। দুটি রিপোর্টের মূলকথায় কোনো পার্থক্য নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের লাফিয়ে বেড়ে চলা দামের উল্লেখ করে দৈনিক দুটি জানিয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে রাজধানী ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ ২০০৯ সালে ১০০ টাকায় যা কিছু কেনা যেতো সেগুলোই ২০১৮ সালে কিনতে লেগেছে ১৮১ টাকা। রিপোর্টে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও বাসভাড়ার মতো কয়েকটি খাত বা বিষয়ের মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের উল্লেখ করা হয়েছে। এতে জানা গেছে, ২০০৯ সালে রাজধানীর সাধারণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দুই কক্ষের একটি বাসার মাসিক ভাড়া ছিল ১০ হাজার ৮০০ টাকা; ২০১৮ সালে সে একই বাসার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৭০০ টাকা। ২০০৯ সালে ৩২০ টাকায় যে সুতি শাড়ি পাওয়া যেতো, ২০১৮ সালে সে একই শাড়ির জন্য দিতে হয়েছে ৮০০ টাকা। অনেকাংশে একই হারে বেড়েছে অন্য সব পণ্যের দামও।
এভাবে পণ্যমূল্যের সঙ্গে মানুষের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা রিপোর্টে ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘সবচেয়ে ব্যয়বহুল’ নগরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এ এক বিরাট ‘সার্টিফিকেট’ই বটে! অন্যদিকে এমন একটি ‘সার্টিফিকেটের’ জন্য সবদিক থেকে মূল্য গুনতে হচ্ছে মধ্যবিত্তসহ সাধারণ মানুষকে। কারণ চালসহ নিত্যপণ্যের দাম শুধু যে বেড়েছে তা নয়, বেড়েছেও লাফিয়ে লাফিয়ে। সরকারের সকল অভিযানই ব্যর্থ ও লোক দেখানো হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, অন্যদিকে বাজার থেকে গেছে অনিয়ন্ত্রিত। একই অবস্থা এখনো চলছে। বড়কথা, অবস্থায় শুভ কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সব পণ্যের দাম বেড়ে চললেও মানুষের আয়-রোজগার কিন্তু বাড়েনি। তাদের জন্য চাকরি বা ব্যবসারও সুযোগ সৃষ্টি করেনি সরকার। সে কারণে সাধারণ মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। তাদের আসলে নাভিশ্বাস উঠেছে। জানা গেছে, তিন কোটির বেশি মানুষ এরই মধ্যে দু’ বেলা পেট ভরে খেতে পারছে না। ফলে তথ্যাভিজ্ঞরা এমনকি দুর্ভিক্ষের আশংকাও করছেন। কেউ কেউ বলেছেন, দেশে আসলে অঘোষিত দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভীতিকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তা সত্ত্বেও মানুষকে বাজারে যেতেই হচ্ছে। বেশি দাম দেয়ার সাধ্য না থাকলেও বাজারে না গিয়ে পারছে না তারা। এমন অবস্থায় সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠেছে, দেশে আদৌ কোনো সরকার রয়েছে কি না। কারণ, কোনো পণ্যের দামই রাতারাতি বাড়েনি। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে জানা গেছে, দাম বেড়ে আসছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কিন্তু কোনো পর্যায়েই ধমক দেয়ার এবং লম্বা আশ্বাস শোনানোর বাইরে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও সরকারকে সততার সঙ্গে নড়াচড়া করতে দেখা যায়নি। বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সরকার বাস্তবে সম্ভাবনাময় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ ঘটনাক্রমে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ভয় দেখালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনো হচ্ছে না। দাম কমছে না কোনো পণ্যেরই।
এমন অবস্থায় ভুক্তভোগী মানুষ না ভেবে পারছে না যে, কথিত ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের অতি চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে বলেই কোনো ধমকে কান পর্যন্ত দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। আর অতি চমৎকার সম্পর্কের পেছনে যে চাঁদা ও কমিশনই প্রধান ফ্যাক্টর বা নির্ধারকের ভূমিকা রাখে সে কথাটাও কাউকে বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এমনকি প্রকাশ্যেও দৃশ্যপটে এসেছেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে তৎপর হয়ে উঠেছে পুলিশের লোকজন। এ ধরনের সহজবোধ্য কিছু কারণে ব্যবসায়ীরাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে যথেচ্ছভাবেই। দামও চলে যাচ্ছে মানুষের নাগালের অনেক বাইরে। এক কথায় বলা যায়, পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো সফলতাই দেখাতে পারেনি সরকার। এমন অবস্থার মাশুল গুনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের তো বটেই, নাভিশ্বাস উঠছে এমনকি মধ্যবিত্তদেরও।
প্রসঙ্গক্রমে জানানো দরকার, জীবনযাত্রার যে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে তা কিন্তু কেবলই চাল-আটা-তেল এবং মাছ-মাংস ও সবজি ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের জন্য বাড়েনি। এখানে বাসা ভাড়া, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, গ্যাস বিদ্যুৎ ও পানির বিল থেকে কেব্ল টেলিভিশনের জন্য ডিশ অ্যান্টিনার সংযোগ ফি ও মাসিক ভাড়া এবং কাজের লোকের বর্ধিত বেতন পর্যন্ত সবকিছু হিসাবে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়েই বেড়ে চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অর্থাৎ মূল্য ও ব্যয় শুধু খাদ্যের বাড়ছে না। এসবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যানবাহনের ভাড়া যেমন বাড়ানো হচ্ছে তেমনি বাড়ানো হচ্ছে বাড়ি ভাড়াও। অর্থাৎ বিক্রেতা থেকে বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ যানবাহনের মালিকরা তো বটেই, বাড়িওয়ালারাও যার যার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য দাম বাড়িয়ে চলেছেন। মাঝখান দিয়ে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতাসীনদের কথা অবশ্য আলাদা। কারণ, মানুষের যখন জিহবা বেরিয়ে পড়ছে তখনও কল্পিত সফলতার ঢেঁকুর তুলে বেড়াচ্ছেন তারা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, অসৎ ও মুনাফাখোর টাউট ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় ও সহযোগিতা দেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত কঠোরতার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা এবং পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনা। চাল, চিনি, সয়াবিন ও আটার মতো জরুরি পণ্যগুলো ওএমএস-এর মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা নেয়া হলেও মানুষের উপকার হতে পারে। মনিটরিং করে যথেচ্ছভাবে দাম বাড়ানোর কার্যক্রমকে প্রতিহত না করা গেলে পণ্যের দাম আরো বাড়তেই থাকবে এবং সরকারের কথিত ‘কঠোর নজরদারি’র কোনো সুফলই মানুষ ভোগ করতে পারবে না। কারণ, সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভীতিকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মূল্যস্ফীতির দাপটে কমে যাচ্ছে মানুষের প্রকৃত আয়। কোনো একটি প্রসঙ্গেই এখন আর শতকরা হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। বলা যাচ্ছে না, অমুক পণ্যের দাম এত শতাংশ বেড়েছে।
এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে পারে না। ওদিকে এগিয়ে আসছে পবিত্র রমযান। সে কারণে সরকারের উচিত কঠোরতার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার ও পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনার পাশাপাশি আর্থিক খাতের দুর্নীতি কমিয়ে আনা। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এমন হওয়া দরকার দেশ যাতে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
এসব বিষয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দেশপেমিক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও সরকারের পরামর্শ করা উচিত। কারণ, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া মানুষের কোনো উপায় থাকে না। কথাটা আমরা অবশ্য এখনই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই না!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ